মিতালী চাকমা ধর্ষণ ও সুশীল সমাজ এবং নারী নেত্রীদের দ্বিচারিতা

মাহের ইসলাম
স্থানীয় এক ডিগ্রী কলেজের তৃতীয় বর্ষের এক ছাত্রীকে দীর্ঘদিন ধরেই প্রস্তাব দেয়া হচ্ছিল একটি রাজনৈতিক দলে যোগ দেয়ার। কিন্তু মেয়েটি সেই প্রস্তাব অগ্রাহ্য করে চলছিল। কে জানে, কি ছিল তার মনে? হতে পারে লেখাপড়া করে মেয়েটি একটি উন্নত জীবনের স্বপ্ন দেখতো। তাই সে অন্ধকার জগতের, অনিশ্চিত জীবনের, ঝুঁকিপূর্ণ কাজের, দেশ, রাষ্ট্র ও সমাজ বিরোধী, পাপময় কোনো জীবনের সাথে নিজেকে জড়াতে চায়নি।
এমন হতে পারে, পড়ার খরচ যোগাতে বাবা-মা আর বড় বোনের কষ্টের ছবি তার মানসপটে এমনভাবে গ্রোথিত ছিল যে, পড়ালেখার বাইরে অন্য কোনো কিছুতে জড়ানো মানেই নিজের দরিদ্র ও সমস্যা জর্জরিত পরিবারের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতার সামিল বলে বিবেচিত হয়েছিল। অথবা বাবা-মায়ের কষ্টার্জিত উপার্জনে পড়তে এসে লেখাপড়ার বাইরে অন্য কোন কিছুতে জড়াতে মন সায় দেয়নি।

লেখাপড়াকে ধ্যান-জ্ঞান হিসেবে গ্রহণ করে সে হয়ত ভেবেছিল, লেখাপড়ার পিছনেই সমস্ত প্রচেষ্টা নিয়োগ করবে যেন সকলের মুখ উজ্জল করতে পারে। আশা ছিল, একদিন দেশবাসী তার নাম জানবে। তার অর্জনে পিতা-মাতার দুঃখক্লিষ্ট মুখে ফুটবে গর্বের হাসি, গর্বিত হবে ভাই-বোন, সহপাঠিরা, এমনকি এলাকার সকলে।

দেশবাসীর কাছে তার নাম কতটা পৌঁছেছে, সেটা জানা না থাকলেও এলাকাবাসীর কাছে তার নাম এখন পৌঁছে গেছে সেটা নিশ্চিত। তেমনি এটাও নির্দ্বিধায় বলা যায় যে, গর্বিত হওয়ার পরিবর্তে কন্যার কল্যাণে তার পিতা-মাতা এখন প্রাণ হারানোর শংকায় ভুগছে। বাস্তবে তারা কোথায় আছে, কেমন আছে – কেউ জানে না।

রাঙ্গামাটির এক প্রত্যন্ত গ্রামে দুই বোন আর এক ভাইয়ের সংসারে মিতালী চাকমা মাঝের জন। দুনিয়াবী প্রাচুর্যে লাগাতার ঘাটতির ঢেউ সংসারের সকলকে প্রতিনিয়ত ভিজে চুপসে দিলেও পরস্পরের প্রতি ভালোবাসার কমতি কখনো শিশিরের ফোঁটা হয়েও কারো গায়ে লাগেনি। দিন এনে দিন খেতে না হলেও সাধ আর সামর্থ্যের যোজন যোজন দূরত্ব কখনই সন্তানদের উপযুক্ত মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার সংকল্প থেকে এই পরিবারের কর্তাকে বিচ্যুত করতে পারেনি।
বৃষ্টিতে ভেজা চোখের জলের মতই এই বাস্তবতা পরিবারের বড় মেয়েটি বুঝে ফেলে একটু বড় হওয়ার পরেই।

তাই বাবা-মায়ের কাঁধ থেকে সংসারের জোয়ালের ভার কিছুটা হলেও লাঘবের অভিপ্রায়ে, সে লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়ার পরিবর্তে প্রিয় বাবা-মা আর আদরের ছোট ভাই-বোনদের ছেড়ে শহরে ছোট-খাটো এক চাকুরিতে যোগ দিতে অনেকটাই বাধ্য হয়েছে আগেই। আর তাদের সকলের অতি আদরের ছোট ভাই এখনো স্কুলের গন্ডী পেরুতে পারেনি।

