বাংলাদেশের নারী জাগরণের নেপথ্য কারিগর

fec-image

আমরা যখন নারী জাগরণের কথা বলি, তখন অনেক বড় বড় তাত্ত্বিক কথা শুনতে পাই। কিন্তু গত তিন দশকে মাটির কাছাকাছি যে বিপ্লব ঘটে গেছে তার নেপথ্যে একজন মানুষের জেদ আর শান্ত উপস্থিতি কাজ করেছে জাদুর মতো। তিনি আর কেউ নন,সদ্য প্র‍্যয়াত সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। বাংলাদেশের সমাজ যখন রক্ষনশীলতার বেড়াজালে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ছিল, যখন একটা সাধারণ গ্রাম্য পরিবারের মেয়ে হওয়া মানেই ছিল কেবল রান্নাবান্না আর পরের ঘরে যাওয়ার প্রস্তুতি,ঠিক সেই জমাটবদ্ধ অন্ধকারে তিনি এক ঝলক আলোর মতো এসে দাঁড়িয়েছিলেন। তার সেই চিরচেনা সাদা সিফন শাড়ি আর কপালে টিপ ছাড়াই এক অদ্ভুত গাম্ভীর্যপূর্ণ অবয়ব এদেশের কোটি নারীকে বুঝিয়ে দিয়েছিল যে পর্দার ওপাড়েও একটা আকাশ আছে এবং সেই আকাশট নারীদের পক্ষে জয় করা সম্ভব। তিনি কোন মঞ্চে দাঁডিয়ে নারী অধিকার নিয়ে পশ্চিমা ঢংগে চিৎকার করেন নি বরং তিনি কাজ করেছেন এমনভাবে যাতে সমাজটা নিজের অজান্তেই বদলে যেতে বাধ্য হয়। বাংলাদেশে আজ আমরা যে নারীদের জয়জয়কার দেখি, তার ভিত্তিটা তাঁর সেই শান্ত অথচ কঠিন সিদ্ধান্তের কারণেই তৈরী হয়েছে।

নব্বই দশকের শুরুতে যখন তিনি প্রথমবার ক্ষমতায় এলেন, তখন এদেশের মেয়েদের শিক্ষার হার ছিল একদম তলানিতে। মা-বাবা তাদের মেয়েকে স্কুলে পাঠাবেন কিনা তা নিয়ে দশবার ভাবতেন। আর ঠিক সেই সময়েই বেগম খালেদা জিয়া নিলেন এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ। মেয়েদের জন্য দশম শ্রেনী পর্যন্ত শিক্ষা অবৈতনিক করে সাথে উপবৃত্তির ব্যবস্থা করলেন। এই সিদ্ধান্ত কেবল একটি সরকারি প্রকল্প ছিল না, এটি ছিল এদেশের লক্ষ লক্ষ মায়ের অধরা স্বপ্নকে উস্কে দেয়া। ওই সামন্য কিছু উপবৃত্তির টাকা আর অবৈতনিক পড়ার সুযোগ,এটাই কিন্তু গ্রামের নিরক্ষর বাবা-মা’র মনে জেদ তৈরী করেছিল যে, তাদের মেয়েটিও অন্তত প্রাইমারি স্কুল পাশ দিবে। আমরা আজ বড় বড় শব্দে ” উইমেন এমপাওয়ারমেন্ট” এর গল্প বলি কিন্তু সেই সময়ে গ্রামবাংলার মেঠো পথে যখন প্রথমবার একঝাঁক মেয়ে সাইকেল চালিয়ে কিংবা দলবেঁধে স্কুলে যাওয়া শুরু করলো, সেট দৃশ্যটাই ছিল নীরব বিপ্লব। ওই সময়ে যদি তিনি এই যুগান্তকারী সিদ্ধান্তটা না নিতেন তবে আজ হয়তো আমাদের গার্মেন্টস সেক্টর থেকে শুরু করে কর্পোরেট অফিসগুলোতে এত নারীর পদচারণা দেখা যেত না। তিনি আসলে নারীদেরকে ঘরে বসে কেবল অধিকারের কথা বলতে শেখাননি বরং তাদের হাতে বই আর মনে জেদ তুলে দিয়ে রাজপথে নিয়ে এসেছিলেন।

বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্প আজ বিশ্বের দরবারে আমাদের মাথা উঁচু করে রেখেছে তার প্রাণ ভোমরা কিন্তু কোটি কোটি নারী শ্রমিক। এই নারীদের স্বাবলম্বী হওয়ার নেপথ্যে বেগম খালেদা জিয়ার শিল্পনীতির বড় ভূমিকা ছিল। নব্বইয়ের দশকের সেই উত্তাল সময়ে তিনি যখম নারী শ্রমিকদের কাজের পরিবেশ আর তাদের নিরাপত্তায় গুরুত্ব দিচ্ছিলেন, তখন আসলে তিনি এক বিশাল কর্মীবাহিনী তৈরী করছিলেন যারা একদিন এদেশের অর্থনীতির চাকা ঘুরিয়ে দেবে। একজন সাধারণ গৃহবধূ থেকে যেভাবে তিনি নিজেকে রাজনীতির উত্তাল সমুদ্রে সঁপে দিয়েছিলেন, সেই লড়াইটাই ছিল এদেশের নারীদের জন্য এক জীবন্ত অনুপ্রেরণা।  তিনি যখন রাজপথে পুলিশের টিয়ার গ্যাস আর লাঠিপেটার সামনে অবিচল দাঁড়িয়ে থাকতেন, তখন টিভি, রেডিওর সামনে বসে থাকা কোন এক মফস্বলের কিশোরী নিজের অজান্তেই শিখে নিত যে, জীবনের প্রতিকূলতায় মাথা নোয়াতে নেই। তার এই”আপোষহীন”  ভাবমূর্তিটি আসলে এদেশের নারীদের চরিত্রের ভিতর এক ধরণের কাঠিন্য আর আত্মবিশ্বাস বুনে দিয়েছিল। আমরা প্রায়ই ভুলে যাই যে, একজন নারীর নেতৃত্বে দেশ পরিচালিত হওয়াটাই ছিল সমাজ সংস্কারের সবচাইতে বড় বিজ্ঞাপন। তাঁকে দেখা এদেশের মানুষ অভ্যস্ত হয়েছে যে সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা কেবল পুরুষের একচেটিয়া নয়, বরং একজন নারীও সাহসের সাথে রাষ্ট্রের হাল ধরতে পারেন।

স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার জন্য কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ, নারীদের জন্য কোটা ব্যবস্থা প্রবর্তন যা বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীদের অংশ গ্রহণ নিশ্চিত করে।

প্রাথমিক শিক্ষাদানে নারীদের ব্যাপক সুযোগ তৈরী করে দেয়া শিক্ষার মান বৃদ্ধির পাশাপাশি নারীর ক্ষমতায়নেও সহযোগিতা করেছে। পাশাপাশি বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীদের জন্য বিশেষ প্রনোদনা দেয়া, উদ্যোক্তা তৈরির ক্ষেত্রে স্বল্পসুদে ঋণ দেয়াও নারীদের ক্ষমতায়নে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছিল।

