লেখাপড়ার খরচ চালানোর জন্য কোকোকে দিনরাত পিজ্জা ডেলিভারি করতে হয়েছে


বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে আমার যতটুকু প্রত্যক্ষ যোগাযোগ তা আদৌ তাৎপর্যপূর্ণ কিছু নয়। আজ বিষাদদীর্ণ সন্ধ্যায় তাদেরই স্মৃতিতর্পণ করা উচিৎ যাদের রচনার মধ্য দিয়ে বেগম খালেদার জিয়ার নেতৃত্বের গুণাবলী, আপসহীন রাজনৈতিক অবস্থান এবং দেশপ্রেম প্রোজ্জ্বলিত হয়ে উঠবে। নিশ্চয় অনেকে সে রকম কিছু লিখবেন। আমি দু’ ফোঁটা শিশির বিন্দু রেখে যেতে পারি মাত্র।
১৯৯০ সালে আমি অস্ট্রেলিয়ার মনাশ ইউনিভার্সিটিতে এমবিএ করছিলাম। তখন আরাফাত রহমান কোকোর সঙ্গে পরিচয় ঘটে এবং সেই পরিচয় থেকে কিছু ঘনিষ্ঠতাও হয়। সে সময় কোকো খুবই আর্থিক সংকটের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। সে এসেছিল ভিক্টোরিয়া ইউনিভার্সিটিতে আন্ডারগ্রাজুয়েট পড়ার জন্য। এক কিংবা দুই সেমিস্টার পড়ার পর তার মা আর টাকা পাঠাতে পারেননি । পড়া বন্ধ। হাতের টাকা এক সময় ফুরিয়ে গেল। পিজ্জা হাটের ডেলিভারি বয় হিসেবে কাজ করে কোকোকে চলতে হতো।
শুক্র ও শনিবার সন্ধ্যা থেকে কাজের বেশ চাপ থাকতো কোকোর। খাওয়ার সময় পর্যন্ত পাওয়া যেত না। কখনো রাত দুটার দিকে ক্ষুধা পেটে বাসায় এসে ঘুম ভাঙ্গিয়ে বলত, ‘ভাবীকে বলেন, ফ্রিজে যা আছে গরম করে দিতে।‘ খিচুড়ী আর ডিম ভাজা করে দিতে সময়বেশী লাগতো না। কিন্তু আমার স্ত্রী অপ্রস্তুতবোধ করতেন। হাজার হলেও বেগম খালেদা জিয়ার ছেলে। সে সময় আমার স্ত্রী ছুটি নিয়ে কিছু দিন মেলবর্ণে ছিলেন।
১৯৯০ এর গ্রীষ্মের ছুটিতে আমি ঢাকা আসার জন্য টিকিট করেছি। সময়টা অক্টোবরের শেষভাগ হবে। এ সময় কেউ ঢাকা থেকে এসে থেকে মায়ের পাঠানো কিছু ডলার দিয়ে গেছে কোকোর হাতে। মার্কিন ডলার। খরচ করতে হলে সেগুলো অস্ট্রেলিয় ডলারে রূপান্তর করতে হবে। কোকোকে নিয়ে মনাশ বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের কমনওয়েলথ ব্যাঙ্কে গেলাম। ব্যাংক কর্মকর্তা পরীক্ষা করে জানালেন, ৫০টি একশত ডলার নোটের সবগুলি জাল। তিনি অকাতরে নোটগুলি ফিরিয়ে দিলেন।
আমরা খুব হতাশ হয়ে পড়লাম। কোকো বললো, আপনি দেশে যাচ্ছেন। এই ডলারগুলো নিয়ে আম্মার হাতে ফিরিয়ে দিতে পারবেন না? আমি রাজি হলাম: কেন পারবো না? পারবো।
ঢাকায় ফিরে ফোন করে নিয়ে হেমন্তের এক প্রশান্ত সন্ধ্যায় কোকোদের শহীদ মইনুল হোসেন রোডের বাড়িতে গেলাম। কোকোর আম্মা সর্বজনশ্রদ্ধেয় দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সাক্ষাৎ পেলাম। সংক্ষিপ্ত সাক্ষাৎ। তাঁর হাতে খামে ভরা ওই পাঁচ হাজার ডলার তুলে দিলাম।
তাঁকে খুব ব্যথিত দেখালো। চিন্তিতও। অস্ট্রেলিয়াতে ছেলের বাড়ী ভাড়া, দৈনিক খাওয়া দাওয়ার খরচ ইত্যাদি জিজ্ঞেস করলেন। মৃদুকণ্ঠে স্বগতোক্তির মতো বললেন, যে ভদ্রলোক তাকে ওই ডলারগুলো কিনে দিয়েছে সে অত্যন্ত দায়িত্বজ্ঞানহীনতার পরিচয় দিয়েছে। আক্ষ্পে করে বললেন, তার কাছ থেকে ওই টাকা উদ্ধার করা যাবে কিনা সন্দেহ।
মিষ্টি ও চা খাওয়ার পর বললাম, নভেম্বরের শেষ সপ্তাহে আমি মেলবর্ণে ফিরে যাবো। তিনি কি কিছু দেবেন আমার কাছে? কোকোর জন্য?
