সোশ্যাল মিডিয়ায় ছবি ছড়িয়ে দিয়ে হেয়-প্রতিপন্ন

মধ্যযুগীয় নির্যাতনের শিকার পাহাড়ি মেয়েরা

fec-image

পার্বত্য চট্টগ্রামের তিনটি জেলা- খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি এবং বান্দরবান, যেখানে বাঙালিদের পাশাপাশি বিভিন্ন উপজাতি সম্প্রদায়ের লোকেরা বাস করে। সেখানে একটি উল্লেখযোগ্য সামাজিক প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়- পাহাড়ি নারীদের মধ্যে বাঙালি পুরুষদের প্রতি আকর্ষণ এবং তাদের সাথে সম্পর্ক গড়ে তোলার প্রচেষ্টা।

এই প্রবণতা গত তিন যুগেরও বেশি সময় ধরে চলছে, যার ফলে এক হাজারেরও অধিক পাহাড়ি নারী বাঙালি পুরুষদের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়ে সুখের সংসার গড়েছেন এবং উন্নত জীবনের সন্ধানে নতুন পথ বেছে নিয়েছেন। পাহাড়ি সমাজে বিশৃঙ্খলা, সন্ত্রাসবাদ, খুন-খারাবি, মাদক সেবন, নেশায় মাতাল অবস্থা এবং অকর্মণ্যতার কারণে এই নারীদের একটি অংশ স্বামী বা জীবনসঙ্গী হিসেবে বাঙালি সুপুরুষদের পছন্দ করছে।

পাহাড়ি নারীরা চায় একটু শান্ত, ভদ্র স্বভাবের, স্মার্ট পুরুষ, যিনি সুখে রাখার নিশ্চয়তা দিতে পারে, খেয়াল রাখতে পারে, কেয়ারিং করতে পারে এবং ছোটখাটো আবদার পূরণ করতে পারে। এই ধরনের বাঙালি পুরুষদের প্রতি তারা দুর্বল। পছন্দের বাঙালি সুপুরুষ পাওয়ার জন্য তারা জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে হুমকির সম্মুখীন হলেও নিজের জাতি পরিচয়, ধর্ম ও সংস্কৃতি ত্যাগ করে ভিন্ন ধর্মের পুরুষের সাথে অজানা উদ্দেশ্যে পাড়ি জমাচ্ছে।

বাঙালি পুরুষরা এই ত্যাগকে ভালোবাসার চাদরে ভরিয়ে দেয়, জীবনের সব দুঃখ-কষ্ট একপাশে রেখে পাহাড়ি নারীকে শান্তিতে রাখার জন্য সবকিছু দেয়। যদিও কিছু নারী উন্নত জীবনের আশায় ব্যক্তিগত চিন্তায় ভুল করে ধোঁকা খায়, কিন্তু তা তুলনামূলকভাবে নগণ্য।
স্থানীয়রা বলছে, পাহাড়ি সন্ত্রাসী সংগঠনগুলো যদি বাধা না দিত, তাহলে এই সংখ্যা লক্ষাধিক হতো।

এই সংগঠনগুলো জাতি রক্ষার নামে বাঙালি পুরুষদের সাথে পাহাড়ি নারীদের কথা বলা, চলাফেরা, প্রেম বা বিবাহ নিষিদ্ধ করে। কেউ এই নিয়ম অমান্য করলে তাকে গণধর্ষণ, নিলামে তোলা, হত্যা বা তার পরিবারকে জরিমানা ও সমাজচ্যুত করা হয়।

বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বাঙালি ছেলেদের সঙ্গে থাকা ছবি, ভিডিও নিয়ে নারীদের নির্যাতন, হেনস্তা, স্পর্শকাতর স্থানে হাত দেওয়া বা দলবেঁধে গণধর্ষণ করা হয়, এবং তার ভিডিও বা ছবি সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে দেওয়া হয়। এভাবে একজন পাহাড়ি নারীকে সামাজিকভাবে এবং মানসিকভাবে শেষ করে দেওয়া হয়। এই মধ্যযুগীয় নির্যাতন থেকে বেঁচে ফেরা নারীর সংখ্যা খুবই কম; কেউ যদি ফিরে আসেন, তিনি ভাগ্যবান। এই ভয় দেখিয়ে নির্যাতন করা হয় যাতে কেউ বাঙালি পুরুষদের সাথে সম্পর্ক না করে।

