বান্দরবানে নিরাপত্তা বাহিনীর টহলে ইউপিডিএফ-কেএনএন হামলা, পাল্টা জবাব, হতাহত, গোলাবারুদ উদ্ধার

fec-image

বান্দরবানের রুমায় নিরাপত্তা বাহিনীর একটি নিয়মিত টহলের উপর ইউ পিডিএফ ও কেনএফএর সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা অকষ্মাৎ গুলি বর্ষণ করলে দুই নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য সামান্য আহত হয়। এই ঘটনায় নিরাপত্তা বাহিনী পাল্টা জবাব দিতে শুরু করলে ইউপিডিএফ ও কে এল এফ এর সন্ত্রাসীরা টিকতে না পেরে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি স্বীকার করে পালাতে বাধ্য হয়। পরবর্তীকালে নিরাপত্তাবাহিনী ঘটনাস্থলে তল্লাশি চালিয়ে বেশ কিছু অস্ত্র ও গোলাবারুদ এবং সামরিক সরঞ্জাম উদ্ধার করতে সক্ষম হয়। এ ঘটনায় নিরাপত্তা বাহিনী ইউপিডিএফ ও কে এন এফ এর বেশ কিছু বড় সামরিক ক্যাম্প ধ্বংস করতে সক্ষম হয়েছে বলে জানা গেছে।

স্থানীয় বিশ্বস্ত সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে, গতকাল দুপুরে বান্দরবন জেলার রুমা উপজেলা সংলগ্ন রাঙ্গামাটি জেলার বিলাইছড়ি উপজেলার সীমান্তবর্তী রেংতাং এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার অংশ হিসেবে নিরাপত্তা বাহিনীর একটি নিয়মিত টহলের উপর ইউপিডিএফ ও কে এন এফ সন্ত্রাসীদের একটি যৌথবাহিনী অতর্কিত গুলি বর্ষণ করেন। এতে নিরাপত্তা বাহিনীর একজন কর্মকর্তা এবং একজন এনসিও সদস্য সামান্য আহত হয়। আহত সেনা কর্মকর্তার পায়ে এবং এনসিও সদস্যর কাঁধে ছরারা গুলির স্প্লিন্টারের আঘাত লেগেছে। এতে তারা সামান্য আহত হয়েছে। আহত লেফটেন্যান্ট পদমর্যাদার কর্মকর্তার ডান হাতে ছররাগুলির স্প্রিন্টার লাগলে তিনি সামান্য আহত হন। পরবর্তীতে তাকে হেলিকপ্টার ঢুকে উদ্ধার করে প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়ার পর তিনি সম্পূর্ণ আশঙ্কা মুক্ত অবস্থায় রয়েছেন।

অপর আহত ল্যান্স কর্পোরাল পদমর্যাদার এই সদস্যকে পরবর্তীতে স্থানীয় একটি বিজিবি ক্যাম্পে নিয়ে প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়া হয় এবং বর্তমানে তিনি সম্পূর্ণ আশঙ্কা মুক্ত অবস্থায় রয়েছেন।

এদিকে ইউপিডিএফ-কেএনএফ সন্ত্রাসীদের আকস্মিক হামলার জবাব নিরাপত্তা বাহিনী দ্রুত দিতে শুরু করলে উভয় পক্ষের মধ্যে বেশ কিছুক্ষণ থেমে থেমে গোলাগুলি হয়। এক পর্যায়ে সন্ত্রাসীরা টিকতে না পেরে পালিয়ে গেলে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলের আশপাশে তল্লাশি চালিয়ে এখনো পর্যন্ত ঘটনাস্থল থেকে ২টি এসবিবিএল আগ্নেয়াস্ত্র, ১৫৯ রাউন্ড ৭.৬২মি:মি: এর গুলি, ৩টি ওয়াকিটকি সেট, মোবাইল সিম কার্ডসহ এবং বেশকিছু কেএনএফ এর ব্যবহৃত সামরিক ইউনিফর্ম উদ্ধার করা হয়েছে। বর্তমানে এলাকাটি ঘিরে তল্লাশি অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

