সিঙ্গাপুরে ওসমান হাদির ইন্তেকাল


ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদি ইন্তেকাল করেছেন। সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি ইন্তেকাল করেছেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)।
সিঙ্গাপুরে ওসমান হাদির চিকিৎসা দেখভালের সঙ্গে যুক্ত থাকা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা আজ বৃহস্পতিবার রাত ১০টার দিকে ঢাকার সাংবাদিকদের বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
একাধিক শীর্ষ জাতীয় দৈনিকের অনলাইন সংস্করণ ও ওসমান হাদির ভেরিফায়েড ফেইসবুক পেজের এডমিন থেকেও ওসমান হাদির মৃত্যুর খবর জানানো হয়েছে।
ওসমান হাদির ভেরিফায়েড ফেইসবুক পেইজে বলা হয়েছে, ভারতীয় আধিপত্যবাদের মোকাবেলায় মহান বিপ্লবী ওসমান হাদিকে আল্লাহ শহিদ হিসেবে কবুল করেছেন।
বিদায় বন্ধু শহীদ হাদী শিরোনামে নিজের ভেরিফায়েড পেইজে স্ট্যাটাস দিয়েছেন প্রবাসী লেখক ও অনলাইন এক্টিভিস্ট পিনাকী ভট্টাচার্য। তিনি লিখেছেন, ‘আল্লাহর সকল সৃষ্টি নিশ্চয় তাঁর কাছেই ফিরে যাবে। (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন!)। ফ্যাসিবাদ বিরোধী সংগ্রামে আমাদের সহযোদ্ধা বীর শহীদ শরীফ ওসমান হাদী আমাদের এই পৃথিবীর মায়া ছেড়ে চলে গেছে।’
গত শুক্রবার দুপুরে রাজধানীর পল্টনের বিজয়নগর এলাকায় গুলিবিদ্ধ হন শরিফ ওসমান হাদি। প্রথমে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (ঢামেক) নেওয়া হয়। সেখানে তার মাথায় অস্ত্রোপচার করে গুলির অংশ বের করা হয়। রাতে তাকে এভার কেয়ার হাসপাতালে রেফার করা হয়। সেখান থেকে গত সোমবার সিঙ্গাপুরে পাঠানো হয়। ওইদিন দুপুর ১টা ৫৫ মিনিটে হাদিকে বহনকারী এয়ার অ্যাম্বুলেন্সটি ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ত্যাগ করে।
সময়ের এক সাহসী কণ্ঠস্বর শরিফ ওসমান হাদি। সরকার প্রধান থেকে শুরু করে দেশপ্রেমিক সর্বস্তরের মানুষ যার সুস্থ্যতার জন্য দোয়া করছেন। তাঁকে হত্যাচেষ্টার প্রতিবাদ আর বিক্ষোভে ফেটে পড়ছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন। হাসপাতালের গেটে হাউমাউ করে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েছেন সহযোদ্ধারা।
ওসমান হাদি বয়সে তরুণ হলেও জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ও অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে তার বক্তব্য, লেখালেখি ও যাবতীয় কর্মকাণ্ড আধিপত্যবাদীদের দুর্গে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। তারা ওসমান হাদির চোখে সাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের এক সুরক্ষিত মানচিত্র দেখতে পেয়েছে। একাধিকবার হত্যার হুমকি দিয়েও থামানো যায়নি তাকে। বরং আগামীর সংসদ সদস্য হয়ে তিনি কথা বলতে চেয়েছেন দেশের সর্বোচ্চ প্লাটফর্মে। রুখে দাঁড়াতে চেয়েছেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে। ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্র বিনির্মাণের স্বপ্ন নিয়ে তাই তো তিনি ১২ ডিসেম্বর শুক্রবার পবিত্র জুমার নামাজ শেষে ছুটছিলেন নির্বাচনী প্রচারণায়। মানুষের কাছে গিয়ে বলতে চাইছেন তাঁর বুকভরা স্বপ্নের কথা। আর এ সময়ে রাজধানীর বিজয় নগরে পেছন দিক থেকে মাথায় গুলি চালিয়ে পালিয়ে যায় সন্ত্রাসীরা।
ঝালকাঠির একটি অতি সাধারণ পরিবারে জন্ম নেয়া অসাধারণ এই বিপ্লবী পড়াশোনা করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে। শিক্ষকতা তার পেশা, অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো তাঁর নেশা। একঝাঁক সহযোগী তরুণ বিপ্লবী জুলাই যোদ্ধা নিয়ে গড়ে তোলা সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম ‘ইনকিলাব মঞ্চ’। আর এই ইনকিলাব মঞ্চ’র মুখপাত্র হিসেবে তিনি ক্রমেই হয়ে উঠছিলেন বাংলাদেশের মুখপাত্রে, স্থান করে নিয়েছিলেন স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের মানচিত্রে।
শরিফ ওসমান হাদির গ্রামের বাড়ি ঝালকাঠির নলছিটিতে। বাবা প্রয়াত মাদ্রাসার শিক্ষক মাওলানা আবদুল হাদি। নেছারাবাদ কামিল মাদ্রাসায় ওসমান হাদির শিক্ষাজীবনের শুরু। পরে তিনি ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের ২০১০-২০১১ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। ২০২৪ সালে শিক্ষার্থীদের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে সাহসী ভূমিকার জন্য তিনি জাতীয় পর্যায়ে বিশেষ পরিচিতি পান। টিভি টকশো ছাড়াও ইনকিলাব মঞ্চের বিভিন্ন সভা-সমাবেশে দেওয়া ঝাঁজাল ও প্রতিবাদী বক্তব্যে দেশের সাধারণ মানুষের কাছে তিনি হয়ে ওঠেন একজন খাঁটি দেশপ্রেমিক অনন্য সাহসী মুখের প্রতিচ্ছবি।
জীবন সংগ্রামে টিকে থাকার লড়াইয়ে তিনি এক সময় প্রাইভেট পড়িয়েছেন, ইউনিভার্সিটি অব স্কলারস বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে করেছেন শিক্ষকতাও। লিখেছেন একাধিক বই। একাধিক সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনে যুক্ত থাকলেও জুলাই আন্দোলনের পূর্বে রাজনীতি থেকে দূরে ছিলেন ওসমান হাদি।
নভেম্বরে দেশি-বিদেশি অন্তত ৩০টি ফোন নম্বর থেকে ফোন এবং মেসেজে হত্যার হুমকি পেয়েও থেমে যাননি ওসমান হাদি। এমনকি তার বাড়িতে আগুন দেওয়া এবং মা-বোন ও স্ত্রীকে ধর্ষণের হুমকিও ছিল ওই সব মেসেজে।

