পারিবারিক বন্ধনে ভালবাসায় বেড়ে উঠা সন্তানদের পরিবারের প্রতি শ্রদ্ধা আর দায়িত্বশীলতার পাশাপাশি বাস্তবতার আলোকে কষ্ট আর পরিশ্রমকে পাথেয় বানিয়ে জীবন যুদ্ধে এগিয়ে যাওয়ার এমন অনেক গল্প হয়ত পাঠকের জানা আছে। সেদিক থেকে মিতালী চাকমাকে নিয়ে কিছু লেখার কোন প্রয়োজন ছিল না। তবে, তার জীবনের ক্যনাভাসে কিছু দুর্জনের আঁচড়ের বিভীষিকা এবং তৎপ্রেক্ষিতে আমাদের সমাজের প্রতিক্রিয়ার অসঙ্গতির উপর থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নেয়া নিতান্তই অমানবিক বিবেচিত হওয়ার কারণেই এই লেখার অবতারণা করা হয়েছে।

গত ২৩ নভেম্বর ২০১৮ তারিখে খাগড়াছড়ি প্রেসক্লাবে অনুষ্ঠিত এক প্রেস ব্রিফিং এর পরেই মিতালী চাকমার ঘটনাবলী আলোচিত হতে থাকে। বিভিন্ন সুত্র হতে প্রাপ্ত তথ্যাবলী থেকে তার অপহরণের ঘটনার পরিস্কার একটা চিত্র পাওয়া যায়।(https://goo.gl/mT4JP4)

আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলে যোগ দেয়ার আহবান উপেক্ষা করায় ১৭ আগস্ট ২০১৮ তারিখে তাকে অপহরণ করা হয়েছিল। এর পরে তাকে আটকে রেখেই বিয়ের প্রস্তাব দেয়া হয়। সে রাজী না হলে, তাকে স্থানীয় দুই নেতার হাতে তুলে দেয়া হলে, তার প্রতি চালানো শুরু হয় অবর্ণনীয় শারীরিক এবং মানসিক নির্যাতনের ষ্টীম রোলার।
তার বিভীষিকাময় জীবনের একাংশ কিছুটা হলেও উঠে এসেছে, তার কান্নামিশ্রিত কন্ঠে,

“তাদেরকে বলাবলি করতে শুনেছি যে, আমাকে গর্ভবতী না করলে আমি হয়তো ইউপিডিএফ এ যোগ দিতে রাজী হবো না। এমতাবস্থায় গত ৩০/৮/২০১৮ তারিখ হইতে ১৯/১১/২০১৮ তারিখ পর্যন্ত ইউপিডিএফ কর্মীরা আমাকে বিভিন্ন সময়ে একাধিকবার রেপ করে। ইউপিডিএফ (প্রসীত) এর কর্মীদের পাশবিক নির্যাতনে আমি শারীরিক ও মানষিকভাবে ভেঙ্গে পড়ি। বেশ কয়েকবার আত্নহত্যার চেষ্টা করেও করতে পারি নাই।“

তার কাছ থেকে আরো জানা যায় যে, তাকে সব সময় দুইজন অস্ত্রসহ পাহারা দিয়ে রাখত, যেন সে পালাতে না পারে। তবে, যেখানে আটকে রাখা হয়েছিল, সেখানে সেনাবাহিনীর এক টহল দলের আনাগোনা টের পেয়ে অস্ত্রধারীরা সরে পড়ে। এই সুযোগে, সে টহল দলের কাছে এসে তার দুর্দশার কথা জানালে, তারা তাকে উদ্ধার করে এনে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করে।

প্রয়োজনীয় ডাক্তারী পরীক্ষা ও মামলার প্রক্রিয়া শেষ হলেও প্রাণ ভয়ে সে এখন বাড়ীতে ফিরতে পারেনি। সে এখন চিন্তিত আছে এই ভয়ে যে, তার বাবা-মাকে এই সন্ত্রাসীরা মেরে ফেলবে। তার সাথে আরো দুই জন নারী বন্দি ছিল, তাদেরকে উদ্ধারের আবেদনও সে জানিয়েছে।

