এক চির আপোষহীন সংগ্রামী নেত্রীর বিদায় 

fec-image

সাঈদ সাহেবের মুখ দেখে খালেদা জিয়া তার কাছে জানতে চান কী হয়েছে? সাঈদ সাহেব তাকে বলেন, পাকিস্তানি অফিসাররা তাদের হাতিয়ার জমা দেয়ার নির্দেশ দিয়েছে। কিন্তু সৈনিক ও জেসি করা শঙ্কিত। তাদের ধারণা হাতিয়ার জমা দিলে পাকিস্তানিরা তাদের সাথে খারাপ কিছু করতে পারে। এই পরিস্থিতিতে তাদের করণীয় সম্পর্কে জানতে তিনি সৈনিক ও দেশীয়দের পক্ষ থেকে জিয়াউর রহমানের কাছে নির্দেশ নিতে এসেছিলেন। খালেদা জিয়া সাঈদ সাহেবকে বলেন, জিয়াউর রহমানের নির্দেশ ছাড়া আপনারা কোনভাবেই অস্ত্র জমা দেবেন না। তার এই কথায় সাঈদ সাহেবের মুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে, তিনি বুকে সাহস পান এবং সালাম দিয়ে চলে আসেন। বেগম খালেদা জিয়ার এই নির্দেশ পাওয়ার কারণে সেদিন বাঙালি জেসিও ও সৈনিকরা হাতিয়ার জমা দেয়নি।

বেগম খালেদা- জিয়া একটি কালের অধ্যায় শেষ করে চলে গেলেন মহাকালের পথে। প্রত্যেক মানুষকেই মৃত্যুর আস্বাদ পেতে হবে। নশ্বর পৃথিবীতে যিনি জন্মগ্রহণ করেছেন তাকে অবশ্যই একদিন ছেড়ে যেতে হবে- মহাকালের এই নিয়ম মেনে বাংলাদেশের তিন যুগের এক মহীয়সী নারী চির বিদায় নিলেন। দীর্ঘ ফ্যাসিবাদী দুঃশাসনের রক্তস্নাত পথ মাড়িয়ে দেশের মানুষ যখন গণতান্ত্রিক উত্তরণের চূড়ান্ত পর্বে উন্নীত হয়েছে, সেই পর্বে তিনি আমাদের ছেড়ে গেলেন। অথচ শত অন্যায় অত্যাচার জুলুম নিপীড়ন সহ্য করে দেশে থেকে যিনি এই গণতান্ত্রিক লড়াই চালিয়ে গেলেন তিনি শেষ বিজয়টা দেখে যেতে পারবেন না। দেশের মানুষ ও তার দলের নেতাকর্মী সমর্থকদের এই আফসোস এখন পোড়াচ্ছে।

১৯৪৫ সালে সারা পৃথিবী যখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতায় এক অনিশ্চিত সময় পার করছিল, ঠিক তখনই ৫ আগস্ট হিরোশিমায় ও ৯ আগস্ট নাগাসাকিতে মানব ইতিহাসে প্রথমবারের মতো পারমাণবিক বোমার বিস্ফোরণ ঘটিয়ে জাপানকে মাথানত করতে বাধ্য করে যুক্তরাষ্ট্র। এই নারকীয় ঘটনার মধ্য দিয়েই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটে। এর এক সপ্তাহকাল পরেই ১৫ ই আগস্ট ভারতবর্ষের অবিভক্ত বাংলার জলপাইগুড়ির ছোট্ট শহরে জন্ম নেয় এক ফুটফুটে শিশু। তার অপরূপ সৌন্দর্যের কারণে সবাই তাকে পুতুল নামে ডাকতে শুরু করে এবং একসময় সেটাই তার ডাকনাম হয়ে যায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ডামাডোলের পরে এই পুতুলের জন্ম ঘটনায় পরিবার ও আত্মীয়-স্বজন বলতে শুরু করে, মেয়েটি শান্তি নিয়ে জন্মগ্রহণ করেছে। তার জন্মে পৃথিবীতে শান্তি নেমে এসেছে। সেদিন পরিবারের সদস্যরা কিংবা আত্মীয়-স্বজন কেউই ধারণা করতে পারেনি এই পুতুল একদিন একটি জাতির ত্রাণকর্তা রূপে আবির্ভূত হবেন।

