গণপিটুনিতে হত্যার শিকার অলিগলির কসাই ও মুসলিমরা

ভারতে ব্যবসায়ীদের ‘মায়ের’ মাংস রপ্তানির সরকারি লাইসেন্স

fec-image

পৃথিবীর চতুর্থ বৃহত্তম গরুর মাংস রপ্তানিকারক দেশ কোনটি? উত্তর শুনে মাথা ঘুরবে, ভারত। হ্যাঁ, সেই ভারত, যেখানে গরু ‘মাতা’, যেখানে গোমাংস সন্দেহে পেহলু খান, রকবার খান, তাবরেজ আনসারি, মুহাম্মদ আখলাকদের পিটিয়ে প্রাণ নেওয়া হয়েছে, যেখানে রাস্তায় কসাই ভাইকে বেঁধে রেখে ভিডিও ভাইরাল করা হয়। সেই ভারতই ২০২৪ এ ৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের গরুর মাংস রপ্তানি করেছে।

ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া, মিশর, সৌদি আরব, এমনকি ইউরোপের প্লেটে যাচ্ছে ভারতীয় গরুর মাংস। প্রশ্ন একটাই, গোমাতা যদি এতই পবিত্র, তাহলে এত মাংস বের হয় কোত্থেকে?

এখানেই আসল গল্প। ভারতের মাংস সরবরাহ চেইন একসময় ছিল লক্ষ লক্ষ ছোট কসাইয়ের হাতে, মুসলিম, দলিত, কুরেশি, পিছিয়ে পড়া হিন্দু পরিবার, যাঁরা প্রজন্মের পর প্রজন্ম এই পেশায়। তাঁরা কৃষকের কাছ থেকে বুড়ো বা অসুস্থ গরু কিনতেন, পাড়ার দোকানে জবাই করতেন, স্থানীয়ভাবে বিক্রি করতেন। ছোট মাপের কিন্তু লক্ষ লক্ষ পরিবারের রুটিরুজি।

তারপর শুরু হলো নতুন খেলা। ২০১৪ এর পর থেকে রাস্তায় আবির্ভাব ঘটলো গোরক্ষক বাহিনীর, ট্রাক থামানো, কসাইকে পেটানো, কখনো গণপিটুনিতে হত্যা। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রতিবেদনে ২০১৫ থেকে ২০২৩ এর মধ্যে শুধু গোমাংস সন্দেহে ৬০ এর বেশি গণপিটুনির ঘটনা নথিভুক্ত, ভিকটিমের ৮০ শতাংশই মুসলিম।

প্রতিটি লিঞ্চিং এর ভিডিও ভাইরাল হলো, ভয় ছড়িয়ে পড়লো, ছোট কসাই দোকান বন্ধ করলেন, কৃষক বুড়ো গরু বিক্রি করার জায়গা পেলেন না, পাড়ায় পাড়ায় গরু ছেড়ে দিলেন, স্থানীয় বাজার ভেঙে পড়লো। ঠিক এই সময়ে দৃশ্যপটে আবির্ভাব হলো বিশাল কর্পোরেট কসাইখানার।

অলকবির এক্সপোর্টস, আল্লানা গ্রুপ, এমকেআর ফ্রোজেন ফুডস, এইচএমএ অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ, বেশিরভাগের লাইসেন্স আছে রাজনৈতিক সংযোগ থাকা শিল্পপতি পরিবারের হাতে।

এই কোম্পানিগুলো সস্তায় কৃষকের কাছ থেকে গরু কিনছে, শিল্প-স্কেলে জবাই করছে, প্যাকেট করে রপ্তানি করছে। কর্পোরেট কসাইখানায় গরু জবাই হলে কেউ গোরক্ষক হয়ে রাস্তায় নামে না, ভিডিও ভাইরাল হয় না, গণপিটুনি হয় না। ধর্মের পবিত্রতা থামে কারখানার গেটে।

এটি একটি পরিচিত অর্থনৈতিক কৌশল, ইংরেজিতে ‘মার্কেট ফোরক্লোজার ট্যাকটিক’। ছোট প্রতিযোগী হটিয়ে দিয়ে বড় ব্যবসায়ী একচেটিয়া দখলে নেয় পুরো বাজার। ভারতে এই কৌশলের সাথে ধর্মের নাম জুড়ে দেওয়া হয়েছে, যেন সাধারণ মানুষ বুঝতে না পারেন কী হচ্ছে। মজার ব্যাপার আরও আছে, ২০১৭ সালে যখন গোরক্ষা সবচেয়ে তীব্র, তখনই ভারতের গরুর মাংস রপ্তানি রেকর্ড গড়েছে। ২০১৪ থেকে ২০২৪ এর দশ বছরে রপ্তানি প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। যত গোরক্ষা, তত রপ্তানি, হিসাবটা মেলে? আমজনতা চিৎকার করছে ‘জয় গোমাতা’, আর সেই গোমাতা সাইলেন্টলি প্যাকেট হয়ে বিদেশের প্লেটে যাচ্ছে।

পেহলু খানের পরিবার আজও আদালতে ঘুরছে, তাবরেজ আনসারির স্ত্রী আজও বিচার পাননি, মুহাম্মদ আখলাকের ছেলে দশ বছর পরও স্বাভাবিক হতে পারেননি। আর সেই একই সময়ে অলকবির, আল্লানার মালিকেরা বিলিয়ন ডলারের সাম্রাজ্য গড়েছে। সাধারণ হিন্দু ভাই বুঝতে পারে না, তিনি ধর্মের আবেগে যাকে সমর্থন দিচ্ছে, সে আসলে তাঁর প্রতিবেশী মুসলিম কসাইয়ের পকেট কেটে বিশাল কর্পোরেটের পকেট ভরছে। তাঁর ছেলেও বেকার হচ্ছে, তাঁর কৃষক বাবাও ঠকছে, পুরো ছোট অর্থনীতি মরছে। শুধু মুসলিম মরছে না, ধর্মের সাথে এর কোনো সম্পর্ক নেই, কিন্তু ধর্মবিদ্বেষের সাথে আছে শত হাজার।

ফুলের মালা পরা গোমাতার গায়ে সিঁদুর ঢালা হচ্ছে এক হাতে, আর অন্য হাতে কর্পোরেট লাইসেন্স ইস্যু হচ্ছে। জনতা ভক্তিতে কাঁদছে, ব্যবসায়ী হাসছে রপ্তানি চালানে। এ এক চমৎকার পলিটিক্যাল ইকোনমি অফ ক্রোনি ক্যাপিটালিজমের জ্বলন্ত উদাহরণ, ধর্ম এখানে অস্ত্র নয়, ধর্ম এখানে পর্দা, পর্দার পেছনে চলছে পরিকল্পিত একচেটিয়া দখলদারি।

হে আল্লাহ, ভারতের নির্যাতিত মুসলিম, দলিত ও সাধারণ মানুষকে তোমার হেফাজতে রাখো, সাধারণ হিন্দু ভাইদের চোখ খুলে দাও যেন আসল খেলাটা বুঝতে পারেন, ধর্মের নামে চলা এই কর্পোরেট লুটতরাজ থামিয়ে দাও, আর আমাদের সাহস দাও সত্য বলার, যত গালি আসুক, যত হুমকি আসুক। আমিন।

লেখক : মানবিক কর্মী, অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট, মহাপরিচালক, হাফেজ্জী চ্যারিটেবল সোসাইটি অব বাংলাদেশ।

Print Friendly, PDF & Email
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও পড়ুন