নতুন সরকারের চুক্তি ‘লঙ্ঘনে’র অভিযোগ ভিত্তিহীন : পার্বত্য মন্ত্রণালয়ে মীর হেলাল প্রথম বাঙালি নন


পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিনকে প্রতিমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেয়ার পর একটি বিশেষ মহল ‘পার্বত্য চুক্তি লঙ্ঘনের’ যে ধুয়া তুলছেন, তা কেবল ভিত্তিহীনই নয়, বরং ঐতিহাসিক সত্যের চরম অপলাপ। বর্তমান বিতর্কের বিপরীতে দাঁড়িয়ে প্রশাসনিক ইতিহাস ও নথিপত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মীর হেলাল এই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রথম কোনো বাঙালি নন। বরং রাষ্ট্রের প্রয়োজনে এবং সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষায় বিগত দুই দশকে অন্তত ৮ জন বাঙালি ব্যক্তিত্ব বিভিন্ন সময়ে এই মন্ত্রণালয়ের নীতিনির্ধারণী শীর্ষ পদে সফলভাবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
ঐতিহাসিক নজির বলছে, ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া নিজেই এই মন্ত্রণালয়ের পূর্ণ মন্ত্রীর দায়িত্বভার গ্রহণ করেছিলেন। শুধু তাই নয়, বর্তমান সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসও দায়িত্ব গ্রহণের পর এই মন্ত্রণালয়ের অভিভাবক হিসেবে কাজ করেছেন। এছাড়াও বিভিন্ন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে লেঃ জেঃ (অবঃ) হাসান মশহুদ চৌধুরী, লেঃ জেঃ (অবঃ) রুহুল আলম চৌধুরী, ড. ইফতেখার আহমেদ চৌধুরী এবং ড. ফখরুদ্দীন আহমদের মতো প্রথিতযশা বাঙালি ব্যক্তিত্বরা এই মন্ত্রণালয় পরিচালনা করেছেন। সুতরাং, বর্তমান সরকারের একজন বাঙালি আইনজীবীকে প্রতিমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া কোনো চুক্তি লঙ্ঘন নয়, বরং এটি একটি সুদীর্ঘ প্রশাসনিক ও সাংবিধানিক ঐতিহ্যের প্রতিফলন।
গবেষক ও বিশেষজ্ঞদের মতে, ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চুক্তি কোনো রাষ্ট্রীয় আইন নয়, বরং এটি একটি রাজনৈতিক সমঝোতা স্মারক মাত্র। দেশের সার্বভৌম সংবিধান বা সংসদের কোনো বিধিবদ্ধ আইনকে পাশ কাটিয়ে একটি চুক্তি কখনো সরকারের প্রশাসনিক এখতিয়ারকে খর্ব করতে পারে না। তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার এই নিয়োগের মাধ্যমে মূলত পাহাড়ে একটি বৈষম্যহীন ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতি’র (Inclusive Politics) সূচনা করেছেন, যেখানে পাহাড়ি ও বাঙালি উভয় জনগোষ্ঠীর সমান অংশীদারিত্ব নিশ্চিত হয়েছে।
তারেক রহমানের ‘রেইনবো নেশন’ দর্শন
জনাব তারেক রহমানের এই সাহসী পদক্ষেপের মূলে রয়েছে তাঁর একটি দীর্ঘমেয়াদী এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক দর্শন। তিনি বিশ্বাস করেন, বাংলাদেশের মানচিত্রে কোনো বিভাজন রেখা থাকতে পারে না। তারেক রহমান অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন— “এ দেশে কেউ ‘আদিবাসী’ বা ‘নৃগোষ্ঠী’ পরিচয়ে ছোট নয়, বরং ধর্ম-বর্ণ-জাতি নির্বিশেষে আমাদের সবার পরিচয় আমরা সবাই বাংলাদেশি।” তিনি দক্ষিণ আফ্রিকার নেলসন ম্যান্ডেলার সেই ঐতিহাসিক ‘রেইনবো নেশন’ (Rainbow Nation) বা ‘রংধনু জাতি’র ধারণাকে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ধারণ করেন। তাঁর মতে, পাহাড়ি ও বাঙালির বৈচিত্র্যই বাংলাদেশের সৌন্দর্য।