১৯৪৭ সালে ভারত বর্ষ ভাগের পর পিতা ইসকান্দার মজুমদারের হাত ধরে পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সাথে পুতুলও চলে আসেন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের দিনাজপুরে। এখানেই স্থায়ী বসবাস শুরু করে পরিবারটি। জন্মসূত্রে বেগম খালেদা জিয়া মীর জুমলার বংশধর। মীর জুমলা মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের প্রতিনিধি হিসেবে সুবাহ বাংলার সুবেদার ছিলেন। দেশপ্রেম তার শোণিতে চির বহমান। এরা মূলত আরব থেকে এখানে এসেছিলেন।

পাকিস্তান সেনাবাহিনীর তৎকালীন ক্যাপ্টেন জিয়াউর রহমান তার এক ঘনিষ্ঠ আত্মীয় এর কাছে দিনাজপুর গার্লস স্কুলে পাঠরত খালেদা জিয়ার কথা শোনেন। পারিবারিক সূত্রে খালেদা জিয়া এবং জিয়াউর রহমান দূর সম্পর্কের খালাতো বোন ছিলেন। জিয়াউর রহমান তার মকবুল নানার কাছে প্রথম খালেদা জিয়ার সৌন্দর্যের কথা শোনেন। দিনাজপুরে পোস্টিং থাকায় স্বাভাবিক কারণে ওই বাড়িতে তার যাতায়াত ছিল। খালেদা জিয়া মেট্রিক পাশ করার পর ক্যাপ্টেন জিয়াউর রহমান সরাসরি তার মায়ের কাছে বিয়ের প্রস্তাব পেশ করেন, খালা আমি আপনার জামাই হতে চাই। ( আপোষহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া ও বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা: ইনাম আহমেদ চৌধুরী, পৃষ্ঠা- ১৬)। পরবর্তীকালে উক্ত মকবুল হোসেন (জিয়াউর রহমানের নানা) আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব নিয়ে যান এবং ১৯৬০ সালে অনাড়ম্বর অনুষ্ঠানের মধ্যে দু’জনের আকদ অনুষ্ঠিত হয়। এক বছর পরে ঢাকার হোটেল শাহবাগে বিবাহ উত্তর সংবর্ধনা অনুষ্ঠিত হয়।

১৯৬৫ সালে জিয়াউর রহমানের পাকিস্তানে পোস্টিং হয়ে গেলে তিনিও স্বামীর সাথে পাকিস্তান চলে যান। সেখানে ক্যাপ্টেন জিয়াউর রহমান পাক-ভারত যুদ্ধে খেমকারান সেক্টরে বীরত্ব প্রদর্শন করে পাকিস্তান সরকারের বীরত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় খেতাব এবং দেশব্যাপী ভুয়সী প্রশংসা অর্জন করেন। ১৯৬৯ সালে মেজর জিয়াকে আবার পূর্ব পাকিস্তানের জয়দেবপুরে সেকেন্ড ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের সেকেন্ড ইন কমান্ড হিসেবে বদলি করা হয়। সেখান থেকে চার মাসের প্রশিক্ষণের জন্য জার্মানি যান এবং জার্মানি থেকে ফিরে এসে চট্টগ্রামে অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের টুআইসি হিসেবে জয়েন করেন। তখন তার দুই ছেলে পিনোর বয়স চার এবং কোকোর বয়স দুই বছর। ২৫ শে মার্চ ১৯৭১ পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ঢাকায় নিরীহ জনগণের উপর হামলা করে। একই রাতে জিয়াউর রহমানকে চট্টগ্রাম বন্দরে পাকিস্তান থেকে আসা জাহাজের মালামাল খালাস করার জন্য পাঠানো হয়।

