সারা দেশের কালিমা খচিত পতাকা উত্তোলনে হিড়িকের নেপথ্যে কী

fec-image

হঠাৎ করেই বাংলাদেশের হাট, মাঠ, রাস্তাঘাট যত্রতত্র কালিমার পতাকা লাগানোর জন্য একশ্রেণীর তরুণদের মধ্যে জোশ প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। টেকনাফ থেকে তেতুলিয়া রূপসা থেকে পাথুরিয়া কোথাও বাদ নেই এই জোশের স্ফুরণে। মূলত ইসলামিক ঘারনার, অনেক ক্ষেত্রে মাদ্রাসা ব্যাকগ্রাউন্ডের কিছু তরুণ এই কাজে আঞ্জাম দিচ্ছেন। তাদের দাবি, বর্তমানে বিশ্বকাপের উন্মাদনায় সারা দেশে যেভাবে আর্জেন্টিনা, ব্রাজিলসহ অন্যান্য দেশের পতাকা টানানো হচ্ছে, এর কাউন্টার হিসেবে তারা কালিমাখচিত ইসলামের পতাকা লাগাচ্ছেন সারাদেশে। ইতোমধ্যেই বাংলা স্ট্রিম নামে একটি অনলাইন তাদের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দেখিয়েছে, হেফাজত নেতা মুফতি হারুন ইজাহার এ ধরনের একটি নির্দেশ তার কর্মী ও সমর্থকদের দিয়েছিল। এরপর থেকে সারাদেশে কালিমার পতাকা লাগানোর এই প্রবণতা শুরু হয়েছে। তবে সারাদেশে যেভাবে কালিমার পতাকা লাগানো হচ্ছে তার পুরোটাই হারুন ইজহারের দল করছে, নাকি এর পাশাপাশি অন্যরাও করছে সে বিষয়ে কোন আলোচনা ওই রিপোর্টে উপস্থাপিত হয়নি।

বিশ্বকাপ ফুটবল নিছকই একটি বিনোদন। আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের পতাকা তুলে এই দেশগুলোর ফুটবল টিমের প্রতি এই আবেগ ও সমর্থন দেখানো এক ধরনের প্রতীকী ব্যাপার। যেটা তাদের দলের সমর্থকেরা করে থাকে। এখানে মনে রাখা প্রয়োজন, যারা এইসব দেশের পতাকা তুলছেন, তারা কিন্তু এইসব দেশকে সমর্থন করছেন না। এই সব দেশের ফুটবল টিমের সমর্থন করছেন। আমি নিজে বিশ্বকাপ ফুটবলে আর্জেন্টিনার সমর্থক। অনেক সময় আমার বাসার জানালায় আমিও আর্জেন্টিনার পতাকা তুলেছি, আর্জেন্টিনার জার্সি কিনে পরেছি। এক সময় এদেশে আবাহনী ও মোহামেডানের পতাকা এভাবেই বাড়ির ছাদে জানালায় দোকানের কার্নিশে স্থান পেত। জাতীয় ফুটবল দুর্বল হয়ে পড়ার কারণে সেই প্রবণতা হ্রাস পেয়েছে।

আমিও তখন মোহামেডানের পতাকা তুলেছি। যেদিন থেকে বিশ্বকাপ ফুটবল দেখা শুরু করেছি ম্যারাডোনার খেলা দেখেই বড় হয়েছি। মেসির আবির্ভাব না হলে আর্জেন্টিনার প্রতি আমার সমর্থন পরবর্তীতে থাকতো কিনা আমি জানিনা এবং মেসির পরে এটা থাকবে কিনা সেটা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে। অর্থাৎ এটা একান্তই মেসি বা ম্যারাডোনার ফুটবল দক্ষতার প্রতি আমার সমর্থন। আর্জেন্টিনার পুরো ফুটবল দলের প্রতিও নয়। ইসরাইল সমর্থক আর্জেন্টিনা দেশের প্রতি সমর্থন দুর কি বাত। এবং আমার দৃঢ় বিশ্বাস, বিশ্বকাপ চলাকালে যারা বিভিন্ন দলের পতাকা ও জার্সি পড়ে সমর্থন জানাচ্ছেন তাদের বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অবস্থানটা এরকমই। সেক্ষেত্রে এ ধরনের নিছক বিনোদনের বিষয় কি করে ইসলামের কাউন্টার যোগ্য হয়ে উঠল এটা আমার বিবেচনায় আসছে না। ইসলামের প্রতি ভালোবাসা ও আবেগ প্রদর্শনে আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের পতাকার কাউন্টার হিসেবে কালিমার পতাকা উত্তোলন যথেষ্ট যোগ্য কর্মসূচি কিনা সেটা ভেবে দেখার দাবি রাখে।