এই দর্শনে পাহাড় ও সমতলের প্রতিটি মানুষের নাগরিক অধিকার সমান। যুগ যুগ ধরে পাহাড়ের মানুষদের মধ্যে যে কৃত্রিম বিভেদ ও অবিশ্বাসের দেয়াল তৈরি করা হয়েছে, তা ভেঙে সবাইকে একই জাতীয় পতাকার নিচে একীভূত করাই তাঁর লক্ষ্য। পার্বত্য মন্ত্রণালয়ে বাঙালি ও পাহাড়ি নেতৃত্বের এই যুগলবন্দী মূলত সেই রেইনবো নেশন বিনির্মাণের প্রথম শক্তিশালী পদক্ষেপ, যেখানে কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর তোষণ নয়, বরং ১৮ কোটি মানুষের অভিন্ন ‘বাংলাদেশি’ পরিচয়ই হবে শ্রেষ্ঠতম শক্তি।
ভূ-রাজনৈতিক সংবেদনশীলতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন
বাংলাদেশের সামগ্রিক ভূখণ্ডে পার্বত্য চট্টগ্রাম কেবল আয়তনের দিক থেকেই বড় নয়, বরং এটি দেশের জাতীয় নিরাপত্তা ও ভূ-রাজনীতির অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। বাংলাদেশের মোট আয়তনের প্রায় এক-দশমাংশ জুড়ে এই অঞ্চলের অবস্থান। প্রাকৃতিক সম্পদের অফুরন্ত ভাণ্ডার, পাহাড়, বনভূমি আর কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থান একে দক্ষিণ এশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত করেছে।
পার্বত্য চট্টগ্রামের সীমানা ভারত ও মিয়ানমারের সাথে যুক্ত। এই ত্রিমুখী সীমান্তের কৌশলগত গুরুত্ব অপরিসীম। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এই অঞ্চলটি সবসময়ই আন্তর্জাতিক অপশক্তির নজরদারিতে থাকে। বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন, অবৈধ অস্ত্রের অনুপ্রবেশ এবং ছায়াযুদ্ধের (Proxy War) মাধ্যমে রাষ্ট্রকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টায় লিপ্ত একটি গোষ্ঠী পাহাড়কে অশান্ত রাখতে চায়। ২০২৬ সালের ঐতিহাসিক নির্বাচনের পর জনাব তারেক রহমানের নেতৃত্বে গঠিত নতুন সরকার যখন দায়িত্ব গ্রহণ করল, তখন পাহাড়ের প্রতিটি মানুষের মনে এক নতুন ভোরের আশার সঞ্চার হয়েছে।
বিগত আমলের ‘তোষণ নীতি’ ও বঞ্চনার ইতিহাস
বিগত দেড় দশকের হাসিনা রেজিমে আমরা দেখেছি, পাহাড়ের সমস্যা সমাধানে কেবল একটি বিশেষ জনগোষ্ঠীকে (পিজেএসএস) তুষ্ট করার আত্মঘাতী নীতি গ্রহণ করা হয়েছিল। ১৯৯৭ সালের চুক্তির দোহাই দিয়ে পাহাড়ের প্রায় অর্ধেক জনগোষ্ঠী—অর্থাৎ বাঙালিদের নাগরিক অধিকারকে কার্যত হরণ করা হয়েছিল। পাহাড়ের বাঙালিরা প্রজন্মের পর প্রজন্ম সেখানে বাস করলেও ‘স্থায়ী অধিবাসী’ স্বীকৃতির ক্ষেত্রে নানা প্রতিবন্ধকতার শিকার হয়েছেন। তারা ভোট দিতে পারলেও ভূমির অধিকার বা প্রশাসনিক ক্ষমতায় অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকে পরিণত হয়েছিলেন। তারেক রহমানের সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করেই এই একপাক্ষিক ও পক্ষপাতমূলক রাজনৈতিক দর্শনের মূলে আঘাত করেছেন।
অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতির নবযাত্রা ও নতুন নেতৃত্ব
