কোনো ষড়যন্ত্রই যেন বাংলাদেশের স্থিতিশীলতা নষ্ট করতে না পারে

fec-image

পাহাড় অশান্ত হবে ৫ই আগষ্টের পরে, এইটা আমরা কম বেশি সকলেই অনেক আগেই অনুমান করেছিলাম, সম্প্রতি খাগড়াছড়ির ঘটনা থেকে বোঝা যায় বাংলাদেশের এই দুর্বল জায়গাটা তে আক্রমণ করে দেশকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা শুরু হয়ে গেছে। ঘটনার সূত্রপাত খাগড়াছড়ির সিঙ্গিনালা এলাকায় অষ্টম শ্রেণির এক ছাত্রীর নিখোঁজ হওয়া থেকে। রাত ৯টার দিকে সে টিউশন শেষে ফেরার পথে আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। পরে তাকে অচেতন অবস্থায় পাওয়া যায় এবং ধর্ষণের অভিযোগ আনা হয়।

খবরের কাগজগুলো পড়ে এবং ইলেকট্রনিক মিডিয়ার নিউজ দেখে যেটা বুঝলাম, প্রথমে ভিকটিম কোনো অপরাধীর নাম বলতে পারেনি, এফআইআরএও কারো নাম উল্লেখ করা হয়নি। পরবর্তীতে কয়েকটি সংবাদপত্রে দেখা যায় ৩ জন বাঙালির নাম মামলা হিসেবে যুক্ত হয়েছে এবং দ্রুতই শয়ন শীল নামে একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। কিন্তু সিসি ক্যামেরার ফুটেজে স্পষ্ট হয়েছে অভিযোগের সময় তিনি বাজারে ঘোরাফেরা করছিল, যা অভিযোগের সত্যতা নিয়ে সন্দেহ সৃষ্টি করে।

সম্প্রতি সম্ভবত চ্যানেল ২৪ এর একটি সাক্ষাৎকার প্রকাশ করা হয়েছে ভিকটিমের বাবার, সাক্ষাৎকারটি দেখতে বোঝা যাবে অনেক অসংগতি রয়েছে, যা প্রকৃত ঘটনা সম্পর্কে সত্যিই সন্দেহ সৃষ্টি করে, সত্যতা বলতে পারব না। এরই মধ্যে পুলিশ ও প্রশাসন দ্রুত তদন্ত শুরু করলেও পাহাড়ি সংগঠনগুলো এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে আন্দোলন ও সংঘাত তৈরি করতে নামে। তারা সেনাবাহিনীকে লক্ষ্য করে হামলা চালায়, বাঙালিদের বাড়িঘরে আগুন ধরায় এবং সাম্প্রদায়িক সংঘাত উসকে দেওয়ার চেষ্টা করে। অথচ মেডিকেল পরীক্ষায় স্পষ্টভাবে দেখা যায়, মেয়েটি ধর্ষিত হয়নি। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যে, এই মেডিকেল রিপোর্টও প্রস্তুত করেন একজন চাকমা চিকিৎসক, তবুও সংগঠনগুলো তথ্যকে বিকৃত করে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

এমন অবস্থায় কিছু তথাকথিত মানবাধিকারকর্মী এবং পার্শ্ববর্তী দেশের প্রভাবাধীন এনজিও ঘটনাটিকে বাড়িয়ে তুলে সন্ত্রাস ও বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা চালায়। এই কৌশল নতুন কিছু নয়, বহু বছর ধরেই ভারতের ইন্ধনে পাহাড়ি সশস্ত্র সংগঠনগুলো অপহরণ, হত্যা, চাঁদাবাজি ও সহিংসতার মাধ্যমে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করে আসছে।

‘৭৫ পরবর্তীতে বাংলাদেশের সরকার দেশের স্বার্থে স্বাধীন পথ অনুসরণ শুরু করলে, ভারত গোপনে এই পাহাড়ি বিদ্রোহ উসকে দেওয়ার খেলায় মেতে ওঠে। ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ তখন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সশস্ত্র শাখা শান্তি বাহিনীকে প্রশিক্ষণ ও অস্ত্র দেয় ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের জঙ্গলে। ষাটের দশকে যে ভারতীয় নেতারা পার্বত্য অঞ্চলকে ভারতভুক্ত করতে চেয়েছিল, তারা স্বাধীন বাংলাদেশকে দুর্বল করতে “জুম্মল্যান্ড” নামে পৃথক রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখিয়ে শান্তি বাহিনীকে লেলিয়ে দেয়। যার খুব সুস্পষ্ট প্রমাণ হচ্ছে সম্প্রতি ত্রিপুরার রাজার একটি টেলিভিশন ইন্টারভিউ যা সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে আছে। ‘৭৭ থেকে দুই দশক ধরে আমাদের সেনা ও সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে রক্তক্ষয়ী গেরিলা যুদ্ধ চলে পাহাড়ে। ‘৯৭ শান্তিচুক্তির মাধ্যমে সেই বিদ্রোহের অবসান ঘটলেও সব সন্ত্রাসী গোষ্ঠী অস্ত্র সমর্পণ করেনি। শান্তিচুক্তি বিরোধীরা পরবর্তীতে ইউপিডিএফ গঠন করে আবার সন্ত্রাসের পথ বেছে নিয়েছে।