এছাড়া, সুন্দরী পাহাড়ি নারীকে কিছু উগ্র পাহাড়ি যুবক ভোগ করতে ব্যর্থ হলে, অর্থাৎ প্রস্তাবে রাজি না হলে, তাকে গায়েল করার জন্য বাঙালির সাথে সম্পর্ক আছে বলে অভিযোগ করে অভিযুক্ত করা হয়। এআই যুগে ছবি এডিট করে তা ছড়িয়ে দেওয়া বা ব্ল্যাকমেইল করে ভোগ করা হয়। কেউ প্রতিবাদ করলে তাকে সোশ্যাল মিডিয়ায় ট্রল করা হয়।

সবচেয়ে দুঃখজনক হচ্ছে, সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া এসব এআই ছবি ও ভিডিওর যাচাই-বাছাই ছাড়া একদল উগ্র মানুষ পাহাড়ি মেয়েদের চরিত্র নিয়ে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করছে, ধর্ষণের হুমকি দিচ্ছে এবং বিভিন্নভাবে তাদের সামাজিক মর্যাদা অপদস্ত করছে। এটি একধরণের মানবতা-বহির্ভূত, পশুসুলভ উন্মাদনার শোভা মনে হয়।

সভ্যতার এই যুগে পাহাড়ি নারীরা পরাধীনতার শিকলে বাঁধা। আমাদের নারীবাদী এবং সুশীল সমাজ পাহাড়ে নারী নির্যাতন নিয়ে কখনো অদৃশ্য কারণে কথা বলে না। অথচ এই পাহাড়ি নারীদের বিরাট অংশ যুগের পর যুগ ধরে স্বজাতি মাতাল, নেশাখোর, জুয়াড়ি, একাধিক নারীতে আসক্ত এবং অকর্মণ্য পুরুষের ভোগ্যপণ্য হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

এক অনুসন্ধানে দেখা যায়, পার্বত্য চট্টগ্রামের তিনটি পাহাড়ি জেলা এবং তার ২৬টি উপজেলায় স্কুল-কলেজে বাঙালি সহপাঠীদের সাথে পাহাড়ি নারীদের কথা বলা নিষিদ্ধ। পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ এই বিষয়ে সজাগ দৃষ্টি রাখে। অনেক সময় সহপাঠীদের সাথে প্রয়োজনমাফিক বা সৌজন্যতা রাখতে গিয়ে কথা বলায় সন্দেহের মধ্যে পড়ে নির্যাতন ও ধর্ষণের শিকার হন পাহাড়ি শিক্ষার্থীরা। একইভাবে চাকরি বা অন্যান্য ক্ষেত্রে বাঙালি সহকর্মীদের সাথে কথা বলতে বাধার সম্মুখীন হয়।

বর্তমানে পাহাড়ের সচেতন পাহাড়িরা তাদের সন্তানদের শিক্ষিত করতে এবং উন্নত জীবনের আশায় ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন নামকরা বিশ্ববিদ্যালয় এবং কর্মস্থলে পাঠায়। সেখানে বাঙালি পুরুষদের সাথে অনেকের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। কিন্তু এসব সম্পর্ক নিয়ে পাহাড়ি নারীদের কঠোর শাস্তির মুখোমুখি হতে হয়। তাদের উপর নজরদারি করা হয়, মোবাইল এবং চলাফেরা পর্যবেক্ষণ করা হয়।

