“ না চাইলেও বাংলাদেশ এই অনুপ্রবেশকারী বিষয়ক ঝামেলায় জড়িয়ে পড়বেই। অনেক বাঙ্গালিকেই ভারত সরকার ইতিমধ্যে অনুপ্রবেশকারী বলে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দিয়েছে জোর করে। বাংলাদেশের মানুষকে ও সরকারকেও তাই এই ব্যপারে সজাগ থাকতে হবে। স্বার্থের এবং আদর্শের দিক থেকে পশ্চিম বাংলার বাঙালি জাতিয়তাবাদীরা বাংলাদেশের মানুষের বন্ধু।”

পশ্চিমবঙ্গে বাঙালিবাদী আন্দোলনের অন্যতম শক্তি ইসলাম 

fec-image

আন্দোলনের শুরু

বাংলাবাদি বা বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলন শুরু হয়েছে “বাংলা পক্ষ”-এর হাত ধরে ২০১৭ সালে। এরপর আস্তে আস্তে আরো অনেক সংগঠন হয়েছে। আন্দোলন এখনো পর্যন্ত রক্ষণাত্মক রয়ে গেছে। পশ্চিম বাংলায় হিন্দিভাষীদের ব্যাপক সংখ্যা বৃদ্ধি ঘটছে দেখে ভীত হয়ে শহুরে বাঙালিরাই মূলত হিন্দি বহিরাগতদের বিরুদ্ধে কিছু রক্ষণাত্মক রাজনীতি শুরু করেছে। রক্ষণাত্মক বলেই এদের মূল কথা হলো হিন্দিভাষী অভিবাসীদের চাকরিতে যথাসম্ভব কম জায়গা দেওয়া ও পশ্চিমবঙ্গের জমি-বাড়ি দখল করতে বাঁধা দেওয়া। অন্যদিকে যদিও বাঙালিদের ব্যবসা করতে বলছে বাংলাবাদীরা, কিন্তু নির্মম সত্যিটা হল বাঙালির কাছে প্রাথমিক পুঁজি অর্থাৎ সিড ক্যাপিটাল নেই। আর সেই জন্য বাঙালি ব্যবসা করে গুজরাটি মারওয়ারী পুঁজির (যা প্রায় ৮০ বছর ধরে বিকাশ লাভ করেছে ভারত রাষ্ট্রের মধ্যে) সাথে পেরে উঠবে না। যদি প্রাথমিক পুঁজি অর্থাৎ সিড ক্যাপিটাল সঞ্চয় করতে হয়, তাহলে আগে গুজরাটি মারওয়ারি পুঁজিকে পশ্চিম বাংলার ব্যবসা থেকে উচ্ছেদ করতে হবে এবং সেটা করতে হবে গায়ের জোরে। এই গায়ের জোরে গুজরাটি মারওয়ারি পুঁজি উচ্ছেদের প্রসঙ্গটা যখন আসবে তখনই বাংলা জাতীয়তাবাদী আন্দোলন রক্ষণাত্মক থেকে আক্রমণাত্মক হয়ে উঠবে।

আন্দোলনের ধরণ

কিন্তু এখনো পর্যন্ত বাংলাবাদী সংগঠনগুলো আক্রমণাত্মক হয়ে উঠতে পারছে না। এর একটা কারণ হল বাংলাবাদি আন্দোলন এখনো পর্যন্ত মূলত শহুরে মধ্যবিত্তদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। “জাতীয় বাংলা সম্মেলন” চেষ্টা করেছিল এই আন্দোলনকে বাঙালি মধ্যবিত্তের বাইরে নিয়ে যেতে। বিশেষ করে হকারদের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে। কিন্তু প্রবল রাষ্ট্রীয় চাপের মুখে পড়ে তারা কয়েক ধাপ এগিয়েও খুব বড় সাফল্য এখনো পর্যন্ত পায়নি। “জেন-জি, পশ্চিমবঙ্গ” এই আন্দোলনে ঢুকেছে মূলত বাঙালি মুসলমানকে বাংলাবাদি আন্দোলনে নিয়ে আসার উদ্দেশ্যে। বিশেষ করে গ্রাম ও শহরতলীর বাঙালি মুসলমানকে বাংলাবাদি আন্দোলনের অংশ করে তোলাই এই সংগঠনের উদ্দেশ্য। বাঙালি মুসলমানদের এই আন্দোলনের অংশ করে তুলতে পারলেই একমাত্র এই আন্দোলন আক্রমণাত্মক হয়ে উঠতে পারবে। অর্থাৎ গুজরাটি মারোয়ারি পুঁজিকে পশ্চিমবঙ্গ থেকে উচ্ছেদ করার আন্দোলন শুরু করতে পারবে।

