নির্বাচনের মাধ্যমে কতটা নিরাপদ হবে বিভীষিকাময় মিয়ানমার


মিয়ানমারের সামরিক জান্তার প্রহসনের নির্বাচন নিয়ে কথা বলার সাহস দেখাতে পারছেন না সেখানকার মানুষ। এমনকি নির্বাচনের সমালোচনা করে ফেইসবুক পোস্ট দেয়া কিংবা পোস্টে লাইক দিলেও গ্রেপ্তার আতঙ্ক। মিয়ানমারের সাধারণ জনগণ সামরিক জান্তার এই সাধারণ নির্বাচনকে বলছেন মিথ্যার নির্বাচন, প্রহসনের নির্বাচন। তাদের অভিযোগ, ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে অং সান সু চির গণতান্ত্রিক সরকারকে হটিয়ে অবৈধভাবে মিয়ানমারের ক্ষমতা দখল করেছে সেনাবাহিনী। গণতান্ত্রিক সরকারের কাছ থেকে ক্ষমতা কেড়ে নিয়ে সামরিক জান্তা তাদের স্বাধীনতা কেড়ে নিয়েছে।
এই নির্বাচনকে জাতিসংঘ, পশ্চিমা দেশ এবং মানবাধিকার সংগঠনগুলো অবাধ ও সুষ্ঠু নয় বলে প্রত্যাখ্যান করেছে। সাবেক নেত্রী অং সান সু চি এখনো বন্দি এবং তার দল ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমোক্রেসি (এনএলডি) বিলুপ্ত করা হয়েছে। এই সুযোগে নির্বাচনের মধ্য দিয়ে সেনা সমর্থিত ইউনিয়ন সলিডারিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি (ইউএসডিপি) মিয়ানমারে সবচেয়ে বড় দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে যাচ্ছে।
জাতিসংঘ বলছে, সহিংসতা ও দমন-পীড়নের পরিবেশে জনগণের স্বাধীন মতপ্রকাশ ও অংশগ্রহণের সুযোগ নেই। ২০২১ সালের অভ্যুত্থানের পর শুরু হওয়া গৃহযুদ্ধে এ পর্যন্ত প্রায় ৯০ হাজার মানুষ নিহত, ৩৫ লাখ বাস্তুচ্যুত এবং ২ কোটি ২০ লাখ মানুষ মানবিক সহায়তার প্রয়োজনের মধ্যে রয়েছে।
মিয়ানমারের ২০১৫ এবং ২০২০ সালের নির্বাচন ছিল দেশটির ইতিহাসে সুষ্ঠু দুটি নির্বাচন। এই দুটি নির্বাচনেই সু চির দল বিপুলভাবে জয়ী হয়। ২০১৫ সালের সাধারণ নির্বাচনকে মিয়ানমারের প্রথম সত্যিকারের অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন হিসেবে ধরা হয়। এই নির্বাচনে সু চির দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসি বা এনএলডি সংসদের ৩৯০ আসনে বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করে। যা ছিল মিয়ানমারের দীর্ঘ ২৫ বছরের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো গণতান্ত্রিক উপায়ে সবার অংশগ্রহণে সাধারণ নির্বাচন। ভোটকেন্দ্রগুলোতে ছিল লম্বা লাইন। অনেকেই জীবনে প্রথমবারের মতো ভোট দেন। অং সান সুচির ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসি বা এনএলডি ছাড়াও সেনা সমর্থিত ইউনিয়ন সলিডারিটি ডেভেলপমেন্ট পার্টি বা ইউএসডিপি ওই নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। ২০১৫ সালের সাধারণ নির্বাচনের মধ্য দিয়েই মূলত মিয়ানমারে প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে চলা অর্ধ-শতাব্দীরও বেশি সময়ের সামরিক শাসনের অবসান ঘটে।
