পোল্যান্ডে রুশ ড্রোন অনুপ্রবেশ

পূর্ব ইউরোপে নিরাপত্তা জোরদার করছে ন্যাটো

fec-image

পোল্যান্ডের আকাশসীমায় রাশিয়ার এক ডজনেরও বেশি ড্রোন ঢুকে পড়ার ঘটনার পর পূর্ব ইউরোপে নিরাপত্তা জোরদার করছে ন্যাটো। পশ্চিমা সামরিক জোটটি ওই অঞ্চলে অস্ত্রশস্ত্র বাড়াতে নতুন মিশন শুরু করেছে। এই মিশনে ইতোমধ্যে ডেনমার্ক, ফ্রান্স ও জার্মানি যোগ দিয়েছে। আরও কয়েকটি ন্যাটো মিত্র দেশ শিগগির এতে অংশ নেবে বলে আশা করা হচ্ছে। খবর বিবিসি ও আলজাজিরার।

গত বুধবার পোল্যান্ড জানায়, মোট ১৯টি ড্রোন তাদের আকাশসীমায় প্রবেশ করেছে। এর মধ্যে কিছু ভূপাতিত করা হয়, বাকিগুলো মাঠে ও একটি বাড়িতে গিয়ে পড়েছে। পোল্যান্ড জানিয়েছে, ইচ্ছাকৃতভাবে এটা করা হয়েছে। তবে মস্কো বলছে, তাদের পোল্যান্ডে হামলার কোনো পরিকল্পনা ছিল না।

রাশিয়া পূর্ণমাত্রায় ইউক্রেনে আগ্রাসন শুরুর পর থেকে কয়েকবার সীমান্তবর্তী দেশগুলোয় ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ঢুকে পড়ার ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু এবারের অনুপ্রবেশকে সবচেয়ে গুরুতর বলে মনে করা হচ্ছে। পোলিশ প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টাস্ক একে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সংঘাতের সবচেয়ে কাছাকাছি পরিস্থিতি হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

ন্যাটোর প্রতিক্রিয়া
ডেনমার্ক ঘোষণা দিয়েছে, তারা পোল্যান্ডের আকাশ প্রতিরক্ষা জোরদার করতে দুটি এফ-১৬ যুদ্ধবিমান ও একটি যুদ্ধজাহাজ পাঠাবে। ডেনিশ প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেন বলেন, ‘পুতিন থামবে না, আমাদের পরীক্ষা করছে। তাই ডেনমার্কের অবদান রাখা জরুরি।’

ফ্রান্স জানিয়েছে, তারা তিনটি রাফাল যুদ্ধবিমান পাঠাবে। জার্মানি চারটি ইউরোফাইটার পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। যুক্তরাজ্যও জানিয়েছে, ‘ইস্টার্ন সেন্ট্রি’ অভিযানে তারা পূর্ণ সমর্থন দেবে এবং শিগগির বিস্তারিত জানানো হবে।

শুক্রবার নিউইয়র্কে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের জরুরি বৈঠকে ইউরোপীয় দেশগুলো ও যুক্তরাষ্ট্র পোল্যান্ডের প্রতি সমর্থন জানায়। মার্কিন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূত ডরোথি শিয়া বলেন, ‘আমরা ন্যাটোর প্রতিটি ইঞ্চি রক্ষা করব। পোল্যান্ডের আকাশসীমায় এ ধরনের অনুপ্রবেশ অত্যন্ত উদ্বেগজনক।’

তিনি আরও উল্লেখ করেন, প্রায় এক মাস আগে আলাস্কায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের বৈঠকের পর থেকেই ইউক্রেনের শহর ও অবকাঠামোতে রাশিয়ার হামলা বেড়েছে। ইউরোপীয় মিত্রদের ভাষ্য, এর মাধ্যমে প্রমাণ হয়েছে, পুতিন যুদ্ধ শেষ করার কোনো আগ্রহ দেখাচ্ছেন না।

পোল্যান্ডের পররাষ্ট্র দপ্তরের সচিব মারসিন বোস্যাকি জাতিসংঘে এক বৈঠকে ভূপাতিত ড্রোন ও ক্ষতিগ্রস্ত বাড়ির ছবি তুলে ধরে বলেন, ‘এটি ভুলবশত হয়নি, আমরা নিশ্চিত।’

