মিয়ানমারে নতুন যুগের বিদ্রোহীরা যুদ্ধে জিতেছে

fec-image

স্বায়ত্তশাসিত সামরিক বাহিনী তাতমাদাও নতুন ধরনের বিদ্রোহের মুখে পড়েছে যদিও মিয়ানমার সরকার শান্তি কামনা করেন।তবে এই বিদ্রোহ মোকাবিলা করা ও দমন করার মতো প্রস্তুতি তাদের নেই বলেই মনে হচ্ছে।

মিয়ানমারের ‘নতুন’ বিদ্রোহীরা আগের প্রজন্মের বিদ্রোহীদের চেয়ে ভিন্ন। তারা অত্যন্ত ক্ষিপ্রগতির, খুব কমই নির্ধারিত অবস্থানে থাকে, বরং আঘাত করে সরে পড়ার নীতি অনুসরণ করছে। এর ফলে মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর গতানুগতিক রণাঙ্গনে হামলা চালানোর কৌশলটি ক্রমবর্ধমান হারে অকার্যকর হয়ে পড়ছে।

পরিস্থিতি অনেকটা ভিয়েতনামে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যে অবস্থায় পড়েছিল, তার মতো : অদৃশ্য শত্রু ছায়া থেকে বেরিয়ে এসে আক্রমণ করে এবং পাল্টা হামলাটি যতটা না তাদের ওপর লাগে, তার চেয়ে বেশি লাগে বেসামরিক নাগরিকদের ওপর।

কারেন ন্যাশনাল ইউনিয়ন (কেএনইউ) অনেক দিন ধরেই থাই সীমান্তে ঘাঁটি গেড়ে আছে। তারা মোই নদীর তীরজুড়ে বেশ কয়েকটি ঘাঁটি নির্মাণ করেছে। তাদের সুরক্ষিত সদরদফতরে পাকা ভবন রয়েছে। সেখানে বেসামরিক প্রশাসন ও সামরিক কমান্ড ইউনিট রয়েছে।

মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী সহজেই এসব স্থাপনায় হামলা চালাতে পারে। ১৯৮০-এর দশকের শেষ দিকে ও ১৯৯০-এর দশকের প্রথম দিকে এসব স্থাপনা প্রচলিত হামলার মুখে পড়ে।

দেশটির উত্তর দিকে থাকা কচিন ইন্ডিপেন্ডেন্ট আর্মি (কেআইএ) একসময় উত্তর কচিন রাজ্যের বেশির ভাগ এলাকা নিয়ন্ত্রণ করত। তারা ১৯৯৪ সালের ফেব্রুয়ারি মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর সাথে যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে সই করে।

এক সময়ের শক্তিশালী কমিউনিস্ট পার্টি অব বার্মা আগে শান রাজ্যে ২০ হাজার বর্গ কিলোমিটার এলাকা নিয়ন্ত্রণ করত। এসব এলাকার বেশির ভাগই এখন ইউনাইটেড ওয়া স্টেট আর্মিার নিয়ন্ত্রণে। এই গ্রুপটি মিয়ানমারের সবচেয়ে বড় ও সর্বোত্তমভাবে অস্ত্রে সজ্জিত।

মিয়ানমারের নতুন জাতিগত সেনাবাহিনীগুলো, তথা পশ্চিম রাখাইন রাজ্যের আরাকান আর্মি (এএ) ও উত্তর শান রাজ্যের তাং ন্যাশনাল লিবারেশন আর্মি (টিএনএলএ) শুরুতে কেআইএর কাছ থেকে প্রশিক্ষণ পেয়েছিল। কিন্তু পরে তারা ভিন্ন ধরনের প্রতিরোধের আশ্রয় গ্রহণ করে।

এএ ও টিএনএলএ অত্যন্ত ক্ষিপ্রগতির বাহিনী। তারা প্রকাশ্যে কোনো ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণ করতে চাচ্ছে না। বরং তারা মনোবল ভেঙে দেয়া গেরিলা হামলা চালিয়ে সরে পড়ার মিশন পরিচালনা করে।

এই দুই গ্রুপের কোনোটিরই স্থায়ী সামরিক ঘাঁটি নেই। তারা সামরিক গোপন আস্তানা থেকে হামলা চালায়। এর ফলে তারা অসতর্ক অবস্থায় থাকা মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর ওপর হামলা চালাতে পারে।

