অস্ট্রেলিয়ার সংসদে আজহারী কট্টরপন্থী ইসলামি ধর্মপ্রচারক হিসেবে চিহ্নিত, ভিসা বাতিল

বাংলাদেশি ইসলামী বক্তা মিজানুর রহমান আজহারীকে অস্ট্রেলিয়ার সংসদে একজন কট্টরপন্থী ইসলামি ধর্মপ্রচারক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তিনি ইহুদি জনগণের বিরুদ্ধে এক প্রকার “ঐশ্বরিক শাস্তি” হিসেবে অ্যাডলফ হিটলারের প্রশংসা করেছিলেন বলে অভিযোগ উঠেছে। আজহারীর ভিসা বাতিল করা হয়েছে এবং তিনি এখন অস্ট্রেলিয়া থেকে বহিষ্কারের অপেক্ষায় আছেন বলে গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে বলা হয়।
ডেইলি মেইলের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে: “বাংলাদেশী ধর্মপ্রচারক আজহারী তার ‘লিগ্যাসি অফ ফেইথ’ সিরিজের অংশ হিসেবে ইস্টার উপলক্ষে অস্ট্রেলিয়া সফর করছিলেন, যার মধ্যে ব্রিসবেন, মেলবোর্ন, সিডনি এবং ক্যানবেরায় যাত্রা বিরতি ছিল। মঙ্গলবার আজহারীর ভিসা বাতিল করা হয়েছে। তিনি এখন নির্বাসনের অপেক্ষায় আছেন।”
প্রতিবেদনে ডেইলি মেইল আরও উল্লেখ করেছে যে, চরমপন্থী বিদ্বেষমূলক বক্তব্যের অভিযোগে আজহারীকে এর আগে যুক্তরাজ্যে প্রবেশে এবং নিজ দেশ বাংলাদেশে জনসমাবেশে ধর্মপ্রচারে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছিল।
লিবারেল সিনেটর জোনাথন ডানিয়াম বুধবার অস্ট্রেলিয়ার সংসদে বলেন, আজহারীর আগমনের বিষয়ে তাকে এবং অন্যান্য সংসদ সদস্যদের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে সতর্ক করা হয়েছিল।
বুধবার সিনেটে তিনি এ বিষয়ে বলেন, ‘আমি জানি মন্ত্রীসহ বেশ কয়েকজন সংসদ সদস্য অস্ট্রেলিয়ান ফেডারেশন ফর এথনিক অ্যান্ড রিলিজিয়াস মাইনরিটিজ ইন বাংলাদেশের মতো গোষ্ঠীগুলোর কাছ থেকে বার্তা পেয়েছিলেন।
ডেইলি মেইলের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রে দেওয়া এক বক্তব্যে আজহারী ইহুদি-বিদ্বেষী বিভিন্ন ষড়যন্ত্র তত্ত্বের প্রচার করেন, হলোকাস্টের প্রশংসা করেন, ইহুদিদের অমানবিক হিসেবে তুলে ধরেন এবং তার শ্রোতাদের তাদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করার আহ্বান জানান।
আজহারী হিটলারকে ইহুদিদের জন্য ‘ঐশ্বরিক শাস্তি’ হিসেবে বর্ণনা করেন, ‘ইহুদিরা বিশ্বের সবচেয়ে বড় সন্ত্রাসী’ বলে ঘোষণা করেন এবং তাদের একটি ‘বিষাক্ত কলঙ্ক’ বলে আখ্যায়িত করেন।
তিনি আরও দাবি করেন যে ‘এইডসসহ বিশ্বের বিভিন্ন সমস্যার’ জন্য ইহুদিরা দায়ী, এবং অভিযোগ করেন যে তারাই এই রোগটি আবিষ্কার করেছে। আজহারী তার বক্তব্যে ‘ইহুদিদের প্রতি হিটলারের নিষ্ঠুরতা নিয়ে আনন্দ প্রকাশ করেছেন’।
তার এই সফর সোমবার রাতে ব্রিসবেনে শুরু হয় এবং ৩ এপ্রিল মেলবোর্নে, ৪ এপ্রিল সিডনিতে এবং ৬ এপ্রিল ক্যানবেরায় অব্যাহত থাকার কথা ছিল।
