অগ্রাধিকার কোটার নামে পাহাড়ে বাড়ছে বৈষম্যের পাপ

fec-image

এতদিন ধরে পার্বত্য জেলাগুলোতে বিভিন্ন নিয়োগের ক্ষেত্রে উপজাতীয়দের অগ্রাধিকারের নামে (কমবেশি) ৭০% এবং বাঙালিদের ৩০% নিয়োগ করা হয়ে আসছে। এর ফলে পার্বত্য বাঙালিরা কতটা বঞ্চনা ও বৈষম্যের শিকার হচ্ছে সেটা কিছুটা অনুমান করা যায় পরিসংখ্যান দেখলে। ২০২২ সালের জনশুমারির প্রাথমিক প্রতিবেদন অনুসারে রাঙ্গামাটি জেলার মোট জনসংখ্যা ৬৪৭৫৮৭ জন। এর মধ্যে বাঙালি ২৭৪৭২৩ (৪২.৪২%) জন, তারা চাকরি পাবেন ৩০% এবং উপজাতি ৩৭২৮৬৪ (৫৭.৫৮%) জন, তারা চাকরি পাবেন ৭০%। খাগড়াছড়ির মোট জনসংখ্যা ৭১৪১১৯ জন। এর মধ্যে বাঙালি ৩৬৪৭৪১ (৫১.০৮%) জন, তারা চাকরি পাবেন ৩০% এবং উপজাতি ৩৪৯৩৭৮ (৪৮.৯২%) জন, তারা চাকরি পাবেন ৭০%। বান্দরবান জেলার মোট জনসংখ্যা ৪৮১১০৯ জন। এর মধ্যে বাঙালি ২৮৩১৩৪ (৫৮.৮৫%) জন, তারা চাকরি পাবেন ৩০% এবং উপজাতি ১৯৭৯৭৫ (৪১.১৫%) জন, তারা চাকরি পাবেন ৭০%।

রাঙামাটির একটি উপজেলা লংগদু, সেখানকার মোট জনসংখ্যা ৮৪৪৭৭ জন, এর মধ্যে বাঙালি ৬৩৫৯৫ (৭৫.২৮%) জন, তারা চাকরি পাবেন ৩০%; উপজাতি ২০,৮৮২ (২৪.৭৮%) জন, তারা চাকরি পাবেন ৭০%! খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গা উপজেলার মোট জনসংখ্যা ১২৬৬০৯ জন। এর মধ্যে বাঙালি ৯৬৩৫২ (৭৬.১০%), তারা চাকরি পাবেন ৩০%, উপজাতি ৩০২৫৭ (২৩.৯০%), তারা চাকরি পাবেন ৭০%। বান্দরবানের আলীকদম উপজেলার মোট জনসংখ্যা ৬৩৮০০ জন, এর মধ্যে বাঙালি ৩৮৬৮৭ (৬০.৬৪%) তারা চাকরি পাবেন ৩০% এবং উপজাতি ২৫১১৩ (৩৯.৩৬%) তারা চাকরি পাবেন ৭০%।

তবে বৈষম্যের এই অনুপাত মোটামুটিভাবে মেনে চলার চেষ্টা করা হয় বড় ধরনের নিয়োগের ক্ষেত্রে; কিন্তু যেসব ক্ষেত্রে ১০/১৫/২০ জনের ছোট ছোট নিয়োগ থাকে, সেই ক্ষেত্রে উপাজাতীয়দের অগ্রাধিকারের নামে ৮০%, এমনকি ৯০% পর্যন্ত নিয়োগ দেয়া হয়ে থাকে। যেমন ২০২৪ সালের ২৩ নভেম্বর রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের অধীনে RHDC- ERRD-CHT, UNDP’ এর যৌথ প্রকল্পের জনবল নিয়োগের ক্ষেত্রে মাত্র ১০ শতাংশ বাঙালি প্রার্থী নিয়োগ দিয়েছিল। উপজাতি নিয়োগ দিয়েছিল ৯০ শতাংশ, উপজাতিদের মধ্যে অধিকাংশই ছিল চাকমা জনগোষ্ঠির। ২০২৪ সালের ২০ ডিসেম্বর রাঙ্গামাটি জেলা পরিষদের অধীনে RHDC ও ILO এর যৌথ বাস্তবায়নাধীন ProGRESS প্রকল্পের ১০০ শতাংশ জনবল নিয়োগ দিয়েছে চাকমা জনগোষ্ঠি থেকে।

বাঙালিদের এসব ক্ষেত্রে কিছুই করার থাকে না। কিন্তু আপনারা যারা বিভিন্ন পর্যায়ের দায়িত্বে আছেন, তারা এই বৈষম্যের পাপকে কোন যুক্তিতে বৈধ করছেন?