তল্লাশি চলাকালে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা ইউপিডিএফ ও কেএনএফ সদস্যদের আস্তানা এবং আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে রক্তের চিহ্ন দেখতে পেয়েছেন। এতে ধারণা করা হচ্ছে, সন্ত্রাসীদের পক্ষে ব্যাপক হতাহত হয়েছে। কিন্তু তারা রাতের আধারে হতাহতদের অধিকাংশকেই সরিয়ে ফেলেছে। পুরো এলাকা জুড়ে তল্লাশি অভিযান এখনো চলমান রয়েছে। অভিযান শেষ হলে এ ব্যাপারে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যাবে।

২০২২ সালে বান্দরবানে বম জাতিগোষ্ঠী ভিত্তিক সন্ত্রাসী সংগঠন কুকিচীন ন্যাশনাল ফ্রন্ট (কেএনএফ) আত্মপ্রকাশের পর পার্বত্য চট্টগ্রামে একটি নির্দিষ্ট উপজাতীয় জনগোষ্ঠী কর্তৃক বৈষম্যের শিকার বলে অভিযোগ তোলে। সে সময় তাদের দাবি ছিল শান্তি চুক্তি পরবর্তীকালে সরকারের দেয়া নানা প্রণোদনা সুযোগ সুবিধা ও কোটা মূলত পাহাড়ের একটি জাতিগোষ্ঠী লুফে নিচ্ছে। ফলে প্রান্তিক ট্রাইবাল জনগোষ্ঠী বঞ্চিত হচ্ছে, বৈষম্যের শিকার হচ্ছে। এর প্রতিবাদে তারা বান্দরবান ও রাঙ্গামাটি জেলার ছয়টি প্রান্তিক উপজাতীয় জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত এলাকায় একটি স্বতন্ত্র রাজ্য প্রতিষ্ঠার দাবি তোলে। এ নিয়ে শুরুতে উক্ত এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকারী জনসংহৃতি সমিতির সন্ত্রাসীদের সাথে ব্যাপক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে জেএসএস সন্ত্রাসীদের শীর্ষ পর্যায়ের বেশ কিছু সামরিক কমান্ডার ও সদস্য হতাহত হয়।

পরবর্তীকালে ব্যাংক লুট ও অস্ত্র লুটের ঘটনায় কেএনএফের সাথে সরকারি বাহিনীর কয়েক দফা সংঘর্ষে উভয়পক্ষে বেশ কিছু হতাহতের ঘটনা ঘটলে পূর্বের সমীকরণ পাল্টে যায়। এই সুযোগে খাগড়াছড়ি ভিত্তিক ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট ইউপিডিএফ কেএনএফ এর পক্ষে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারণা চালালে উভয়ের মধ্যে মানসিক যোগাযোগ শুরু হয় এবং একপর্যায়ে তা সামরিক যোগাযোগে পরিণত হয়। ৩৬ জুলাই বিপ্লবের পর বাংলাদেশে একটি আঞ্চলিক শক্তির আধিপত্য হ্রাস পেলে তারা পার্বত্য চট্টগ্রামকে অশান্ত করার পরিকল্পনা গ্রহণ করে। তারই অংশ হিসেবে খাগড়াছড়ি ও রাঙ্গামাটি বারবার অশান্ত হয়ে ওঠে। এ সময় ইউপিডিএফ নতুন করে অস্ত্র ও জনবল তৈরির দিকে মনোযোগী হয়। তারা ভারত ও মিয়ানমার থেকে অস্ত্র সংগ্রহ এবং জনবলের প্রশিক্ষণ নেয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। ভারত থেকে অস্ত্র বাংলাদেশে চোরাচালানের সময় প্রতিদ্বন্দ্বী সংগঠন জেএসএসের বিরোধিতায় বেশ কিছু বড় বড় চালান আটক হলে ইউপিডিএফ অস্ত্র ও প্রশিক্ষণের গন্তব্য মায়ানমারে বিস্তারে মনোযোগী হয়। এই অংশ হিসেবে তারা কেএনএফ এর সাথে সম্পর্ক গড়ে তোলে। যদিও ইউপিডিএফ চাকমা ডমিনেটেড সংগঠন এবং শুরুতে কে এন এফ এর মূল অভিযোগ ছিল চাকমাদের বিরুদ্ধে।

