বেহেশতের মালিক আল্লাহ, কোনো দল তা দেবার ক্ষমতা রাখে না : তারেক রহমান


সিলেটে বিএনপির নির্বাচনী জনসভায় বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, বেহেশত-দোজখের মালিক আল্লাহ, কোনো দল তা দেবার ক্ষমতা রাখে না। সিলেট সরকারি আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে বিশাল জনসমূদ্রে একটি রাজনৈতিক দলের বেহেশত দেবার মিথ্যা প্রতিশ্রুতির প্রতি ইঙ্গিত করে তিনি একথা বলেন।
তারেক রহমান তাঁর বক্তব্য’র মাঝখানে একজন হাজীকে মঞ্চে ডেকে নিয়ে তাঁর কাছে জানতে চান, কাবার মালিক, বেহেশত, দোজখের মালিক কে। তিনি বলেন আল্লাহ । এরপর তারেক রহমান তাঁকে বসতে বলে উপস্থিত জনতার উদ্দেশ্যে বলেন, আপনারা সবাই সাক্ষ দিলেন, কাবার মালিক আল্লাহ, বেহেশতের মালিক আল্লাহ, দোজখেরও মালিক আল্লাহ, সবকিছুর মালিক আল্লাহ। যেটার মালিক আল্লাহ সেটা কি দেয়ার ক্ষমতা কেউ রাখে? রাখে না। তাহলে নির্বাচনের আগেই একটি দল এই দিব, ওই দিব, টিকেট দেবার কথা বলছে। যেটার মালিক মানুষ না, সেটা সে দেবার কথা বলে শিরক করা হচ্ছে। দেবার মালিক একমাত্র আল্লাহ। সবকিছুর ব্যাপারে আল্লাহর অধিকার। কাজেই আপনাদেরকে ঠকাচ্ছে। নির্বাচনের পরেও আপনাদেরকে ঠকাবেন। তারা মানুষকে শুধু ঠকাচ্ছেই না, যারা মুসলমান তাদেরকে তারা শিরকই করাচ্ছে, নাইজুবিল্লাহ।
বিএনপির চেয়ারম্যান ওই দলটির প্রতিষ্ঠা ও স্বাধীনতা সংগ্রামে ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। তিনি উপস্থিত জনতার উদ্দেশ্যে বলেন, কেউ কেউ বলে ওমুককে দেখেছি, তমুককে দেখেছি, এবারে একে দেখেন। ১৯৭১ সালে লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে স্বাধীন হয়েছে আমাদের এই প্রিয় মাতৃভূমি। সেই মাতৃভূমিকে স্বাধীন করার সময় অনেকের ভূমিকা আমরা দেখেছি, যাদের ভূমিকার কারণে এদেশের লক্ষ লক্ষ ভাইয়েরা শহীদ হয়েছেন। এদেশের লক্ষ লক্ষ মা বোনেরা সম্ভ্রম হারিয়েছেন। তাদেরকে তো বাংলাদেশের মানুষ দেখেই নিয়েছে। এই কুফরির বিরুদ্ধে, এই হটকারিতার বিরুদ্ধে, এই মিথ্যার বিরুদ্ধে আমাদেরকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।
তিনি বলেন, আমরা দেশকে স্বৈরাচার থেকে মুক্ত করেছি। এখন মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। শুধু কথা বলার অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পারলেই হবে না। মানুষকে স্বাবলম্বী করে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর ব্যবস্থা করতে হবে। প্রতিটি মানুষ যেতে খেয়ে-পড়ে ভালোভাবে বেঁচে থাকতে পারে, প্রতিটি মানুষ যাতে নিরাপদে থাকতে পারে, সেটিই হচ্ছে টেক ব্যাক বাংলাদেশ। আমরা বিগত ১৫ বছরে দেখেছি, ওমুককে বলে এসেছি, তমুককে ক্ষমতায় রাখার জন্য। কী বলেছিল না? সেই জন্য বলেছি, দিল্লি নয়, পিন্ডি নয়। আমরা দেখেছি, ১৯৭১ সালে তারা কাদের সাথে লাইন দিয়েছিল। যাদের কথা একটু আগে বললাম। যারা মিথ্যা কথা বলে মানুষকে ঠকাচ্ছে। আমরা দেখেছি তাদের আস্তানা কোথায়। সেজন্য বলেছি, যেমন দিল্লি নয়, তেমন পিন্ডি নয়, নয় অন্য কোনো দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ। আমরা বিশ্বাস করি, দেশের মানুষই হচ্ছে দেশের সকল ক্ষমতার উৎস। সেজন্য আমরা দেশের উন্নয়ন ও দেশের মানুষের ভাগ্য উন্নয়নে বিশ্বাস করি। শুধু ভোট এবং কথা বলার অধিকার নয়, বিএনপি চায় দেশের মানুষকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করে দিতে। যুব সমাজের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে চাই। লক্ষ লক্ষ ভাই বোনেরা বেকার হয়ে বসে আছেন, আমরা তাদেরকে বেকার রাখতে চাই না।
বিএনপির ধানের শীষের প্রথম জনসভায় তারেক রহমান বলেন, ‘আজকে লক্ষ লক্ষ মানুষ এই মাঠে সমবেত হয়েছেন। এই পরিবেশ ও সবার অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে কয়েক হাজার মানুষকে জীবন দিতে হয়েছে। বিগত ১৫ বছরে ইলিয়াস আলীকে গুম করা হয়েছে, আমরা হারিয়েছি জুনাইদকে, দিনারকে। বিএনপির লক্ষ লক্ষ মানুষ খুন, মামলা ও হয়রানীর শিকার হয়েছেন। ফ্যাসিস্ট আমলে উন্নয়নের নামে মানুষ শুধু লুটপাট দেখেছে।