প্রায় ২২-২৩ বছর আগের কথা। শারমিন নামে একটা মেয়ে দৈনিক ইনকিলাবের ফিচার বিভাগে মহিলা পাতায় লিখতো। ও আমার ডিপার্টমেন্টের বেশ কয়েক বছরের জুনিয়র। ডিপার্টমেন্টের বড় ভাই সূত্রে আমার কাছে এসেছিল লেখালেখির জন্য। আমি তাকে মহিলা বিভাগের প্রধান ফাহমিদা আহমদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিই। ও সেখানেই লিখতো। শারমিনের বিয়ের অনুষ্ঠানে মহিলা বিভাগের সবাইকে এবং আমাকে দাওয়াত দেয়। ওর বাসা সাইনবোর্ডের দিকে ছিল। সেখানে পরিচয় হয় শারমিনের শ্বশুর অবসরপ্রাপ্ত সুবেদার সাঈদ সাহেবের সাথে। সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে সাঈদ সাহেব আমাকে জানান, ২৫ শে মার্চের ওই রাতে তিনি জিয়াউর রহমানের কমান্ডে অষ্টম ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের দায়িত্বরত ছিলেন। আমি আগ্রহী হয়ে সেই রাতের খবর জানতে একটি সাক্ষাৎকার নেওয়ার প্রস্তাব করলে তিনি তাতে রাজি হন।

পরবর্তীতে একদিন আমার আমন্ত্রণে সাঈদ সাহেবকে ইনকিলাবে আসেন সাক্ষাৎকার দিতে। ওই রাতের স্মৃতিচারণ করে তিনি জানান, অষ্টম বেঙ্গল রেজিমেন্টের সিইও লেফটেন্যান্ট কর্নেল জানজুয়া বাঙালি সৈনিকদের হাতিয়ার জমা দেয়ার নির্দেশ দেন। এই নির্দেশ পেয়ে তারা সবাই হতচকিত হয়ে পড়েন। ইতোমধ্যেই ক্যান্টনমেন্ট ও ঢাকার পরিস্থিতি সম্পর্কে বিভিন্নভাবে তারা অবগত ছিলেন। ফলে তারা শঙ্কিত হয়ে পড়েন। এ সময় তাদের করণীয় কী সেটা জানতে সকল সৈনিক ও জেসিও দের পক্ষ থেকে সাঈদ সাহেব বাঙালি অফিসারদের মধ্যে সিনিয়র মেজর জিয়ার বাসভবনে যান। তিনি তখনও জানতেন না জিয়াউর রহমানের অবস্থান। বাসায় কলিংবেল চাপলে বেগম জিয়া দরজা খোলেন। সালাম দিয়ে সাঈদ সাহেব জিয়াউর রহমানের অবস্থান জানতে চান। বেগম জিয়া তাকে জানান, জিয়াউর রহমান বন্দরে গিয়েছেন জাহাজ থেকে মালামাল খালাস করতে। তার মুখে এ কথা শুনে সাঈদ সাহেব কিছুটা হতাশ ও মনমরা হয়ে পড়েন। সাঈদ সাহেবের মুখ দেখে খালেদা জিয়া তার কাছে জানতে চান কী হয়েছে? সাঈদ সাহেব তাকে বলেন, পাকিস্তানি অফিসাররা তাদের হাতিয়ার জমা দেয়ার নির্দেশ দিয়েছে। কিন্তু সৈনিক ও জেসিওরা শঙ্কিত। তাদের ধারণা হাতিয়ার জমা দিলে পাকিস্তানিরা তাদের সাথে খারাপ কিছু করতে পারে। এই পরিস্থিতিতে তাদের করণীয় সম্পর্কে জানতে তিনি সৈনিক ও দেশীয়দের পক্ষ থেকে জিয়াউর রহমানের কাছে নির্দেশ নিতে এসেছিলেন। খালেদা জিয়া সাঈদ সাহেবকে বলেন, জিয়াউর রহমানের নির্দেশ ছাড়া আপনারা কোনভাবেই অস্ত্র জমা দেবেন না। তার এই কথায় সাঈদ সাহেবের মুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে, তিনি বুকে সাহস পান এবং সালাম দিয়ে চলে আসেন। বেগম খালেদা জিয়ার এই নির্দেশ পাওয়ার কারণে সেদিন বাঙালি জেসিও ও সৈনিকরা হাতিয়ার জমা দেয়নি।