ইউপিডিএফ (প্রসীত) এর পক্ষ থেকে অবশ্য এই অভিযোগ অস্বীকার করে দাবী করা হয়েছে যে, তাদের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করার উদ্দেশ্যেই এমন পরিকল্পিত নাটক সাজানো হয়েছে। ইতোমধ্যেই সোশ্যাল মিডিয়াতে এমন দাবীর সপক্ষে বেশ কিছু প্রচারণাও লক্ষ্য করা গেছে।

ইতোপূর্বে এক চাকমা নারীকে কোনো বাঙ্গালী কর্তৃক ধর্ষণের শুধুমাত্র অভিযোগ পাওয়ার পর প্রমাণিত হওয়ার আগেই কি পরিমাণ প্রতিবাদ হয়েছিল– সেটা বলার বিন্দুমাত্র প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না। ইতি চাকমা নিহতের ঘটনায় দেশবাসী তা প্রত্যক্ষ করেছে।(https://goo.gl/Ch4cKz) কারণ, এমন প্রতিবাদ মিছিল ঢাকার শাহবাগ ছাড়াও চট্রগ্রাম, রাজশাহী, সিলেট ইত্যাদি বিভিন্ন জায়গায় দেশবাসী প্রত্যক্ষ করেছেন। আর যদি কোনোভাবে একটা ধর্ষণের ঘটনায় নিরাপত্তা বাহিনীর দিকে আঙ্গুল তোলা যায়, তাহলে কি লঙ্কাকাণ্ড হতে পারে সেটাও দেশবাসী দেখেছে বিলাইছড়ির দুই মারমা বোনের ঘটনায়। এ ধরনের ঘটনার প্রেক্ষিতে অপরাধীর শাস্তি দাবী করে আন্দোলন বা নারী নির্যাতনের প্রতিবাদে যাবতীয় পদ্ধতি প্রয়োগে পার্বত্য চট্টগ্রাম ও বাংলাদেশের সুশীল সমাজ, মানবাধিকার কর্মীদেরকেও অহরহই দেখা যায়।(https://goo.gl/eHFoQR)

অথচ, নারীর প্রতি সংবেদনশীল এই মানুষগুলোই আবার একদম চুপ মেরে যান, যদি ধর্ষক, খুনী আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলের সাথে সংশ্লিষ্ট কেউ হয় বা অবাঙ্গালী কেউ হয়। তেমনটি ঘটে থাকলে, অনেক সময় আবার অপপ্রচার চালানো হয় ঘটনার দায় বাঙ্গালী বা নিরাপত্তা বাহিনীর উপর চাপিয়ে দেয়ার অপচেস্টায়। এক বছরের মধ্যেই সংঘঠিত মাত্র দু’টি ঘটনাকে উদাহরণ হিসেবে সামনে উপস্থাপন করে আমাদের সমাজের কিছু মানুষের দৃষ্টিভঙ্গির বৈপরীত্যের পাশাপাশি প্রতিক্রিয়ার অসঙ্গতির এই চিত্র পরিস্কারভাবে ফুটিয়ে তোলা সম্ভব।(https://goo.gl/1ps1YB)