কেবল বাংলাদেশ নয় বিশ্বকাপ ফুটবল চলাকালে সারা বিশ্বেই বিভিন্ন দল ও খেলোয়াড়ের সমর্থকেরা তাদের সমর্থিত দল ও খেলোয়াড়ের প্রতি ভালোবাসা দেখাতে নানা ধরনের কর্মকাণ্ড ও পাগলামি করে থাকে। জার্সি পরা খুব সাধারণ ঘটনা। শরীরে নানা ধরনের উলকি আঁকা, দলীয় জার্সির মত শরীরকে রঙিন করা, জার্সি বা পতাকার মত রংয়ের ফুটবল, বাদ্যযন্ত্র তৈরি করা, এমনকি পুরুষ ও নারীরা একই ধরনের অন্তর্বাস তৈরি করে পরিধান করে থাকে। বাংলাদেশের মানুষ নিজের ঘরবাড়ি যানবাহন প্রিয় গরু, ছাগল, কুকুর, বিড়াল, আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের পতাকার রঙে রঙিন করে থাকে। এরকম আরো অনেক পাগলামি আমরা দেখি। মুফতি ইজাহার সাহেবের কাছে আমার প্রশ্ন, এগুলোর কাউন্টার আপনি কিভাবে করবেন? আপনিও কি ইসলামপ্রিয় মানুষকে তাদের প্রিয় পশুর শরীরে ইসলামিক সিম্বল আঁকার জন্য নির্দেশ দিবেন? ইসলামিক সিম্বল ছাপ দেয়া অন্তর্বাস পরিধান করার নির্দেশ দিবেন? (নাউজুবিল্লাহ!) এ সকল দলের ভক্তরা প্রিয় দলের প্রতি সমর্থন জানাতে যা যা করে তার কতটা জায়গায় আপনি কাউন্টার দিতে পারবেন?

দ্বিতীয় প্রশ্ন রাজনৈতিক। ৩৬ জুলাই বিপ্লবের পর যখন বাংলাদেশের ইসলামপন্থীরা দীর্ঘ ফ্যাসিস্ট রেজিমের নিষ্পেষণের যাঁতাকল থেকে মুক্তি পেলো তখন তাদের বাঁধভাঙ্গা আবেগ আমরা দেখেছি। (যদিও ৩ আগস্ট পর্যন্ত অনেক শীর্ষ আলেম নেতা ফ্যাসিবাদী দুঃশাসনকে সমর্থন দিয়েছেন এবং চার তারিখ থেকে ভোল পাল্টে মহা বিপ্লবী সেজে গেছেন।) বাংলাদেশের ইসলামপন্থীদের যৌক্তিকভাবে তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য সুযোগ করে দিয়েছিল এই জুলাই বিপ্লব। কিন্তু বিপ্লবের অব্যবহিত পরে আমরা দেখলাম, ইসলামপন্থী ও মাদ্রাসা ছাত্রদের মিছিলে বিশাল বিশাল কালিমার ক্যালিগ্রাফি করা কালো পতাকা নিয়ে মিছিল করতে। মাথায় কালিমা খচিত ফেটটি বেঁধে মিছিল করতে। অথচ হাসিনা রেজিমে সাড়ে ১৫ বছরে এই ঘটনা একবারও দেখা যায় নি। কিন্তু কেন? তখন কি ইসলামের এই চেতনা ছিল না? বিশ্বকাপ ফুটবল খেলা তখন হয়নি? তখনও কি দেশে আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের পতাকা লাগানো হতো না? মুফতি ইজহার সাহেব তখন কোথায় ছিলেন?

