ওপারের সাত রাজ্যের সশস্ত্র গোষ্ঠীর উপদ্রব এ পারের পাহাড়ে


পার্বত্য চট্টগ্রামের পূর্ব ও দক্ষিণ পার্শ্বজুড়ে সীমান্তের ওপারে অনেকগুলো গোপন ও সশস্ত্র সংগঠন সক্রিয় রয়েছে। ভারতের দাবি অনুযায়ী এ সংগঠনগুলো সন্ত্রাসী ও বিচ্ছিন্নতাবাদী হিসেবে পরিচিত। তবে এরা নিজেদেরকে ‘স্বাধীনতাকামী’ অথবা ‘স্বায়ত্তশাসন’ আদায়ের সংগ্রামে সক্রিয় বলে মনে করে। যদিও এগুলো ভারতের অংশে তৎপর, তবুও এর কিছু ঝাপটা যে বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চলে লাগবে না- সেটা মনে করার অবকাশ নেই। তাই সেদিকেও সতর্ক দৃষ্টি রাখা বাঞ্ছনীয়।
আমরা জানি, বাংলাদেশের সাথে ভারত পৃথিবীর পঞ্চম বৃহত্তম স্থল সীমানা ভাগাভাগি করে আসছে। এর মধ্যে ভারতের সেভেন সিস্টার্স বা সাত রাজ্যের সাথে সীমান্ত আছে প্রায় ১ হাজার ৬০০ কিলোমিটার। বাংলাদেশের সাথে ভারতের যে ৪ হাজার কিলোমিটারেরও বেশি দীর্ঘ স্থলসীমান্ত রয়েছে, তার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই এই সেভেন সিস্টার্সের সঙ্গে যুক্ত। আরও নির্দিষ্ট করে বললে সাতটি রাজ্যের মধ্যে চারটি রাজ্য- আসাম, মেঘালয়, ত্রিপুরা ও মিজোরামের সাথে সরাসরি সংযুক্ত আছে বাংলাদেশ।
সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের মণিপুর ও মিয়ানমারের চিন প্রদেশের ঘটনাবলি বৈশ্বিক রাজনৈতিক সমীকরণের হিসাব হচ্ছে নতুন করে। অতীতে সেভেন সিস্টার্সের রাজ্যগুলো জাতিগত ও ধর্মীয় মেরুকরণে একে অপরের সাথে দ্বন্দ্বে লিপ্ত ছিল। এখনো তা কোনো না কোনো প্রকারে অব্যাহত আছে। বিশেষ করে গত বছর থেকে চলমান মণিপুর দাঙ্গায় হিন্দু মেইতেইদের হাতে খ্রিস্টান কুকিরা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনা এবং বিগত বছরগুলোতে ভারত সরকারের বৈষম্যমূলক দমন নীতির ফলে একটি জাগরণ সৃষ্টি হয়েছে এই জনপদে।
অশান্তির উপসর্গ বিদ্যমান
কথিত শান্তিবাহিনীর অশান্তির জেরে বাংলাদেশ সরকার এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির মধ্যে স্বাক্ষরিত হয় একটি আনুষ্ঠানিক চুক্তি। ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। কথিত এই শান্তিচুক্তির পরও পাহাড়ে অশান্তির উপসর্গ আজও বিদ্যমান। সাম্প্রতিক তথ্যে জানা যায়, পার্বত্য এলাকার ভিতরে কিছু অপরাজনীতির উপসর্গ যেমন আছে, তেমনই বাইরের ইন্ধনও ক্রিয়াশীল রয়েছে। ভিতরে তিন পার্বত্য জেলাকে অশান্ত করে তুলছে সশস্ত্র ৫টি সন্ত্রাসী গ্রুপ। আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি ও বিভিন্ন স্বার্থ নিয়ে প্রায় প্রতিদিন এক গ্রুপের সঙ্গে আরেক গ্রুপের গোলাগুলি হচ্ছে। শান্তিচুক্তির ২৪ বছরে সর্বোচ্চ বরাদ্দে পাল্টে যাওয়া এ অঞ্চলে সন্ত্রাসীরা বিভিন্ন দল ও উপদলে বিভক্ত হয়ে খুন করেছে আড়াই হাজারের বেশি মানুষ।