আর এই বৈষম্য কি শুধু নিয়োগের ক্ষেত্রেই? মোটেই না। উন্নয়ন প্রকল্প, উন্নয়ন বরাদ্দ, শিক্ষা বৃত্তিসহ সকল ক্ষেত্রেই এই বৈষম্য করা হচ্ছে পার্বত্য চট্টগ্রামে। গত ১৩ মে ২০২৫ পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের বিশেষ প্রকল্প কর্মসূচি থেকে খাগড়াছড়ি জেলা পরিষদের অনুকূলে খাদ্যশস্য বরাদ্দের তালিকা প্রকাশ করা হয়। তবে এটি নতুন কোনো তালিকা নয়। এর আগে ২৭ মার্চ ২০২৫ যে তালিকা প্রকাশের পর স্বজনপ্রীতি, দুর্নীতি, জাতিগত বৈষম্যসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছিল, সেটি বাতিল করে সংশোধন করে এই তালিকা প্রকাশ করে মন্ত্রণালয়।

১৩ মে প্রকাশিত সংশোধিত তালিকায় ৫৮ জন ব্যক্তি/প্রতিষ্ঠানকে মোট বরাদ্দ প্রদান করা হয়েছে ১৫২২ মে. টন খাদ্যসশ্য। এর মধ্যে বাঙালি ৫ জন (৮.৬২%) বরাদ্দ পেয়েছেন ৮০ মে. টন (৫.২৬%), চাকমা পেয়েছেন ৫২ জন (৮৯.৬৬%) বরাদ্দ পেয়েছেন ১৪৩২ মে. টন (৯৪.০৯%) এবং মারমা পেয়েছেন ১ জন (১.৭২%) বরাদ্দ পেয়েছে ১০ মে. টন (০.৬৬%)।

এর আগে ২৭ মার্চ যে তালিকা প্রকাশ করা হয়েছিল, সেখানেও মোট ৫৮ ব্যক্তি/প্রতিষ্ঠানকে মোট ১৯১৩ মে. টন খাদ্যসশ্য বরাদ্দ দেয়া হয়েছিল। এর মধ্যে বাঙালি ৫ জন (৮.৬২%) বরাদ্দ পেয়েছেন ৮০ মে. টন (৪.১৮%), চাকমা পেয়েছেন ৫২ জন (৮৯.৬৬%) বরাদ্দ পেয়েছেন ১৮২৩ মে. টন (৯৫.৩০%) এবং মারমা ১ জন (১.৭২%) বরাদ্দ পেয়েছেন ১০ মে. টন (০.৫২%)।

অথচ, ২০২২ সালের জনশুমারির প্রাথমিক প্রতিবেদন অনুসারে খাগড়াছড়ির মোট জনসংখ্যা ৭১৪১১৯ জন। এর মধ্যে বাঙালি ৩৬৪৭৪১ (৫১.০৮%) জন এবং অবাঙালি ৩৪৯৩৭৮ (৪৮.৯২%) জন। অবাঙালিদের মধ্যে চাকমা ১৭৫,১৬৫ (২৪.৫৩%) জন, ত্রিপুরা ৯৮,৫০০ (১৩.৮০%) জন, মারমা ৭৪,২১০ (১০.৩৯%) জন এবং অবশিষ্টরা অন্যান্য জনগোষ্ঠির।

অর্থাৎ জনসংখ্যানুপাতে খাদ্যসশ্য বণ্টিত হলে বাঙালিদের পাওয়ার কথা ৫১.০৮% পেয়েছে ৮.৬২%, চাকমাদের পাওয়ার কথা ২৪.৫৩% পেয়েছে ৮৯.৬৬%, মারাদের পাওয়ার কথা ১০.৩৯% পেয়েছে ১.৭২%, ত্রিপুরাদের পাওয়ার কথা ১৩.৮০% পেয়েছে ০.০০%।

শুধু কি খাদ্যশস্য বণ্টনেই পার্বত্য মন্ত্রণালয় থেকে এই জাগিত বৈষম্য করা হচ্ছে? না, এই বৈষম্য করা হচ্ছে সর্বক্ষেত্রে। উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা যায়, পার্বত্য মন্ত্রণালয় গত ২৫ মার্চ ২০২৫ খাগড়াছড়ি জেলা পরিষদের মাধ্যমে বণ্টনের জন্য আপদকালীন পরিস্থিতি মোকাবেলায় ১৯৫ ব্যক্তি/প্রতিষ্ঠানকে ৩ কোটি ১২ লাখ ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দ দিয়ে একটি তালিকা প্রকাশ করেছিল।

পার্বত্য মন্ত্রণালয় প্রকাশিত ১৯৫ ব্যক্তি/প্রতিষ্ঠানের তালিকা পর্যবেক্ষণ করে দেখা যায় বাঙালি ৪১ (২১.০৩%), চাকমা ১০০ (৫১.২৮%), মারমা ৪২ (২১.৫৪%), ত্রিপুরা ১০ (৫.১৩%) এবং সাঁওতাল ২ (১.০৩%) অর্থ বরাদ্দ পেয়েছেন। জেলায় মোট বরাদ্দকৃত ৩ কোটি ১২ লাখ ৫০ হাজার টাকার মধ্যে বাঙালি ৪২ লাখ ৯০ হাজার টাকা (যা মোট বরাদ্দের ১৩.৭৩%), চাকমা ২ কোটি ২৮ লাখ ৪০ হাজার টাকা (যা মোট বরাদ্দের ৭৩.০৯%), মারমা ২১ লাখ ৭০ হাজার টাকা (যা মোট বরাদ্দের ৬.৯৪%), ত্রিপুরা ১৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা (যা মোট বরাদ্দের ৫.৬০%) এবং সাঁওতাল ২ লাখ টাকা (যা মোট বরাদ্দের ০৬৪%) পেয়েছেন।

বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন থেকে সৃষ্ট শক্তি যখন দেশের সরকার, তখন সেই সরকারের আমালে দেশের একটি অংশে এমন বৈষম্য কীভাবে চলতে পারে?

লেখক: সাংবাদিক ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক গবেষক।

Print Friendly, PDF & Email
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও পড়ুন