অন্তর্ঘাতমূলক কাজে জড়িত সন্দেহে বরকল বিজিবি ক্যাম্প থেকে ৩ ভিক্ষু ও ভুয়া সেনাকর্মকর্তাসহ ১২ জন আটক
স্টাফ রিপোর্টার:
সেনাবাহিনীর অফিসার বলে মিথ্যা পরিচয় দিয়ে রাঙামাটির বরকলে বিজিবির একটি ক্যাম্পে (ছাউনি) প্রবেশ ও অর্ন্তঘাতমূলক কাজে জড়িত সন্দেহে তিন বৌদ্ধ সাধকসহ ১২ জনকে আটক করে বরকল থানায় হস্তান্তর করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ বিজিবি।
আটককৃতদের মধ্যে সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট পরিচয়দানকারী পাহাড়ি যুবকের নাম বিভাস দেওয়ান। সে রাঙামাটি সদর থানার বিজয় সরনী গ্রামের অবসরপ্রাপ্ত স্বাস্থ্য কর্মকর্তা বি কে দেওয়ানের পুত্র। তার মায়ের নাম কনিকা দেওয়ান।
অপর আটককৃতরা হলো: রিটেন চাকমা, সুনীতি বিকাশ চাকমা, রিপেন চাকমা, রিগেন চাকমা, ছন্দ সেন চাকমা, মুক্তবীর চাকমা, রুহিত চাকমা, জ্যাকসন চাকমা, শ্রীমৎ বুদ্ধজ্যাতি ভান্তে, শান্ত প্রিয় ভান্তে ও গিরিমান্দ ভান্তে। আটককৃতদের মধ্যে রাঙামাটি সরকারি কলেজে অধ্যয়নরত রয়েছে ৫ জন, চট্টগ্রাম বিশ্ব বিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত রয়েছে একজন, চট্টগ্রামের প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত রয়েছে একজন। বাকিদের মধ্যে বৌদ্ধ ভান্তে রয়েছেন তিনজন, বাকি একজন ফটো সাংবাদিক।
শ্রীমৎ বুদ্ধজ্যাতি ভান্তে, শান্ত প্রিয় ভান্তে ও গিরিমান্দ ভান্তে রাঙামাটি রাজবন বিহারের বৌদ্ধ ভিক্ষু এবং ছন্দসেন চাকমা ফ্রিল্যান্স ফটোগ্রাফার। রাঙামাটি রাজবন বিহার কর্তৃপক্ষ তিনজন বৌদ্ধ সাধককে আটক করার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
বিজিবি বরকল জোনের অধিনায়ক (সিও) লে. কর্নেল মো. আলাউদ্দিন আল মামুন জানান, বৃহস্পতিবার বেলা ১২টার দিকে তাদের আটক করা হয়। এর আগে আটক ১২ জনের দলটি বরকলের শীর্ষ পাহাড় এসএস টিলায় (ফালিটাঙ্যা মোন) গিয়েছিলেন।
সেখানে গিয়ে তাদের দলের একজন ফালিটাঙ্যা মোনের বিজিবি ক্যাম্পে গিয়ে নিজেকে সেনাবাহিনীর লেফট্যানেন্ট পরিচয় দেন। এই পরিচয়ের কারণে বিজিবির সদস্যরা সেখানে তাদের আপ্যায়ন করেন। তবে ভুয়া সেনা কর্মকর্তার আচার আচরণ ও কথাবার্তায় সন্দেহ হলে তারা বরকলের বিজিবি জোনে খবর দেন।
এ ছাড়াও পাহাড় থেকে নেমে বরকল সদরের বিজিবি চেকপোস্ট এলাকাটি তারা বিচ্ছিন্নভাবে পার হচ্ছিলেন। এতে বিজিবির আরো সন্দেহ বাড়ে। তাছাড়া যিনি নিজেকে সেনা অফিসার পরিচয় দিয়েছিলেন সংশ্লিষ্ট দফতরে খবর নিয়ে তার পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এজন্য তাদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়।