৩০ লাখ অধিবাসী অধ্যুষিত এসব অঞ্চলে পাহাড়ি বাঙালি সবাই এসব সশস্ত্র গ্রুপের কাছে জিম্মি। মূলত বছরে হাজার কোটি টাকার চাঁদাবাজির আধিপত্য নিয়েই চলছে সংঘাত। আর এসব সংঘাতে রক্তাক্ত জনপদে পরিণত হয়েছে পুরো পাহাড়ি এলাকা। স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও গোয়েন্দা সূত্রে জানা যায়, তিন পার্বত্য এলাকায় দাপিয়ে বেড়াচ্ছে মূলত পাঁচ সন্ত্রাসী সশস্ত্র সংগঠন। এরা হলো জেএসএস, জেএসএস (সংস্কার), ইউপিডিএফ, গণতান্ত্রিক এবং সর্বশেষ যুক্ত হয়েছে এমএনপি (মগ গণতান্ত্রিক পার্টি)।
এছাড়া ত্রিপুরার জঙ্গি সংগঠন ‘কুকি-চিন’ এখানেও তৎপর বলে খবর প্রকাশিত হচ্ছে। ২০২১ সালে বান্দরবান সীমান্তে আরেকটা ‘কুফল’ তৈরি করছে কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট (কেএনএফ) নামে পার্বত্য সন্ত্রাসী গ্রুপ। বম আদিবাসী জনগোষ্ঠীর তরুণ যুবকদের নিয়ে গড়ে উঠেছে কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট (কেএনএফ)। সংগঠনটির নেতৃত্ব দেয়া তরুণের নাম নাথান বম। আবার মিয়ানমারের সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে চীন প্রদেশের যুদ্ধরত স্বাধীনতা সংগ্রামী গোষ্ঠীর সাথে মিজোদের সহানুভূতির সম্পর্ক সৃষ্টি করেছে নানা রহস্যের।
বিবিসির একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, শান্তি চুক্তির পরে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে জটিল এক রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি হয়েছে। চুক্তি সম্পাদনের সাথে সাথেই এর বিরোধিতা করে তৈরি হয়েছিল ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট বা ইউপিডিএফ। বর্তমানে ইউপিডিএফ এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির দুটো করে গ্রুপ রয়েছে। এরা সবাই পরস্পরের প্রতিপক্ষ।
গত কয়েক বছর যাবত এসব সংগঠন একে অপরের সাথে সংঘাতে লিপ্ত। নিত্যদিন খুনোখুনি হচ্ছে। অবৈধ অস্ত্র এবং চাঁদাবাজি এখন সর্বগ্রাসী রূপ নিয়েছে পাহাড়ে। স্থানীয় ব্যবসায়ী জাহাঙ্গীর আলম বিবিসিকে বলেন, “আমাদের দম বন্ধ হয়ে যাবার মতো অবস্থা হয়েছে। বিভিন্ন গ্রুপকে চাঁদা দিতে দিতে আমরা শেষ হয়ে যাচ্ছি।”
সীমান্তবর্তী অঞ্চলের পরিস্থিতি
পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের সংলগ্ন সীমান্ত ও তার অদূরবর্তী এলাকাগুলো বহুদিন যাবত বিচিত্রপ্রকারের অশান্তিপূর্ণ কর্মকাণ্ডে ভুগে চলেছে। উল্লেখ করা জরুরি যে, এই পার্বত্য ভূমির নিকটস্থ ও অদূরে অবস্থিত বিস্তীর্ণ প্রতিবেশী হলো ভারতের সেভেন সিস্টার্স খ্যাত সাত রাজ্যের অন্যতম ত্রিপুরা ও মিজোরাম। এছাড়া আসাম ও মনিপুরে কোনো ঝড় উঠলে তার ঝাপটা লাগে বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামে।
এই সাত রাজ্যে যে কী মাত্রায় ‘বিদ্রোহী’ যা ভারতের সরকারি ভাষায় ‘সন্ত্রাসী’ গোষ্ঠী তৎপর রয়েছে তার তালিকা দেখলে বিস্মিত হতে হয়। দেড় দশক আগে প্রাপ্ত এক হিসেবে ভারতের ২৩টি রাজ্য ও ৭টি ইউনিয়ন টেরিটরির মধ্যে ১১টি রাজ্যেই তাদের ভাষায় সন্ত্রাসী, বিদ্রোহী ও চরমপন্থী হিসেবে চিহ্নিত ১৭৭টি সংগঠন সক্রিয় রয়েছে। এর মধ্যে সেভেন সিস্টার্সে এ ধরনের সর্বাধিক সংখ্যক সংগঠন তৎপর বলে জানা যায়।
তবে আসাম, ত্রিপুরা, মণিপুর, মেঘালয়, নাগাল্যান্ড, মিজোরাম, অরুণাচল প্রভৃতি রাজ্যের বেশির ভাগ সংগঠন নিজেদের ‘স্বাধীনতাকামী’ বলে পরিচয় দেয়। তারা তাদের কার্যক্রমকে সন্ত্রাসী নয়, ‘স্বাধীনতার জন্য লড়াই’ বলে উল্লেখ করে থাকে। আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী কার্যক্রম বিষয়ে গবেষণাকারী প্রতিষ্ঠান ‘ইনস্টিটিউট ফর কনফ্লিক্ট ম্যানেজমেন্ট’-এর ওয়েবসাইট থেকে প্রাপ্ত তথ্যে সে সময় জানা যায়, এ ধরনের সর্বাধিক সংগঠন রয়েছে মনিপুরে।
সেখানে ৩৯টি সংগঠন সক্রিয় ছিল। আসামে ৩৬টি জঙ্গি-চরমপন্থী সংগঠন তাদের কার্যক্রম চালায়। ত্রিপুরার ছিল ৩০টি সংগঠন। এছাড়া সেসময় মেঘালয়ে ৪টি, নাগাল্যান্ডে ৩টি, মিজোরামে ২টি এবং অরুণাচল রাজ্যে ১টি সংগঠনের কথা জানা যায়।
আসাম রাজ্যের তালিকায় থাকা উল্লেখযোগ্য সংগঠনগুলো হলো- ইউনাইটেড লিবারেশন ফ্রন্ট অব আসাম (উলফা), ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট অব বোডোল্যান্ড (এনডিএফবি), কামতাপুর লিবারেশন অর্গানাইজেশন (কেএলও), বোডো লিবারেশন টাইগার ফোর্স (বিএলটিএফ), গোর্খা টাইগার ফোর্স (জিটিএফ), ইউনাইটেড লিবারেশন ফ্রন্ট অব বারাক ভ্যালি, মুসলিম লিবারেশন ফ্রন্ট অব আসাম (এমইউএলএফএ),
মুসলিম টাইগার ফোর্স (এমটিএফ) প্রভৃতি। মনিপুরে ইউনাইটেড ন্যাশনাল লিবারেশন (ইউএনএফএল), পিপলস্ লিবারেশন আর্মি (পিএলএ), মনিপুর লিবারেশন টাইগার আর্মি (এমএলটিএ), কুকি ন্যাশনাল ফ্রন্ট, কুকি রেভ্যুলেশনারি আর্মি, কুকি লিবারেশন আর্মি প্রভৃতি। ত্রিপুরায় রয়েছে, ইউনাইটেড লিবারেশন ফ্রন্ট অব ত্রিপুরা, অল ত্রিপুরা টাইগার ফোর্স, ইউনাইটেড বেঙ্গলি লিবারেশন ফোর্স, অল ত্রিপুরা ন্যাশনাল ফোর্স প্রভৃতি।