গণমাধ্যম পর্যবেক্ষণ থেকে আমার যতদূর মনে পড়ে, হাসিনা আমলে তিনি যেমন মাজলুম হয়েছেন বহুবার, তেমনি হাসিনার স্তবকতাও করতে দ্বিধা করেননি যখন সুযোগ পেয়েছেন। ২০২৬ সালের নির্বাচনের একেবারে শেষ মুহূর্তে তিনি বিএনপির বিরুদ্ধে অবস্থান নেন তার বাবা মুফতি ইজহারুল ইসলাম। দীর্ঘদিন তিনি বিএনপির সাথে জোটে রাজনীতি করেছেন বিএনপি’র সাবেক চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার সহযোগী হয়ে। কিন্তু নির্বাচনের মাত্র পূর্বে তিনি একটি ভিডিও বার্তা দিয়ে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের উপর ২০ লাখ টাকা চাঁদাবাজির অভিযোগ এনে তার হাতে দেশ নিরাপদ নয় বলে তাকে বয়কট করা আহ্বান জানান। আবার নির্বাচনের পরপরই তার পুত্র হারুন ইজহারকে প্রধানমন্ত্রীর সাথে সাক্ষাৎ করে বই উপহার দিতে দেখা যায়। তারেক রহমান তার স্বাভাবিক উদারতা, ক্ষমা ও প্রতিশোধহীনতা নীতির কারণে তাকে মঞ্চে ওঠারও সুযোগ দেন। উলামা জনতা ঐক্য পরিষদ নামে তার একটি সংগঠন আছে।

এই সংগঠনের কয়েকটি সেমিনারে আমাকে দাওয়াত দিয়েছিলেন তিনি। আমি অংশ নিয়েছি সেখানে। অত্যন্ত বিনয়, শ্রদ্ধা এবং ভদ্রতা দেখিয়েছেন তিনি ও তার সমর্থকেরা। আয়োজনগুলো সুশৃংখল। কিন্তু সেখানে উত্থাপিত অনেক বক্তব্যের সাথে আমি একমত হতে পারিনি। যেমন ইরান ইসরাইল যুদ্ধ চলাকালে বায়তুল মোকাররম মসজিদে ফিলিস্তিন জনগণের প্রতি সংহতি জানানোর জন্য একটি সমাবেশে আমাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। আমি সেখানে গিয়ে দেখলাম, ফিলিস্তিনি জনগণের প্রতি সহানুভূতি এবং ইসরাইলের ধ্বংস কামনায় জোশের কোন কমতি নেই। অথচ আমি অবাক হলাম, ইরানের উপর ইসরাইল যে নির্বিচারে বম্বিং করছে সেটা নিয়ে কোন বক্তব্যই নেই তাদের। আমি আমার বক্তব্যে সেই প্রশ্ন তুললাম। বললাম, আপনারা ইসলামী ভ্রাতৃত্ববোধের কথা বলছেন, অথচ ইরানকে বাদ দিয়ে কেবল ফিলিস্তিনি জনগণের দুর্ভোগের কথা বলছেন। অর্থাৎ আপনাদের ভাতৃত্ববোধে পিক এন্ড চুজ আছে। ইসলামী ভ্রাতৃত্ববোধ বাদ দিলেও মানবিক কারণে হলেও একটি চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধের প্রতিবাদ্য করা যায়। আমার মূল কথাটি ছিল, এই জোশ দিয়ে অর্ধশতাধিক বছর ধরে আরবরা কেবল ইসরাইলি গুলির সামনে বুক পেতে শহীদ হতে পেরেছে। ইসরাইলের কিছুই করতে পারেনি। কিন্তু ইরান দেখিয়ে দিচ্ছে, কীভাবে ইসরাইলকে মোকাবেলা করতে হয়। আপনারা যদি সত্যিই ইসরাইলকে মোকাবেলা করতে চান তাহলে জ্ঞানে, বিজ্ঞানে প্রযুক্তি ও সমরাস্ত্রে নিজেদের উন্নত করুন। জোশে হুঁশ হারিয়ে ফায়দা নেই। জোশ কমিয়ে হুঁশ বাড়ান। সবাইকে জ্ঞানে বিজ্ঞানে প্রযুক্তিতে ও সমরাস্ত্রে উন্নত হওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিতে বলুন।

