মসজিদে মাইক লাগিয়ে আজান দেয়া শুরু করার পর থেকেই সন্ত্রাসীরা তাকে পুণরায় হুমকি দিতে শুরু করে

যেভাবে হত্যা করা হয় শহীদ ওমর ফারুক ত্রিপুরাকে

fec-image

ঢাকা থেকে রোয়াংছড়িতে ফিরে আসার পর শান্তিবাহিনী তার বাড়িতে গিয়ে ইসলাম ধর্ম গ্রহণের জন্য প্রাণনাশের হুমকি দেয়। কিন্তু সাহসী ওমর ফারুক তাদেরকে বলে, ধর্ম পরিবর্তন তার গণতান্ত্রিক অধিকার। কাজেই কোনো ভুল বা অন্যায় তিনি করেননি। তবুও সন্ত্রাসীরা তাকে হুমকি দিলে তিনি সন্ত্রাসীদের বলেন, তোমরা কী করবা আমার? প্রাণ নিবা? নাও আমি বুক পেতে দিলাম। গুলি করো। আমি শহীদ হয়ে যাবো। এই বলে তিনি জামার বোতাম খুলে সন্ত্রাসীদের সামনে বুক চেতিয়ে দাঁড়ান।

বান্দরবান জেলার রোয়াংছড়ি উপজেলার শহীদ ইমাম ওমর ফারুককে(৫০) ঘরে ঢুকে গুলি করে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা। এসময় তার স্ত্রী রাবেয়া বেগম স্বামীকে রক্ষা করার চেষ্টা করলে সন্ত্রাসীরা তার বুকে লাথি মারলে তিনি ছিটকে পড়ে যান বলে জানান তার মেজো মেয়ে আমেনা। উল্লেখ্য গত ১৮ জুন রাতে এশার নামাজ শেষে ঘরে ফিরে আসার পর উপজাতীয় সন্ত্রাসীরা এই নও মুসলিম ঈমামকে নির্মমভাবে হত্যা করে। শহীদ ওমর ফারুক(পূর্বনাম পুর্নেন্দু ত্রিপুরা)  রোয়াংছড়ির মতো দূর্গম পার্বত্য এলাকায় কমপক্ষে ত্রিশ পরিবারকে ইসলাম ধর্মে দিক্ষিত করেছিলেন। এ জন্যই তাকে উপজাতীয় সন্ত্রাসীরা হত্যা করেছে বলে দাবী পরিবারটির।

ওমর ফারুকের পরিবার সূত্র পার্বত্যনিউজকে জানায়, ওমর ফারুখের তিন মেয়ে হাফসা ত্রিপুরা, আমেনা ত্রিপুরা, ও মায়মুনা ত্রিপুরা। হাফসা ত্রিপুরার বিয়ে হয়ে গেছে, তিনি স্বামীর সাথে বর্তমানে ঢাকায় থাকেন। আমেনা ত্রিপুরা ৭মে শ্রেণিতে পড়েন, ছেলে ইব্রাহীম ত্রিপুরা তৃতীয় শ্রেণীতে পড়ে। ছোট মেয়ে মায়মুনা ত্রিপুরা তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ে। তারা সবাই মাদ্রাসাতে পড়াশোনা করছে।

পুর্নেন্দু ত্রিপুরার বাবা বৌদ্ধ ধর্ম থেকে খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। ২০১৪ সালে পুর্নেন্দু ত্রিপুরা থানচিতে তার একজন উপজাতীয় মুসলিম বন্ধুর দাওয়াতে উদ্বুদ্ধ হয়ে ইসলাম ধর্ম গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেন। এরপর বান্দরবানে এসে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন এবং ওমর ফারুক নাম গ্রহণ করেন। ইসলাম ধর্ম গ্রহণের পর তিনি ঢাকায় গিয়ে তাবলিগে যোগ দেন।তাবলিগে এক চিল্লা(৪০দিন) সময় দেয়ার পর নিজ গ্রামে ফিরে এসে মেয়ে হাফসা ও আমেনাকে ঢাকায় নিয়ে এসে মাদ্রাসাতে ভর্তি করে দেন।

