পরিকল্পিত বিভ্রান্তি : সালাউদ্দিন আহমদকে ঘিরে সংগঠিত ন্যারেটিভ তৈরির অন্তরালে কারা?


১৭ মার্চ রাতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সংসদীয় কার্যক্রম কীভাবে পরিচালিত হবে, তা নির্ধারণ করে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ একটি প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। আর এ প্রজ্ঞাপনটি জারির পর পরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমদকে ঘিরে একটি পরিকল্পিত ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ন্যারেটিভ ছড়ানো হয়। তাকে নিয়ে যে পোস্ট ও ভিজ্যুয়াল কনটেন্টগুলো ছড়ানো হচ্ছে, তা বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয়—এটি কোনো বিচ্ছিন্ন মতামত নয়, বরং একটি পরিকল্পিত ও সমন্বিত প্রচারণা।
একই ধরনের অভিযোগ, একই ভাষার পুনরাবৃত্তি এবং নির্দিষ্ট কয়েকজন অ্যাকাউন্ট থেকে ধারাবাহিকভাবে একই ন্যারেটিভ ছড়ানো—এই পুরো ঘটনাকে একটি সংগঠিত অপপ্রচারের দিকেই নির্দেশ করে।
এই প্রচারণায় সক্রিয় তিনটি নাম বিশেষভাবে সামনে আসে—Abrar Ahmed Shuvro, S M Sayem এবং Md Mustafizur Rahman। তাদের পোস্টগুলো আলাদা আলাদা হলেও, ভেতরের কাঠামো ও বার্তা প্রায় এক।
Abrar Ahmed Shuvro তার পোস্টে দাবি করেন, “একটি বিশ্বস্ত সূত্র” থেকে জানা গেছে যে লেফটেন্যান্ট জেনারেল শাহীনকে ভবিষ্যৎ সেনাপ্রধান হিসেবে প্রস্তুত করা হচ্ছে এবং এর সাথে ভারতীয় প্রভাবের ইঙ্গিত দেন। একই পোস্টে তিনি সরাসরি সালাউদ্দিন আহমদকে প্রতিরক্ষা, মন্ত্রিপরিষদ ও সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে—এমন একটি তথ্যকে এমনভাবে উপস্থাপন করেন যেন এটি অস্বাভাবিক এবং সন্দেহজনক কোনো পদক্ষেপ। এখানে লক্ষণীয় বিষয় হলো—“বিশ্বস্ত সূত্র” ছাড়া কোনো যাচাইযোগ্য তথ্য বা প্রমাণ তিনি দেননি।
অন্যদিকে S M Sayem তার পোস্টে আরও একধাপ এগিয়ে “ডি-ফ্যাক্টো” এবং “ডি-জিউর” প্রধানমন্ত্রী তত্ত্ব দাঁড় করান। তিনি দাবি করেন, তারেক রহমান হচ্ছেন “ডি-জিউর প্রধানমন্ত্রী” আর সালাউদ্দিন আহমদ হচ্ছেন “ডি-ফ্যাক্টো প্রধানমন্ত্রী”—অর্থাৎ বাস্তবে তিনিই দেশ পরিচালনা করছেন। এই বক্তব্যকে গ্রহণযোগ্য করতে তিনি “De facto” এবং “De jure” শব্দের ব্যাখ্যাও যুক্ত করেন। কিন্তু পুরো বিশ্লেষণে কোথাও তিনি সংবিধান, প্রশাসনিক কাঠামো বা বাস্তব সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার কোনো নির্দিষ্ট উদাহরণ দেননি। বরং জটিল পরিভাষা ব্যবহার করে একটি ধারণাগত বিভ্রান্তি তৈরি করা হয়েছে, যা সাধারণ পাঠকের কাছে বিশ্বাসযোগ্য মনে হতে পারে।
Md Mustafizur Rahman-এর পোস্টেও একই সুর দেখা যায়। তিনি প্রশ্ন তোলেন—প্রধানমন্ত্রীর অনুপস্থিতিতে সালাউদ্দিন আহমদ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকবেন কি না, এবং সাথে সাথে “এটা হওয়া উচিত না” বলে ব্যক্তিগত অবস্থান জানান। একই সঙ্গে তিনি আবার “বিশ্বস্ত সূত্রে” সেনাবাহিনীর নিয়োগ সংক্রান্ত তথ্য উল্লেখ করেন এবং “ভারতীয় এজেন্ট” প্রসঙ্গ তুলে আনেন। এখানে তথ্যের চেয়ে মতামত ও আশঙ্কাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
এই তিনটি পোস্ট বিশ্লেষণ করলে কয়েকটি সাধারণ প্যাটার্ন স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে।