তারেক রহমানের সরকার পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে যে আমূল পরিবর্তন এনেছেন, তা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক যুগান্তকারী ঘটনা। দীর্ঘকাল ধরে এই মন্ত্রণালয়ে কেবল উপজাতীয় প্রতিনিধি নিয়োগ দেওয়ার একটি অলিখিত ও অসাংবিধানিক প্রথা চালু ছিল। এবার সেই প্রথা ভেঙে উপজাতীয় মন্ত্রী সাবেক বিচারক দীপেন দেওয়ানের পাশাপাশি বাঙালি প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
এই জোড়া নেতৃত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তাদের শিক্ষাগত ও পেশাগত যোগ্যতার কারণে। মন্ত্রী দীপেন দেওয়ান বিচার বিভাগ থেকে আসা একজন অভিজ্ঞ ব্যক্তিত্ব, যিনি আইনের সূক্ষ্ম দিকগুলো বোঝেন। অন্যদিকে প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন একজন উচ্চশিক্ষিত তরুণ আইনজ্ঞ। পাহাড়ের প্রধান সমস্যা হলো ভূমি বিরোধ এবং প্রশাসনিক জটিলতা, যা নিরসনে আইনের মানুষের বিকল্প নেই।
পার্বত্য চট্টগ্রাম রিসার্চ ফাউন্ডেশন-এর চেয়ারম্যান ও পার্বত্য নিউজের সম্পাদক মেহেদী হাসান পলাশ এ বিষয়ে বলেন- পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির ‘ঘ’ খণ্ডের ১৯ নম্বর ধারায় উপজাতীয় মন্ত্রীর বিধানটি পুরোপুরি মানা হয়েছে এবং দীপেন দেওয়ানকে মন্ত্রী নিয়োগের মাধ্যমে চুক্তির মূল শর্ত পূরণ করা হয়েছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, “চুক্তিতে কোনো বাঙালি বা সমতলের কাউকে প্রতিমন্ত্রী করা যাবে না—এমন কোনো নিষেধাজ্ঞা বা নিষেধাজ্ঞা নেই।”
জনাব পলাশ আরও যোগ করেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ‘সমদৃষ্টি’র যে দর্শন—পাহাড় ও সমতলের সবাইকে ‘বাংলাদেশি’ পরিচয়ে একীভূত করা—এই নিয়োগের মাধ্যমে তা বাস্তবে রূপ পেয়েছে। একজন পাহাড়ি মন্ত্রীর পাশাপাশি সমতলের বাঙালি প্রতিমন্ত্রী নিয়োগ দিয়ে সরকার মূলত পাহাড় ও সমতলের বৈষম্য দূর করে ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতি’ নিশ্চিত করেছে, যা চুক্তির স্পিরিটের সাথে পুরোপুরি সঙ্গতিপূর্ণ।
সাংবিধানিক বিশ্লেষণ ও আইনি বৈধতা: চুক্তি বনাম রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামো
বাংলাদেশের সংবিধান রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন। সংবিধানের ৭(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, অন্য কোনো আইন বা চুক্তি যদি সংবিধানের সহিত অসামঞ্জস্য হয়, তবে সেই চুক্তির যতটুকু অসামঞ্জস্যপূর্ণ, ততটুকু বাতিল হইবে। ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চুক্তি পর্যালোচনার ক্ষেত্রে এই সাংবিধানিক মানদণ্ডটিই ধ্রুব সত্য। তারেক রহমানের সরকার যখন বাঙালি প্রতিমন্ত্রী নিয়োগ দিয়েছেন, তখন যারা ‘চুক্তি লঙ্ঘনের’ দোহাই দিচ্ছেন, তারা মূলত সংবিধানের শ্রেষ্ঠত্বকে অস্বীকার করছেন।
১. মৌলিক অধিকারের সাম্য ও অ-বৈষম্য (২৭, ২৮, ২৯ ও ২৬ অনুচ্ছেদ)
পার্বত্য চুক্তির কিছু ধারা সরাসরি সংবিধানের মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী। অনুচ্ছেদ ২৭ অনুযায়ী সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান। অনুচ্ছেদ ২৮ ও ২৯ ধর্ম বা গোষ্ঠীগত কারণে বৈষম্য না করা এবং সরকারি নিয়োগে সমতার নিশ্চয়তা দেয়। অথচ পার্বত্য চুক্তিতে ‘উপজাতীয়’ পরিচয়ের ভিত্তিতে পদ সংরক্ষণ করে বাঙালিদের প্রশাসনিক নেতৃত্ব থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। সংবিধানের ২৬ (২) অনুচ্ছেদে স্পষ্টভাবে বলা আছে— রাষ্ট্র মৌলিক অধিকারের সহিত অসামঞ্জস্যপূর্ণ কোনো আইন বা চুক্তি প্রণয়ন করিবেন না, এবং অনুরূপ কিছু করা হইলে তা বাতিল হইয়া যাইবে।