এই কড়াকড়ি বিধিনিষেধ উপেক্ষা করে পাহাড়ি নারীরা শান্তির নীড় খুঁজে নিচ্ছে। পছন্দের বাঙালি সুপুরুষের সাথে জুটি বেঁধে জীবনকে রঙিন করতে উপজাতি থেকে বাঙালি মুসলিম, হিন্দু বা বড়ুয়া হয়ে যাচ্ছে।

গত কয়েক দশকে বাঙালি পুরুষ বিয়ে করা অনেক পাহাড়ি নারীকে জেএসএস, ইউপিডিএফের মতো সংগঠনগুলো বিভিন্ন কলাকৌশলে অপহরণ করে, পিতা-মাতাকে জিম্মি করে ফিরিয়ে এনেছে। এসব নারীর অনেকে আজ সমাজে অবহেলা এবং কটুক্তির মধ্যে জীবন কাটাচ্ছেন, আবার অনেকের বেঁচে থাকা নিয়ে কোনো তথ্য নেই।

অনুসন্ধান থেকে জানা যায়, পাহাড়ি সমাজে নারীরাই মূলত জুমে ফসল উৎপাদন ও বিক্রি করে সংসারের ভার বহন করেন। দিনরাত পরিশ্রম করে ঘর এবং বাহিরের সব কাজ সামলাতে হয় তাদের। বিপরীতে বহু পুরুষ অলস জীবনযাপন করেন—ঘোরাফেরা, মদপান করে নেশাগ্রস্ত অবস্থা বা ঘরে বসে হুক্কা টানাই তাদের নিত্যদিনের অভ্যাস। সংসারের আর্থিক এবং সামাজিক দায়ভার প্রায় সম্পূর্ণভাবে নারীদের কাঁধে। কেউ কেউ পরকীয়ার প্রেমিকার সাথে সংসার ভাগ করে নিতে বাধ্য হন, সহ্য করেন স্বামীর নানামুখী নির্যাতন। যদিও সভ্যতার কারণে এখন শিক্ষার আলোতে নারী-পুরুষ উভয় বিভিন্ন পেশাজীবি কিন্তু প্রান্তিক এলাকায় জুম চাষ এখনো চলমান।

অন্যদিকে, বাঙালি পুরুষদের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার পর অনেক নারী ভিন্ন চিত্র দেখেন। সেখানে সংসারের দায়িত্ব ভাগাভাগি হয়, পুরুষরাও গৃহস্থালির কাজে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। পরিচ্ছন্ন জীবনাচার, পারস্পরিক সম্মান এবং আবেগঘন সম্পর্কের মাধ্যমে তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল এবং সুখী সংসার গড়ে ওঠে। এসব অভিজ্ঞতা পাহাড়ি নারীদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ায় অনেকের মনেই বাঙালি তরুণরা আদর্শ জীবনসঙ্গী হিসেবে জায়গা করে নেন। ফলে ভালোবাসার টানেই তারা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার সাহস দেখায়।