রাশিয়ার জাতিসংঘে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূত ভাসিলি নেবেনজিয়া পাল্টা যুক্তি দিয়ে বলেন, ড্রোনগুলোর সর্বোচ্চ পাল্লা ৭০০ কিলোমিটার, যা দিয়ে পোল্যান্ডে পৌঁছানো সম্ভব নয়। তিনি অভিযোগ করেন, পোল্যান্ড পরিস্থিতি শান্ত করার বদলে উত্তেজনা ছড়াচ্ছে।

আঞ্চলিক পরিস্থিতি
নেদারল্যান্ডস ও চেক প্রজাতন্ত্র পোল্যান্ডে অতিরিক্ত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছে। লিথুয়ানিয়া একটি জার্মান ব্রিগেড পাবে, সঙ্গে থাকবে ইউক্রেনের আকাশসীমা অতিক্রম করতে পারে এমন রুশ হামলার আগাম সতর্কবার্তা।

এদিকে, শুক্রবার রাশিয়া ও বেলারুশ যৌথ সামরিক মহড়া শুরু করেছে, যা তারা প্রতি চার বছরে একবার আয়োজন করে। এই মহড়া পোল্যান্ড ও লিথুয়ানিয়ার সীমান্তের কাছে, একই সঙ্গে বাল্টিক ও বারেন্টস সাগরেও অনুষ্ঠিত হচ্ছে। রাশিয়া ও বেলারুশ বলছে, মহড়ার উদ্দেশ্য প্রতিরক্ষা শক্তি যাচাই, প্রতিবেশী দেশগুলোর জন্য কোনো হুমকি নয়।

কূটনৈতিক অচলাবস্থা
ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ জানান, শান্তি আলোচনায় ‘বিরতি’ এসেছে এবং এর জন্য ইউক্রেনের ইউরোপীয় মিত্রদের দায়ী করেন তিনি। আর ট্রাম্প সতর্ক করেন, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের প্রতি তাঁর ধৈর্য দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। একই সঙ্গে তিনি মস্কোর ওপর ব্যাংক, তেল ও শুল্ক খাতে নতুন করে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপের হুমকি দিয়েছেন।

শুক্রবার ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ব্যাংক, তেল ও শুল্ক– সব দিক থেকেই খুব কঠোর নিষেধাজ্ঞা আসছে। রাশিয়াকে শাস্তি দিতে এরই মধ্যে অনেক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। উদাহরণ হিসেবে তিনি ভারতের ওপর আরোপিত বাড়তি শুল্কের কথা উল্লেখ করেন, যা রাশিয়ার জ্বালানি কেনার কারণে বাড়ানো হয়েছিল। ট্রাম্পের দাবি, ‘এটা মূলত ইউরোপের সমস্যা, যুক্তরাষ্ট্রের নয়।’

গত মাসে ট্রাম্প-পুতিন বৈঠকের পর ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে সরাসরি আলোচনার আহ্বান জানিয়েছিলেন ট্রাম্প। কিন্তু তাতে কোনো অগ্রগতি হয়নি।

এদিকে, রাশিয়া থেকে তেল কিনছে এমন দেশগুলোর ওপর শুল্ক আরোপ করতে যুক্তরাষ্ট্র তার মিত্রদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে।

শুক্রবার জি৭ ভুক্ত দেশগুলোর অর্থমন্ত্রীদের এক ভার্চুয়াল বৈঠকে এ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। বৈঠকে রাশিয়ার ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা এবং ইউক্রেন যুদ্ধ চালিয়ে যেতে তাঁকে ‘সহায়তা করছে’ এমন দেশগুলোর ওপর সম্ভাব্য শুল্ক আরোপ নিয়েও কথা বলেন তারা।

এর আগে এই সপ্তাহে ট্রাম্প ইউরোপীয় নেতাদের জানান, প্রয়োজনে ভারত ও চীনের ওপর নতুন করে কঠোর শুল্ক আরোপ করবেন তিনি। তবে শর্ত হলো, ইউরোপকেও একই পদক্ষেপ নিতে হবে। ব্লুমবার্গ জানায়, ওয়াশিংটনে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও মার্কিন কর্মকর্তাদের বৈঠকে ফোনে যোগ দিয়ে ট্রাম্প এ প্রস্তাব দেন।

Print Friendly, PDF & Email
ঘটনাপ্রবাহ: জার্মানি, ডেনমার্ক, ন্যাটো
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও পড়ুন