বান্দরবানে হাজারো কৃষকের স্বপ্ন ভাসিয়ে নিল পাহাড়ি ঢল

fec-image

কয়েক দিন আগেও পাহাড়ের বুকজুড়ে ছিল সবুজের সমারোহ। লাউ, শসা, মরিচ, বেগুন, বরবটি আর টমেটোতে ভরা ক্ষেতগুলো যেন কৃষকের স্বপ্নের প্রতিচ্ছবি। কিন্তু টানা বর্ষণ আর পাহাড়ি ঢলের বন্যায় সেই স্বপ্ন এখন কাদামাটির নিচে চাপা পড়ে গেছে। বান্দরবানের বিস্তীর্ণ সবজি ক্ষেত আজ যেন নীরব এক শোকগাথা। যেদিকে চোখ যায়, শুধু খা খা মাঠ আর বন্যার রেখে যাওয়া ধ্বংসস্তূপ।

রেইছা সদর ইউনিয়নের ৩নং ওয়ার্ডের রত্নপুর এলাকার বাসিন্দা কনক তংচঙ্গ্যা। ব্যাংক থেকে লোন নিয়ে শুরু করেছিলেন নানা রকমের সবজির চাষ। স্বপ্ন ছিল এসবের মাধ্যমে পরিবার নিয়ে সুখে শান্তিতে সংসার চলবে। তা আর হল নাহ। বন্যার পানি ভেসে নিয়ে গেছে তার শ্রম, স্বপ্ন আর বিনিয়োগ। তিলে তিলে গড়ে তোলার শত একরে সবজির বাগান এখন ধ্বসের চিত্র। বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর দুঃখ ভরা ক্লান্ত নিয়ে বাগান ঘুরে দেখে হতাশ হয়ে পড়েছেন কনক তংচঙ্গ্যা।

বুক ভরা কষ্ট নিয়ে প্রবীন উদ্যেক্তা কনক তংচঙ্গ্যা বলেন, ব্যাংক থেকে লোন নিয়ে কলা বাগান, বেগুন, ধন্যপাতা, শিম ও মাছের ঘেরসহ চাষ করেছিলাম। কিন্তু বন্যায় পানি সবকিছু ধ্বস করে দিয়ে গেছে। অবশিষ্ট বলতে কিছুই আর রইল নাহ। পুকুরে সব মাছ ভেসে গেছে, ধন্যপাতা,কলা বাগান,বেগুনসহ কিছু নষ্ট হয়ে গেছে। এখন কি খাবো’ ব্যাংক লোন কিভাবে পরিশোধ করব পরিবার নিয়ে কিভাবে কাটব সেটা ভেবে পাচ্ছি নাহ।

টানা আটদিন এই বন্যার প্রবল স্রোত শুধু ফসলই ভাসিয়ে নেয়নি, কেড়ে নিয়েছে কৃষকের কয়েক মাসের শ্রম, সময় আর বিনিয়োগ। অনেক জমিতে এখনো জমে আছে কাদা ও বালুর স্তূপ। কোথাও গাছের ডালপালা, কোথাও ভেসে আসা আবর্জনা। একসময় যে জমিতে প্রতিদিন কৃষকের ব্যস্ত পদচারণা ছিল, সেখানে এখন নেমে এসেছে নিস্তব্ধতা।

বান্দরবানে গোয়ালিয়াখোলা, দুংখি পাড়া, রত্নপুর, তারাছা, ভরাখালী, লেমুঝিড়িসহ এসব এলাকাকে বলা হত সবজির কারখানা। কিন্তু এখন বিস্তীর্ণ মাঠ জুড়ে শুধু ধ্বস স্তুপে চিত্র। পঁচে গেছে বেগুন, নষ্ট হয়ে গেছে ধন্যপাতা, তলিয়ে গেছে কলা গাছ,শসা, কাকরোল আর ভেসে গেছে পুকুরে কয়েক হাজারে মাছের ঘের। এই বন্যার স্রোত ভেসে নিয়ে গেছে হাজারো কৃষকের স্বপ্ন আর রেখে গেছে শুধু ক্ষয়ক্ষতি চিত্র।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর তথ্য মতে, টানা ভারী বর্ষণের এবার বন্যায় বান্দরবানে ২ হাজার ১৫০ হেক্টর জমি ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। তারমধ্যে ৩৮৫ হেক্টর জমি পুরোপুরি নষ্ট হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার কৃষক। যা ক্ষয়ক্ষতি পরিমান দাঁড়িয়েছে প্রায় ১০০ কোটি টাকা উর্ধ্বে।
জেলার সদর, লামা, আলীকদম, নাইক্ষ্যংছড়ি,রুমাসহ সাত উপজেলার শত শত একর জমির সবজি পানির নিচে তলিয়ে গেছে। বন্যার স্রোতে অনেক ক্ষেতের ফসল ভেসে গেছে, আবার কোথাও দীর্ঘসময় পানি জমে থাকায় নষ্ট হয়ে গেছে পরিপক্ব সবজি। ফলে এক মৌসুমের বিনিয়োগ হারিয়ে দিশেহারা কৃষকরা।

ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা জানিয়েছে , এ বছরের মতো এমন ক্ষতির মুখোমুখি তাঁরা অনেক দিন হননি। বীজ, সার, সেচ ও শ্রমিকের পেছনে ধারদেনা করে যে অর্থ ব্যয় করেছিলেন, তার কিছুই আর ঘরে তোলার সুযোগ হয়নি। অনেকের চোখে এখন নতুন করে চাষ শুরু করার অনিশ্চয়তা, ঋণ শোধের দুশ্চিন্তা আর পরিবারের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা।

তারাছা তালুকদার পাড়া বাসিন্দা চাষী মংশৈনু মারমা বলেন, এবারে বন্যা শসা, বরবটি আর কাকরোল সব নষ্ট হয়ে গেছে। লোন নিয়ে চাষ করেছিলাম সব ধ্বস হয়ে গেছে। কি করব বুঝতে পারছি না। ব্যাংকের লোন রয়েছে আর সরকার থেকেও সহযোগিতা পাবো কিনা জানি না।

ভরাখালী চাষী করিম বলেন, এবছর ব্যাংক থেকে লোন নিয়ে ঢেরশ, বেগুন চাষ শুরু করেছি মাত্র। কিন্তু সবশেষ হয়ে গেছে। সবকিছু পানিতে তলিয়ে ভেসে গেছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ- পরিচালক আবু নাঈম মোহাম্মদ সাইফুদ্দিন বলেন, আমন বিজতলা, আউশ, গ্রীষকালীন সবজি, ফলবাগান যাবতীয় বন্যার পানিতে নিমোজ্জিত হয়েছে। মাঠ পর্যায়ের ক্ষতিগ্রস্ত কৃষদের তালিকা চলমান রয়েছে। এই বন্যায় প্রায় কয়েক হাজার কোটি টাকা ক্ষতি হয়েছে। এখনো তালিকা চলমান রয়েছে। সবকিছু শেষে ক্ষতিগ্রস্থ কৃষকদের তালিকা করে প্রনোদনা দেয়ার আশ্বাস দেন কৃষি বিভাগ।

Print Friendly, PDF & Email
ঘটনাপ্রবাহ: বান্দরবান
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও পড়ুন