ভূমি নিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইনের শুনানি

সংশয়, উদ্বেগ-আতঙ্কে আন্দোলনে নামছে পাহাড়ের বাঙালি সংগঠনগুলো

fec-image

ভূমি কমিশনে বাঙালিদের বিভিন্ন দাবী দাওয়া নিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম নাগরিক পরিষদ ইতোমধ্যেই  আগামী শুক্রবার (২০ ডিসেম্বর) পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজেলা সদরে মতবিনিময় ও গণসংযোগ এবং  ২১ ডিসেম্বর (শনিবার) তিন পার্বত্য জেলা সদরে মানববন্ধন কর্মসূচি পালনের কর্মসূচী ঘোষণা করেছে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশনে দায়ের করা অভিযোগের শুনানি আগামী ২৩ ডিসেম্বর শুরু হতে পারে। কিন্তু শুনানী শুরু হওয়ার আগেই এ নিয়ে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা ও আতঙ্ক বোধ করছে পার্বত্য অধিকার নিয়ে আন্দোলন করা বাঙালি নেতারা।  এ আইন ও কমিশনকে বৈষম্যমূলক ও বাঙালি বিদ্বেষী আখ্যা দিয়ে ইতোমধ্যে আন্দোলনের ডাক দিয়েছে তারা।

একইসাথে তারা পাহাড়ি-বাঙালি সমতা বিধান করে এই কমিশন গঠন, আপিল করার সুযোগসহ বিভিন্ন দাবি দাওয়া নিয়ে আন্দোলনের ঘোষণা দিয়েছে। মানববন্ধন, স্মারকলিপি পেশসহ বৃহত্তর আন্দোলনেরও ডাক দিয়েছেন তারা। পার্বত্যনিউজের সঙ্গে একান্ত আলাপে পার্বত্য চট্টগ্রাম নাগরিক পরিষদ, ছাত্র পরিষদ ও মহিলা পরিষদের নেতারা এসব দাবি দাওয়ার কথা তুলে ধরেন।

বান্দরবান জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও পার্বত্য চট্টগ্রাম নাগরিক পরিষদের স্টিয়ারিং কমিটির সদস্য কাজী মুজিবর রহমান বলেছেন, আমরা ইতিমধ্যে গত ১২ ডিসেম্বর ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইনের শুনানি স্থগিতের জন্য মানবন্ধন করেছি। কিন্তু এখন একটি বৈষম্যমূলক আইন দ্বারা এই শুনানি হতে যাচ্ছে। অবিলম্বে এই আইন পরিবর্তন করতে হবে। আমরা এই আইনের সংশোধনী চাই। এই আইনে শুধু বাঙালিরা নয় অনেক পাহাড়ি সম্প্রদায়ও ক্ষতিগ্রস্থ হবে।

তিনি বলেন, এই কমিশন হতে হবে জনসংখ্যার আনুপাতিক হারে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে এই কমিশনের ৫ জনের মধ্যে ৩ জন পাহাড়ি। ২ জন সরকারের প্রতিনিধি। তারা বাঙালিদের প্রতিনিধিত্ব করছে না।

তিনি বলেন, এই কমিশনে আপিল করারও কোন সুযোগ নেই। এর সংশোধন করতে হবে। যদি দেশের সংবিধান সংশোধন করা যায়। এই বৈষম্যমূলক আইনের সংশোধন কেন করা যাবে না?

আগামী ২১ ডিসেম্বর তিন পার্বত্য জেলায় মানববন্ধন কর্মসূচি নেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি। কঠিন কোন কর্মসূচি নেবেন কীনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা এখন শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি দিচ্ছি। এই আন্দোলনের মাধ্যমে সরকারের কাছে দাবি এই ভূমি কমিশন আইন সংশোধন করে পাহাড়ি-বাঙালি সবার সাংবিধানিক অধিকার ফিরিয়ে দেয়া হোক। এর পরবর্তীতে সময় বলে দিবে আমরা কী কর্মসূচি নেবো।

পার্বত্য চট্টগ্রাম নাগরিক পরিষদের স্টিয়ারিং কমিটির সদস্য মনিরুজ্জামান মনির বলেছেন, আমরা আশা করেছিলাম বিচারক খাদেমুল ইসলামের সমন্বয়ে যে কমিশন গঠন করা হয়েছিলো সেই ধারাবাহিকতা রক্ষা করে ভূমি কমিশন গঠন করা হবে। কিন্তু সেটি হয়নি।

এখনকার যে কমিশন হয়েছে সেটি হচ্ছে সন্তু লারমার কমিশন। পাহাড়িদের ভূমি কমিশন। এটি শুধু সন্তু লারমার পক্ষে কথা বলে। যেখানে পার্বত্য অঞ্চলে অর্ধেক জনগোষ্ঠী বাঙালি। সেখানে  বাঙালিদের কোন প্রতিনিধি শুনানিতে রাখা হয়নি। এই কমিশনের চেয়ারম্যান বাঙালি হলেও তিনি সরকারের প্রতিনিধি, তিনি পাহাড়ের কেউ নন। এ জন্য আমরা উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ করছি যে আমরা এক্ষেত্রে ন্যায় বিচার পাবো না। এই কমিশনের শুনানি হবে বাঙালি-পাহাড়ি সবার জন্য একটি প্রহসন।

তিনি বলেন, আগামী ২১ ডিসেম্বর শনিবার তিন পার্বত্য জেলায় আমরা মানবন্ধন কর্মসূচি ঘোষণা করেছি। বিশেষ করে যেহেতু শুনানিটা খাগড়াছড়ি জেলায় হবে। আমরা খাগড়াছড়িতে বিশাল আকারে মানবন্ধন করবো।