বিভিন্ন রাজ্যে বাঙালির ওপর আক্রমণ

২০২৫ সালের নতুন “অনুপ্রবেশকারী ফেরত পাঠানো” আইন মেনে বাংলাদেশী অনুপ্রবেশকারী ধরপাকড়ের নামে ভারতের সমস্ত রাজ্যে (বিজেপি শাসিত হোক বা না হোক) শুরু হয়েছে বাঙালি উচ্ছেদ। বাংলা ভাষায় কথা বললেই “বাংলাদেশী অবৈধ অনুপ্রবেশকারী” বলে ট্যাগ দিয়ে দিচ্ছে ভারতের অন্যান্য রাজ্যে। এইভাবে বাঙ্গালীদের বাধ্য করা হচ্ছে অন্য রাজ্যে বাংলা ভাষায় কথা না বলতে। অনেক বাঙালিকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর চেষ্টাও হয়েছে। অর্থাৎ বাংলা ভাষাকে শেষ করা এবং বাঙালি জাতিকে ভাতে মারার এক সুনিপুণ পরিকল্পনা গুজরাটি মারোয়ারি পুঁজি ও হিন্দিভাষী ভোটব্যাঙ্ক নিয়ন্ত্রিত ভারত রাষ্ট্র তৈরি করেছে। বাংলাদেশী অনুপ্রবেশকারী বলে চিহ্নিত করে একদিকে যেমন বাঙালি মুসলমানকে হত্যা করা হচ্ছে, অন্যদিকে তেমনি সত্যিকারের বাংলাদেশী অনুপ্রবেশকারী হিসেবে বাঙালি হিন্দুদেরও অত্যাচার করা হচ্ছে। বলা বাহুল্য, বাংলাদেশ থেকে অবৈধ পথে ভারতে আসা অধিকাংশ বাঙালিই হল বাঙালি হিন্দু। বাঙালি হিন্দুদের এই অংশটা মূলত নিম্ন বর্ণ এবং বিজেপির ভোটব্যাঙ্ক।