ঢাকা থেকে রোয়াংছড়িতে ফিরে আসার পর শান্তিবাহিনী তার বাড়িতে গিয়ে ইসলাম ধর্ম গ্রহণের জন্য প্রাণনাশের হুমকি দেয়। কিন্তু সাহসী ওমর ফারুক তাদেরকে বলে, ধর্ম পরিবর্তন তার গণতান্ত্রিক অধিকার। কাজেই কোনো ভুল বা অন্যায় তিনি করেননি। তবুও সন্ত্রাসীরা তাকে হুমকি দিলে তিনি সন্ত্রাসীদের বলেন, তোমরা কী করবা আমার। প্রাণ নিবা, নাও আমি বুক পেতে দিলাম। গুলি করো। আমি শহীদ হয়ে যাবো। এই বলে তিনি জামার বোতাম খুলে সন্ত্রাসীদের সামনে বুক চেতিয়ে দাঁড়ান। সেদিন ওমর ফারুকের ত্বাকওয়া ও ঈমানী চেতনার কাছে হতবিহ্বল হয়ে সন্ত্রাসীরা তাকে গুলি না করে ফিরে যায়।

মূলত তাবলিগের মাধ্যমেই ওমর ফারুকের মধ্যে দাওয়ার চেতনা অঙ্কুরিত হয় এবং তিনি তার আশেপাশের অমুসলিমদের মাঝে দাওয়াত দিতে শুরু করেন এবং একটির পর একটি পরিবারকে ইসলামের আলোয় দিক্ষিত করতে থাকেন।বেশ কিছু পরিবার ইসলামের সুশীতল ছায়ায় চলে আসলে ওমর ফারুক একটি মসজিদ নির্মাণের উদ্যোগ নেন এবং এ লক্ষ্যে নিজের এক একর জমি মসজিদকে দান করেন। নিজেই সে মসজিদ প্রতিষ্ঠা করে নিজেই সেখানে অক্তিয় নামাজের ইমামতি শুরু করেন।এক পর্যায়ে ২০১৮ সালে এই মসজিদে তিনি মাইক লাগিয়ে আজান দেয়া শুরু করেন।

সূত্র মতে, এই মাইক লাগানোর পর থেকে তার উপর নতুন করে প্রাণনাশের হুমকি শুরু হয়। তিনি প্রায়ই তার পরিবার, স্বজন ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের নিকট বলতেন, ওরা আমাকে হত্যা করবে। বস্তুত ঘটেছেও তাই।

ওমর ফারুকের মেজো মেয়ে আমেনার বর্ণনা মতে, তার বাবা প্রতিদিন রাতে এশার নামাজ পড়ে এসে পরিবারের সাথে রাতের খাবার খান। ১৮ জুন শুক্রবার দিবাগত রাতেও অন্যান্য দিনের মতোই তার বাবা এশার নামাজ শেষ করে বাড়িতে ফিরে একটি চেয়ারে বসে বিশ্রাম গ্রহণ করছিলেন। বাড়ির অন্যান্যরা রাতের খাবার রেডি করছিলো। এসময় একটি কণ্ঠস্বরে ঘরের বাইরে থেকে তার পূর্বের ত্রিপুরা নাম ধরে তাকে ডাক দেয়।

ওমর ফারুক এই ডাকের অর্থ বুঝতে পেরেছিলেন। তাই তিনি কোনো উত্তর না দিয়ে জানালার ফাঁক দিয়ে বাইরে দেখার চেষ্টা করেন এবং ঘরের ভেতরেই অবস্থান করেন। এ সময় পাশের জঙ্গল থেকে অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীরা দরোজা ভেঙে ঘরে ঢুকে তার দিকে অস্ত্র তাক করলে ওমর ফারুকের স্ত্রী রাবেয়া বেগম স্বামীকে রক্ষা করতে ছুটে যান। কিন্তু সন্ত্রাসীরা তার বুকে লাথি মারলে তিনি ছিটকে পড়ে যান। এসময় সন্ত্রাসীরা খুব কাছে থেকে ওমর ফারুকের মাথায় দুই রাউন্ড গুলি করলে তিনি মুখ থুবড়ে পড়ে যান এবং সাথে সাথেই শাহাদাত বরণ করেন। খবর পেয়ে সেনাবাহিনী ঘটনাস্থলে আসে, কিন্তু তার আগেই সন্ত্রাসীরা পালিয়ে যায়।