ডানিয়াম বলেন, আলবানিজ সরকার আজহারীকে অস্ট্রেলিয়ায় প্রবেশের অনুমতি দিয়েছে, যা গভীরভাবে উদ্বেগজনক; কারণ উগ্রবাদী কার্যকলাপ এবং বিদ্বেষ ছড়ানোর বিষয়ে তার আন্তর্জাতিক রেকর্ড সুপরিচিত ও প্রামাণ্য।
সিনেটে তিনি বলেন, ‘তবে দুঃখজনকভাবে, এই সরকার কর্তৃক ভিসা পাওয়া বক্তা মি. আজহারী বিশ্বের অন্যান্য বেশ কয়েকটি অংশে জাতিগত বিদ্বেষ ছড়ানোর দায়ে অভিযুক্ত এবং প্রমাণিত হয়েছেন।’
তিনি যুক্তরাজ্যের দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, যেখানে হিন্দু-বিদ্বেষ ছড়ানোর উদ্বেগের কারণে ২০২১ সালে আজহারীর প্রবেশাধিকার বাতিল করা হয়েছিল।
ডানিয়াম বলেন, বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষও চরমপন্থা এবং জনশৃঙ্খলার হুমকির কারণে এই ধর্মপ্রচারকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছিল। তিনি বলেন, ‘তার নিজ দেশ বাংলাদেশে, সরকার তখন তাকে চরমপন্থী মতাদর্শ প্রচার এবং কট্টর ইসলামি গোষ্ঠীগুলোর প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়ার জন্য অভিযুক্ত করেছিল।’
‘তিনি যা করছিলেন তার মাধ্যমে ছড়ানো বিভেদ এবং বিদ্বেষের কারণে পুলিশকে তার সমাবেশগুলোর বিষয়বস্তু পর্যবেক্ষণ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।’
ডানিয়ামের মতে, আজহারীর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো একক কোনো ধর্মীয় গোষ্ঠীর বাইরেও বিস্তৃত এবং এটি তার বিদ্বেষমূলক বক্তব্যের একটি ধারাবাহিক ধরন প্রকাশ করে।
তিনি বলেন, ‘তার ইহুদি-বিদ্বেষমূলক বক্তব্য, হিন্দু ধর্মের প্রতি কুৎসা রটানো এবং বাঙালি সংস্কৃতিকে দানবীয় হিসেবে তুলে ধরার অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে।’
ডানিয়াম বলেন, এই ইতিহাস থাকা সত্ত্বেও সরকার আজহারীকে অস্ট্রেলিয়ায় প্রবেশের অনুমতি দিয়েছিল। তিনি বলেন, ‘তবে অবশ্যই, এত কিছুর পরও এবং আমি যোগ করতে পারি যে এগুলোর সবই পাবলিক রেকর্ডে থাকার পরও, এই লোকটিকে এখানে আসার জন্য ভিসা দেওয়া হয়েছে।’
অস্ট্রেলিয়ান ফেডারেশন ফর এথনিক অ্যান্ড রিলিজিয়াস মাইনরিটিজ ইন বাংলাদেশ চলতি সপ্তাহের শুরুতে অবিলম্বে হস্তক্ষেপের আহ্বান জানিয়ে বার্কের কাছে চিঠি লিখেছিল।
সংগঠনটি সতর্ক করেছিল যে আজহারীর বক্তব্য ধর্মীয় উত্তেজনা উসকে দেওয়ার এবং উগ্রবাদী বক্তব্যকে বৈধতা দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে।
গোষ্ঠীটি আজহারীর অতীতের বিস্তৃত প্রমাণাদি তুলে ধরে, যার মধ্যে রয়েছে ইহুদি-বিদ্বেষী ষড়যন্ত্র তত্ত্ব, সহিংসতার প্রশংসা এবং ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর উসকানিমূলক আক্রমণ।
মন্তব্যের জন্য ডেইলি মেইল এই সফরের আয়োজক ‘ইসলামিক প্র্যাকটিস অ্যান্ড দাওয়াহ সার্কেল’-এর সাথে যোগাযোগ করেছে বলেও জানিয়েছে তারা।

