২০২০ সালের ৮ নভেম্বর মিয়ানমারে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে ১ হাজার ১৭১টি জাতীয়, রাজ্য এবং আঞ্চলিক আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা হয়। এই নির্বাচনেও অং সান সু চি’র ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমোক্রেসি (এনএলডি) জয়লাভ করে। তবে ২০২০ সালের এই সাধারণ নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ তুলে ক্ষমতা দখল করে নেয় সেনাবাহিনী। সামরিক জান্তার এই অভ্যুত্থানে দেশটি এক ভয়াবহ গৃহযুদ্ধের দিকে যায় এবং ২০২১ সালের ১ ফেব্রুয়ারি নির্বাচিত সরকারের কাছ থেকে ক্ষমতা কেড়ে নেয় সেনাবাহিনী। মিয়ানমারের বেশিরভাগ জনগণ এই অভ্যুত্থান প্রত্যাখ্যান করে এবং সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ এবং সশস্ত্র প্রতিরোধ শুরু করে।
আগের দুই নির্বাচনে মিয়ানমারের রাজপথ ছিল সু চির দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসির (এনএলডি) লাল পতাকায় মোড়া। সে সময়কার নির্বাচনী পরিবেশ ছিল উৎসবমুখর। এমনকি ২০২০ সালের নির্বাচনেও মহামারি করোনার বিধিনিষেধের কারণে প্রচার সীমিত থাকলেও মানুষের সক্রিয়তা ছিল চোখে পড়ার মতো।
মিয়ানমারের আসন্ন নির্বাচন নিয়ে গত মঙ্গলবার গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জাতিসংঘ। সংস্থাটি জানিয়েছে, জান্তা সরকার এবং তাদের বিরোধিতাকারী সশস্ত্র গোষ্ঠী—উভয়পক্ষ থেকেই সাধারণ মানুষকে ভোট দেওয়া বা না দেওয়ার বিষয়ে হুমকি দেওয়া হচ্ছে। জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক প্রধান ফলকার টুর্ক বলেন, ‘সহিংসতা এবং চরম দমন-পীড়নের মধ্যেই এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।’
জান্তা সরকারের দাবি, কোনো ধরনের বলপ্রয়োগ বা দমন-পীড়নের মাধ্যমে এই নির্বাচন করা হচ্ছে না। নির্বাচনে ভোট গ্রহণ হবে তিন ধাপে। প্রথম ধাপের ভোট চলছে আজ ২৮ ডিসেম্বর। দ্বিতীয় ধাপ ১১ জানুয়ারি আর তৃতীয় ধাপ ২৫ জানুয়ারি। জানুয়ারির শেষে ফল ঘোষণা করা হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। মিয়ানমারের মোট ৩৩০টি নির্বাচনী এলাকার মধ্যে ২৬৩ এলাকায় নির্বাচন হবে। শুধু সেনানিয়ন্ত্রিত এলাকায়গুলোতেই এই নির্বাচন হচ্ছে। অন্যান্য এলাকা সশস্ত্র বিদ্রোহীদের দখলে।
গণতান্ত্রিক সরকারের কাছ থেকে ক্ষমতা কেড়ে নেয়ার পর থেকে প্রায় ৫ বছর ধরে চলা সশস্ত্র গৃহযুদ্ধে জর্জরিত মিয়ানমার। দ্বন্দ্ব-সংঘাতে বিভক্ত জাতি। সেনা সমর্থিত ইউনিয়ন সলিডারিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি বা ইউএসডিপি মানুষকে ভালো দিনের আশা দেখালেও তাতে তারা বিশ্বাস রাখতে চায় না। তাছাড়া সামরিক জান্তার এই প্রহসনের নির্বাচনকে ভালো চোখে নিচ্ছেন না দেশ-বিদেশের মানুষ। নির্বাচনের পেছনে দেখা হচ্ছে অসৎ উদ্দেশ্য।
সামরিক অভ্যুত্থানের ফলে মিয়ানমারে শুরু হওয়া গৃহযুদ্ধে গত ৫ বছরে হাজার হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। গ্রামাঞ্চলে বিমান হামলা, স্থলমাইন বিস্ফোরণ, বাধ্যতামূলক সেনাবাহিনীতে নিয়োগ এবং রাজনৈতিক দমন-পীড়নের মাধ্যমে এক বিভীষিকাময় পরিস্থিতি চলছে মিয়ানমারে। সাধারণ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে মিয়ানমারে রাজনৈতিক দমন-পীড়ণ কিংবা সশস্ত্র বিদ্রোহ আদৌ কমবে না, বরং আরো বাড়বে, এমন শঙ্কা থেকেই যায়। তবে গণমাধ্যমের খবরে বলা হচ্ছে, মিয়ানমারে সামরিক জান্তার এই নির্বাচনে চীনের কূটনৈতিক সমর্থন রয়েছে এবং প্রযুক্তিগত ও আর্থিক সমর্থন দিচ্ছে বেইজিং।
লেখক : সাংবাদিক ও গবেষক। ই-মেইল : [email protected]
