এখানে আমাদের এখন দুটি দাবি। একটি হলো এই কমিশনে প্রতিটি পার্বত্য জেলা থেকে ২ জন করে মোট ৬ জন প্রতিনিধি নেওয়া হোক। যেহেতু এখানকার জনসংখ্যার অর্ধেক বাঙালিরা। তাহলে এখানে সমতা বজায় থাকে। আর এখন যে ভূমি কমিশন আইন আছে এর সংস্কার জরুরি। না হলে এই আইনের মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হবে।

তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা গওহর রিজভী এসে আমাদের কথা দিয়েছিলেন। একটি সুষ্ঠু সমতাভিত্তিক কমিশন করবেন। কিন্তু আসলে কিছুই হয়নি।

এখনই কোন কঠোর কর্মসূচি নয়। একটি শান্তিপূর্ণ কর্মসূচির মাধ্যমে বাঙালিদের অধিকার আদায়ের কথা বলা হবে বলেও জানান তিনি।

পার্বত্য চট্টগ্রাম নাগরিক পরিষদের স্টিয়ারিং কমিটির সদস্য এস এম মাসুম রানা বলেছেন, ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি আইন একটি বৈষম্যমূলক আইন। এই আইনের কারণে আমরা উদ্বিগ্ন। সমতলের জন্য এক আইন আর পাহাড়ি অঞ্চলে এক আইন এটি চলতে পারে না। দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করে সবার জন্য সমান আইন করতে হবে।

এ সময় তিনি মানববন্ধন থেকে কঠোর কর্মসূচি নেওয়া হবে জানিয়ে বলেন, আমরা শনিবার মানববন্ধনে সরকারের কাছে আমাদের দাবি দাওয়া তুলে ধরব। এখান থেকে আমরা আল্টিমেটাম দেবো। সরকারের কাছে আমরা স্মারকলিপি দেবো।

পার্বত্য চট্টগ্রাম নাগরিক পরিষদের স্টিয়ারিং কমিটির সদস্য  আব্দুল মজিদ বলেছেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। এ নিয়ে বাঙালিরা খুব আতঙ্কের মধ্যে আছে। পুরো ভূমি কমিশন আইনটা পাহাড়িদের পক্ষেই গেছে। আমাদের বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন আশ্বাস দেওয়া হলেও আমাদের কোন সফলতা নেই এক্ষেত্রে। আমরা ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের প্রস্তুতি নিচ্ছি।

পার্বত্য চট্টগ্রাম নাগরিক পরিষদের স্টিয়ারিং কমিটির সদস্য  ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বাঙালি ছাত্র পরিষদের বান্দরবান জেলার আহ্বায়ক মিজানুর রহমান আখন্দ বলেছেন, পার্বত্য ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন একটি বিতর্কিত কমিশন। এই কমিশনে  বাঙালিদের রাখা হয়নি। আমাদের দাবি অবিলম্বে এই কমিশনে বাঙালিদের স্থান দিতে হবে। তিন জেলার ২ জন করে ৬ জন রাখতে হবে। আপিলের সুযোগ রাখতে হবে।

তিনি বলেন, এই আইন পার্বত্যবাসী প্রত্যাখ্যান করেছে। এমনকি পাহাড়ি পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীও প্রত্যাখ্যান করেছে। এ জন্য এখন আমরা মানববন্ধন কর্মসূচি নিয়েছি। কিন্তু এতে দাবি আদায় না হলে বৃহত্তর কর্মসূচি নেওয়া হবে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম নাগরিক পরিষদের স্টিয়ারিং কমিটির সদস্য  হাবিবুর রহমান বলেছেন, এখনকার যে পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন হয়েছে সেটি একটি একপেশে কমিশন। বাঙালি পাহাড়ি এখানে জনসংখ্যার দিক থেকে সমান সমান। এরপরও এখানে পাহাড়িদের মধ্যে থেকে প্রতিনিধি আছে। কিন্তু বাঙালিদের কোন প্রতিনিধি নেই।

তিনি বলেন,   কমিশনের শুনানিতে সংখ্যাগরিষ্ঠের কথা শোনা হবে। কিন্তু এখানে পাহাড়ি উপজাতিরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ। যার কারণে পুরো রায়টি ওদের পক্ষে যাবে।

তিনি বলেন, দাবি না মানলে কঠোর কর্মসূচিতে যাওয়া হবে বলে জানিয়ে তিনি বলেন, এখানে বাঙালিদের অন্তর্ভূক্ত করতে হবে। আপিলের কোনো সুযোগ রাখা হয়নি। আপিলের সুযোগ রাখতে হবে। সর্বোপরি বাঙালি প্রতিনিধি রাখতে হবে। শনিবার মানববন্ধন কর্মসূচি রাখা হয়েছে। দাবি মানা না হলে ধাপে ধাপে আরও কঠোর কর্মসূচি নেওয়া হবে। ঘেরাও কর্মসূচি নেওয়া হবে।

উল্লেখ্য, ভূমি কমিশনে বাঙালিদের বিভিন্ন দাবী দাওয়া নিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম নাগরিক পরিষদ ইতোমধ্যেই  আগামী শুক্রবার (২০ ডিসেম্বর) পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজেলা সদরে মতবিনিময় ও গণসংযোগ এবং  ২১ ডিসেম্বর (শনিবার) তিন পার্বত্য জেলা সদরে মানববন্ধন কর্মসূচি পালনের কর্মসূচী ঘোষণা করেছে।

Print Friendly, PDF & Email
ঘটনাপ্রবাহ: পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশনের চেয়ারম্যান, ভূমি কমিশন
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

sixteen − five =

আরও পড়ুন