বান্দরবানের সীমান্তবর্তী উপজাতীয় পাড়াগুলোতে আরাকান আর্মিতে বাধ্যতামূলক যোগদানের চাপ : এলাকা ত্যাগ করেছে বহু যুুবক

fec-image

বাংলাদেশের বান্দরবান জেলার মিয়ানমার সীমান্তবর্তী উপজাতীয় পাড়াগুলোতে রাখাইনে বিদ্রোহী সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মিতে বাংলাদেশী উপজাতীয় যুবকদের বাধ্যতামূলক যোগ দেয়ার জন্য গোপনে চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে। ১৬-২০ বছর বয়সী উপজাতীয় যুবকদের উপর এই চাপ বেশি রয়েছে। তাদেরকে উচ্চ বেতনে আরাকান আর্মিতে যোগ দেয়া এবং বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের ফেলে আসা বসত বাড়িতে পুনর্বাসনের লোভও দেখানো হচ্ছে। তবে এই লোভে কাজ না হলে তাদের নানা কায়দায় ইচ্ছার বিরুদ্ধে আরাকান আর্মিতে যোগ দিতে বাধ্য করা হচ্ছে। এই চাপ সৃষ্টির কাজটি করছে ইতোপূর্বে সীমান্তবর্তী পাড়াগুলো থেকে আরাকান আর্মিতে যোগ দেয়া বাংলাদেশী উপজাতীয় সদস্যরা। রাখাইনের বেশিরভাগ এলাকা আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে আসার পর এলাকাগুলোর দখল ধরে রাখা, সরকার ও রোহিঙ্গা বিরোধীদের সাথে যুদ্ধের মাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ায় আরাকান আর্মির বিপুল পরিমাণ লোকবল প্রয়োজন। কিন্তু স্থানীয়ভাবে সেই লোকবল না পাওয়ায় তাদের নজর পড়েছে বাংলাদেশী সীমান্তবর্তী উপজাতীয় পাড়াগুলোতে। সম্প্রতি বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার বাইশারীর আরাকান আর্মিতে যোগ দেয়া এক উপজাতীয় সদস্যের মৃত্যুর খবর অনুসন্ধানে গিয়ে পার্বত্যনিউজের প্রতিনিধি এ তথ্য জানতে পারে।

গত ৮ জুন থেকে বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার বাইশারীসহ আশপাশের এলাকায় রাখাইন সশস্ত্র বিদ্রোহী গ্রুপ আরকান আর্মির এক সদস্যের মৃত্যর খবর নিয়ে ধুম্রজালের সৃষ্টি হয়েছে। বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাকে নিয়ে অনেক লেখালেখি শুরু হয়। কেউ বলছেন তিনি রাখাইনে যুদ্ধে মৃত্যবরণ করেছেন। আবার কারো মতে, সে মারা যায়নি। তাকে ঘিরে বিভিন্ন মানুষের কাছে বিভিন্ন কথা জানা যাচ্ছে। গত তিনদিন যাবত তাকে নিয়ে চলছে আলোচনা।

কে এই আরকান আর্মির সদস্য?

পার্বত্যনিউজের প্রতিবেদক গত ২দিন যাবত সরজমিনে তদন্তসহ অনুসন্ধান করে স্থানীয় বিভিন্ন ব্যক্তির সাথে কথা বলে জেনেছেন, বাংলাদেশি নাগরিক পার্বত্য জেলা বান্দরবান এর নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার বাইশারী ইউনিয়নের ৭ নং ওয়ার্ড পশ্চিম বাইশারী গুদাম পাড়া / মার্মা পাড়ার বাসিন্দা মিংগা মার্মার সর্বকনিষ্ঠ পুত্র শুলু মার্মা ওরফে মংনু মার্মা ওরফে মংছাইলা মার্মা এই তিনটি নামে পরিচিত এই ছেলেটি বিগত একযুগ পুর্বে মিয়ামারের সশস্ত্র বিদ্রোহী গ্রুপ আরকান আর্মিতে যোগদান করছেন। সেই থেকে মাঝে মধ্যে নিজ বাড়ীতে বেড়াতে ও আসতেন বলেও পারিবারিক সুত্রে জানায়।

সম্প্রতি সময়ে তার মৃত্যুর খবর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়লে এলাকার লোকজনসহ সকলের মাঝে বিষয়টি নিয়ে কৌতুহলের সৃষ্টি হয়। ইতোমধ্যেই গতকাল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিষয়টি তার ছোটবোন যিনি লাকি মার্মা নামের আইডি থেকে এলাকাবাসীকে জানান, আমার ভাইয়ের মৃত্যুর খবরটি গুজব। সে মারা যায়নি। সে জীবিত রয়েছেন এবং একটু অসুস্থ রয়েছে, সকলের নিকট দোয়াও চেয়েছেন তিনি।

ফেসবুকের এই খবরের ভিত্তিতে অনুসন্ধানে নামে পার্বত্যনিউজ। স্থানীয় বিভিন্ন ব্যক্তির সাথে আলাপ করে জানা যায়, শুধু তিনি নন, আরকান আর্মিতে সীমান্তবর্তী উপজেলা নাইক্ষ্যংছড়ি, আলীকদম, থানছি, লামাসহ বিভিন্ন উপজেলায় প্রচুর বাংলাদেশী উপজাতীয় সদস্য ট্রেনিং শেষ করে বর্তমানে আরকান আর্মিতে যোগ দিয়ে মিয়ামারের সাথে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে বলে স্থানীয় একাধিক সূত্রে নিশ্চিত হওয়া গেছে। বিশেষ করে সীমান্তের পাড়া গুলু থেকে বাধ্যতামূলক আরকান আর্মিতে যোগ দিতে বাধ্য করেছে আরাকান আর্মির সদস্যরা। অনেকে বাধ্যতামূলক যোগ দেওয়ায় রাজী না থাকায় প্রাণভয়ে এলাকা থেকে পালিয়ে অন্যত্র বসবাসের খবরও পাওয়া গেছে। বিশেষ করে ১৬-২০ বছরের যুবকদের উপর এই বাধ্যতামূলক গোপন নোটিশ জারী করা হয়েছে।

তার ছোট্টবোন লাকী মার্মা জানায়, সে আগে মাঝেমধ্যে বেড়াতে আসতো। এখন একবছর যাবত বাড়ী আসে না। তবে তিনি নাকি বর্তমানে একজন কমান্ডার হয়েছেন, দায়িত্বও বেড়ে গেছে এবং মংডু শহরের কাছাকাছি অবস্থান করছেন বলেও তার বোন পার্বত্যনিউজ প্রতিনিধিকে জানান।

এ প্রেক্ষিতে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় বেশ কয়েকজন ব্যক্তি পার্বত্যনিউজ প্রতিবেদককে জানান, সরকারের উচিত অতি দ্রুত বিষয়টি নিয়ে কাজ করা। না হলে এটি বাংলাদেশের নিরাপত্তার জন্য প্রবল ঝুঁকি সৃষ্টি হবে।

Print Friendly, PDF & Email
ঘটনাপ্রবাহ: আরাকান আর্মি, পার্বত্য চট্টগ্রাম, বান্দরবান
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও পড়ুন