এই বছরের জানুয়ারীতে রাঙ্গামাটির বিলাইছড়ির দুই মারমা বোনের ঘটনা নিয়ে কী না করেছে পার্বত্য চট্টগ্রাম ও ঢাকার সুশীল সমাজের, মানবাধিকারের নেতা কর্মীরা। (https://goo.gl/xKdvZS) দেশের বড় বড় শহরে প্রতিবাদ মিছিল ও মানববন্ধন, শাহবাগে সেনাবাহিনীকে বিদ্রুপ করে আয়োজিত পথনাটক, ব্লগ ও সংবাদপত্রে নারীবাদীদের লেখালেখি, মানবাধিকার কমিশনের তদন্ত কমিটি, উদ্বিগ্ন সুশীল সমাজের বিবৃতি, সুপ্রিম কোর্টে কিছু দেশবরেণ্য ব্যক্তির দৌঁড়াদৌঁড়ি, ঢাকার বুকে মশাল মিছিল, চাকমা সার্কেল চীফের পত্নীর আবেগঘন মিথ্যাচার, হাসপাতালে পাহারা বসানো ইত্যাদির বাইরে আরও অনেক কিছুই ছিল। অথচ, ঐ সময়ে আবেগে আপ্লূত হওয়া ব্যক্তিবর্গের অনেকেই আজো জানেন না যে, এক মিথ্যে অভিযোগকে কেন্দ্র করে কিভাবে তাদের অনুভূতিকে ব্লাকমেইল করা হয়েছে।(https://goo.gl/TZiEEi

বেশিদিন আগের কথাও নয়। ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে রাঙামাটিতে এক সংবাদ সম্মেলনে এক নারী নিজের মুখে যা শুনিয়েছে, তা অনেকটাই ভৌতিক সিনেমার কাহিনী বলে মনে হচ্ছিল। ভিন্ন সম্প্রদায়ের একজনকে ভালোবেসে বিয়ে করায় জোসনা চাকমাকে দুই মাস হাতে-পায়ে শিকল বেঁধে অন্ধকার ঘরে আটকে রেখে দিনের পর দিন অমানবিক নির্যাতন করেছিল ইউপিডিএফ। ১৬ জানুয়ারী ২০১৭ এর মধ্যরাতে কোনমতে পালিয়ে এসে আশ্রয় প্রার্থনা করে নিকটস্থ সেনাবাহিনীর ক্যাম্পে। এরপর সেনাবাহিনী তাকে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করে। তিন দিন পরে সংবাদ সম্মেলনের সময় বার বার কান্নায় ভেঙ্গে পড়ছিল হতভাগা এই নারী। সংবাদ সম্মেলনে সে নিজেই জানায় যে, তার স্বামী বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারী হলেও শুধুমাত্র বাঙালী বড়ুয়া সম্প্রদায়ের একজনকে বিয়ে করার অপরাধেই এই নির্মম ও লোমহর্ষক পরিস্থিতির শিকার হতে হয়েছিল তাকে।(https://goo.gl/4z3pzq)

একজন নির্যাতিতা নারী প্রকাশ্য সংবাদ সম্মেলনে তার জীবনের উপর বয়ে যাওয়া দুর্বিষহ যন্ত্রণা জানান দিলেও এর প্রতিবাদের আওয়াজ দেশের কোনো দিক থেকেই শোনা যায়নি। এমনকি, কোনো নারীবাদী সংগঠন বা মানবাধিকার কমিশন যাদের জেলা অফিস এই রাঙ্গামাটিতেই অবস্থিত – প্রতিবাদতো দুরের কথা এমন ভয়াবহ এবং গাঁ শিউরে উঠা ঘটনার সত্যতা যাচাইয়ের জন্যে হলেও নির্যাতিতার সাথে কথা বলার প্রয়োজনও অনুভব করেনি। আমাদের সমাজের যে মহিয়সী নারীগণ আর কিছু না হলেও নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে অন্তত কলম দিয়ে যুদ্ধ করেন, তাদের মধ্য হতেও কেউ এই হতভাগ্যার কান্নায় নিদেনপক্ষে সহমর্মিতা পর্যন্ত ব্যক্ত করেননি। রাস্তায় প্ল্যাকার্ড নিয়ে রোদের মধ্যে দাড়িয়ে মানববন্ধনেও দেখা যায়নি কাউকে।