সন্ত্রাসী সংগঠনগুলো বাঙালি বিয়ে করা মেয়েদের সঙ্গে যা করে-
প্রায় ১৯ বছরেরও বেশি সময় আগে এক বাঙালি যুবক জামাল উদ্দিনের সাথে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে মারমা সম্প্রদায়ের তরুণী মিনিরওজা মারমার। পারস্পরিক ভালোবাসার টানে শেষ পর্যন্ত ইসলামি শরিয়ত অনুযায়ী তারা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। বিয়ের পর তার উপজাতীয় পরিচয় পরিবর্তিত হয়ে নতুন নাম হয় আয়েশা সিদ্দিকা। বর্তমানে এই দম্পতির সংসারে দুই সন্তান রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে শান্তিপূর্ণভাবে চলছিল তাদের পারিবারিক জীবন। কিন্তু এই আন্তঃজাতিগত এবং আন্তঃধর্মীয় সম্পর্ক মেনে নিতে পারেনি কথিত আঞ্চলিক সংগঠন ইউপিডিএফের কিছু সশস্ত্র সদস্য। বিয়ের প্রায় ১২ বছর পর, ২০১৬ সালের ৮ নভেম্বর রাঙামাটি নানিয়ারচর ঘিলাছড়ি বাজার এলাকা থেকে আয়েশা সিদ্দিকাকে জোরপূর্বক ধরে নিয়ে যায় তারা। পরবর্তী একদিন এবং একরাত তাকে আটকে রেখে শারীরিক এবং মানসিক নির্যাতন চালানো হয়। চোখ এবং গলায় শিকল পরিয়ে তাকে অবিরাম জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়—কেন ভিন্ন ধর্মের, কেন একজন বাঙালি পুরুষকে জীবনসঙ্গী হিসেবে বেছে নিয়েছেন। এক পর্যায়ে তার গলায় ধারালো অস্ত্র ঠেকিয়ে ভয়ভীতি প্রদর্শন করে মিথ্যা বক্তব্য আদায় করা হয়। নির্যাতনের ভিডিও বা অডিও ধারণের সময় তাকে স্বামী এবং শ্বশুরের বিরুদ্ধে সহিংসতার অভিযোগ তুলতে বাধ্য করা হয়, যা তার ভাষ্যমতে সম্পূর্ণ সাজানো। এসব দৃশ্য সন্ত্রাসীরা রেকর্ড করে রাখেন। পরে নিরাপত্তা বাহিনীর তৎপরতায় তারা আয়েশাকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হন। ঘটনার ভয়াবহতা সত্ত্বেও আতঙ্কের কারণে পরিবারটি থানায় মামলা করার সাহস পায়নি। এরপরও প্রতিশোধমূলক কর্মকাণ্ড চালায় সন্ত্রাসীরা। তার শ্বশুরের মালিকানাধীন আনারস বাগানে হামলা চালিয়ে প্রায় ৮২ হাজার আনারস কেটে নষ্ট করে দেওয়া হয়।

২০১৩ সালে প্রথম আলো পত্রিকার সাংবাদিক সৈকত ভদ্র ভালোবাসার সম্পর্কের সূত্রে খাগড়াছড়ির রেটিনা চাকমাকে ২ অক্টোবর ধর্মান্তরিত করে বিবাহ করেন। পরবর্তীতে ২০১৪ সালের ৬ আগস্ট ইউপিডিএফ-এর সদস্যরা রেটিনা চাকমার পিতা-মাতার মাধ্যমে তাকে ঢাকায় স্বামীর বাসা থেকে অপহরণ করে। এই ঘটনার প্রেক্ষিতে সৈকত ভদ্র যশোরে নিজ থানায় হুমকির বিষয়ে সাধারণ ডায়েরি করেন, কিন্তু পুলিশ কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। এরপর ২০১৫ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি তিনি ঢাকার জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১০০ ধারায় স্ত্রী উদ্ধারের আবেদন করেন (মামলা নং–৬৪/২০১৫, স্মারক নং–২২৪/(২))। আদালত ১৯ ফেব্রুয়ারি রেটিনার বাবা-মাকে তাকে সঙ্গে নিয়ে ঢাকার আদালতে হাজির হওয়ার নির্দেশ দেন। তারা আদালতে উপস্থিত হলেও রেটিনাকে হাজির করেননি। ফলে আদালত রেটিনাকে উদ্ধারের লক্ষ্যে সার্চ ওয়ারেন্ট জারি করেন, যা পুলিশের অবহেলায় কার্যকর হয়নি। ২০১৫ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি সোমবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে এক সংবাদ সম্মেলন করেন সৈকত ভদ্র। সেখানে তিনি তার স্ত্রী উদ্ধারের দাবি জানান এবং তার ওপর সংঘটিত অপরাধের বিচার প্রার্থনা করেন। বর্তমানে রেটিনা চাকমা জীবিত না মৃত—এ বিষয়ে কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায়নি।