এই সাক্ষাৎকারটি দীর্ঘ হওয়ায় আমার তৎকালীন সিনিয়র এটি প্রচার করতে সম্মত না হওয়ায় আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের এক মহামূল্যবান ঘটনা আড়ালে রয়ে যায়। মাইক্রো ক্যাসেটে ধারণ করা সেই সাক্ষাৎকার এবং এর ট্রান্সক্রিপ্ট আমি সংরক্ষণ করেছিলাম। কিন্তু অফিসের ডেস্ক পরিবর্তন হওয়ার সময় লেবাররা অনেক জিনিসপত্র হারিয়ে ফেলে তার মধ্যে এটাও ছিল। বেশ কিছুদিন পর আবার আমি শারমিনের সাথে যোগাযোগ করি সাক্ষাৎকারটি পুনরায় নেয়ার জন্য। কিন্তু সাঈদ সাহেব ততদিনে আর বেঁচে নেই।

বেগম খালেদা জিয়ার সেদিনের সেই ছোট্ট কিন্তু অত্যন্ত সাহসী একটি সিদ্ধান্ত আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের মোড় পরিবর্তনে বিরাট ভূমিকা রাখে। কেননা বন্দরে যাওয়ার পথেই ক্যাপ্টেন খালিকুজ্জামান এর কাছ থেকে তথ্য পেয়ে জিয়াউর রহমান ক্যান্টনমেন্টে ফিরে আসেন এবং তার কমান্ডিং অফিসারকে বন্দী করে অন্যান্য বাঙালি অফিসার ও সৈনিকদের একসাথে করে স্থানীয়ভাবে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে মুক্তিযুদ্ধ শুরু করেন। কিন্তু বাঙালি সৈনিকরা যদি আগেই হাতিয়ার জমা দিয়ে দিত তাহলে ক্যান্টনমেন্টে ফিরে এসে বিদ্রোহ ঘোষণা করতে জিয়াউর রহমানকে হয়তো বেগ পেতে হতো। সেদিনে খালেদা জিয়ার ছোট্ট কিন্তু সাহসী ও বলিষ্ঠ একটি সিদ্ধান্ত আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সূচনা পর্বে বিরাট ভূমিকা রেখেছিল।

২৫শে মার্চ রাত্রে দুই শিশুসন্তান ও স্ত্রী খালেদা জিয়াকে অনিশ্চিত অবস্থায় রেখে জিয়াউর রহমান ক্যান্টনমেন্ট ত্যাগ করেন। ছোট্ট দুই শিশু সন্তান নিয়ে খালেদা জিয়ার শুরু হয় আরেক যুদ্ধ। ক্যান্টনমেন্ট থেকে তিনি দুই শিশু সন্তানকে নিয়ে গোপনে ছোট চাচার বাসায় যান এবং সেখানে কিছুদিন থাকার পর চুপিসারে ঢাকায় এসে বড় বোন খুরশিদ জাহান হকের বাসায় ওঠেন। কিন্তু পাক বাহিনী তাদের খবর জেনে যাওয়ায় এই ঠিকানাও ছাড়তে হয়। অবশেষে বেশ কয়েকটি ঠিকানা পরিবর্তনের পর ১৯৭১ সালের ২রা জুলাই খালেদা জিয়া দুই সন্তান সহ আটক হন। সেখান থেকে তাদের নিয়ে আটক রাখা হয় আর্মি অফিসার্স মেসে। এখান থেকে খালেদা জিয়া মুক্তি পান ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর- বিজয়ের দিন।