উদাহারণ দিয়ে তিনি বলেন, ‘২০০৫ সালে বন্যার সময় সুনামগঞ্জ এসেছিলাম, তখন আসতে মাত্র ৫ ঘন্টা সময় লেগেছিল, এখন আসতে ১০ ঘন্টা লাগে। এতো সময় লাগে না লন্ডন যেতেও। তথাকথিত নির্বাচন দিয়ে তারা শুধু ভোটের অধিকার, কথা বলার অধিকার কেড়ে নেয়নি। তারা উন্নয়নের নামে দেশের অর্থ বিদেশে নিয়ে গেছে।’
তিনি বলেন, ‘১২ ফেব্রুয়ারি ধানের শীষ নির্বাচিত হলে স্বৈরাচার মুক্ত দেশে গণতন্ত্রের যাত্রা শুরু হবে।’
তারেক রহমান বলেন, ‘বিএনপি দেশের এ অবস্থার পরিবর্তন করতে চায়। কৃষক কার্ড দিয়ে কৃষকের পাশে দাড়াতে চায়, ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে দেশের প্রত্যেকটি পরিবারের নারী পুরুষকে সাবলম্বী করে গড়ে তুলতে চাই। বেকার যারা আছেন, তাদেরকে আর বেকার থাকতে দিব না। তাদেও জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে কাজে লাগাবো।
তারেক রহমান স্লোগান ধরে বলেন, করবো কাজ, গড়বো দেশ সবার আগে বাংলাদেশ। এজন্য সবাইকে ধানের শীষের ভোট দেওয়ার আহবান জানান।
বিএনপির চেয়ারম্যান বলেন, শহীদ জিয়াউর রহমানের সময় খাল খনন কর্মসূচি শুরু হয়েছিল। এখন আমরা আবার শুরু করতে চাই। এতে কৃষকরা যেমন লাভমান হবেন, তেমনিভাবে ওপার থেকে পানি ছেড়ে দিলেও বন্যায় ভেসে যাবো না। তারেক রহমান বলেন, আমরা সবসময় বলি দিল্লি নয়, পিন্ডি নয়, নয় অন্য দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ। টেইক ব্যাক বাংলাদেশ।
২২ জানুয়ারি ১২টা ৫৮ মিনিটে তারেক রহমান বক্তব্য শুরু করেন। ১টা ২৫ মিনিটে তাঁর বক্তব্য শেষ হয়। এর আগে সকাল ১০টা ৫০ মিনিটের দিকে জনসভা শুরু হয়। স্থানীয় নেতারা মঞ্চে বক্তব্য দেওয়া শুরু করেন। সিলেট জেলা ও মহানগর এবং সুনামগঞ্জ জেলা বিএনপির উদ্যোগে এ সভার আয়োজনে সভাপতিত্ব করেন সিলেট জেলা বিএনপির সভাপতি আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী। বিশেষ অতিথি বক্তব্য দেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। জনসভা সঞ্চালনা করেন মহানগর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি রেজাউল হাসান কয়েস লোদী ও মহানগরের সাধারণ সম্পাদক ইমদাদ হোসেন চৌধুরী।
শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব হুমায়ুন কবির, সাংগঠনিক সম্পাদক জি কে গউছ, সহসাংগঠনিক সম্পাদক মিফতাহ সিদ্দিকী, কলিম উদ্দিন মিলন, আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক আবদুর রহমান, শাহরিয়ার হোসেন চৌধুরী, আবুল কাহের শামীম, সিলেট মহানগর ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক ফজলে রাব্বি এহসান প্রমুখ।
তারেক রহমান সিলেট ছাড়াও আজ আরও ছয়টি জেলার ছয়টি স্থানে নির্বাচনী জনসভায় যোগ দেবেন। সিলেট সরকারি আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে প্রধান অতিথির ভাষণ শেষে তিনি সড়কপথে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হবেন। পথিমধ্যে তিনি সিলেট-ঢাকা মহাসড়কসংলগ্ন ছয় জেলায় আয়োজিত সভায় ভাষণ দেবেন। এর মধ্যে প্রথমে মৌলভীবাজারের সদর উপজেলার শেরপুরের আইনপুর খেলার মাঠে এবং পরে হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জ উপজেলার প্রস্তাবিত নতুন উপজেলা পরিষদের মাঠে আয়োজিত সভায় যোগ দেবেন।
পরে তারেক রহমান ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল উপজেলার কুট্টাপাড়া ফুটবল খেলার মাঠে, কিশোরগঞ্জের ভৈরব স্টেডিয়ামে, নরসিংদীর পৌর পার্কে এবং নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার অথবা রূপগঞ্জ গাউসিয়া এলাকায় আয়োজিত সমাবেশে যোগ দেবেন। এসব জনসভায় তিনি সংশ্লিষ্ট জেলাগুলোর বিএনপি-মনোনীত ও সমর্থিত প্রার্থীদের আনুষ্ঠানিকভাবে পরিচয় করিয়ে দেবেন।
