২০১৫ সালের ১২ এপ্রিল খাগড়াছড়ি থেকে চট্টগ্রামগামী একটি বাস বাইল্যাছড়ি স্কুলের সামনে থামানো হলে দীঘিনালা উপজেলার ক্ষেত্রলাল ত্রিপুরার কন্যা দীপা ত্রিপুরা (১৮) এবং সাতকানিয়া উপজেলার আহমদ কবীরের পুত্র মো. আবদুল হান্নান (২৪)-কে ইউপিডিএফ পিসিপি’র সন্ত্রাসীরা অপহরণ করে অপহরণের পর সন্ত্রাসী ক্রিফল ত্রিপুরা ও নেপাল ত্রিপুরা দীপা ত্রিপুরাকে মোটরসাইকেলে করে রেংকুম এলাকার একটি ঝুম ঘরে আটকে রাখে। অপরদিকে সজীব ত্রিপুরার নেতৃত্বে আদিত্য ত্রিপুরা, রাজু ত্রিপুরা ও উৎপল ত্রিপুরা আবদুল হান্নানকে পার্শ্ববর্তী জঙ্গলে নিয়ে গিয়ে শারীরিক নির্যাতন চালায়। ঘটনা জানার পর মাটিরাঙ্গা জোনের ক্যাপ্টেন আসিফ আহমেদের নেতৃত্বে সেনাবাহিনী অভিযান চালিয়ে সন্দেহভাজন পাঁচজনকে আটক করে গুইমারা থানায় হস্তান্তর করে। কিন্তু থানায় তাদের বিরুদ্ধে কোনো মামলা দায়ের না করে মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়। একই রাতে মধ্যস্থতায় আবদুল হান্নানকে মুক্তি দেওয়া হয়।এদিকে রেংকুমের ঝুম ঘরে দীপা ত্রিপুরাকে পালাক্রমে গণধর্ষণ করে পিসিপি’র স্থানীয় নেতা ক্রিফল ত্রিপুরা, নেপাল ত্রিপুরা, সজীব ত্রিপুরা, সুরঞ্জিত ত্রিপুরা, অভি ত্রিপুরা ও রাজু ত্রিপুরা। গণধর্ষণের সময় রাজু ত্রিপুরা পুরো ঘটনাটি মোবাইলে ধারণ করে। পরে সেনাবাহিনীর হাতে আটক সজীব ত্রিপুরা জিজ্ঞাসাবাদে ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে এবং জানায় যে নেতৃত্ব দিয়েছে ক্রিফল ও নেপাল ত্রিপুরা। পরদিন দ্বিতীয় দফা নির্যাতনের পর বাইল্যাছড়ি সাইনবোর্ড এলাকায় স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও নেতৃবৃন্দের মধ্যস্থতায় দীপা ত্রিপুরাকে তার পিতা-মাতার কাছে হস্তান্তর করা হয়। একটি প্রভাবশালী মহলের চাপে দীপা ত্রিপুরার পরিবার ধর্ষণকারীদের বিরুদ্ধে মামলা করতে সাহস পায়নি। পুলিশও বাদী হয়ে মামলা দায়ের করেনি, ফলে অভিযুক্তরা আইনের আওতার বাইরে থেকে যান।