এএ এখন মিয়ানমারের সবচেয়ে সক্রিয় ও কঠিনতম আঘাতকারী বিদ্রোহী সেনাবাহিনী। তারা কেবল উত্তর রাখাইন রাজ্য থেকেই নয়, অনেক দক্ষিণে রাখাইন রাজ্য ও অবশিষ্ট মিয়ানমারের মধ্যে সংযোগকারী প্র্রধান মহাসড়কেও হামলা চালাচ্ছে।

গত বছরের আগস্ট মাসে টিএনএলএ, এএ ও কোকং বিদ্রোহী জোট মান্দালয় থেকে মাত্র ৬৭ কিলোমিটার দুরে পিইন ওও লইন গ্যারিসন টাউনের অত্যন্ত মর্যাদাসম্পন্ন ডিফেন্স সার্ভিসেস টেকনলজিক্যাল একাডেমিতে আকস্মিক হামলা চালায়।

২০০৯ সালে প্রতিষ্ঠিত টিএনএলএর হাতে ৫ হাজার যোদ্ধা আছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আর একই বছর প্রতিষ্ঠিত এএ’র হাতে আছে অন্তত ৩ হাজার যোদ্ধা।

এসব যোদ্ধা অত্যন্ত ক্ষিপ্র, তরুণ। তারা ২০১৫ সালে প্রথম বড় ধরনের সামরিক হামলা চালায়।

রাখাইন রাজ্যের বৌদ্ধ জাতিগত রাখাইনদের কাছ থেকে সমর্থন পাচ্ছে এএ। তারা তাদের জাতিগত-জাতীয়তাবাদী বার্তা ছড়িয়ে দিতে ডিজিটাল মিডিয়া ব্যবহার করে। তাদের নেতা তুন মিয়াত নাইং বেশ কয়েকবার ইন্টারনেট ভিডিওতে এসেছেন। তিনি চমৎকার ইংরেজি বলেন, পেশাদার ও সুশৃঙ্খল সৈনিক হিসেবে নিজেকে প্রদর্শন করেছেন।

রোহিঙ্গা মুসলিম উদ্বাস্তু সঙ্কটের মধ্যেই এই গ্রুপটির আত্মপ্রকাশ ঘটেছে।

এএর জবাবে তাতমাদাও রাখাইন রাজ্যের ৫টি টাউনশিপে ইন্টারনেট বন্ধ করে দিয়েছে। তারা বিমান হামলাও চালিয়েছে। কিন্তু এতে লাভ হয়েছে সামান্যই। আসলে সুনির্দিষ্ট কোনো লক্ষ্যবস্তু না থাকায় হামলা বিফলেই যাচ্ছে।

আবার তাদের হামলায় বেসামরিক নাগরিক নিহত হওয়ায় তারা জনসমর্থন আরো বেশি করে হারাচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে মধ্য ফেব্রুয়ারির একটি হামলার কথা বলা যায়। মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর গোলন্দাজ ইউনিটের গোলা একটি স্কুলে আঘাত হানলে ১৯ শিশু নিহত হয়। মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর হামলায় রাখাইন রাজ্যে অন্তত এক লাখ বেসামরিক নাগরিক তাদের ঘরবাড়ি হারিয়েছে।

গত ১৮ ফেব্রুয়ারি সমাজকল্যাণ মন্ত্রী উইন মিত আইয়ে ও রাখাইন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী নিয়া পুকে বহনকারী একটি সামরিক হেলিকপ্টার আক্রান্ত হয়। এতে হেলিকপ্টারটি বিধ্বস্ত না হলেও এতে এএ’র সক্ষমতা ভালোমতোই বোঝা গেছে।

মিয়ানমার সরকার শান্তি উদ্যোগ গ্রহণ করলেও নতুন নতুন স্থানে সঙ্ঘাত ছড়িয়ে পড়ায় তা ব্যর্থ হতে বসেছে।

মিয়ানমার সরকার ইঙ্গিত দিয়েছে যে তারা এপ্রিলে আরেক দফা শান্তি আলোচনায় বসবে। এদিকে আগামী নভেম্বরে দেশটিতে সাধারণ নির্বাচন হবে। এর আগে শান্তিচুক্তি হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম।

আর এএ ও টিএনএলর মতো ক্ষিপ্র ও চলমান বিদ্রোহী গ্রুপগুলো মনে করছে, মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে তারাই জয়ী হতে যাচ্ছে। এমন অবস্থায় মিয়ানমারের জাতিগত যুদ্ধ সহসাই শেষ হবে, এমন সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ।

সূত্র : সাউথ এশিয়ান মনিটর

Print Friendly, PDF & Email
ঘটনাপ্রবাহ: মিয়ানমার, যুদ্ধ, সামরিক বাহিনী
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

nine − 2 =

আরও পড়ুন