আমেনার দাবী, অন্যান্য দিন পাড়াগুলোর প্রত্যেক বাড়িতে বাইরে সোলার বিদ্যুতের বাল্ব জ্বললেও ওইদিন পাড়ায় কোনো বাড়ির বাইরের আলো জ্বালানো হয় নি। গুলির শব্দ শুনে প্রতিবেশী খ্রিস্টান পরিবারের কেউ এগিয়ে না এসে সবাই ঘরে অবস্থান করেছে।

অন্যদিকে কাছাকাছি পাড়ায় বসবাসকারী নওমুসলিম পরিবারগুলো ওমর ফারুকের উপর আসা হুমকির বিষয়টি অবগত ছিলো। ফলে ওমর ফারুকের বাড়িতে গুলির শব্দ শুনে তারা ঘটনাটি সহজেই বুঝে ফেলে এবং সন্ত্রাসীরা এবার তাদের হত্যা করতে আসবে ধারণা করে সকলে স্ত্রী, সন্তানসহ জঙ্গলে পালিয়ে যায়।

ঘটনার পর ওমর ফারুকের পরিবার ও তার হাতে বাইয়াত হওয়া মুসলিম পরিবারগুলো ব্যাপক নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে শুরু করলে তারা সকলেই এলাকা ত্যাগ করেছে। বর্তমানে তারা সবাই একটি অজ্ঞাত স্থানে বসবাস করছে।

এদিকে বান্দরবানের রোয়াংছড়িতে নওমুসলিম ওমর ফারুক (পুর্নচন্দ্র ত্রিপুরা) হত্যার পাচঁদিন অতিবাহিত হলেও জড়িত উপজাতীয় সন্ত্রাসীদের মধ্যে কাউকে চিহ্নিত করতে পারেনি আইন শৃংখলা বাহিনী। তবে ‘ঘটনার ক্লু অনেকটা ষ্পষ্ট দাবি সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের’।

এদিকে নিহতের স্ত্রী হত্যার ঘটনায় আইনের আশ্রয় নিলেও বর্তমানে তিনি নিজেও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। যেকোন মুহুর্তে হামলার আশংকা করছেন তার পরিবার।

ঘটনার পরদিন ১৯ জুন নিহতের স্ত্রী রাবেয়া বেগম বাদী হয়ে রোয়াংছড়ি থানায় অজ্ঞাতনামা পাচঁ আসামির বিরুদ্ধে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। মামলা নং-১, তারিখ ১৯-৬-২০২১।

ধর্মান্তরিত হয়ে মসজিদ নির্মাণ এবং ইসলাম ধর্ম প্রচারের কারনে তাকে হত্যা করা হয়েছে বলে অনেকটা প্রশাসন নিশ্চিত হলেও হত্যার ঘটনার সঙ্গে জড়িত উপজাতীয় উগ্রপন্থী সন্ত্রাসীদের এখন পর্যন্ত কাউকে শনাক্ত করতে পারেনি আইন শৃংখলা বাহিনী।

এই বিষয়ে রোয়াংছড়ি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এএইচএম তৌহিদ কবির বলেন, উপজেলা সদর থেকে হত্যাকাণ্ডের ঘটনাস্থল প্রায় ১৮ কি.মি দুর্গম এলাকায়। ঘটনার পর বিরূপ আবহাওয়া ও বৃষ্টি উপেক্ষা করে পুলিশ ওই এলাকায় একাধিক অভিযান চালিয়েছে এবং ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করার কাজ চলছে। হত্যাকাণ্ডের পেছনে ‘জেএসএস জাতীয় কেউ’ থাকতে পারেন বলে ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা পার্বত্যনিউজকে বলেন।