একজন মহীয়সী নারীর প্রস্থান মানে শুধু একটি প্রাণের চলে নয়, বরং একটি জীবন্ত ইতিহাসের যবনিকাপাত। তিনি বাংলাদেশের নারীদের শিখিয়েছিলেন যে শালীনতা বজায় রেখেও কিভাবে পৃথিবীর সবচাইতে বড় আসরে নেতৃত্ব দেয়া যায়। তাঁর সেই মার্জিত রুচি, কথা বলার ধীরস্থির ভঙ্গি আর ব্যক্তিত্বের এক অদ্ভুত মোহিনী শক্তি আজও এদেশের নারীদের কাছে অনুকরণীয়।তিনি যখন আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করতেন,তখন সারাবিশ্ব দেখতো এক অন্য বাংলাদেশেকে যেখানে একজন নারী সব বাধাঁ মাড়িয়ে দেশের ভাগ্য গড়ে দিচ্ছেন। আজ বাংলাদেশে নারী শিক্ষার হার ছেলেদের প্রায় সমান(২০২৪ এর তথ্য অনুসারে মোট স্বাক্ষরতার হার ৭৭.৯%, পুরুষ ৮০.১% এবং নারী ৭৫.৮%)। বাংলাদেশের যে নারীরা হিমালয় জয় করেছে কিংবা খেলায় মাঠে বিশ্ব জয় করেছে তার শুরুর যাত্রাটা ওই সাদা শাড়ি পরা মানবীর হাত দিয়েই শুরু হয়েছিল। তিনি আসলে এমন এক নীরব কারিগর ছিলেন যিনি নিজেই হয়তো আড়ালে থেকে গেছেন অনেকাংশে, কিন্তু তার গড়া সেই নারী সমাজ আর আলোকবর্তিকা হয়ে জ্বলছে।

বেগম খালেদা জিয়ার প্রস্থান আমাদের জন্য এক গভীর শোকের বিষয় তবে তাঁর রেখে যাওয়া জাগরণ কোনদিন মুছে যাবে না। এদেশের প্রতিটি স্কুলে যখন টিফিন পিরিয়ডে কিশোরীদের উচ্ছল হাসি শোনা যায়, মাস শেষে একজন নারী কর্মী যখন নিজের উপার্জনের সম্মানীটা হাতে নেয় তখন সেখানে অবচেতনভাবে বেগম জিয়ার ছোঁয়া থাকে। তিনি ছিলেন এমন একজন নেত্রী যিনি ক্ষমতার দম্ভে নয়, বরং মায়ার বাঁধনে মানুষকে আবদ্ধ করেছিলেন। তিনি বুঝিয়ে দিয়েছিলেন নারী মানেই কেবল ত্যাগের প্রতিমূর্তি নয়, বরং নারী মানে এক লড়াকু সত্তা। তাঁর এই জীবন দর্শনই আজ এদেশের কোটি কোটি নারীকে শক্তি যোগায়। ইতিহাস যখন বাংলাদেশের নারী জাগরণের কথা লিখবে তখন অবশ্যই বেগম খালেদা জিয়ার নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। কারণ তিনি কেবল শাসন করেননি,তিনি এদেশের নারীদের হৃদয়ে আত্মমর্যাদার বীজ বুনে দিয়ে গিয়েছেন।

বেগম খালেদা জিয়া কেবল একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ছিলেন না, তিনি ছিলেন এদেশের নারীদের নীরবতার ভাষা, প্রতিবাদের ভাষা। তিনি শিখিয়েছেন কিভাবে নীরবে কাজ করে গোটা জাতিকে বদলে দেয়া যায়। তার মহাপ্রয়াণে যে শুন্যতা তৈরী হলো তা হয়তো কখনো পূরণ হবে না। তবে তাঁর দেখানো সেই শিক্ষার আলো আর আত্মনির্ভরশীলতার পথ ধরে বাংলাদেশের নারীরা আরও বহুদূর এগিয়ে যাবে, এটাই হবে তাঁর প্রতি সবচাইতে বড় শ্রদ্ধা নিবেদন। তাঁর বিদায় বড়ই করুণ,  তবে তাঁর রেখে যাওয়া আদর্শ আর নারী জাগরণের সেই উজ্জ্বল মশাল আমাদের সামনের দিনগুলোতে আরও বেশি সাহস দিবে।

লেখক শাহেনা আক্তার : সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী মহিলাদল, খাগড়াছড়ি জেলা।

Print Friendly, PDF & Email
ঘটনাপ্রবাহ: খাগড়াছড়ি, খালেদা জিয়া, নারী জাগরণ
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও পড়ুন