ইতিহাসের আলোয়

এবার একটু ইতিহাসের দিকে তাকানো যাক। ১৯৪৭ সালে বাংলার মুসলমান ও নিম্নবর্ণের নেতারা ঐক্যবদ্ধ বাংলার পক্ষে থাকেন আর অধিকাংশ উচ্চবর্ণ নেতারা বাংলাভাগের পক্ষে থাকেন। পশ্চিমবঙ্গে উচ্চবর্ণ নেতাদের দাপট বেশি থাকায় পশ্চিমবঙ্গ আলাদা হয়ে ভারতে যুক্ত হয় ও পূর্ববঙ্গ পূর্ব পাকিস্তান হিসেবে পাকিস্তানে যুক্ত হয়। পূর্ববঙ্গে যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডলের নেতৃত্বে নিম্ন বর্ণের মানুষের এই অবস্থান ভারত রাষ্ট্র প্রথম থেকেই মেনে নেয়নি। সেই জন্যেই ১৯৫০ সালের ২৬শে জানুয়ারির পরে আসা কোনও পূর্ববঙ্গের হিন্দু যাতে ভারতের নাগরিকত্ব না পায় সেই ব্যবস্থা করে। ১৯৪৬ থেকে ১৯৪৯ সালের মধ্যে পূর্ববঙ্গ থেকে অধিকাংশ উচ্চবর্ণ লোকেরাই ভারতে চলে আসে। এবং তাদের ভারত রাষ্ট্র নাগরিকত্ব দিয়ে দেয়। এরপরে কোনও পূর্ব পাকিস্তানকে মেনে নেওয়া নিম্নবর্ণের বাঙালি যেন ভারতে এসে নাগরিকত্ব না পায় সেই ব্যবস্থা কায়েম করে ভারত সরকার। এমনকি ১৯৫০ সালের ২৬শে জানুয়ারির পরে আসা কোনও পূর্ববঙ্গের হিন্দু যদি ভারতীয়কে বিয়ে করে তাহলেও তাদের সন্তানেরা নাগরিক যাতে না হয় তেমনই ব্যবস্থা করা আছে ভারতীয় সংবিধানের ৫(খ) ধারায়। অবশ্যই এই কাজ করা হয়েছে সুনিপুণ চালে। বলা হয়েছে বৈধ অনুপ্রবেশকারীদের সন্তানেরা নাগরিকত্ব পাবে, অর্থাৎ অবৈধ পথে আসা অনুপ্রবেশকারীরা পাবে না। পূর্ববঙ্গ থেকে আসা অধিকাংশ হিন্দুই প্রায় ৯৯% এসেছে অবৈধ পথে। বৈধ পথে আসা মানে ভারতের পাসপোর্ট এক্ট মেনে লং টার্ম ভিসা থাকা আর অভিবাসন এক্ট মেনে রেসিডেন্সিয়াল ভিসা থাকা। ৯৯% পূর্ববঙ্গ থেকে আসা মানুষেরই এই দুটো নেই। মনে রাখা দরকার বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তান থেকে আসা বৈধ অমুসলমান অভিবাসীদেরই কেবল মোদী সরকার “সিএএ”-র মাধ্যমে নাগরিকত্ব দিচ্ছে। তাই বাংলাদেশ থেকে আসা হিন্দুরা নিজেদের অভিবাসী বলে স্বীকার করে ফেলবে সিএএ-তে এপ্লাই করলে। অথচ ৯৯%-এর কাছেই লং টার্ম ভিসা ও রেসিডেন্সিয়াল পারমিট না থাকায় তারা অবৈধ অনুপ্রবেশকারী হিসেবে চিহ্নিত হয়ে যাবে। এই বিষয়গুলো মাণিক মণ্ডল, দীপক ব্যপারী এবং তাদের সংগঠন “দামাল বাংলা” লাগাতার প্রচার করে এসেছে। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যনার্জিও এই মতকে সমর্থন করেন ও বাংলাদেশ থেকে আসা হিন্দুদের সিএএ-তে এপ্লাই করতে নিষেধ করেন। এখনো পর্যন্ত এই কারণেই বাংলাদেশ থেকে আসা অধিকাংশ হিন্দু্রা সিএএ-তে এপ্লাই করেনি। ভারত সরকার যখন দেখল সিএএ-র নাম করে অবৈধ অনুপ্রবেশকারী ধরা যাচ্ছেনা, তখন তারা “এসআইআর” নিয়ে আসলো। বলা হল, ২০০২ সালের ভোটার লিস্টে যাদের নাম নেই অথবা যাদের মা-বাবাদের নাম নেই, তাদের নাগরিকত্বের প্রমাণ দেখাতে হবে। এর ফলে ২০০২-এর পরে বাংলাদেশে থেকে আসা কোনও মানুষের নাম ভোটার লিস্টে উঠবেনা। ফলে এমনিতেই তারা বেনাগরিক হয়ে যাবে। এর ফলে বাংলাদেশ থেকে শেষ ২০-২৫ বছরে আসা মানুষের মধ্যে তৈরি হয়েছে মোদী সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ। তাদের বিজেপি বিদ্বেষ আস্তে আস্তে তাদের মধ্যেকার মুসলমান বিদ্বেষকেও ছাপিয়ে যাচ্ছে।