২. রাষ্ট্রের একক চরিত্র বনাম ‘দ্বৈত শাসন’
সংবিধানের ১ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বাংলাদেশ একটি ‘একক প্রজাতন্ত্র’। অথচ চুক্তির মাধ্যমে গঠিত ‘আঞ্চলিক পরিষদ’ রাষ্ট্রকাঠামোর ভেতরে আরেকটি সমান্তরাল শাসনের জন্ম দিয়েছে। আমার গবেষণামূলক প্রবন্ধ “পার্বত্য আঞ্চলিক পরিষদ: একক রাষ্ট্রে দ্বৈত কাঠামো” (দৈনিক নয়াদিগন্ত, ১০ নভেম্বর ২০২৫) এ আমি উল্লেখ করেছি যে, এই ব্যবস্থা বাংলাদেশের প্রচলিত প্রশাসনিক রীতি থেকে সম্পূর্ণ আলাদা ও স্বায়ত্তশাসিত, যা একক রাষ্ট্রচরিত্রের পরিপন্থী। ২০১০ সালে হাইকোর্ট বিভাগও এই আঞ্চলিক পরিষদ আইনকে অসাংবিধানিক ও বেআইনি ঘোষণা করেছিলেন।
১৯ নম্বর ধারার ব্যবচ্ছেদ ও বাঙালির অংশীদারিত্ব
চুক্তির ‘ঘ’ খণ্ডের ১৯ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, উপজাতীয়দের মধ্য থেকে একজন মন্ত্রী নিয়োগ করে মন্ত্রণালয় গঠন করা হবে। সরকার এই শর্ত পূর্ণাঙ্গ রক্ষা করে দীপেন দেওয়ানকে মন্ত্রী করেছেন। কিন্তু এখানে প্রতিমন্ত্রী বা উপমন্ত্রী নিয়োগে কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই। সংবিধানের ৫৬(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রতিমন্ত্রী নিয়োগের এখতিয়ার সম্পূর্ণ প্রধানমন্ত্রীর।
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ হলো ১৯ (১২) উপ-ধারা, যেখানে মন্ত্রণালয়কে সহায়তা করার জন্য ৩ জন ‘অ-উপজাতীয়’ বা বাঙালি সদস্যের উপদেষ্টা কমিটির কথা বলা হয়েছে। উপদেষ্টা কমিটিতে যদি বাঙালিদের আইনি বৈধতা থাকে, তবে প্রতিমন্ত্রী হিসেবে বাঙালির অংশগ্রহণ চুক্তির মূল সুর বা ‘Spirit’ এর সাথেই সংগতিপূর্ণ।
পার্বত্য গবেষক ও সাংবাদিক সৈয়দ ইবনে রহমত মনে করিয়ে দিয়েছেন— “মীর হেলালই প্রথম বাঙালি নন। ২০০১-২০০৬ পর্যন্ত স্বয়ং বেগম খালেদা জিয়া এই মন্ত্রণালয়ের পূর্ণ মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। সর্বশেষ ড. মুহাম্মদ ইউনূসও এ মন্ত্রণালয় সামলিয়েছেন।
“বর্তমান সরকারের এই সময়োপযোগী সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে যারা অভিযোগ তুলছেন, তাদের দাবিকে ‘দুঃখজনক’ ও ‘ভিত্তিহীন” বলে অভিহিত করেছেন তিনি।
সর্বশেষ দৃষ্টান্ত হিসেবে বলেন- ড. মুহাম্মদ ইউনূস-ও সরকার গঠনেরপর পার্বত্য মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা রূপে এ মন্ত্রণালয় সামলিয়েছেন। সুতরাং প্রশাসনিক ও রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনে বাঙালি ব্যক্তিত্বদের এই মন্ত্রণালয়ে নেতৃত্ব দেওয়ার উদাহরণ নতুন কিছু নয়।
