বনফুল থেকে মাসে ৩ লাখ টাকার অবৈধ সম্মানি নিচ্ছেন প্রসেনজিৎ চাকমারা


রাজধানীর ‘বনফুল আদিবাসী গ্রিনহার্ট কলেজে’ প্রচলিত নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে প্রতি মাসে তিন লাখ টাকার অবৈধ সম্মানি নিচ্ছেন ট্রাস্টিরা। গত এক যুগে তাঁরা এভাবে চার কোটি টাকার বেশি সম্মানি নিয়েছেন।
ট্রাস্টেদের এপ্রিলের সম্মানি নেওয়ার একটি শিটে দেখা যায়, প্রসেনজিৎ চাকমা ৮০ হাজার টাকা, ধনমণি চাকমা ৬৫ হাজার টাকা, রিয়েল দেওয়ান ৬৫ হাজার টাকা, কামনা দেওয়ান ৫০ হাজার টাকা সম্মানি নিয়েছেন। আরেকজন ট্রাস্টি ৬৫ হাজার টাকা সম্মানি নিলেও তিনি আগে থেকেই প্রতিষ্ঠানে চাকরি করছেন। প্রতি মাসে সম্মানি নিলেও ট্রাস্টিরা কাগজপত্রে স্বাক্ষর করেন না। এ ব্যাপারে বাধা দিলে তাঁরা শিক্ষক-কর্মকর্তাদের চাকরি ‘খেয়ে ফেলার’ হুমকি দেন।
রাজধানীর মিরপুরে ২০০৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় এই কলেজটি। প্রতিষ্ঠানটিতে ঢাকা শিক্ষা বোর্ড অনুমোদিত নিয়মিত গভর্নিং বডি রয়েছে, যাদের প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনা করার কথা।
কিন্তু নিয়ম-নীতি না মেনে গভর্নিং বডিকে পাশ কাটিয়ে প্রতিষ্ঠানটির হর্তাকর্তা কয়েকজন সদস্য মাসে তিন লাখ টাকার সম্মানি নেন, যা প্রচলিত আইন অনুযায়ী অবৈধ। এমনকি বিদেশে বসবাস করেও সম্মানি নিচ্ছেন ট্রাস্টের সাধারণ সম্পাদক। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান বলেন, ‘ট্রাস্ট মানে ফ্রি অব কস্ট। অর্থাৎ ট্রাস্টিরা বিনামূল্যে সেবা দেবেন। কিন্তু ট্রাস্টিরা যদি অর্থ নেন, সেটা সঠিক হবে না। আমরা কোনোভাবেই এই অনৈতিকতা সমর্থন করি না। যদি কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এটা হয়ে থাকে, তাহলে আমরা খোঁজখবর নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব।’
নাম প্রকাশ না করে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের একজন আইনজীবী বলেন, ‘যদি ট্রাস্টিরা ভিন্ন নামে বেতন বা সম্মানি নিয়ে থাকেন, তাহলে তা অবৈধ। বোর্ডের তদন্তে যদি ব্যাপারটি প্রমাণিত হয়, তাহলে তাঁরা আগে যত টাকা নিয়েছেন, সবই ফেরত দিতে হবে।’
সূত্র জানায়, ২০১৪ সালে প্রধান ট্রাস্টি ও গভর্নিং বডির সভাপতি বৌদ্ধ ভিক্ষু ভেন. প্রজ্ঞানন্দ মহাথের ধর্মীয় সম্মেলনে কানাডা ও আমেরিকায় যান। এ সময় তিনি ট্রাস্টের সাধারণ সম্পাদক প্রসেনজিৎ চাকমাকে সাময়িকভাবে দায়িত্ব দিয়ে যান। এই সুযোগে প্রসেনজিৎ চাকমা একটি বৈঠক ডাকেন। সেখানে ট্রাস্টিদের একেকজনের নামের সঙ্গে একেকটি পদবি দিয়ে প্রত্যেকের জন্য মোটা অঙ্কের সম্মানি নির্ধারণ করা হয়।
এই কমিটিতে প্রধান ট্রাস্টি ও গভর্নিং বডির সভাপতি ভিক্ষু ভেন. প্রজ্ঞানন্দ মহাথেরকে করা হয় প্রধান নির্বাহী। ট্রাস্টি প্রসেনজিৎ চাকমা নিজের পদবি ধারণ করেন পরিচালক, অর্থ ও নিয়োগ; ধনমণি চাকমার পদবি বাজেট, কেনাকাটা ও ট্রাস্ট ব্যবস্থাপনা পরিচালক; রিয়েল দেওয়ানের পদবি উন্নয়ন পরিচালক; প্রীতিময় চাকমা হোস্টেল ব্যবস্থাপক এবং কামনা দেওয়ানের পদবি মহিলাবিষয়ক পরিচালক। অথচ ২০১৪ সালের পদবি ও সম্মানির রেজুলেশনে এখনো স্বাক্ষর করেননি প্রধান ট্রাস্টি ও গভর্নিং বডির সভাপতি। এর পরও ১২ বছর ধরে অনেকটা গায়ের জোরেই মোটা অঙ্কের সম্মানি নিয়ে যাচ্ছেন কয়েকজন ট্রাস্টি।