২০১৬ সালের ২৯ মে রাঙামাটির বিলাইছড়ি উপজেলায় জেএসএস সন্তু গ্রুপ সমর্থিত পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ (পিসিপি) অর্থ সম্পাদক সুনীতিময় চাকমার নেতৃত্বে প্রায় ২০ জনের একটি দল আয়না চাকমা (১৫)-কে অপহরণ করে। অভিযোগ, বাঙালি কম্পিউটার দোকানদার শিহাবের সাথে সম্পর্কের জেরে তাকে গহিন জঙ্গলে নিয়ে দলবদ্ধভাবে ধর্ষণ করা হয়। রক্তাক্ত আয়না চাকমার চিৎকার পাহাড়ের আকাশ-বাতাস সেদিন ভারী হয়েছিল।
২০১৭ সালে রাঙামাটি সদর উপজেলার কুতুকছড়ির জহলাল চাকমার কন্যা জোসনা চাকমা (৩০) চট্টগ্রামে একটি পোশাক কারখানায় চাকরি করার সময় বড়ুয়া সম্প্রদায়ের বৌদ্ধ ধর্মের অপু চন্দ্রকে ভালোবেসে বিবাহ করেন। পরিবার সম্মতি দিলেও ইউপিডিএফ এই বিয়ে মেনে নেয়নি। এর জেরে ২০১৬ সালের ১৮ নভেম্বর জোসনা চাকমা বাবার বাড়িতে এলে তাকে ইউপিডিএফের সশস্ত্র সদস্যরা অপহরণ করে। পরবর্তীতে তিনি বন্দিদশা থেকে পালিয়ে ২০১৭ সালের ১৬ জানুয়ারি রাত আনুমানিক ২টার দিকে কুতুকছড়ি সেনা ক্যাম্পে পৌঁছে ঘটনার বর্ণনা দেন। তার জবানবন্দিতে উঠে আসে—তাকে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছিল এবং পরিবারের সদস্যদের ওপর নির্যাতন ও অর্থদণ্ড আরোপ করা হয়েছিল।

২০১৭ সালে প্রেমিক বাঙালি যুবকের সাথে পালিয়ে এক ত্রিপুরা নারী শ্রমিকের বিয়ের জের ধরে ফটিকছড়ির দাঁতমারা নাছিহা চা-বাগানের প্রায় ৭৮ জন পাহাড়ি শ্রমিককে ‘জিম্মি’ করে রেখেছিল ইউপিডিএফ। শব্দ বালা ত্রিপুরা নামের ওই নারীকে ফিরিয়ে না দিলে শ্রমিকদের বাগানে যেতে দেব না তারা। এলাকাটি অত্যন্ত দুর্গম পাহাড়ি এলাকা এবং কোনো পক্ষ এত দিন মুখ না খোলায় বিষয়টি পাঁচ দিন ধরে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা সংস্থাগুলোর নজরে আসেনি। বাগান কর্তৃপক্ষও এ নিয়ে থানায় কোনো অভিযোগ করেনি। এর আগে গত ১৫ এপ্রিল প্রেমিক দাঁতমারা ইউপির ৮ নম্বর ওয়ার্ডের হাইক্কাটিলা গ্রামের সুরত আলীর ছেলে মুহাম্মদ আরিফ (২৫)-এর সাথে পালিয়ে যান ওই বাগানের তশিরাম ত্রিপুরার মেয়ে শব্দ বালা ত্রিপুরা (২০)। উভয় পরিবার থানায় কোনো অভিযোগ করেনি। স্থানীয়রা জানান, ঘটনার পর ২১ এপ্রিল একদল পাহাড়ি কয়েকটি চাঁদের গাড়ি নিয়ে বাগানে ঢুকে পাহাড়ি শ্রমিকদের তুলে নিয়ে যায়।

২০১৭ সালের ৮ সেপ্টেম্বর মাটিরাঙ্গার বাইল্যাছড়ি এলাকা থেকে চলন্ত বাসে স্বামীর সামনেই ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করা ফাতেমা বেগমকে ইউপিডিএফ সন্ত্রাসী নয়ন ত্রিপুরা অপহরণ করে। আজ পর্যন্ত তার কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।

এছাড়া মাটিরাঙ্গার সোনাবি চাকমা, রাঙামাটির রিনা ত্রিপুরা, রামগড়ের মণিকা ত্রিপুরাসহ অসংখ্য পাহাড়ি নারী বাঙালি মুসলিম যুবককে ভালোবাসার কারণে অপহরণ, গণধর্ষণ ও হত্যার মতো ভয়াবহ নির্যাতনের শিকার হয়েছে।