কালের পরিক্রমায় নানা পথ বেয়ে জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রের শীর্ষ পদে অধিষ্ঠিত হন। কিন্তু খালেদা জিয়া রয়ে যান একজন সাধারণ গৃহবধূ ও মমতাময়ী মা হিসেবে। ১৯৮১ সালের ৩০ মে রাত দশটায় জিয়াউর রহমান খালেদা জিয়াকে শেষ ফোন কল করেছিলেন। জানিয়েছিলেন তিনি ভালো আছেন এবং আগামীকাল ফিরবেন। এটাই তাদের শেষ কথাবার্তা। পরদিন সকালে রেডিওতে জিয়াউর রহমানকে হত্যার ঘোষণা শুনে খালেদা জিয়া মেঝেতে লুটিয়ে পড়েন। জিয়াউর রহমান সমাহিত হয় ক্রিসেন্ট লেকের পাশে। প্রিয়তম পত্নী হিসেবে বেগম খালেদা জিয়া তার স্মৃতি রোমন্থন করতেন আর যখনই ইচ্ছে হতো তার মাজারে গিয়ে ফাতেহা পাঠ করতেন, দোয়া করতেন। সুস্থ থাকা পর্যন্ত এই নিয়মের কখনো ব্যত্যয় ঘটেনি। জিয়াউর রহমানের হত্যার পেছনে ষড়যন্ত্রকারী হিসেবে সেনাপ্রধান হুসেইন মোহাম্মদ এরশাদ রাষ্ট্রক্ষমতা নিয়ে জিয়াউর রহমানের গড়া দল বিএনপিকে ভেঙে টুকরো টুকরো করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। দলের সিনিয়র জুনিয়র ও সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের অনুরোধে একজন অতি সাধারণ গৃহবধূ, মমতাময়ী মা কে রাজনীতির বন্ধুর পথে নেমে আসতে হয়। দলের ৩ হাজার নেতাকর্মীকে আটক করে সামরিক সংক্ষিপ্ত আদালতে বিচার করে বিভিন্ন মেয়াদের শাস্তি প্রদান করা হয়।

১৯৮২ সালের ৩ জানুয়ারি খালেদা জিয়া বিএনপির প্রাথমিক সদস্য পদ গ্রহণ করেন। ৮ জানুয়ারি সংবাদপত্রে এক দীর্ঘ বিবৃতিতে দেশবাসীকে তার রাজনীতিতে পদার্পণের সিদ্ধান্তের কথা জানান। এর মধ্যেই ২৪ মার্চ জেনারেল এরশাদ রাতের অন্ধকারে বঙ্গভবনে ঢুকে বন্দুকের নলের মুখে বিচারপতি সাত্তারের কাছ থেকে রাষ্ট্র ক্ষমতা কেড়ে নেন। দলের পরবর্তী কাউন্সিলে জুনিয়র নেতাকর্মী ও সমর্থকদের প্রবল চাপের মুখে চেয়ারম্যান পদের জন্য মনোনয়নপত্র জমা দিলেও পরবর্তীকালে দলের ঐক্যের স্বার্থে এই মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করে নিয়ে সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। কিন্তু অসুস্থতাজনিত কারণে চেয়ারম্যান বিচারপতি সাত্তার নিষ্ক্রিয় হয়ে গেলে খালেদা জিয়া নিজ কাছে দায়িত্ব তুলে নিয়ে দেশব্যাপী গণসংযোগ ও আন্দোলন গড়ে তোলেন এরশাদের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে। ১৯৮৪ সালের ১০ মে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বেগম খালেদা জিয়া বিএনপি’র চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। দলের দায়িত্ব নিয়ে আরো দৃঢ় পদক্ষেপে বেগম খালেদা জিয়া স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোলেন। এদিকে এরশাদের চক্রান্ত আরও জোরালো হতে শুরু করে। নানা ষড়যন্ত্রের বাঁকে পড়ে সিনিয়র নেতারা একে একে দল ছাড়তে শুরু করলেও তিনি আপসহীন হয়ে রইলেন। ১৯৮৬ নির্বাচনে বিএনপি বাদে অন্যান্য সকল রাজনৈতিক দল নির্বাচনে অংশ নিয়ে সংসদে গেলে কিছু সময়ের জন্য খালেদা জিয়া কোণঠাসা হয়ে পড়েন। কিন্তু আপোষহীন নেতৃত্বের কারণে দ্রুতই নিজেকে গুছিয়ে ওঠেন এবং এরশাদের বিরুদ্ধে প্রবল আন্দোলন চালিয়ে যান। এর পরিণতিতে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর স্বৈরশাসক এরশাদ রাষ্ট্র ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন।