বর্তমান পরিস্থিতিতেও সেই একই চিত্র আমরা দেখছি। ৫ আগস্ট ২০২৪-এর পরে দেশের ভেতরে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর থেকেই ভারতের আশ্রয়-প্রাপ্ত সশস্ত্র গ্রুপগুলো নতুন করে সক্রিয় হয়ে উঠেছে। সাম্প্রতিক খাগড়াছড়ির ঘটনাই তার প্রমাণ। একটি মনগড়া ধর্ষণের গুজব রটিয়ে ইউপিডিএফ ও তাদের সমমনা বাহিনী পাহাড়ি জনগোষ্ঠীকে উসকে দিয়ে বাঙালিদের বিরুদ্ধে সংঘাতে নামিয়েছে। ফলস্বরূপ গুইমারায় সড়ক অবরোধ, অগ্নিসংযোগ, নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর হামলা চলেছে, ৩ জন নিরীহ লোক গুলিতে প্রাণ হারিয়েছেন, বহু সেনা-পুলিশ আহত হয়েছেন। পরে মেডিক্যাল রিপোর্টে স্পষ্ট হয়ে গেছে যে অভিযোগ করা ধর্ষণের কোনো প্রমাণই মেলেনি।

ইউপিডিএফ ভারতের ত্রিপুরা সীমান্তের ওপারে কমপক্ষে ৬টি ঘাঁটি স্থাপন করেছে। রত্ননগর, টুইচামা, নারায়ণপুর, পূর্ব সবরুম-এর মতো ক্যাম্পে শত শত জঙ্গি আশ্রয় ও প্রশিক্ষণ পাচ্ছে ভারী অস্ত্রশস্ত্রসহ। সেখান থেকেই ভারী একে 47, এম 16 ইত্যাদি অস্ত্র হাতে নিয়ে সন্ত্রাসীরা বাংলাদেশের ভেতরে ঢুকে পড়ছে নাশকতা চালাতে। ভারতের মদদ ছাড়া এত আধুনিক অস্ত্র ও রসদ-পুঁজি এসব বিচ্ছিন্নতাবাদীদের হাতে আসার প্রশ্নই ওঠে না। গত কয়েক বছরে পার্বত্য সন্ত্রাসীরা চাঁদাবাজি ও অপরাধের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা সংগ্রহ করেছে, যার বড় অংশই বিদেশি অস্ত্র কেনা ও ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নে ব্যয় হচ্ছে। পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে, বাংলাদেশের শান্তি বিনষ্ট করতে এবং আমাদের ভৌগোলিক অখণ্ডতা বিপন্ন করতে প্রতিবেশী রাষ্ট্রের একটি মহল নেপথ্যে উঠে পড়ে লেগেছে।

আমাদের মনে রাখতে হবে, পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ, ইতিহাসে যেমন ছিল, এখনো তেমনই আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। ভারত বহুবার আমাদের ক্ষতি করার চেষ্টা করেছে, কিন্তু বাংলাদেশের সাহসী জনগণ ও বাহিনী তা বারবার ব্যর্থ করে দিয়েছে। পাহাড় ও সমতলের শান্তিপ্রিয় সাধারণ মানুষ কখনোই ভারত পোষিত সন্ত্রাসীদের বিভেদের রাজনীতি সফল হতে দেবে না। আমাদের সেনাবাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জীবনবাজি রেখে দেশদ্রোহী জঙ্গিদের মোকাবিলা করছে এবং করবে। আমরা জাতি হিসেবে অঙ্গীকার করি, বহিরাগত ইন্ধনে সৃষ্ট কোনো ষড়যন্ত্রই বাংলাদেশের সংহতি ও স্থিতিশীলতা নষ্ট করতে পারবে না।

উৎস : www.facebook.com/Ahmed Daniel Islam/posts, 2/10/2025

Print Friendly, PDF & Email
ঘটনাপ্রবাহ: পার্বত্য, বাংলাদেশ, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও পড়ুন