কিন্তু পরবর্তী পরিস্থিতিতে ইউ পিডিএফ কে এন এফ কে ব্যবহার করে বান্দরবানে আসে আরাকান আর্মির সাথে সম্পর্ক গড়ে তোলে। এবং আরাকান আর্মির মাধ্যমে মিয়ানমারে তাদের ক্যাম্পে প্রশিক্ষণ এবং সেখান থেকে অস্ত্র পাচারে মনোযোগী হয়। ফলে ইউপিডিএফ কে এন এফ ও আরাকান আর্মি এক ত্রিমুখী সমঝোতার সৃষ্টি হয়। এদের পেছনে বিভিন্ন আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শক্তির মদদ থাকায় অত্যন্ত দ্রুত এই ত্রিশক্তি পার্বত্য চট্টগ্রামের অখণ্ডতার জন্য চ্যালেঞ্জ হিসেবে মাথাচাড়া দিয়ে উঠছিল। এরকম সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে নিরাপত্তা বাহিনী উপ দ্রুত এলাকায় তাদের টহল জোরদার করে। এ ধরনেরই একটি টহল এর উপর গতকাল অকস্মাৎ হামলার ঘটনা ঘটেছে।

এই প্রেক্ষিতে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে বিশেষজ্ঞ ও নিরাপত্তা সংশ্লিষ্টদের দাবি, শান্তি চুক্তির পর বান্দরবান থেকে বেশিরভাগ ক্যাম্প প্রত্যাহার করায় সেখানে নিরাপত্তা ঘাটতি ব্যাপকভাবে পরিলক্ষিত হয়েছে। সেই প্রেক্ষাপটে পূর্ব থেকে থাকা জেএসএস ও কেএনএফের পাশাপাশি ইউপিডিএফ এর আগমন এবং তাদের সাথে আরাকান আর্মির যোগাযোগ পরিস্থিতি উত্তপ্ত করে তোলে।

অভিযোগ রয়েছে আরাকান আর্মি বাংলাদেশের মধ্যে ঘাঁটি গাড়তে প্রত্যন্ত এলাকায় নিম্নবিত্ত উপজাতীয় নারীদের বিবাহ করে তাদের ঘরে আশ্রয় নিচ্ছে। এছাড়াও সমমনা উপজাতীয় হেডম্যান, কারবারি, চেয়ারম্যান মেম্বারদের ব্যবহার করে নাগরিকত্ব সনদ গ্রহণ করে ন্যাশনাল আইডি কার্ড সংগ্রহের চেষ্টা চালাচ্ছে যাতে বাংলাদেশে অবস্থান নির্বিঘ্ন হয়।

এরই মধ্যে সম্প্রতি মিয়ানমারের চীন স্টেট ভিত্তিক খুমি ন্যাশনাল ফ্রন্ট (কেপিএফ) সন্ত্রাসীদের একটি গ্রুপ বাংলাদেশে প্রবেশ করে বিজিবির কাছে স্থানীয়ভাবে থাকার জন্য চিঠি প্রদান করে। বিজিবি এই চিঠি প্রত্যাখ্যান করে তাদের বাংলাদেশ থেকে বেরিয়ে যেতে বাধ্য করে। ফলে পার্বত্য চট্টগ্রামের স্থানীয় ও বহিরাগত ইনসার্জেন্ট গ্রুপের ব্যাপক উপস্থিতি আগামী দিনে বান্দরবানের অখন্ডতা ও নিরাপত্তায় ব্যাপক চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করতে পারে বলে অভিজ্ঞ মহলের অভিমত। সে কারণে তারা বান্দরবানের রুমা, থানচি, রোয়াংছড়ি, ট্রাইজংশন এলাকায় ব্যাপকভাবে সেনা ও বিজিবি ক্যাম্প বৃদ্ধি করার দাবী জানিয়েছে।

Print Friendly, PDF & Email
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও পড়ুন