প্রথমত, “বিশ্বস্ত সূত্র” বা “ভিতরের খবর” ব্যবহার করে প্রমাণহীন দাবি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হয়েছে। এটি একটি পরিচিত প্রোপাগান্ডা কৌশল, যেখানে সূত্রের নাম বা তথ্য যাচাইয়ের সুযোগ না রেখে পাঠকের মধ্যে বিশ্বাস তৈরি করা হয়।
দ্বিতীয়ত, “ভারতের এজেন্ট” বা বিদেশি প্রভাবের অভিযোগ বারবার তোলা হয়েছে, কিন্তু কোনো নির্দিষ্ট প্রমাণ বা ঘটনার উল্লেখ নেই। এটি মূলত আবেগনির্ভর একটি ট্যাগ, যা দ্রুত মানুষের মনে সন্দেহ তৈরি করে।
তৃতীয়ত, রাষ্ট্র পরিচালনার স্বাভাবিক প্রক্রিয়াকে অস্বাভাবিক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর অনুপস্থিতিতে দায়িত্ব অর্পণ করা বা প্রশাসনিক দায়িত্ব বণ্টন—এগুলো কোনো নতুন বিষয় নয়। কিন্তু এগুলোকে এমনভাবে দেখানো হয়েছে যেন এর পেছনে গোপন উদ্দেশ্য রয়েছে।
চতুর্থত, একই সময়ে একই ধরনের ভিজ্যুয়াল কনটেন্ট ছড়ানো হয়েছে, যেখানে সালাউদ্দিন আহমদের ছবি ব্যবহার করে তাকে সরাসরি ক্ষমতার কেন্দ্র হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। এটি একটি “visual reinforcement” কৌশল—যেখানে ছবির মাধ্যমে বার্তাকে আরও শক্তিশালী করা হয়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এই পুরো ন্যারেটিভে একটি সাধারণ লক্ষ্য কাজ করছে: জনগণের মনে সন্দেহ তৈরি করা। “কে আসলে দেশ চালাচ্ছে?”, “কোথাও কি গোপন নিয়ন্ত্রণ আছে?”, “রাষ্ট্র কি অন্য কারো প্রভাবে চলছে?”—এই প্রশ্নগুলো ইচ্ছাকৃতভাবে উসকে দেওয়া হচ্ছে।
কিন্তু বাস্তবতা অনেক সরল। বাংলাদেশে সরকার পরিচালিত হয় সংবিধান অনুযায়ী, এবং প্রশাসনিক দায়িত্ব বণ্টন প্রধানমন্ত্রীর এখতিয়ার। কোনো ব্যক্তি আনুষ্ঠানিক পদ ছাড়া রাষ্ট্র পরিচালনা করছেন—এমন দাবি করার জন্য সুস্পষ্ট প্রমাণ প্রয়োজন, যা এই পোস্টগুলোতে সম্পূর্ণ অনুপস্থিত।
সবকিছু মিলিয়ে বলা যায়, Abrar Ahmed Shuvro, S M Sayem এবং Md Mustafizur Rahman-এর পোস্টগুলো একটি বৃহত্তর ন্যারেটিভের অংশ, যেখানে তথ্যের চেয়ে ধারণা, আর যুক্তির চেয়ে আবেগকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এই ধরনের প্রচারণার উদ্দেশ্য সরাসরি কাউকে সমালোচনা করা নয়, বরং ধীরে ধীরে একটি সন্দেহের পরিবেশ তৈরি করা—যেখানে সত্য-মিথ্যার সীমারেখা অস্পষ্ট হয়ে যায়।
আর এ পরিকল্পিত ক্যাম্পেইনটি হলো যখন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সংসদীয় কার্যক্রম কীভাবে পরিচালিত হবে, তা নির্ধারণ করে মঙ্গলবার (১৭ মার্চ) রাতে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ একটি প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। সেখানে বলা হয়েছে- প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের অনুপস্থিতিতে জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় সংক্রান্ত দায়িত্ব পালন করবেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। পাশাপাশি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ এবং সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ সংক্রান্ত দায়িত্ব পালন করবেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে নিয়ে অপপ্রচার না হলেও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে নিয়ে অপপ্রচারটি পরিকল্পিত। -উৎস : ইনসাইড স্টোরি

