তৃণমূল কংগ্রেস-এর অবস্থান

স্বাভাবিকভাবেই তৃণমূল ২০২৬ বিধানসভা নির্বাচন জিততে বাঙালি মুসলমান ও পূর্ববঙ্গ থেকে আসা বাঙালি হিন্দু নিম্নবর্ণদের মন জিততে উঠে পড়ে লেগেছে। তৃণমূল সবসময় বোঝাতে চাইবে, নির্বাচনে বিজেপিকে হারানোটাই একমাত্র কাজ। তৃণমূল কখনোই বলবে না গুজরাটি মারওয়ারি পুঁজিকে পশ্চিমবঙ্গ থেকে উচ্ছেদ করাটাই আসল কাজ। বরং নির্বাচনে জিতে তৃণমূল সরকার এই গুজরাটি মারওয়ারী পুঁজিরই স্বার্থ রক্ষা করে যাবে। এই স্বার্থ রক্ষা করতেই তৃণমূল, সিপিএম, কংগ্রেস বাঙালিকে হিন্দিভাষী উচ্ছেদের আন্দোলনে নামতে দেবে না। তৃণমূল এই জায়গায় প্রচণ্ডভাবে এলার্ট। যদিও তৃণমূলেরই কোন কোন নেতা (বার্নপুর, বীরভূমে যেমন ঘটেছে) আঞ্চলিক বাঙালি জনতার চাপে হিন্দিভাষী উচ্ছেদের কিছু অ্যাকশন নিয়েছে। এর থেকে বোঝা যায় বাঙালির মধ্যে হিন্দিভাষী বহিরাগতদের পাল্টা মার দেওয়ার ইচ্ছে আছে।

ভবিষ্যতে বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলন জোরদার হবে

পাল্টা মারের ইচ্ছাকে কাজে লাগিয়েই আস্তে আস্তে করে বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে পশ্চিমবঙ্গের বুক থেকে গুজরাটি মারোয়ারি পুঁজি উচ্ছেদের আন্দোলনে পরিণত করতে পারে। আর এর জন্য পশ্চিমবঙ্গের স্বশাসনের পক্ষে কথা বলা শুরু করতে হবে। “দামাল বাংলা” সংগঠনের মাণিক ফকির বলছেন, পশ্চিমবঙ্গকে নতুন দাস শ্রমের হাব বানাতে চায় ভারত রাষ্ট্র। বেনাগরিক করে দিয়ে অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের দাস শ্রমিকে পরিণত করে বিশ্ববাজারে স্বল্পমূল্যের সামগ্রী তৈরি করতে চাইছে গুজারাঠী মারোয়ারি পুঁজি। লেখকের মতে, ২০০৬-১১ সালের সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম আন্দোলনের ফলে বাংলার মানুষের জমি কেড়ে নিয়ে ব্যবসা ও চাকরী করার যে চেষ্টা চালিয়েছিল গুজারাঠী মারোয়ারি পুঁজি ও হিন্দিভাষিরা, তা ব্যর্থ হয়। ২০১৪ সাল থেকে অনেক বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী ঢুকিয়ে তারা মনে করেছিল বিজেপিকে ক্ষমতায় এনে বাঙালি উচ্ছেদ চালাবে। কিন্তু সেটা হচ্ছেনা দেখে নতুন আগত বাংলাদেশ থেকে আসা অনুপ্রবেশকারীদের বেনাগরিক করে দিয়ে তাদের জমি, সম্পত্তি, পুঁজি দখল করে নেবে গুজারাঠী মারোয়ারি ও হিন্দিভাষিরা। আবার বেনাগরিকদের বাধ্য করবে ভাড়াটে গুণ্ডা হয়ে পশ্চিমবঙ্গ ও আসাম থেকে মুসলমান উচ্ছেদ করতে। আবার ওয়াকফ আইন সংশোধন করে মোদী সরকার ভারত ও পশ্চিম বঙ্গ ও আসামের মুসলমানদের জমি সম্পত্তি দখলের ব্যবস্থা করেই ফেলেছে। ৬ই ডিসেম্বরের পরেই এই মুসলমান সম্পত্তি দখলের প্রক্রিয়া শুরু হবে। এর ফলে বাঙালি মুসলমান ও বাঙালি হিন্দু উদ্বাস্তুদের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের একটা সুযোগও তৈরি হয়েছে। এই সুযোগ কাজে লাগাতে হবে বাংলা পক্ষ, জাতীয় বাংলা সম্মেলন, জেন-জি (পশ্চিমবঙ্গ) ও দামাল বাংলা-র মতো সকল বাঙালি জাতীয়তাবাদী সংগঠনকেই।