বাঙালির সাথে কথিত সম্পর্কের অভিযোগে নির্যাতন ও সোশ্যাল মিডিয়ায় হেনস্তার শিকার হয়েছেন মধুমিতা চাকমা, অলকা চাকমা, মিতালী চাকমা, রুবিনা চাকমা, নিপ্রু মারমা, নাজ্জু ব্লগস, উখাইচিং মারমা বান্দরবানসহ অগণিত নাম না জানা পাহাড়ি নারী।

বাঙালি ছেলেকে জীবনসঙ্গী করে সবচেয়ে বেশি জাতিগোষ্ঠী থেকে হেনস্তা, অপবাদ, ধর্ষণ হুমকি, পিতা-মাতার উপর চাপ পেয়েছেন সাহসী ট্রাইবাল নারী দীঘিনালার মামিয়া তালুকদার তাহি। তিনি বাঙালি ছেলের সাথে সংসার করতে গিয়ে ইতিহাসের পাতায় নাম লিখিয়েছেন। এজন্য তাকে প্রতিনিয়ত গালিগালাজ এবং হুমকি মোকাবেলা করতে হয়। তবুও তিনি থামেননি; বাঙালি স্বামীর সাথে ঘুরাফেরার ছবি শেয়ার করে উপজাতি উগ্রবাদীদের মানসিক যন্ত্রণা দিচ্ছেন, যারা তার বিয়ে মেনে নিতে পারেনি।

নারী অধিকার নিয়ে কাজ করা আইনজীবী অ্যাডভোকেট জহির আহমেদের বক্তব্য এবং মানবাধিকার কর্মী সুষময় চাকমার পর্যবেক্ষণ একত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্যের দিকেই ইঙ্গিত করে—নারীর ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের ওপর বলপ্রয়োগ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। একজন নারী কাকে বিয়ে করবেন, কার সঙ্গে জীবন ভাগ করবেন—এই সিদ্ধান্ত তার নিজের ও তার পরিবারের; এখানে সমাজের তথাকথিত রক্ষণশীলতা কিংবা কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠীর হস্তক্ষেপ মানবাধিকারের সরাসরি লঙ্ঘন। পাহাড়ে বিদ্যমান সংকট অস্বীকার করার সুযোগ নেই, তবে সেই সংকটের সমাধান নারী নির্যাতন, অপহরণ কিংবা সহিংসতার মাধ্যমে নয়। বরং শিক্ষা, সচেতনতা ও নারীর স্বাধীনতার প্রতি সম্মানই পারে পাহাড়ের সামাজিক ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে। একই সঙ্গে এটিও স্বীকার্য যে, পাহাড়ি সমাজের সব পুরুষ অপরাধী নয়; কিন্তু একটি উগ্র ও সশস্ত্র অংশ পরিকল্পিতভাবে এই সংবেদনশীল বিষয়গুলোকে পুঁজি করে পাহাড়ি ও বাঙালির মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করছে, যা সামগ্রিক সম্প্রীতি ও মানবিক সহাবস্থানের জন্য গভীর হুমকি।

এই প্রতিবেদন থেকে স্পষ্ট হয় যে, পাহাড়ি নারীদের বাঙালি পুরুষদের প্রতি আকর্ষণ শুধু ব্যক্তিগত পছন্দ নয়, বরং পাহাড়ি সমাজের অভ্যন্তরীণ সমস্যা এবং নির্যাতনের ফলস্বরূপ। সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর দমনমূলক নীতি সত্ত্বেও এই প্রবণতা চলমান। সমাজের সচেতনতা এবং আইনি সুরক্ষা বাড়ানো দরকার যাতে এই নারীরা স্বাধীনভাবে জীবনসঙ্গী বেছে নিতে পারেন। এই ঘটনাগুলো নারী অধিকারের প্রশ্ন তুলে দেয় এবং সুশীল সমাজকে এ নিয়ে কথা বলতে উদ্বুদ্ধ করে।

সূত্র : হিল ডিসকভারি ফেইসবুক পেইজ

Print Friendly, PDF & Email
ঘটনাপ্রবাহ: খাগড়াছড়ি, নারী, নির্যাতন
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও পড়ুন