৩৬ জুলাই বিপ্লবের পরে যখন ইসলামপন্থীরা জোশে হুঁশ হারিয়ে বিশাল বিশাল কালিমা খচিত সাদাকালো পতাকা নিয়ে মিছিল করছিল, আবার সেই সব পতাকার ছবি বিশ্ব মিডিয়ায় ছড়িয়ে দিয়ে পরাজিত রাজনৈতিক ও আঞ্চলিক শক্তিসমূহ বিশ্বব্যাপী প্রচার চালিয়েছে বাংলাদেশে তালেবান ও আল-কায়েদার উত্থানের অভিযোগ দিয়ে। আওয়ামী লীগের পলাতক নেতাকর্মী এবং ভারতীয় গণমাধ্যম গুলো ঢাকার রাজপথে বিশাল বিশাল কলেমা খচিত পতাকা শোভিত মিছিলের সম্বলিত ছবি ও ভিডিও দ্বারা নিউজ করে বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার চালানো হয় যে, মূলত মার্কিন সহযোগিতায় আল কায়েদা, হিজবুত তাহরীর, তালেবানদের সম্মিলিত শক্তি আওয়ামী লীগকে ক্ষমতা থেকে উচ্ছেদ করেছে।

৩৬ জুলাই এর পর আবার দায়িত্বশীল ইসলামিক প্রতিনিধিদের কাউকে কাউকে আফগানিস্তানে ঘুরিয়ে আনা হয়, আফগানি তালেবানদের বিতর্কিত নেতাদের প্রকাশ্যে ও গোপনে বাংলাদেশ সফর করতে ও অবস্থান করতে দেখা যায়। পাকিস্তানের জঙ্গিবাদের সাথে অভিযুক্ত নেতাদের বাংলাদেশ সফরে পাঠানো হয়। তৈরি করা হয় টিটিবি প্লান্ট। আর এর মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ ও ভারত বাংলাদেশ তাদের দুঃশাসন, নির্মূল অভিযান ও পরাজয়কে লেজিটিমেট করতে চেষ্টা করেছে বিশ্বের কাছে। এবং তাতে পা দিয়েছে বাংলাদেশের একশ্রেণীর জোশে হুঁশ হারানো ইসলামপন্থীরা। অথচ এখন এই তালিবানরা আঞ্চলিক রাজনীতিতে ভারতের পরম মিত্র। এই তালিবানরা যারা এক সময় কাশ্মীরে জিহাদ করেছে, আজ ইসলামের চেয়ে ভারতকে বেশি বন্ধু হিসাবে গ্রহণ করেছে। অফিসিয়ালি জোর করে দখল করা মুসলিম অধ্যুষিত কাশ্মীরকে ভারতের ভূখণ্ড বলে মেনে নিয়েছে। ভারতের প্রক্সি হিসেবে টিটিপি তৈরি করে পাকিস্তানে মুসলমানদের ওপর বোমা হামলা করছে। যে যুক্তরাষ্ট্র একসময় আফগানিস্তান ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছে, তালিবানদের প্রতিনিধিরা এখন নিজেরাই সেই আফগানিস্তানে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি চাইছে।