গ্রাম পশ্চিম বাংলায় ছড়িয়ে পড়ছে বাঙালি জাতীয়তাবাদ

আরেকটা বিষয় খুব গুরুত্বপূর্ণ, সেটা বহির রাজ্যে পশ্চিমবঙ্গের যে পরিযায়ী শ্রমিকরা কাজ করতে যাচ্ছে, তাদের মধ্যে বাংলাবাদী আন্দোলন ক্রমেই ছড়িয়ে পড়ছে। এই পরিযায়ী শ্রমিকরা অনেকেই গ্রাম থেকে যায়। আর এভাবেই যে গ্রামের বাঙালিরাও বাংলাবাদী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হতে চলেছে। এই নতুন শক্তিকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বাংলাবাদী আন্দোলনে ঢুকিয়ে নিতে হবে। এদের বোঝাতে হবে, পশ্চিমবাংলার শহর থেকে যদি গুজরাটি মারওয়ারি ব্যবসায়ী ও হিন্দিভাষী শ্রমিকদের যদি উচ্ছেদ করা যায় তাহলে পশ্চিমবাংলাতেই তাদের জন্য অজস্র চাকরি তৈরি হয়ে যাবে। হিসেবটা এরকম: ২২ লাখ বাঙালি পরিযায়ী শ্রমিক অন্য রাজ্যে যায় আর দেড় কোটি অন্যান্য রাজ্যের পরিযায়ী শ্রমিক পশ্চিমবঙ্গে কাজ করে। দেড় কোটির মধ্যে বাইশ লাখ উচ্ছেদ করতে পারলেই বাঙালি পরিযায়ী শ্রমিকের কাজ পশ্চিমবাংলাতেই হয়ে যাবে।

ডি-লিমিটেশন ২০২৬

ইতোমধ্যে আরও একটা বিষয় ভারতের অ-হিন্দিভাষীদের দুশ্চিন্তা বাড়িয়ে তুলেছে, আর তা হল ডি-লিমিটেশন- ২০২৬। ১৯৭৬ সালের পর থেকে হিন্দিভাষি রাজ্যগুলোর জনসংখ্যা ভারতের অহিন্দিভাষি রাজ্যগুলোর থেকে অনেক বেশি বেড়েছে। কিন্তু সেই অনুপাতে হিন্দিভাষি রাজ্যগুলোর সাংসদ সংখ্যা বৃদ্ধি করা হয়নি এতদিন। এর কারণ হল জনসংখ্যা বাড়ালে সাংসদ সংখ্যা যদি বেড়ে যায় তবে তা জনসংখ্যা বাড়ানোর পক্ষে একটা ইন্সেন্টিভ হিসেবে কাজ করবে। যেহেতু ভারতের জনসংখ্যা বৃদ্ধি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে এসেছে এখন, সেইজন্য ২০২৬-এর পরে হিন্দিভাষি রাজ্যগুলোর সাংসদ সংখ্যা তাদের জনসংখ্যার অনুপাতে ৪১% থেকে বেড়ে ৪৭% হতে চলেছে। এর ফলে কেন্দ্রীয় সরকারে অহিন্দিভাষি রাজ্যবাসীদের ভোট মূল্যহীন হয়ে যাবে। হিন্দিভাষিরা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রকের ভূমিকায় চলে যাবে। এই কারণে দক্ষিণ ভারতেও স্বায়ত্ত্বশাসনের কথা উঠছে। পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষিত মানুষও এই কারণেই বাঙালি জাতিয়তাবাদী হচ্ছে।

জনসংখ্যার গুরুত্ব

কিন্তু আরো গভীর একটা কথা বুঝতে হবে। হিন্দি গুজরাটি সাম্রাজ্যবাদের পক্ষে আছে পুঁজি, কেন্দ্রীয় সরকার ও তার রাজ্য সরকারের ওপর আইন বানাবার সাংবিধানিক ক্ষমতা এবং অবশ্যই হিন্দিভাষীদের বাংলাভাষীদের তুলনায় জন্মহার বেশি থাকা। অন্যদিকে বাঙালির পক্ষে পুঁজি নেই, রাজ্য সরকারি আইন সাংবিধানিকভাবে কেন্দ্রীয় সরকারের ওপর হতে পারে না এবং বাঙালির বিশেষ করে বাঙালি হিন্দুর জন্মহার অত্যন্ত কম। বাঙালির একমাত্র আশার আলো বাঙালি মুসলমান সমাজের খানিকটা বেশি জন্মহার। এবং মনে রাখা দরকার এর কারণ ইসলাম। ইসলামের সামাজিক শিক্ষাই বাঙালি মুসলমানদের জন্মহারকে অপেক্ষাকৃত শক্তিশালী রেখেছে। তাই মনে রাখা দরকার বাঙালিবাদী আন্দোলনের অন্যতম শক্তি হল ইসলাম।

