পেকুয়ায় আনন্দ স্কুলের শিক্ষক নিয়োগে জামায়াতি শিক্ষক নিয়োগের চেষ্টা: সীমাহীন অনিয়ম দূর্নীতির অভিযোগ

image_47007 

নিজস্ব প্রতিনিধি,পেকুয়া:
পেকুয়া উপজেলায় আনন্দ স্কুলের শিক্ষক নিয়োগে সীমাহীন অনিয়ম দূর্নীতি ও বেপরোয়া ঘুষ বানিজ্যের অভিযোগ উঠেছে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে। আর নিয়োগ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ অধিকাংশ প্রার্থী জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীরা রয়েছেন।

উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান ও পেকুয়া সদর ইউনিয়ন জামায়াতের আমীর মাওলানা নুরুজ্জামান মনজু, আনন্দ স্কুলের পেকুয়ার ট্রেনিং কো-অর্ডিনেটর  (টি,সি) মো. মাসুম বিল্লাহর বিরুদ্ধে শিক্ষক নিয়োগের নামে ব্যাপক ঘুষ বানিজ্যের অভিযোগ পাওয়া গেছে। আর ভাইস চেয়ারম্যান জামায়াত নেতা মনজু উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের জামায়াত-শিবিরের নেতা কর্মীদের নিয়োগ দেওয়ার জন্য উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার কার্যালয়ে দেন-দরবার শুরু করেছেন।

এছাড়াও প্রাপ্ত অভিযোগে জানা গেছে, পেকুয়া উপজেলার সাত ইউনিয়নের ৬০/৭০ জনের কাছ থেকে নিয়োগ পাইয়ে দেওয়ার কথা বলে কয়েক লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। এ নিয়ে কয়েকজন প্রার্থী ভাইস চেয়ারম্যান ও জামায়াত নেতা মনজুর বিরুদ্ধে আজ বুধবার পেকুয়ার ইউএনও কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। গতকাল ২৭ মে আনন্দ স্কুলের শিক্ষক নিয়োগের ফলাফল ইউএনও‘র কার্যালয়ের সামনের নোটিশ বোর্ডে টানিয়ে দেওয়া হয়। ফলাফলে যে সব প্রার্থীকে উত্তীর্ণ দেখানো হয়েছে তাদের অধিকাংশ সরাসরি জামায়াত-শিবিরের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত।

সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে এর সত্যতা ও মিলেছে। এদিকে আনন্দ স্কুলে শিক্ষক নিয়োগে জামায়াত-শিবিরের লোকদের নিয়োগের ঘটনা ফাঁস হয়ে গেলে মঙ্গলবার দুপুরে উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ইউএনওর কার্যালয়ে গিয়ে এর তীব্র প্রতিবাদ জানান।  

এ ব্যাপারে পেকুয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা শাহাবউদ্দিন ফরায়জী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন ‘জামায়াত নেতা ভাইস চেয়ারম্যান মনজুর সাথে আঁতাত করে ইউএনও ও শিক্ষা কর্মকর্তা তপনকান্তি চৌধূরী মিলে আনন্দ স্কুলের শিক্ষক নিয়োগে ব্যাপক অনিয়মের আশ্রয় নিয়েছে’। ‘এখানে জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীদের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে’।  

ফলাফল বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, উপজেলার মগনামা ইউনিয়নের বাইন্যাঘোনা গ্রামের আনন্দ স্কুলের শিক্ষক হিসেবে বিধি বহির্ভূতভাবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে মগনামা ইউনিয়ন ছাত্রশিবিরের সভাপতি আবুল কাসেমকে (রোল নং ১০০)। তিনি উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান ও জামায়াত নেতা মনজুর কাছের লোক হিসেবে পরিচিত। ওই শিবির নেতার বাড়ী বাইন্যাঘোনা গ্রাম থেকে ৩কিলোমিটার দূরে করলিয়া পাড়া গ্রামে। অথচ আনন্দ স্কুলের শিক্ষক নীতিমালা মতে, স্কুলের ১কিলোমিটার দূরত্বের মধ্যে থেকে প্রার্থী নিয়োগ করার বাধ্যবাধকতা থাকলেও নিয়ম মানা হয়নি। ওই আনন্দ স্কুলের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগের জন্য যথানিয়মে বাইন্যা গ্রামের নুরুল আলমের মেয়ে রোজিনা আক্তার (রোল নং ৯৯) আবেদন করে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় অংশে নিয়েও প্রকাশিত ফলাফলে তার নাম আসেনি।