বেগম খালেদা জিয়া বললেন, এখন তো কোন টাকা দিতে পারবো না। কোকোকে বলবেন, হাতে টাকা হলেই পাঠিয়ে দেব। থাকার ব্যবস্থা ছিল। কিন্তু খুব কম ছিল তাঁর আয়। কিছুক্ষণ চুপচাপ কেটে গেল। বাইরে সন্ধ্যার আঁধার ঘনীভূত হয়েছে। আমি উঠবার জন্য অনুমতি চাইলাম। তিনি দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিলেন: ‘কষ্ট করে’ আসার জন্য ধন্যবাদ জানালেন।
১৯৯১ সালের ৬ ডিসেম্বর সকালের দিকে জানতে পারলাম এরশাদ সরকারের পতন হয়েছে। টেলিভিশনে বেগম খালেদা জিয়ার বক্তৃতা শোনানো হচ্ছে। কোকোকে ফোন করলাম। ফোন কেউ ধরল না। দেশের প্রকৃত অবস্থা কী, কেন স্বৈরশাসক এরশাদ গদি ছেড়ে দিলেন, হয়তো কোকো তার মায়ের সঙ্গে কথা বলে আমাদের জানাতে পারবে এই আশায় সঙ্গে সঙ্গে কোকোর বাসায় চলে গেলাম।
তখন সকাল দশটার বেশী বাজে। কয়েকবার বেল দেয়ার পর কোকো ঘুমচোখে দরজা খুলে দিল। নাটকীয়ভাবে বাংলাদেশে রাজনৈতিক পট বদলে যাওয়ার কিছুই সে জানে না। সারারাত পিজ্জা ডেলিভারির কাজ করে তিনটার দিকে সে ঘুমিয়েছে। তাই উঠতে দেরী। আমি বললাম, তোমার আম্মাকে ফোন করলে হয়তো সঠিক অবস্থা জানতে পারবে।
নত মুখে কোকো জানাল, ফোনের লাইন কাটা। পরপর তিন মাস ফোনের বিল দেয়া সম্ভবপর হয়নি। আমি হতভম্ব হয়ে গেলাম। বুঝতে পারলাম কোকোর খুব দুর্দিন যাচ্ছে; এতটাই খারাপ যা কল্পনাতীত। বললাম, ঠিক আছে, আমি যাচ্ছি। ফ্রেশ হয়ে তুমি আমার বাসায় আসো। আমার বাসায় এসে ফোন থেকে কথা বলবে, ব্রেকফাস্ট করবে।
কোকো জানাল, একমাস যাবত তার গাড়ি নষ্ট। মেরামতের টাকা জোগাড় হচ্ছে না। অন্যের গাড়ি ধার করে সে পিজ্জা ডেলিভারির কাজ করছে।
খুবই দুঃখিত বোধ করলাম। অপরাধবোধ হলো: অস্ট্রেলিয় সরকারের বৃত্তি নিয়ে পড়তে গেছি। অর্থকষ্ট নেই। আর জিয়াউর রহমানের ছেলে টাকার অভাবে কষ্ট করছে? একটু বসেন। আমাকে নিয়ে চলেন। আমি অপেক্ষা করলাম। সে প্রাতঃকৃত্য শেষ করে আমার সঙ্গে বাসায় এসে তার আম্মাকে ফোন করলো। জেনারেল এরশাদের পতনের আশু কারণ জানা সম্ভব হলো।
আমি খুব ভালো পরাটা বানাতে পারতাম। পরাটা বানালাম। আগের দিনের বেঁচে যাওয়া গরুর মাংস ওভেনে গরম করে দিলাম । তারপর চা। একটি মেয়েকে সে পছন্দ করতো। তার ফটো দেখিয়েছিল। ওর কথা জিজ্ঞেস করলাম। কিছুক্ষণ গল্পগুজবের পর কোকোকে বাসায় পৌঁছে দিলাম। কোকোর সঙ্গে ওর বন্ধু মিকি ও স্বপন থাকতো, একই বাসায়।
অচিরেই বাংলাদেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হলো। সরকার প্রধান হলেন বিচারপতি শাহাবুদ্দিন আহমদ। কিছুদিন পর ১৯৯১ সালে ২৭শে ফেব্রুয়ারি দেশে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো;─ বাংলাদেশের পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচন। চমৎকার একটি নির্বাচন যেখানে মানুষ অবাধে ভোট দিতে পেরেছিল। জিয়াউর রহমানের প্রতিষ্ঠা করা বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ৩০০টি আসনের মধ্যে ১৪০টি আসনে বিজয়ী হলো। ২০শে মার্চ তারিখে পার্লামেন্টের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের সমর্থন নিয়ে বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হলেন।