কেউ কি একবার ভেবে দেখেছেন যে, নির্যাতনের ভয়াবহতার পারদ কোন উচ্চতায় উঠলে একজন নারী ধর্ষণের মতো অসম্মানের বিষয় প্রকাশ্যে উচ্চারণ করে! তাও আবার পার্বত্য চট্রগ্রামে ! যেখানে হত্যার বিচার পর্যন্ত চাইতে ভয় পায় সাধারণ মানুষ। অথচ, অতি সাম্প্রতিক এই মিতালী চাকমার ঘটনার প্রতিবাদের কোন ধরণের লক্ষণ চোখে পড়ছে না কোথাও। না পার্বত্য চট্রগ্রামে, না দেশের অন্য কোন স্থানে। নারীর প্রতি সহানুভূতি দেখাতে গিয়ে তৃতীয় পক্ষের শুধুমাত্র অভিযোগেই যারা এর আগে বহুবার নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে যেভাবে সম্ভব প্রতিবাদে সামিল হয়েছিলেন, তারা কোনো এক অজ্ঞাত কারণে এই ঘটনায় কঠোর নীরবতা পালন করছেন। যদিও এখানে নির্যাতিতা নিজেই ভয়াবহ নির্যাতনের কথা প্রকাশ্যে জানিয়েছেন । জোসনা চাকমার ঘটনাতেও এর ব্যতিক্রম কিছু ছিল না।

নারীর প্রতি সংবেদনশীলতা আর পাহাড়ের নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে সকল সময়ে যারা উচ্চকিত, সেই সুলতানা কামাল, বাঞ্চিতা চাকমা, ইয়ান ইয়ান, মিজানুর রহমান, রোবায়েত ফেরদৌস, য়েন য়েন, খুশী কবির প্রমুখদের মিতালী চাকমা’র জন্যে কোন ধরনের পদক্ষেপ যেমন চোখে পড়ছে না, তেমনি তাদের এই হতভাগার জন্যে বিন্দুমাত্র উদ্বেগ আর উৎকন্ঠা আছে বলেও প্রতীয়মান হচ্ছে না।

একজন নারী হিসেবে এবং বিশেষতঃ নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে দেশবাসীর সামনে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত ইমেজের কথা মাথায় রেখে নিতান্ত দায়সারা গোছের হলেও অন্তত ক্ষীণ কন্ঠে কিছু একটা বলা যেত– অথচ তেমন কিছুও করা হচ্ছে না। একই ধরনের নির্লিপ্ততা প্রকাশ পেয়েছে সিএইচটি কমিশনের আচরণে – যারা কিনা পার্বত্য চট্রগ্রামের ইস্যুতে নিজেদের সম্পৃক্ততা প্রমাণের জন্যে এর আগে অসংখ্যবার নিদেনপক্ষে বিবৃতি প্রকাশ করেছেন।

পার্বত্য চট্রগ্রামের সংঘটিত ঘটনাবলীর প্রতি আমাদের দেশের কিছু মানুষের দৃষ্টিভঙ্গির বৈপরীত্য কতটা চরম হতে পারে, তার সর্বশেষ উদাহরণ মিতালী চাকমা’র ঘটনাবলী। যারা এই ধরণের ঘটনায় প্রতিবাদ করেন বা ইতিপূর্বে করেছিলেন– তাদের কাউকেই এখন আর দেখা যাচ্ছে না। অবশ্য আমাদের সমাজের কিছু লোকের এমন আপাতদৃষ্টিতে রহস্যজনক কিন্তু বাস্তবে দ্বিমুখী আচরণ একেবারে আনকোরা কিছু নয়।

গুইমারার উমাচিং মারমা (মার্চ, ২০১৫), দীঘিনালার দীপা ত্রিপুরা (জুন, ২০১৫), বিলাইছড়ির আয়না চাকমা ( মে, ২০১৬), নানিয়ারচরের শুবলপুরি চাকমা (জুলাই, ২০১৭), পানছড়ির নয়না ত্রিপুরা ওরফে ফাতেমা বেগম ( সেপ্টেম্বর, ২০১৭), দীঘিনালার আয়না চাকমা ওরফে রিমা আক্তার (অক্টোবর, ২০১৭) এবং আরো অনেকের ঘটনার ক্ষেত্রেও তাদের ভূমিকা এমন ঘৃন্য এবং লজ্জাজনকই ছিল। (https://goo.gl/Mvcznx) (https://goo.gl/S1fQPB)  