গত ২৫ জুন ট্রাস্টিদের কাছে পাঠানো প্রতিষ্ঠানটির এক চিঠিতে বলা হয়, অনেকেই প্রাপ্তি স্বীকার পত্রে স্বাক্ষর না করে দীর্ঘ সময় ধরে বেতন গ্রহণ করছেন, যা বিধিসম্মত নয়। যাঁরা অতি সত্বর স্বাক্ষর করবেন না, পরবর্তী মাসে তাঁদের বেতন-বিল হবে না।
প্রসেনজিৎ চাকমা জাপানে বসবাস করলেও তিনি বর্তমানে দেশে রয়েছেন। গতকাল মোবাইল ফোনে তাঁকে এ বিষয়ে বিস্তারিত বলে বক্তব্য নিতে চাইলে তিনি পরে কথা বলবেন বলে সংযোগ কেটে দেন।
এ বিষয়ে ধনমণি চাকমা এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘আমরা এই প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা। কাজের বিনিময়ে সম্মানি নিচ্ছি। এখন এটা বৈধ না অবৈধ, তা বলতে পারব না।’ তবে তিনি তাঁর সঙ্গে দেখা করে কথা বলার জন্য বারবার অনুরোধ করেন। আরেক ট্রাস্টি রিয়েল দেওয়ানকে ফোন করলে ধরেন তাঁর স্ত্রী কামনা দেওয়ান। তিনি এ বিষয়ে কথা বলতে রাজি হননি।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, প্রসেনজিৎ চাকমা পাঁচ বছর ধরে চাকরিসূত্রে জাপানে বসবাস করছেন। ধনমণি চাকমা মিরপুরের আইডিয়াল গার্লস ল্যাবরেটরি স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষক। রিয়েল দেওয়ান ও কামনা দেওয়ান স্বামী-স্ত্রী। তাঁদেরও কলেজে তেমন দেখা যায় না। তবে মাস শেষে তাঁরা সম্মানি নিতে নিয়মিতই আসেন। যদিও প্রীতিময় চাকমা নিয়মিত হোস্টেল দেখাশোনা করেন। সার্বক্ষণিক উপস্থিত থেকে প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনা করেন ভিক্ষু ভেন. প্রজ্ঞানন্দ মহাথের।
ট্রাস্ট আইনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে, ট্রাস্টি হিসেবে কাজ করার জন্য কোনো পারিশ্রমিক বা মাসিক সম্মানি দাবি করা যাবে না। আইনের ধারা-৩২-এ বলা হয়েছে, ট্রাস্টি ট্রাস্ট পরিচালনার জন্য যৌক্তিক ও প্রকৃত খরচ (যেমন—ভ্রমণ, নথিপত্র, প্রশাসনিক ব্যয়) ট্রাস্টের তহবিল থেকে নিতে পারেন; কিন্তু এটি সম্মানি বা বেতন নয়।
জানা গেছে, দেড় হাজারের কম শিক্ষার্থীর এই প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে টেনেটুনে চলছে। প্রতিষ্ঠানটির ৮৬ জন শিক্ষক ও ২০-২৫ জন কর্মচারীর বেতন দিতে বেগ পেতে হয়। এরপর প্রতি মাসের শুরুতেই ট্রাস্টি বা তাঁদের প্রতিনিধিরা তাঁদের সম্মানির টাকা নিয়ে যান। ফলে শিক্ষকদের এক মাসের বেতন অন্য মাসের শেষে দিতে হয়। শিক্ষকদের গত মে মাসের বেতনও জুন মাসের ২৫ তারিখে দেওয়া হয়। অথচ ট্রাস্টিরা মাসের ২ তারিখেই তাঁদের সম্মানি নিয়ে গেছেন।
কলেজটির প্রধান ট্রাস্টি ও কলেজ গভর্নিং বডির সভাপতি ভেন. প্রজ্ঞানন্দ মহাথের এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘আমার অবর্তমানে প্রসেনজিৎ চাকমা ট্রাস্টিদের সম্মানি নির্ধারণ করে কলেজের তহবিল থেকে প্রতি মাসে টাকা গ্রহণ শুরু করেন। আড়াই মাস পর আমি দেশে ফিরে ওই কার্যবিবরণীতে সই করিনি। আমার মনে হয়েছে, ট্রাস্ট বিধি মোতাবেক ট্রাস্টিরা মাসিক সম্মানির নামে কোনো রকম অর্থ গ্রহণ করতে পারেন না। কিন্তু ট্রাস্টিদের এই সম্মানি বন্ধে আমি অনেক চেষ্টা করেও সফল হইনি। তাঁরা খুবই সংঘবদ্ধ। আমি নিজেই অনেকটা অসহায় অবস্থার মধ্যে আছি।’
উৎস : কালেরকণ্ঠ অনলাইন
