এ নিয়ে রোজিনা আক্তারের ভাই গিয়াস উদ্দিন মঙ্গলবার ইউএনও‘র কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। রাজাখালী ইউনিয়নের মধ্যম বকশিয়া ঘোনা আনন্দ স্কুলের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগের জন্য ওই গ্রামের জামাল উদ্দিনের স্ত্রী শওকত আরা পারভীন (রোল নং ৭৫) পরীক্ষায় অংশ নেন। তার বাড়ীর পাশেই আনন্দ স্কুলের অবস্থান। কিন্তু প্রকাশিত ফলাফলে তার নাম আসেনি। শওকত আরা অভিযোগ করেছেন, উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান মনজু ও টি,সি মাসুম বিল্লাহ তার গ্রাম থেকে ৩ কিলোমিটার দূরের গ্রাম বামুলা পাড়া গ্রামের মোছাম্মৎ এ্যানির কাছ থেকে ২০হাজার টাকা ঘুষ নিয়ে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ করেছেন। এ্যানি মহিলা জামায়াতে সক্রিয় কর্মী বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।

পেকুয়ার উজানটিয়া নতুন ঘোনা গ্রামের প্রার্থী আসমাউল হুসনা (রোল নং ১৪১) অভিযোগ করেছেন, তাকে চাকুরী পাইয়ে দেওয়ার কথা বলে ভাইস চেয়ারম্যান ২০ হাজার টাকা নিয়েছেন। কিন্তু ফলাফলে তার নাম আসেনি। তিনি এখন টাকা গুলো ফেরৎ চাইতে গিয়ে ভাইস চেয়ারম্যান তাকে নানাভাবে হুমকি দিচ্ছেন। রাজাখালী ইউনিয়নের বকশিয়া ঘোনা আনন্দ স্কুলের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ লাভের জন্য আবেদন করেছিলেন গৃহবধূ আমেনা হেলালী (রোল নং ৬১)। স্কুলটি তার বাড়ীর পাশেই। আমেনা হেলালী অভিযোগ করেছেন, তার গ্রাম থেকে ৩কিলোমিটার দুরের গ্রাম বদিউদ্দিন পাড়ার কাপিয়া জান্নাত (রোল নং ৬০) এর কাছ থেকে উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান মনজু ও টি,সি ১৭হাজার ঘুষ নিয়ে নিয়োগ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ করেছেন। কাফিয়া জান্নাত মহিলা জামায়াতের ওয়ার্ড় সভাপতি বলে জানা গেছে।

এ ভাবে ভাইস চেয়ারম্যান মনজু পেকুয়ার ইউএনও, প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তাকে মোটা অংকে ম্যানেজ করে তার পছন্দের জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীদের আনন্দ স্কুলের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগে দেওয়ার পাঁয়তারা শুরু করেছেন। এভাবে জামায়াত নেতা ভাইস চেয়ারম্যান উপজেলার অধিকাংশ আনন্দ স্কুলে অর্থের বিনিময়ে জামায়াত-শিবিরের লোকদের নিয়োগের জন্য চুড়ান্ত করেছেন।   