তিনি বলেন- অধিকন্তু, আইনি ও সাংবিধানিক দৃষ্টিকোণ থেকে একটি রূঢ় সত্য হলো—‘চুক্তি কোনো আইন নয়’। এটি কেবল একটি রাজনৈতিক সমঝোতা স্মারক। দেশের সার্বভৌম সংসদ বা সংবিধানের কোনো বিধিবদ্ধ আইনকে পাশ কাটিয়ে একটি চুক্তি কখনো সরকারের ওপর বাধ্যতামূলক হতে পারে না। যারা আজ অভিযোগের সুরে কথা বলছেন, তারা হয় আইনের শাসন সম্পর্কে অজ্ঞ, নতুবা না বুঝেই পাহাড়ের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে বিনষ্ট করার অপচেষ্টায় লিপ্ত হয়েছেন।”
রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনে পার্বত্য মন্ত্রণালয়ে বাঙালির ভূমিকা: এক ঐতিহাসিক সত্য
পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্ব নিয়ে যারা সংকীর্ণ সাম্প্রদায়িক বিতর্ক তৈরির চেষ্টা করছেন, তারা সম্ভবত এই মন্ত্রণালয়ের দীর্ঘ প্রশাসনিক ইতিহাস সম্পর্কে সম্যক অবগত নন। ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, রাষ্ট্রের প্রয়োজনে এবং বিশেষ রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সন্ধিক্ষণে বিভিন্ন সময় বাঙালি ব্যক্তিবর্গ এই মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। পার্বত্য মন্ত্রণালয়ের অফিশিয়াল তালিকা অনুযায়ী, দেশের প্রধানমন্ত্রীর পাশাপাশি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ অনেক বাঙালি ব্যক্তিত্ব এই মন্ত্রণালয়ের অভিভাবক হিসেবে কাজ করেছেন। উদাহরণস্বরূপ, ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া নিজেই এই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বভার গ্রহণ করেছিলেন। এছাড়াও বিভিন্ন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে লেঃ জেঃ (অবঃ) হাসান মশহুদ চৌধুরী, লেঃ জেঃ (অবঃ) রুহুল আলম চৌধুরী এবং ড. ইফতেখার আহমেদ চৌধুরীর মতো প্রথিতযশা বাঙালি উপদেষ্টাগণ অত্যন্ত দক্ষতার সাথে এই মন্ত্রণালয় পরিচালনা করেছেন। এমনকি ২০০৭ ও ২০০৮ সালে ড. ফখরুদ্দীন আহমদও প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে এই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন। এমনকি ড. মুহাম্মদ ইউনূস-ও সরকার গঠনেরপর কিছু দিন পার্বত্য মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা রূপে এ মন্ত্রণালয় সামলিয়েছেন। এই ঐতিহাসিক নজিরগুলো প্রমাণ করে যে, পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে সবসময়ই রাষ্ট্রের সামগ্রিক প্রশাসনিক কাঠামোর অন্তর্ভুক্ত ছিল এবং সেখানে বাঙালির নেতৃত্ব কোনো নতুন বা অভাবনীয় বিষয় নয়। বরং বর্তমান সরকার একজন বাঙালি আইনজীবীকে প্রতিমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দিয়ে সেই ঐতিহাসিক ও সাংবিধানিক ধারাবাহিকতাকেই আরও সুসংহত করেছেন।

একটি বৈষম্যহীন নতুন পাহাড়
তারেক রহমানের সরকার পাহাড়ের মানুষের জন্য একটি অভিন্ন ও সুন্দর ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখছে। যেখানে পাহাড় হবে পাহাড়ি ও বাঙালিদের সমঅধিকারের জায়গা। আইনের শাসনে বিশ্বাসী এই নতুন নেতৃত্বের হাত ধরে পার্বত্য মন্ত্রণালয় এবার কেবল উন্নয়নের প্রতীক নয়, বরং ন্যায়বিচার ও টেকসই শান্তির প্রতীকে পরিণত হবে। ষড়যন্ত্রকারীরা যতই বিতর্ক তৈরি করুক, ‘রেইনবো নেশন’ বিনির্মাণের এই যাত্রা পাহাড়কে চিরস্থায়ী অশান্তি ও বৈষম্য থেকে মুক্ত করবেই।
লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

