অতীতের ঘটনাবলীর আলোকে মিতালী চাকমার উপর যে ভয়াবহ নির্যাতন চালানো হয়েছে তার প্রতিবাদ বা বিচারের দাবী করে হয়ত তেমন কেউ সরব হবেন না। কারণ, সচরাচর এই ধরণের ঘটনায় দেশের মূল জনগোষ্ঠীর যারা প্রতিবাদ করেন- অদ্যবধি তারা অপরাধী দেখে প্রতিবাদ করেছেন, অপরাধ বিবেচনা করে প্রতিবাদ করেননি। অপরপক্ষে, পাহাড়ের নেতৃবৃন্দের “প্রতিবাদের চর্চাটা অনেকটা এরকম যে, স্বগোত্রের দুর্বৃত্তরা যাই করুক না কেন, প্রতিবাদ করা যাবে না; কারণ প্রতিবাদ অপরাধ অনুযায়ী হবে না, অপরাধী অথবা নির্যাতিতার পরিচয় অনুযায়ী হবে।” (https://goo.gl/gDHoND

সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন রয়ে যায়, সাধারণ জুম্ম, যাদের কোন রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা নেই, তারা কি মিতালী চাকমার কথা বিশ্বাস করছে? কারণ, তারা তো এখন আর বোকা নেই, অনেক বুদ্ধিমান। পার্বত্য চট্রগ্রামের যে কোন আন্দোলনে নারীরা এখনের পুরুষের ঢাল হিসেবে সামনে থাকে। তাদের হাতে থাকে লম্বা লাঠি, আর নারীর ঢালে আশ্রয় নেয়া পালোয়ানের হাতে থাকে ছোট্ট গুলতি। বছরের যে কোন সময়ে, যে কোন উপলক্ষ্যে আয়োজিত মিছিল বা প্রতিবাদে এখন নারীদের সরব উপস্থিতি নজর এড়ানোর উপায় নেই।

তবে বলাই বাহুল্য, ৩০ মে ২০১৮ তারিখে স্বজাতির হাতে মহালছড়ির তিনজন মারমা ছাত্রী ধর্ষণের শিকার হওয়ার পরেও যখন কেউ কোন প্রতিবাদের আওয়াজ তুলেনি– তখন বুঝতে বাকী থাকে না যে, পাহাড়ে নারীরা এখনো যতটা না মানুষ হিসেবে স্বীকৃত, তার চেয়ে অনেক বেশী কার্যোদ্ধারের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত। প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার মোক্ষম অস্ত্র আর ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলের সবচেয়ে পছন্দের হাতিয়ার হিসেবেই তাদেরকে শ্রেয় বিবেচনা করা হয়। (https://goo.gl/93Xu5v

তাই, অবধারিতভাবেই প্রশ্নের উদ্রেক হয়, মিতালী চাকমা কি নারী নির্যাতনের ক্ষেত্রে আমাদের ‘সমাজের কিছু মানুষের দৃষ্টিভঙ্গির বৈপরীত্যের পাশাপাশি প্রতিক্রিয়ার অসঙ্গতির’ শুধুমাত্র আরেকটি উদাহরণ হিসেবেই থেকে যাবে? নাকি, প্রতিটি জুম্ম নারীরও যে একজন মানুষ হিসেবে বিবেচিত হওয়ার অধিকার থাকতে পারে – তা অন্যরা বিশেষতঃ নারীরা অনুধাবন করবেন? এই ঘটনায় এমন সৎসাহস কি দেখানোর সুযোগ আছে যে, জুম্ম নারীরা ভবিষ্যতে আর কখনো কারো ‘কার্যোদ্ধারের মাধ্যম’ কিংবা ‘স্বার্থ হাসিলের সবচেয়ে পছন্দের হাতিয়ার’ অথবা ‘প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার মোক্ষম অস্ত্র’ হিসেবে ব্যবহৃত হতে চাইবে না?

নোট: সর্ট লিংকগুলো সংশ্লিষ্ট, খবর, তথ্য ও বিশ্লেষণ

লেখক: পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক গবেষক


মাহের ইসলামের আরো লেখা পড়ুন:

Print Friendly, PDF & Email
ঘটনাপ্রবাহ: ইউপিডিএফ, ধর্ষণ, মাহের ইসলাম
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

14 − nine =

আরও পড়ুন