মা প্রধানমন্ত্রী হলেও কোকোর অবস্থার পরিবর্তন ঘটল না । ফেব্রুয়ারিতে নতুন সেমিস্টার শুরু হয়ে গেল। টুইশন ফি’র অভাবে কোকো পড়াশুনা চালিয়ে যেতে পারছে না। সে দেশে ফিরে যেতে চায়। মাঝে মাঝে ফোন করে মাকে বলে বিমান ভাড়া পাঠাতে।
বেগম খালেদা জিয়া চান না ছেলে দেশে ফিরুক। চান না, কোকো প্রধানমন্ত্রীর ছেলে হিসেবে বড় হোক। অন্যদিকে কোকোর ইউনিভার্সিটিতে পড়ার জন্য টাকা পাঠানোও তারপক্ষে সম্ভব হচ্ছিল না।
বেশ কয়েক মাস কেটে গেল। হঠাৎ একদিন কোকো জানালো ওর আম্মা টিকেট কেনার জন্য টাকা পাঠিয়েছেন। আমরা স্টুডেণ্ট ট্রাভেলস-এ গেলাম টিকেট কেনার জন্য। মেলবর্ণ-ব্যাংকক-ঢাকা।
কোকোকে মেলবর্ণের তুলামেরিন এয়ারপোর্টে পৌঁছে দিলাম। আরও অনেকে ছিল। একটি খামে তিন হাজার ডলার হাতে দিয়ে বললাম, দেশে গিয়ে সুবিধা মতো সময়ে তোমার ভাবীকে টাকাটা দিয়ে এসো। ফোন নম্বর লেখা আছে।
কোকো দেশে ফিরে যাওয়ার পর এক সপ্তাহ দু সপ্তাহ করে মাস কেটে গেল। আমার স্ত্রীর সঙ্গে ফোনে কথা বলি মাঝে মাঝে। না, কোকোর কোনো খবর নেই। সে গিয়ে টাকা দিয়ে আসে নি।
প্রায় দু মাস পার হওয়ার পর একদিন সসংকোচে ফোন করলাম বেগম খালেদা জিয়ার বাসার নম্বরে। কোকোকে পাওয়া গেল।
কোকো বিনীত কণ্ঠে জানালো, মেলবর্ন থেকে ঢাকায় ফেরার পর এ পর্যন্ত আম্মা ওকে বাসা থেকে বের হতে দেননি। যে দিন আম্মা বের হতে দেবেন সেদিনই সর্বপ্রথম মিরপুর গিয়ে আমার স্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে টাকাটা পৌঁছে দিয়ে আসবে।
বেগম খালেদা জিয়া কখনো চাননি ছেলেরা প্রধানমন্ত্রীর ছেলে হিসেবে বড়াই করুক। বা বন্ধুদের তোষণের পাত্র হোক।
কয়েকদিন পর কোকো তার আম্মাকে আমার দেয়া ডলারগুলির কথা জানাল। পরদিনই নিরাপত্তাকর্মীদের দিয়ে তিনি কোকোকে মিরপুর আমার শ্বশুড়বাড়ীতে পাঠালেন আমার স্ত্রীর হাতে ডলারের খামটা পৌঁছে দেয়ার জন্য।
২০০২ বিশ্বব্যাংকের কনসালট্যান্সির চাকুরি শেষ হয়ে গেলে আমি সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ে কাজে যোগ দিয়েছি। আমাকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পরিচালক হিসেবে পদস্থ করা হয়েছে। সেখানে মুখ্য সচিব ডঃ কামাল উদ্দিন সিদ্দিকী: কঠিন মানুষ। প্রধানমন্ত্রীর ধারে-কাছে যাওয়ার প্রশ্ন ওঠেনা।
তবে একনেকের সংশ্লিষ্ট ডেস্ক অফিসার হিসেবে কিছুদিন পরপরই আমাকে একনেক সভার জন্য ব্রিফ তৈরি করে দিতে হতো। এছাড়া একনেক সভাতেও উপস্থিত থাকতে হতো বিভিন্ন প্রকল্পের সব কাগজপত্র সহ যদি কোন প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়।
একনেকের সভাতেও দেখেছি তিনি স্মিতমুখে চুপচাপ সভানেত্রীর আসনে আসীন। মন্ত্রীরা আলোচনা করছেন। অপ্রয়োজনে কথা বলা তাঁর স্বভাবগত ছিল না। একবার একটি প্রকল্প নিয়ে অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমান ও মান্নান ভুঁইয়া সাহেবের মত্যে তুমুল তর্ক লেগে গেল। কিছক্ষণ কথাকাটাকাটি চললো। কিছুক্ষণ পর প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া মাইক অন করে বললেন, আমি একটু বলি। মাননীয় অর্থমন্ত্রীর যুক্তি ঠিক আছে। তবে মান্নান ভুঁইয়া সাহেব আমাদের বড় নেতা। আজ আমরা তার আবদার মেনে নেই, কেমন?