জুলাই আন্দোলনে অনেক সাধারণ মাদ্রাসা ছাত্র জড়িত ছিল। তাদের অনেকে শহীদ ও আহত হয়েছেন। কিন্তু ইসলামপন্থী সংগঠনগুলো শেখ হাসিনার ক্ষমতা ছাড়ার দুইদিন আগ পর্যন্ত হাসিনার পায়রাবি ও তাঁবেদারি করে গেছে। তাহলে সেই সংগঠনের নেতারা হঠাৎ করে এত বিশাল বিশাল কলেমাখচিত পতাকা মিছিলে প্রদর্শন করল কেন? এটা কি জোশে করেছে? নাকি উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে আওয়ামীলীগ ও ভারতের ন্যারিটিভ প্রচারের যৌক্তিক প্রেক্ষাপট তৈরির জন্য মানুষের আবেগের ও উচ্ছ্বাসের ভেতরে কলেমা খচিত কালো পতাকা প্রদর্শন করা হয়েছে। আওয়ামী লীগ ও ভারত যে সমস্ত ছবি ও ভিডিও দিয়ে এখানে জঙ্গিবাদের উত্থান এবং জঙ্গিবাদের কাছে তাদের পরাজয় হয়েছে বলে বৈশ্বিক সহানুভূতি আদায়ের কৌশলকে যৌক্তিকতা দেয়ার জন্য ভেতর থেকে কেউ কেউ কলকাঠি নেড়ে এই সমস্ত কলেমাখচিত পতাকা মিছিলে উড়িয়ে দিয়েছে?

প্রশ্নটা আরো যৌক্তিক হয় যখন দেখা গেল, ৩৬ জুলাই বিপ্লবের পর হঠাৎ করে একটি গোষ্ঠী সারা ঢাকা শহরের মেট্রোরেল, এক্সপ্রেস ওয়ের পুল ও বিভিন্ন দেয়াল জুড়ে ইসলামিক ক্যালিগ্রাফি ও আকর্ষণীয় রঙিন দৃশ্য আঁকা শুরু করলো। এ ধরনের মনোলোভা শিল্পকর্ম মানুষের কাছে সমাদৃত হলেও কার্যত এই সমস্ত জায়গায় আওয়ামী লীগের দুঃশাসনের বিরুদ্ধে মানুষের যে প্রতিবাদী স্লোগান, বক্তব্য, চিকা, কার্টুন, যেগুলো বিপ্লবের বারুদে আগুন ধরিয়েছিল, যেগুলো দুঃশাসন ও জুলুমের নতিজা বহন করছিল সেগুলো ঢেকে দেয়া হলো। আমি তখনই এসবের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলাম। কেননা সৌন্দর্য বর্ধন যদি তাদের উদ্দেশ্য হতো তাহলে বিপ্লবের আগেও এবং পরেও তাদের এ ধরনের তৎপরতা দেখা যেত। কিন্তু ওই নির্দিষ্ট সময়েই এ ধরনের বিপুল উদ্যোগ মূলত ঢাকার দেয়াল থেকে ফ্যাসিবাদী দুঃশাসনের ও নির্যাতনের নমুনা ঢেকে দেয়ার উদ্দেশ্যেই পরিচালিত হয়েছিল বলে আমার গভীর বিশ্বাস। এবং এতে ব্যবহৃত হয়েছিল কিছু সাধারণ ইসলামপন্থীদের অনিয়ন্ত্রিত ও সংযত আবেগ। পিছন থেকে কল কাঠি নেড়েছিল আসলে ফ্যাসিবাদ ও তাদের পৃষ্ঠপোষকেরা।

বিশ্বের ইতিহাসের তাকালে দেখা যায় বিপ্লবীদের মাঝেই প্রতি বিপ্লবীরা লুকিয়ে থাকে। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারত একই সাথে মুক্তিবাহিনী ও মুজিব বাহিনীকে সহযোগিতা করেছে। যুদ্ধের পরেও রক্ষী বাহিনী ও গণবাহিনী তাদেরই সৃষ্ট এবং তারা পরস্পর মুখোমুখি।