আটকের পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ প্রাপ্ত তথ্য অনুসারে সেনাবাহিনীর একটি দল রাঙামাটিতে বিভাস দেওয়ানের বাড়িতে তল্লাশী চালিয়ে সেনাবাহিনীর ব্যবহার্য অনেক জিনিস পত্র পায়। এ ছাড়াও তার দেয়া তথ্য অনুসারে সেনাবাহিনী ও র্যাবের েএকটি দল চট্টগ্রাম তার বসবাসকারী ঠিকানায় অভিযান চালিয়ে বেশ কয়েকটি ল্যাপটপ, ক্যামেরাসহ সেনাবহিনীর ব্যবহৃত বিপুল পরিমাণ দ্রব্য খুঁজে পায়।
আটককৃতদের কাছ থেকে ২২টি মোবাইল ফোন, ৩টি অত্যাধুনিক ক্যামেরা ছাড়াও নতুন মডেলের সেনা পোশাক-৩ জোড়া, ওয়ার্কিং ড্রেসের জার্সি-১টি, বিএমএ ক্যাডেটদের ব্যবহৃত হ্যান্ড ব্যাগ-১টি, অফিসার এসডি পোশাক-১ পেয়ার, বীর রেজিমেন্টের গ্রীণ ক্যাপ-১টি, র্যাংক ব্যাজ ২ লেঃ বীর-২ পেয়ার, র্যাংক ব্যাজ লেঃ বীর-১ পেয়ার, অফিসার মেসকীট-১ পেয়ার, বিভিন্ন ডিবিশনের ডিভ সাইন-৮টি, কমান্ড ব্যাজ-২টি, বিভাস লেখা নেইম প্লেট-২টি, ডিএমএস বুট-১ জোড়া, পিটি-সু-১ জোড়া, কালো মুজা-১ জোড়া, বেল্ট-১টি, কম্ব্যাট গেঞ্জি-১টি, প্যারা উইং গ্রীণ কালার-১টি, এ্যামোনেশন উইং-১টি, বিভাস লেখা অফিসার পরিচয় পত্র-১টি, ৭৪তম বিএম লং কোর্সের ক্রেষ্ট-১টি, ডেল কোম্পানীর ল্যাপটপ-১টি, এইচপি কোম্পানীর ল্যাপটপ-১টি, রিবন-২টি, মেডেল-২টি, চেতনা ও মূল্যবোধের কার্ড-১টি, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী লেখা-৩টি।
রাজবন বিহারের একজন ভিক্ষু বলেন, তারা গত কয়েকদিন আগে ফুরমোন পাহাড়ে উঠেছিলেন। এরপর তারা ফালিতাঙ্যা পাহাড়ে যান।
তিনি বলেন ওই সেনা কর্মকর্তা পরিচয়দানকারী ব্যক্তিকে রাজবন বিহারে ভান্তেদের মধ্যে অনেকেই সেনাবাহিনীর অফিসার বলে জানতেন। এই পরিচয় তিনি সব সময় ভান্তেদের কাছে যেতেন। ভান্তেরা তাকে সেনা অফিসার বলে জানেন। তিনি বলেন, ওই লোক সেনা অফিসার নাকি ভুয়া সেটি তারা এতদিন চিহ্নিত করতে পারেননি।
আটকৃত যুবকের ল্যাপটপ পরীক্ষা করে দেখা গেছে চীন,থাইল্যান্ড, কোরিয়াসহ বেশ কয়েকটি দেশের সাথে সন্দেহজনক যোগাযোগের সূত্র পাওয়া গেছে।
তদন্ত সূত্র মতে, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। আটক যুবক বেশ কিছুদিন ধরেই বিভিন্ন সেনা, বিজিবি ক্যাম্পে নিজেকে সেনা কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে ঘুরে বেড়িয়ে ছবি তুলছিলেন। আটককৃত যুবকদের সকলের বয়স ত্রিশের নিচে। সেকারণে ধারণা করা হচ্ছে, বড় ধরণের কোনো অন্তর্ঘাতমূলক ঘটনা ঘটানোর লক্ষ্যে পেছন থেকে কোনো মহল এই যুবকদের ব্যবহার করে থাকতে পারে। সেকারণে রিমাণ্ডে এনে তাদের অধিক জিজ্ঞাসাবাদের প্রয়োজন রয়েছে।
বরকল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নিলু কান্তি বড়ুয়া শুক্রবার রাত ৮টায় গণমাধ্যমকে জানান, বিজিবির সদস্যরা সন্ধ্যা সোয়া সাতটার দিকে আটক ১২ জনকে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করেছেন। বর্তমানে তারা থানায় রয়েছেন। তাদের বিরুদ্ধে বরকল জোনের নায়েক মো. জাকির হোসেন বাদী হয়ে মামলা করেছেন।



