সব তর্ক এক নিমেষে শেষ। তাঁর ব্যক্তিত্ব ছিল অসামান্য। কেউ তাঁকে তিল পরিমাণ অসম্মান করার কথা ভাবতো না।
বেগম খালেদা জিয়ার কমনসেন্স ছিল তীক্ষ্ণ। আমার এক প্রভাবশালী বন্ধু বিদেশস্থ দূতাবাসে পদস্থ হবার জন্য আবেদন করেছিল। সে নির্বাচনী পরীক্ষায় প্রথম হয়েছিল এবং স্বাভাবিকভাবেই তার এই সুযোগটি পাওয়ার কথা। কিন্তু সে অনেক তদবির করিয়েছিল সামরিক ও বেসামরিক সকল উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, কয়েকজন প্রভাবশালী মন্ত্রী, বিরোধীদলীয় কয়েকজন প্রভাবশালী নেতা-নেত্রী ─ সবাই তার জন্য সরাসরি প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নিকট তদবির করেছিলেন। সামারি যাওয়ার পর মাননীয় প্রধানমন্ত্রী লিখে দিলেন নতুন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিয়োগের জন্য। আমার বন্ধুর ওই দফা বিদেশ গমন হলো না। ─ বেগম খালেদা জিয়ার কাছে মনে হয়েছিল, যে অফিসার এতো তদবির করাতে পারে তার বিষয় পুনর্বিবেচনার দাবী রাখে।
একবার বই উৎসব হলো। হুমায়ূন আহমেদ এসেছিলেন তাঁর কয়েকটি বই নিজের হাতে তুলে দেয়ার জন্য। বেগম খালেদা জিয়া উঠে দাঁড়ালেন। হুমায়ূন আহমেদের হাত থেকে বইগুলি নিলেন। কুশল বিনিময় হলো। অকপটে জানালেন, আপনার বই পড়ি। পড়তে ভালো লাগে। হুমায়ূন ভাই বললেন, আপনার হাতে কয়েকটি বই তুলে দিতে পেরে আমি খুশী। বেগম খালেদা জিয়া হাসলেন। ঘন কুয়াশার মধ্যে সূর্যোদয়ের মতো নয় বরং তাঁর হাসি ছিল ঘোরকৃষ্ণ রাত্রির আকাশে চাঁদের উদ্ভাসের মতো স্নিগ্ধ।
পরিণত বয়সে তিনি লোকান্তরিত হলেন। এই পৃথিবীতে পরমেশ্বর কার কাঁধে কী দায়িত্ব চাপিয়ে দেন তার কার্যকারণ উপলব্ধি করা কঠিন। ১৯৮১ থেকে দেশরক্ষা ও সমাজ গঠনের এক গুরু দায়িত্ব পালন করে গেলেন বেগম খালেদা জিয়া। আক্ষরিক অর্থে জীবন উৎসর্গ করে গেলেন। অনেক কষ্ট তাঁকে করতে হয়েছে এই পৃথিবীর মাটিতে। আল্লাহপাক তাঁকে ক্ষমা করুন এবং জান্নাতুল ফিরদৌসে তাঁকে চিরশান্তির আবাস দান করুন ─ করজোড়ে এই প্রার্থনা করি।

