৩৬ জুলাই অভ্যুত্থানের পরে কালো বা সাদা রঙের কলেমাখচিত পতাকা উত্তোলনের সাথে আজকের এই লোকগুলোর সংশ্লিষ্টতা দেখা গিয়েছে। এছাড়াও কয়েকজন বিতর্কিত পীর এবং হিজবুত তাহরীর নামে একটি সংগঠনের সদস্যদের বিরুদ্ধে এই পতাকা উত্তোলনের অভিযোগ তোলা হয়েছিল। হিজবুত তাহরীর নিজেকে সবসময় মার্কিন আধিপত্যবাদের বিরোধী হিসাবে প্রচার করে থাকে। কিন্তু আধিপত্যবাদের ক্রীড়নক ড. ইউনুস ও তার দোসরদের অন্তর্বর্তী সরকারের ব্যাপক সমর্থন যোগানোর অভিযোগ তোলা হয়েছিল সংগঠনটির বিরুদ্ধে। অন্তর্বর্তী সরকারের নিয়োগে হিজবুত তাহরীরের সাথে সরাসরি জড়িত বা পূর্বে জড়িত ছিল এমন কয়েকজনকে নিয়োগের অভিযোগ তোলা হয়। খলিল সাহেব ও তার মানবিক করিডরের পক্ষে জনমত করতে এই সংগঠনের সাবেক নেতাদের উদ্যোগ চোখে পড়ে। ইসলাম বিদ্বেষী শক্তিগুলো সব সময় ইসলামের ক্ষতি করতে ইসলামপন্থীদের ব্যবহার করেছে। ইসলামের বিরুদ্ধে ইসলামকেই দাঁড় করিয়েছে। এখন তো এটা পরিষ্কার আল কায়দা, আইসিস, দায়েশ কাদের তৈরি ছিল। আমি ২০০৬ সালে যখন প্রথম এ বিষয়ে বই লিখেছিলাম, “জঙ্গিবাদ: বাংলাদেশ কেন টার্গেট?” – সেই বইয়ে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছিলাম অনেক তথ্য- প্রমাণ ও রেফারেন্স সহ। আমার মূল বক্তব্যই ছিল, জঙ্গিবাদের সাথে ইসলামের কোন সম্পর্ক নেই। এটা ইসলামকে ধ্বংস করার জন্য, বিতর্কিত করার জন্য, চাপে ফেলার জন্য, ইসলামের অগ্রগতি রোধ করার জন্য পাশ্চাত্যের তৈরি একটি টার্মিনোলজি। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে মুসলমানরা এতে পাশ্চাত্যের ক্রীড়ানক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে সব সময়। সেখানে হয়তো আবু মুসাব জারকাউয়ি, আবু মোহাম্মদ আল জোলানির মত কয়েকজন ভাড়াটিয়া এজেন্ট থাকে, বাকিরা আবেগি, নির্দোষ ও ইসলামের প্রতি নিবেদিত মুসলিম। কিন্তু তারা বুঝতেও পারে না তারা কীভাবে, কার দ্বারা, কোন উদ্দেশ্য সাধনের জন্য প্রকৃতপক্ষে ব্যবহৃত হচ্ছে! তাদের শাহাদাতের তামান্না দিনশেষে ইহুদিদের ব্লুপ্রিন্ট বাস্তবায়ন করছে।

আইসিস ও দায়েশের কর্মীদের এভাবে আমরা দেখেছি সিরিয়ায় কলেমা খচিত পতাকা পিছনে ধরে রেখে মানুষকে জবাই করে ভিডিও তৈরি করতে এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে দিতে। কিন্তু পরে জানা গিয়েছে, এগুলো একটি বৃটিশ পিআর ফার্মের কাজ। সিরিয়ান জঙ্গিদের এসব সাজানো বা ভুয়া ভিডিও তৈরি করার অভিযোগ উঠেছিল ব্রিটিশ পিআর (PR) ফার্ম বেল পটিঞ্জার (Bell Pottinger)-এর বিরুদ্ধে। লন্ডনভিত্তিক এই জনসংযোগ প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল যে, তারা মার্কিন প্রতিরক্ষা সদর দফতর পেন্টাগনের কাছ থেকে বিপুল অর্থ নিয়ে ইরাক ও সিরিয়া যুদ্ধের সময় গোপন প্রোপাগান্ডা বা মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ (Psychological Operations) পরিচালনার অংশ হিসেবে আল-কায়েদা এবং অন্যান্য জঙ্গি গোষ্ঠীর স্টাইলে ভুয়া ও সাজানো ভিডিও তৈরি করেছিল। যে আল সারারের মাথার দাম যুক্তরাষ্ট্র ৫০ মিলিয়ন ডলার ঘোষণা করেছিল, আজ তাকে হোয়াইট হাউসে ডেকে নিয়ে কোলাকুলি করছে।