‘ইনস্টিটিউট ফর কনফ্লিক্ট ম্যানেজমেন্ট’-এর সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী মনিপুরে রয়েছে এইচএমআর পিপলস কনভেনশন, জেলিয়ানগ্রং ইউনাইটেড ফ্রন্ট, জাতীয় বিপ্লবী ফ্রন্ট, জোমি বিপ্লবী আর্মি, কুকি জাতীয় ফ্রন্ট (কেএনএফ), কুকি জাতীয় লিবারেশন ফ্রন্ট (কেএনএলএফ) প্রভৃতি। আসামে রয়েছে, ইউনাইটেড লিবারেশন ফ্রন্ট আসাম (ইউএলএফএ-আই), রাভা ন্যাশনাল লিবারেশন ফ্রন্ট (আরএনএলএফ), ইউনাইটেড পিপলস লিবারেশন আর্মি (ইউপিএলএ), ইউনাইটেড ডেমোক্রেটিক লিবারেশন আর্মি (ইউডিএলএ), টিওয়া লিবারেশন আর্মি (টিএলএ), রাভা ভাইপার আর্মি (আরভিএ), ডিমাসা ন্যাশনাল লিবারেশন আর্মি (ডিএনএলএ) প্রভৃতি।
মেঘালয়ে আছে, ইউনাইটেড আচিক লিবারেশন আর্মি (ইউএলএ), আচিক ন্যাশনাল লিবারেশন আর্মি (এএনএলএ), আচিক ন্যাশনাল ইউনাইটেড ফোর্স (এএনইউএফ), আচিক টাইগার ফোর্স (এটিএফ), ত্রিপুরায় রয়েছে, অল ত্রিপুরা টাইগার ফোর্স (এটিটিএফ), ত্রিপুরা জাতীয় লিবারেশন ফ্রন্ট (এনএলএফটি) ইত্যাদি।
অন্যদিকে মায়ানমারকেন্দ্রিক আরাকান, রাখাইন, রোহিঙ্গা প্রভৃতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সশস্ত্র সংগঠন পার্বত্য এলাকার জন্য হুমকিস্বরূপ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। আরাকান আর্মি নামের গোষ্ঠী বাংলাদেশের অভ্যন্তরে নির্বিঘ্নে চলাচল করতে পারার মতো ঘটনার কথা গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে মিয়ানমারের চলতি গৃহযুদ্ধ,
ভারতে কুকি-চিনদের বিদ্রোহ এবং এই জনপদে প্রতিনিয়ত জাতিগত সংঘাত প্রভাব-প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিচ্ছে। উপরের বিবরণে এটি স্পষ্ট হচ্ছে যে, বাংলাদেশের পার্বত্য জনপদ বহুমুখী জঞ্জালের মধ্যে আবর্তিত হচ্ছে। এই জঞ্জাল অপসারণের সব দায় ও দায়িত্ব হয়তো বাংলাদেশের পক্ষে পালন করা সাধ্যের মধ্যে পড়ে না। তবে তা এড়িয়ে বাবারও উপায় নেই।
এ বিষয়ে প্রধান করণীয় হলো, সেভেন সিস্টার্সে তৎপর সংগঠন-সংস্থাগুলোর কোনো শাখা-প্রশাখা বাংলাদেশের অভ্যন্তরে বিশেষত পাহাড়ের আড়ালে কোনো পর্যায়ে তৎপর কিনা সে বিষয়ে অনুসন্ধান চলমান থাকা প্রয়োজন। এমনকি সাধারণ আপাতদৃষ্টে নিরীহ চলাচল থাকাকেও প্রশ্রয় দেয়া উচিত হবে না। বাংলাদেশের শান্তি ও স্বস্তি বজায় রাখার স্বার্থে এবং দেশের স্বাধীন ও সার্বভৌম সত্তা অক্ষুণ্ণ রাখতে গভীর দৃষ্টি রাখা প্রয়োজন। সেই সঙ্গে যে কোনো প্রকার বিতর্ক এড়িয়ে চলতে সচেষ্ট থাকা জরুরি।
# লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক, কলামিস্ট ও গ্রন্থ রচয়িতা।

