আট বছর নিরবচ্ছিন্ন আন্দোলনের পর বিচারপতি সাহাবুদ্দিনের অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে ৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করেন। জীবনের প্রথম নির্বাচনে তিনি একসাথে পাঁচটি সংসদীয় আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। দেশব্যাপী ব্যাপক নির্বাচনী গণসংযোগ শেষে ২৬ ফেব্রুয়ারি বিকেলে প্রেসক্লাবে আসেন বেগম খালেদা জিয়া। ইতোমধ্যেই আরেক নেত্রী শেখ হাসিনা দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় জয়লাভের ঘোষণা দিয়েছে। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম একই সুরে কথা বলছে। এই প্রেক্ষিতে সাংবাদিকরা তাকে নির্বাচনী ফলাফলের ব্যাপারে প্রশ্ন করলে তিনি তার সহজাত সংক্ষিপ্ত উত্তর দেন, অপেক্ষা করেন সারপ্রাইজের। ২৭ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পর সেই সারপ্রাইজ দেখা গেল বিএনপি ৩০০ সংসদীয় আসনের মধ্যে ১৪৪টি সংসদীয় আসনে জয়লাভ করে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেল। এটা মূলত টানা আট বছর খালেদা জিয়ার দৃঢ় ও আপোষহীন সংগ্রামের ফসল যা জনগণ তার উপর আস্থা রেখে প্রদান করেছিল। তিনি নিজেও পাঁচটি সংসদীয় আসনের সবগুলোতেই জয়লাভ করলেন। পরবর্তী সকল নির্বাচনে তিনি যে সকল আসনে জয়লাভ করেছেন সকল আসনেই তিনি বিজয়ী হয়েছেন। রাজনৈতিক জীবনে কখনোই কোন নির্বাচনে তিনি পরাজিত হননি। আজও তিনি যখন ইহকালের যাত্রা শেষ করে অনন্তকালের পথে চলে গেলেন, একজন বিজয়ীর বেশেই গেলেন।

১/১১ দেশি-বিদেশী ষড়যন্ত্রের মুখে যখন তাকে আটক করা হয়, তার প্রতিদ্বন্দ্বী নেত্রী সেনা সমর্থিত সরকারের সাথে আপোষ করে দেশ ত্যাগ করলেও খালেদা জিয়া জানালেন, তিনি কোথাও যাবেন না। বাংলাদেশের বাইরে তার কোন ঠিকানা নেই। তিনি মরলে এদেশের মাটিতেই মরবেন। তার বড় ছেলে তারেক রহমানের উপরে অবর্ণনীয় নির্যাতন করে মরণাপন্ন অবস্থায় দেশ তাকে বাধ্য করা হয়। তবুও তিনি আপোষ করেননি। তিনি শুধু নিজের জন্য সামরিক সমর্থিত সরকারের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেননি বরং শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যাপারেও তিনি ভূমিকা রাখেন। তার এই না যাওয়া এবং দেশে থেকে যাওয়ার কারণেই শেখ হাসিনার দেশে ফিরে আসার পথ সুগম হয়।

১/১১ সরকার ব্যর্থ হলে তাদের নিরাপদ প্রস্থানের অংশ হিসেবে বেগম খালেদা জিয়ার কাছে সেফ এক্সিট এর প্রস্তাব নিয়ে যান। বিনিময়ে তাকে পুনরায় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করার প্রস্তাব দেয়া হয়। কিন্তু আজন্ম আপোষহীন বেগম খালেদা জিয়া সাংবিধানিক ও অবৈধ সরকারের সেই প্রস্তাব ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেন। বিনিময়ে সাড়ে ১৫ বছরের তাঁর ও তাঁর পরিবারের এবং দলীয় নেতাকর্মীদের ওপর অবর্ণনীয় নির্যাতন, জুলুমের শিকার হয়েও খালেদা জিয়া কখনোই আপোষ করেননি। এই সময়ে তিনি তার প্রাণপ্রিয় ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোকে হারান, মা তৈয়বা মজুমদারকে হারান, স্বামীর স্মৃতি বিজড়িত বাড়িটিও হারাতে হয়। ভিত্তিহীন অভিযোগের ভিত্তিতে গড়ে তোলা মিথ্যা মামলায় নির্দেশিত শাস্তি দিয়ে তাকে কারা অন্তরালে পাঠানো হয়। সেখানে তাকে মেরে ফেলার চক্রান্ত হিসেবে স্লো পয়জনিং করা হয়। তাতে চরমভাবে অসুস্থ হয়ে জীবন সংকটাপন্ন হলেও খালেদা জিয়া আপোষ করেননি। জীবন রক্ষা করতে ডাক্তারগণ তাকে বিদেশে নিয়ে উন্নত চিকিৎসার জন্য বারবার অনুরোধ করলেও প্রবল প্রতিহিংসাপরায়ণ হাসিনা বিদেশে উন্নত চিকিৎসার জন্য স্থায়ীভাবে রাজনীতি ছেড়ে বিদেশে নিরাপদ জীবন যাপনের শর্ত ঠুকে দেয়। অনেকের অনুরোধ সত্বেও খালেদা জিয়া এই অবমাননা করা শর্ত কখনোই মেনে নেননি। তিনি শর্ত দিয়ে বিদেশে চিকিৎসার জন্য যাওয়ার প্রস্তাব ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেন। তার মৃত্যু ফ্যাসিস্ট হাসিনার এতই কাম্য ছিল যে এক পর্যায়ে তিনি প্রকাশ্যেই বলে ফেলেন, ‘এত মর মর করছে, মরে না কেন?’ তাকে কারা অন্তরালে বা গৃহবন্দী অবস্থায় মৃত্যুর জন্য কোন চেষ্টা করতেই বাদ রাখেননি শেখ হাসিনা।

