রাখাইনে আরাকান আর্মির গণহত্যায় প্রাণ যায় অন্তত ১৭০ রোহিঙ্গার

fec-image

২০২৪ সালের মে মাসে রাখাইনের ‘হোয়ার সিরি’তে রোহিঙ্গাদের ওপর চালানো আরাকান আর্মির গণহত্যা নিয়ে তৈরি করা ‘কঙ্কাল ও মাথার খুলি, সর্বত্র ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে’ শীর্ষক প্রতিবেদনের এমন বর্ণনা দিয়ে শুরু করেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)। মঙ্গলবার (১৯ মে) প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের মে মাসে হোয়ার সিরিতে আরাকান আর্মির বেসামরিক নাগরিকদের ওপর ইচ্ছাকৃত হামলা ও গুলি চালানো ছিল যুদ্ধ আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। এ হামলা থেকে বেঁচে যাওয়া আবুল হাশিম বেসামরিক নাগরিকদের ইচ্ছাকৃত হত্যার প্রকৃতি তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, “আমরা শান্তিপূর্ণ বেসামরিক নাগরিক, নিরাপত্তার জন্য এলাকা থেকে সরে যাচ্ছি—এটা বোঝাতে সাদা পতাকা ঝুলিয়েছিলাম। তারা শুধু গুলি চালাচ্ছিল, যারা পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিল।”

আরাকান আর্মীর সংঘটিত যুদ্ধাপরাধগুলোর মধ্যে ছিল—বেসামরিক নাগরিকদের ওপর ইচ্ছাকৃত হামলা, হত্যা, বেআইনি আটক, নির্যাতন ও অন্যান্য দুর্ব্যবহার, অগ্নিসংযোগ, বেসামরিক সম্পত্তির ধ্বংসসাধন এবং লুটপাট। যারা সরাসরি এসব অপরাধ করেছে, তাদের পাশাপাশি আরাকান আর্মির কমান্ডাররাও বেসামরিক নাগরিক ও বেসামরিক সম্পত্তির ওপর বেআইনি হামলার নির্দেশ দেওয়া বা সহায়তা করার জন্য ফৌজদারিভাবে দায়ী হতে পারেন। কমান্ড দায়িত্বের আওতায় তাদের নেতাদের ফৌজদারি দায়বদ্ধতা তদন্ত করা উচিত বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। যদিও আরাকান আর্মি বুথিডংয়ের হোয়ার সিরিতে সংঘটিত যুদ্ধাপরাধ ও গণহত্যার দায় অস্বীকার করেছে।

এর আগে ২০১৭ সালের আগস্টে রোহিঙ্গাদের ওপর যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত করে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। গণহত্যা ও নির্যাতনের হাত থেকে বাঁচতে ওই বছরের ২৫ আগস্ট থেকে দলে দলে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে শুরু করে। বর্তমানে বাংলাদেশে ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গা অবস্থান করছে। এছাড়া ২০২৪ সাল থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত নতুন করে প্রায় দেড় লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে।

প্রতিবেদনে ২০২৪ সালের ২ মে আরাকান আর্মির গণহত্যার বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে। এ গণহত্যার তথ্য এক বছরেরও বেশি সময় পর প্রকাশ্যে আসতে শুরু করে, যখন কিছু জীবিত রোহিঙ্গা বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ায় পালিয়ে যায়। পালিয়ে আসা কয়েক ডজন সাক্ষী ও বেঁচে যাওয়া ব্যক্তির সাক্ষাৎকার নিয়েছে এইচআরডব্লিউ। এছাড়া স্যাটেলাইট চিত্রের মাধ্যমে তাদের বিবরণের সত্যতা যাচাই করা হয়েছে। পাশাপাশি ছবি ও ভিডিও বিশ্লেষণ ও যাচাই করেছে সংস্থাটি। হোয়ার সিরি হত্যাকাণ্ডের পর নিহত বা এখনও নিখোঁজ থাকা ১৭০ জনের বেশি গ্রামবাসীর একটি তালিকা সংকলন করেছে এইচআরডব্লিউ, যাদের মধ্যে প্রায় ৯০ জন শিশু রয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রকৃত মৃতের সংখ্যা সম্ভবত এর চেয়েও বেশি।

২০২৪ সালের জুলাইয়ে ওমর আহমেদ মিয়ানমারের রাখাইনের হোয়ার সিরিতে নিজ গ্রামের অন্যান্য রোহিঙ্গা মুসলিমদের সঙ্গে গোপনে ফিরে আসেন। দুই মাস আগে হোয়ার সিরিতে চালানো আরাকান আর্মির গণহত্যা থেকে তারা বেঁচে গিয়েছিলেন। ওমর আহমেদ বলেন, “আমরা যখন ফেলে যাওয়া কিছু জিনিসপত্র উদ্ধার করতে ফিরে আসি, তখন বাড়িঘর লুট ও পুড়িয়ে দেওয়া অবস্থায় এবং প্রিয়জন ও প্রতিবেশীদের দেহাবশেষ দেখতে পাই। গ্রামে কোনো গবাদিপশু দেখিনি, যদিও একসময় প্রতিটি বাড়িতেই গৃহপালিত পশু ও হাঁস-মুরগি ছিল। আমি শুনেছি, আরাকান আর্মি সেগুলো নিয়ে গেছে। আমি সেই ধানক্ষেতেও গিয়েছিলাম, যেখানে আমার নিকটাত্মীয়সহ প্রায় ৮০ জন গ্রামবাসীকে হত্যা করা হয়েছিল। সেখানে আমি সর্বত্র ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা কঙ্কাল ও মাথার খুলির স্তূপ দেখেছিলাম। মাংস পচে গেলেও পোশাক তখনও অক্ষত ছিল।”

প্রতিবেদনে বাংলাদেশ, ভারত, চীন, রাশিয়া, আসিয়ান, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও আরাকান আর্মির জন্য বেশ কিছু সুপারিশ করেছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ। বাংলাদেশকে দেওয়া সুপারিশে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে। হোয়ার সিরি থেকে পালিয়ে আসা ভুক্তভোগীদের চিকিৎসাসেবা, মানসিক সহায়তা ও নিরাপত্তা সেবা নিশ্চিত করার কথাও বলা হয়েছে। ২০২৪ সাল থেকে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গারা যাতে পর্যাপ্ত খাদ্য, বাসস্থান, চিকিৎসাসহ অন্যান্য জরুরি সেবা পায়, তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি। পাশাপাশি নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও স্বেচ্ছায় প্রত্যাবর্তনের পরিবেশ নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত মিয়ানমারে কোনো ধরনের প্রত্যাবাসন প্রচেষ্টা বন্ধ রাখতে বাংলাদেশকে আহ্বান জানানো হয়েছে।

এছাড়া আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি বাংলাদেশ ও মিয়ানমারে মানবিক সহায়তা বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছে এইচআরডব্লিউ। একই সঙ্গে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে মিয়ানমারের ওপর বৈশ্বিক অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা এবং জান্তা নেতৃত্ব ও সামরিক মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপে চীন ও রাশিয়াকে সমর্থনের আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি।

Print Friendly, PDF & Email
ঘটনাপ্রবাহ: আরাকান আর্মি, গণহত্যা, মিয়ানমার
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও পড়ুন