জানা গেছে, গত কয়েক বছর ধরে উগ্রপন্থি উপজাতীয় সন্ত্রাসীরা একই কায়দায় ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের ৮জন নেতাকর্মী ও একাধিক ব্যবসায়ীকে ব্রাশ ফায়ার করে হত্যা করেছে।

এদের মধ্যে কাউকে সরকারী দল করার কারনে, কাউকে আঞ্চলিক দল ছাড়ার কারনে আবার কাউকে চাঁদার জন্য হত্যা করা হয় বলে আইন শৃংখলা বাহিনীর তদন্তে প্রকাশ পেয়েছে।  কিন্তু ধর্ম প্রচারের কারণে সাধারণ মানুষকে হত্যার ঘটনা এটিই প্রথম।

যার কারণে ওমর ফারুকের হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি দেশের গন্ডি পেরিয়ে বিদেশের মাটিতেও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।

সচেতন নাগরিকরা মনে করেন, একই কায়দায় খুনের ঘটনাগুলোর একটিরও এখনও পর্যন্ত কোন ক্লু বা সুরাহা না হওয়ার কারণে পাহাড়ি সন্ত্রাসীরা ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ড চালাচ্ছে।

এই প্রসঙ্গে পাবর্ত্য চট্টগ্রাম নাগিরক পরিষদের জেলা সভাপতি কাজী মজিবুর রহমান এই প্রতিবেদককে বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে সংগঠিত প্রত্যেক ঘটনার সঙ্গে সরাসরি জেএসএস জড়িত।

তাই এই বাহিনীর অস্ত্র উদ্ধার ও সন্ত্রাসীদের আটকের দাবি জানান তিনি। এছাড়া পাহাড় থেকে প্রত্যাহার করে নেওয়া সেনা ক্যাম্প পুন:স্থাপনের দাবি জানান আওয়ামী লীগের সাবেক এই নেতা।

অন্যদিকে বান্দরবানের একাধিক আলেম-ওলামা জানান, সাম্প্রতিক বান্দরবানে বহু সংস্থা খ্রিষ্টান মিশনারির মাধ্যমে ধর্মান্তিরিত করণের কাজ প্রকাশ্যে চালাচ্ছে।

কখনো-কোথাও মুসলিম সম্প্রদায়ের কেউ তাদের বাঁধা প্রদান করেনি, অথচ ত্রিপুরা থেকে একজন সাধারণ মানুষ মুসলমান হওয়ার কারণে নির্মমভাবে তাকে হত্যা করলো পাহাড়ের সন্ত্রাসীরা।

বিষয়টি গুরুত্বসহকারে দেখার জন্য প্রধানমন্ত্রীসহ পাহাড়ে আইন শৃঙ্খলায় নিয়োজিত সংস্থার প্রতি দাবি জানান।

এদিকে সাম্প্রতিক সময়ে হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে জেলা পুলিশ সুপার জেরিন আকতার বলেন, যে ঘটনাগুলো ঘটছে সেগুলো সব দুর্গম এলাকায়। যার কারণে সন্ত্রাসীরা ঘটনার পর দ্রুত গহীণ অরণ্যে আশ্রয় নেয়। এছাড়া জেলার আইন শৃঙ্খলা ও অপরাধ নিয়ন্ত্রণে রেখেছে পুলিশ।

তিনি আরও জানান, পাহাড়ে হত্যাকাণ্ডের অনেক ঘটনায় মামলা হয়েছে, আসামিও আটক হয়েছে। সন্ত্রাসীরা যে দল বা গোষ্ঠীর হউক-না কেন পুলিশের জালে তাদের আটকা পড়তেই হবে।

Print Friendly, PDF & Email
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

20 + twelve =

আরও পড়ুন