বাংলাদেশের গুরুত্ব

এছাড়াও মনে রাখতে হবে, না চাইলেও বাংলাদেশ এই অনুপ্রবেশকারী বিষয়ক ঝামেলায় জড়িয়ে পড়বেই। অনেক বাঙ্গালিকেই ভারত সরকার ইতিমধ্যে অনুপ্রবেশকারী বলে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দিয়েছে জোর করে। মিয়ানমার থেকে যেভাবে রোহিঙ্গা মেরে বাংলাদেশে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে, ভারতের আসাম ও পশ্চিমবঙ্গ থেকেও জোর করে বাঙালি মুসলমানদের বাংলাদেশে ঢুকিয়ে দেওয়া হতে পারে। বাংলাদেশের মানুষকে ও সরকারকেও তাই এই ব্যপারে সজাগ থাকতে হবে। স্বার্থের এবং আদর্শের দিক থেকে পশ্চিম বাংলার বাঙালি জাতিয়তাবাদীরা বাংলাদেশের মানুষের বন্ধু।

শেষের কিছু কথা

পশ্চিম বাংলা ভারতের শেষ একমাত্র রাজ্য যেখানে রাজনীতিতে উচ্চ বর্ণ শাসন অক্ষুণ্ন আছে। এর একটা কারণ তারা পশ্চিমবঙ্গে নিজেদের সংখ্যার অনুপাত বাড়াতে পেরেছিল ১৯৪৬-এর পরে যখন সমস্ত উচ্চবর্ণরা পূর্ববঙ্গ থেকে পশ্চিমবঙ্গে চলে আসে। ১৯৫১ সালের হিসেব অনুযায়ী পশ্চিমবঙ্গের জনসংখ্যার ৭৭% ছিল বাঙালি হিন্দু, ১৯% মুসলমান (বাঙালি ও উর্দু মিলিয়ে) আর ২% ছিল হিন্দিভাষি (মারোয়ারি, বিহারি)। ২০১১ সালে দেখা গেছে ৫৮% বাঙালি হিন্দু, ২৯% মুসলমান (বাঙালি ও উর্দু মিলিয়ে) ও ৭% হিন্দিভাষি। ২০২৫ সালে এক্ট্রাপোলেট করে বলা যায়, ৫৩% বাঙালি হিন্দু, ৩২% মুসলমান (বাঙালি ও উর্দু মিলিয়ে) ও ১০% হিন্দিভাষি। বাঙালি হিন্দুদের জন্মহার কম বলে তাদের অধিকাংশ অংশটাই বৃদ্ধ। ফলে বলাই যায়, বাঙালি হিন্দু ও বাঙালি উচ্চবর্ণরা সংখ্যার অনুপাতে অনেকটাই দুর্বল হয়ে পড়ছে। পশ্চিম বঙ্গের উচ্চবর্ণরা আপাতত মুসলমান ভোটের সাহায্যে কোন মতে রাজনৈতিক ক্ষমতা ধরে রেখেছে তারা। শেষ ৮০ বছরে তারা দেখেছে কিভাবে ভারত রাষ্ট্রের সাহায্যে মারোয়ারিরা বাঙালি উচ্চবর্ণের ব্যবসা দখল করেছে। তারা জানে মুসলমানরা না থাকলে হিন্দিভাষি মারোয়ারি বিহারী ও পশ্চিম বঙ্গের ধনী কৃষক বর্ণগুলো (যাদের বর্তমান নাম “ওবিসি”) তদের রাজনৈতিক ক্ষমতাও কেড়ে নেবে। তাই ২০২৫ সালে এসে ১৯৪৭ সালের উলটো চরিত্রেই দেখা যাবে বাঙালি উচ্চবর্ণকে।

সৈকত ভট্টাচার্য: অধ্যাপক, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়, জেন-জি, পশ্চিমবঙ্গের সভাপতি ও “দামাল বাংলা”র কর্মী ।

Print Friendly, PDF & Email
ঘটনাপ্রবাহ: পশ্চিমবঙ্গ, বাঙালি
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও পড়ুন