রোহিঙ্গা গণহত্যা মামলার বিচার শুরু আন্তর্জাতিক আদালতে


মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগে গাম্বিয়ার দায়ের করা মামলার মূল তদন্ত শুনানি শুরু করেছে নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগে অবস্থিত আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে)। মিয়ানমারের সামরিক জান্তা সরকারের পক্ষে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বিষয়ক মন্ত্রী ইউ কো কো হ্লাইং–এর নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল শুনানিতে অংশ নিয়েছে।
সোমবার (১২ জানুয়ারি) মিয়ানমারের সংবাদমাধ্যম ‘মিয়ানমার নাউ’তে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, এই শুনানি মোট ৩ সপ্তাহব্যাপী চলবে। প্রথম সপ্তাহে মিয়ানমার ও গাম্বিয়া উভয় পক্ষ তাদের মৌখিক আবেদন উপস্থাপন করবে, যা চলবে আগামী ২৯ জানুয়ারি পর্যন্ত। দ্বিতীয় সপ্তাহে সাক্ষী ও বিশেষজ্ঞদের সাক্ষ্য গ্রহণ করা হবে এবং তৃতীয় সপ্তাহে উভয় পক্ষ তাদের চূড়ান্ত প্রতিক্রিয়া ও পাল্টা যুক্তি উপস্থাপন করবে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, রোহিঙ্গা গণহত্যার শুনানিকে ঘিরে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। আদালত ভবনে প্রবেশের সময় দরজা ও নিরাপত্তা পরীক্ষা জোরদার করা হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক আদালতের ইতিহাসে একটি ব্যতিক্রমী পরিস্থিতি বলে মনে করা হচ্ছে।
আইসিজে এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, এই তদন্ত প্রাসঙ্গিক সংস্থাগুলোর ডাকা সাক্ষী ও বিশেষজ্ঞদের যোগ্যতা এবং সাক্ষাৎকারের ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হবে।
এদিকে, উইমেন্স পিস নেটওয়ার্কের প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক মা ওয়াই নু এবং হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)–এর প্রকাশিত এক যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গাম্বিয়ার দায়ের করা এই মামলাটি অবশেষে একটি গুরুত্বপূর্ণ মূল তদন্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। এটি রোহিঙ্গাদের জন্য নতুন আশার দ্বার খুলে দিয়েছে—যাতে কয়েক দশক ধরে চলা মিয়ানমারের দুর্দশার অবসান ঘটতে পারে’।
মা ওয়াই নু আরও বলেন, “বিশ্ব সম্প্রদায় হিসেবে আমাদের অবশ্যই দৃঢ় থাকতে হবে—মিয়ানমারে দায়মুক্তির সংস্কৃতি বন্ধ করতে এবং রোহিঙ্গাদের অধিকার পুনরুদ্ধারে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে।”
উল্লেখ্য, ১১ নভেম্বর ২০১৯ তারিখে গাম্বিয়া রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে আইসিজেতে মামলা দায়ের করে। ২০১৭ সালে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর তথাকথিত ‘ল্যান্ড ক্লিয়ারিং অপারেশন’-এর ফলে প্রায় সাড়ে সাত লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়।
গাম্বিয়ার আবেদনে অভিযোগ করা হয়, মিয়ানমার গণহত্যা সংক্রান্ত কনভেনশনের বাধ্যবাধকতা লঙ্ঘন করেছে এবং আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী নয়—এমন সব কার্যক্রম অবিলম্বে বন্ধ করার দাবি জানানো হয়। পাশাপাশি ভুক্তভোগীদের জন্য প্রতিকার ও সুরক্ষা নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়।
গাম্বিয়া আইসিজে অনুচ্ছেদ ৯–এর অধীনে গণহত্যা কনভেনশনের ভিত্তিতে আদালতের এখতিয়ার দাবি করে এবং একই সঙ্গে অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থা (Provisional Measures) আরোপের আবেদন জানায়। এর প্রেক্ষিতে আইসিজে ২৩ জানুয়ারি ২০২০ তারিখে মিয়ানমারের জন্য একাধিক অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ জারি করে।
পরবর্তীতে গাম্বিয়ার বিস্তারিত স্মারক দাখিলের পর মিয়ানমার আদালতের এখতিয়ার ও মামলার গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রাথমিক আপত্তি তোলে। তবে ২২ জুলাই ২০২২ তারিখে আইসিজে রায় দেয় যে, গণহত্যা কনভেনশনের অনুচ্ছেদ ৯ অনুযায়ী এই মামলার বিচার করার ক্ষমতা আদালতের রয়েছে।
এরপর মিয়ানমার পাল্টা স্মারক দাখিল করে এবং উভয় পক্ষই উত্তর ও পাল্টা জবাব জমা দেয়।
এ মামলায় আইসিজে আইন ৬৩ অনুযায়ী কানাডা, ডেনমার্ক, ফ্রান্স, জার্মানি, নেদারল্যান্ডস, যুক্তরাজ্য, মালদ্বীপ, স্লোভেনিয়া, কঙ্গো গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র, বেলজিয়াম ও আয়ারল্যান্ড–এর হস্তক্ষেপ আবেদন গ্রহণ করেছে।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) জানিয়েছে, কয়েক দশক ধরে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে বর্ণবাদ, নির্যাতন, চলাচলের স্বাধীনতা হরণসহ মিয়ানমারের সেনাবাহিনী মানবতার বিরুদ্ধে গুরুতর অপরাধ করে আসছে।
এইচআরডব্লিউ–এর এশিয়া অঞ্চলের গবেষক শানাবোচনা বলেন, ‘মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর নৃশংস অপরাধ এবং দায়মুক্তির চক্র অবিলম্বে বন্ধ করা জরুরি। এর সূচনা হিসেবে বিশ্ব সরকারের উচিত আইসিজে কর্তৃক নির্ধারিত অন্তর্বর্তীকালীন আদেশগুলো বাস্তবায়নে মিয়ানমারের সামরিক জান্তার ওপর আইনগত চাপ প্রয়োগ করা’।
উৎস : Myanmar Now থেকে অনুবাদকৃত সংবাদ।
