কাজেই আজকে যারা আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের পতাকার বিপরীতে কালিমার পতাকা দিয়ে বাংলাদেশ ছেয়ে দেয়ার কর্মসূচি পালন করছেন তাদের উদ্যোগকে কেবল সাদা চোখে দেখার সুযোগ নেই। হতে পারে রাস্তায় যে ছেলেটি এই পতাকা টানাচ্ছে সে হয়তো ইসলামের প্রতি আবেগে ভালোবেসে বা জোশে, পীর/আকাবীর নির্দেশে কাজটি করছে। কিন্তু ওই পীর বা মুরুব্বী হয়তো কারো ভাড়া খাটছে অথবা তিনিও অসচেতন ট্র্যাপ এ পড়েছেন। কেননা এ দেশের প্রায় সকল শীর্ষস্থানীয় ইসলামী ব্যক্তিত্বদের আকাবির ভারত, পাকিস্তান বা অন্য কোন তৃতীয় দেশে। এইসব বিদেশি আকাবিরদের সাথে সে সব দেশের বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার বিশেষ যোগাযোগের অভিযোগ থাকে। কলিন্স হামফার, টি এইচ লরেন্স, এলি কোহেন, লিওপোল্ড ওয়েইস, মারমা ডিউক পিক্থল তাদের নামগুলো বিখ্যাত হয়ে আছে। সম্প্রতি ইসরাইলের বিখ্যাত নারী গোয়েন্দা ক্যাথরিন প্যারেজ যিনি ইসলাম ও শিয়া ধর্মের উপর লেখালেখি করে সক্রিয়তা অর্জন করায় ইরান সরকারের আমন্ত্রণে ইরান সফরে যান এবং সেখানে ইরানের সর্বত্র যাতায়াতের সুযোগ পান। সেই সুযোগে জেনারেলদের তথ্য সংগ্রহ করে ফিরে যান। ধারণা করা হয় তার দেয়া তথ্য ব্যবহার করে মোসাদ ইরানি জেনারেলদের খুব সহজেই হত্যা করতে সক্ষম হয়। বাংলাদেশের জেএমবি নেতা শায়খ আব্দুর রহমান সৌদি আরবে সৌদি আরবের একটি বিশ্ববিদ্যালয় পড়াশোনা করতে গিয়ে সেখান থেকে উগ্র মতবাদে দীক্ষিত হন এবং দেশে ফিরে জেএমবি গঠন করেন। জেএমবির সাধারণ সদস্য যারা ৫০০ স্থানে বোমা বিস্ফোরণের সাথে জড়িত ছিল সেই শত শত আবেগী মুসলিমরা জানতো না তাদের এই কাজ মূলত চায়নার সাথে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা চুক্তি যেটা বেগম খালেদা জিয়া করতে গিয়েছিলেন সেটা আটকানোর জন্য মূলত ব্যবহৃত হবে। আমি নিশ্চিত এটা জানলে তারা কেউ এই কাজ যুক্ত হতেন না। তাদেরকে নিশ্চয়ই কোন ইসলামিক কজ দেখিয়ে মগজ ধোলাই করা হয়েছিল। তখন থেকেই আমি এ বিষয়টা নিয়ে ক্রমাগত ক্রমাগত লিখে গেছি। এখন তো বিষয়টি সকলের কাছে পরিষ্কার।

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক, গবেষক আন্তর্জাতিক বিষয়াবলির বিশ্লেষক, সম্পাদক পার্বত্যনিউজ।

Print Friendly, PDF & Email
ঘটনাপ্রবাহ: ইসলাম, কালিমা খচিত পতাকা, ধর্ম
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও পড়ুন