জানা গেছে, গত মাসের ২৯ এপ্রিল আনন্দ স্কুলের পেকুয়ার কো-অর্ডিনেটর ও শিক্ষক নিয়োগ কমিটির সদস্য সচিব মাসুম বিল্লাহ উপজেলার ৭ ইউনিয়নের ৮০টি আনন্দ স্কুলের বিপরীতে শিক্ষক নিয়োগের জন্য বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেন। উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের ৮০টি আনন্দ স্কুলের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ লাভের জন্য প্রায় দুই শতাধিক প্রার্থী নির্দিষ্ট সময়ে আবেদন পত্র জমা দেন টি,সি‘র দফতরে। আর চলতি মাসের ১৯ মে উপজেলা সদরের পেকুয়া জিএমসি ইনষ্টিটিউশনের হলরুমে আনন্দ স্কুলের শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা অনুষ্টিত হয়। একই দিন বিকালে পেকুয়ার ইউএনও‘র কার্যালয়ে প্রার্থীদের মৌখিক পরীক্ষা ও নেওয়া হয়। পরীক্ষায় অংশ নেওয়া প্রার্থী মোছাম্মৎ রোজিনা আক্তার (রোল নং ৯৯), কহিনূর আক্তার (রোল নং ৬৭) সহ আরো একাধিক প্রার্থী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, পরীক্ষার আগের দিন রাত্রে উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান নুরুজ্জামান মনজু পেকুয়া উপজেলা ছাত্র শিবিরের সভাপতি আজহারুল ইসলামের মাধ্যমে প্রশ্নপত্র বিলি করেছেন তাদের পছন্দের প্রার্থীদের কাছে। পরে পরীক্ষার্থীরা প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগ তোলে পরীক্ষা বাতিল করে পুনরায় পরীক্ষার দাবী করলেও কর্তৃপক্ষ কোন ধরণের ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি।     

অভিযোগে ব্যাপারে পেকুয়া উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান ও জামায়াত নেতা নুরুজ্জামান মনজুর সাথে মোবাইলে যোগাযোগ করা হলে তিনি সাংবাদিক পরিচয় পেয়েই কথা বলতে রাজি হননি। পরে বুধবার সকাল ১১টার দিকে তার কার্যালয়ে গিয়ে বক্তব্য নেওয়ার জন্য চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।  

পেকুয়া উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ও আনন্দ স্কুল শিক্ষক নিয়োগ কমিটির সভাপতি তপন কান্তি চৌধুরী আনন্দ স্কুলে শিক্ষক নিয়োগে অনিয়মের বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, ‘কাগজে কলমে আমাকে সভাপতি করা হলেও শিক্ষক নিয়োগে ইউএনও ও ভাইস চেয়ারম্যান মনজু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন’। আমার কোন ধরণের মতামত তারা নেননি।  তিনি আরো বলেন‘ তাদের বাইরে গিয়ে আমি কিছুই করতে পারি নাই। ইউএনও আমার কাছ থেকে জোরপূর্বক রেজাল্ট শিটে স্বাক্ষর আদায় করেছেন। এখন কিছু বললে ইউএনও ও ভাইস চেয়ারম্যানের রোষানলে পড়তে হবে।     

এ ব্যাপারে জানতে পেকুয়ার ইউএনও ও আনন্দ স্কুল শিক্ষক নিয়োগ কমিটির উপদেষ্টা মীর শওকত হোসেন সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, ‘ কিছু কাজ করতে গেলে অনিয়ম সামান্য হবেই’ তবে সেটা নিয়ে কাজ বন্ধ হবেনা’। তিনি আরো বলেন, ‘শিক্ষক নিয়োগে ঘুষ নেওয়ায় ভাইস চেয়ারম্যান মনজুর বিরুদ্ধে কয়েকজন প্রার্থী তার কাছে লিখিত অভিযোগ করেছেন। তিনি আরো বলেন, অভিযোগ তদন্ত আমার দায়িত্বের মধ্যে পড়েনা, তাই এ বিষয়ে আমার করার কিছুই নেই জানিয়ে আর কথা বলতে রাজি হননি।

Print Friendly, PDF & Email
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও পড়ুন