জীবন চরম সংকটাপন্ন অবস্থায় রেখেও, ছেলের লাশ বুকে নিয়ে, আরেক অসুস্থ ছেলের কষ্ট চেপে রেখে খালেদা জিয়া তার দলীয় নেতাকর্মীদের নিয়ে একটি রাষ্ট্রবিরোধী ও সেবা দাস সরকারের পতনের লড়াই চালিয়ে যান দীর্ঘ সাড়ে ১৫ বছর। ৩৬ জুলাই ২০২৪ ছাত্র-জনতার যে অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে পালিয়ে যায় সেই অভ্যুত্থানে সবচেয়ে বড় অংশগ্রহণকারী দল ছিল বিএনপি। তার চেয়েও বড় কথা তার নেতৃত্বে এই বিএনপি সাড়ে ১৫ বছরে বিরামহীন লড়াইয়ে স্বাধীনতার চেতনা ও গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষাকে বাঁচিয়ে রেখেছে যা মূলত ৩৬ জুলাইতে পরিণতি লাভ করেছে।

শেখ হাসিনার পতনের পর উন্নত চিকিৎসার জন্য স্বল্প সময়ের জন্য বিদেশে গেলেও স্বাস্থ্যের কিছুটা উন্নতি হওয়ার সাথে সাথে তিনি পুনরায় দেশে ফিরে আসেন। চাইলে সেখানে থেকে উন্নত চিকিৎসা ও পরিবেশের মধ্যে তিনি আরো ভালো থাকতে পারতেন কিছুটা দিন। কিন্তু দেশ ছেড়ে, দেশের মানুষ ছেড়ে তিনি থাকতে চাননি। তার নিজের ভাষায়, এই দেশ ও এই দেশের মাটি আমার শেষ ঠিকানা। ১৯৮২ সালের ৩ রা জানুয়ারি থেকে শুরু করে ২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর পর্যন্ত দীর্ঘ ৪৩ বছরের রাজনৈতিক জীবনের পরিসমাপ্ত লড়াইয়ের অধিকাংশ সময় তার কেটেছে আপোষহীন লড়াই ও সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। তিনি মাথা নত না করে বারবার সেই লড়াইয়ে বিজয়ী হয়েছেন। যখন রাষ্ট্রক্ষমতায় গিয়েছেন, স্বামীর পদাঙ্ক অনুসরণ করে বাংলাদেশকে সমৃদ্ধশালী ও বিশ্বের বুকে মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করতে নিরন্তর কাজ করেছেন। তিনি আজ এমন সময়ে চলে গেলেন, যখন আরো কিছুটা দিন তার প্রয়োজন এদেশের মানুষের কাছে সবচেয়ে বেশি ছিল। বেগম খালেদা জিয়া চলে গেলেন। কিন্তু বাংলাদেশের জাতীয় ইতিহাস ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশের স্বর্ণালী অধ্যায়ে তাঁর নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।

লেখক: সম্পাদক, পার্বত্যনিউজ, চেয়ারম্যান, সিএইচটি রিসার্চ ফাউন্ডেশন

 

 

 

 

Print Friendly, PDF & Email
ঘটনাপ্রবাহ: খালেদা জিয়া, তারেক রহমান, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও পড়ুন