গ্যাস অনুসন্ধানে পার্বত্যাঞ্চলে ত্রি-মাত্রিক জরিপ চালাবে বাপেক্স

fec-image

পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রাকৃতিক গ্যাস অনুসন্ধানে ত্রি-মাত্রিক জরিপ বা থ্রি-ডি সিসমিক সার্ভে চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলন কোম্পানি-বাপেক্স। রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান এ নিয়ে গঠিত পার্বত্য অঞ্চল। আর এর সাথে যদি যুক্ত করা হয় চট্টগ্রামকে তা হবে দেশের মোট আয়তনের ১৩ শতাংশ। এই অঞ্চলকে ষাটের দশক থেকে তেল-গ্যাসের জন্য ধরা হয় সম্ভবনাময় একটি এলাকা। আর সেই পার্বত্য অঞ্চল থেকে গ্যাস খুঁজতে এবার ত্রি-মাত্রিক জরিপ করবে রাষ্ট্রায়ত্ত তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলন কোম্পানি-বাপেক্স।

ত্রি-মাত্রিক জরিপ বা থ্রি-ডি সিসমিক সার্ভের মাধ্যমে অত্যন্ত দুর্গম ও জটিল এলাকায়ও ভূ-গঠনের সার্বিক চিত্র পাওয়া সম্ভব। মাটির নিচের প্রাকৃতিক সম্পদেরও ধারণা পাওয়া যায়। বাপেক্সের বোর্ড সম্প্রতি এর অনুমোদন দিয়েছে বলে জানা গেছে।

প্রতিষ্ঠানটির বোর্ড চেয়ারম্যান ও জ্বালানি বিভাগের সিনিয়র সচিব মো. আনিছুর রহমান এই অঞ্চলে গ্যাস ও পেট্রোলিয়াম পাওয়ার ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে জানিয়ে বলেন, পার্বত্যাঞ্চল, খাগড়াছড়ি থেকে নোয়াখালী, ফেনী পর্যন্ত অঞ্চলে আমরা থ্রি-ডি সিসমিক সার্ভে করবো।

তিনি আরো বলেন, পার্বত্য এলাকায় কাজ করার জন্য বাপেক্সের সক্ষমতা নেই। সেজন্য আউট সোর্সিং করে বিদেশি কোম্পানি ঠিক করে তার সাথে যৌথভাবে কাজ করবে বাপেক্স। বাপেক্সই তাদের বিল দেবে।
এর আগে দুই দফায় পার্বত্য চট্টগ্রামে গ্যাস অনুসন্ধানের উদ্যোগ নিলেও তা আলোর মুখ দেখেনি। প্রথম দফায় বাপেক্সের সাথে বিদেশি কোম্পানির কাজ করার অনুমোদন দেয়নি জ্বালানি বিভাগ। ২০১৪-১৫ সালে অনুমোদন মিললেও আগ্রহ দেখায়নি বিদেশি কোনো কোম্পানি। পার্বত্য চট্টগ্রামের মতো দুর্গম এলাকায় বাপেক্সের অনভিজ্ঞতার কথা চিন্তা করে এবার শুরু থেকেই বিদেশি কোম্পানির সহায়তার কথা ভাবছে মন্ত্রণালয়।

বাপেক্সের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মর্তুজা আহমেদ ফারুক মনে করেন, পার্বত্য অঞ্চলে যারা কাজ করবে তাদের নিরাপত্তা জোরদার করতে হবে সবার আগে। এই নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তিনি উল্লেখ করেন, অতীতে এই নিরাপত্তার জন্য বিদেশি অনেক কোম্পানি কাজ না করে চলে গেছে।

পার্বত্য এলাকায় অনুসন্ধান কার্যক্রম চালাতে গত কয়েক বছরে রাশিয়া, উজবেকিস্তান ও জাপানের কয়েকটি প্রতিষ্ঠান আগ্রহ দেখিয়েছে। তাই এ বছরের শুরুতে রাশিয়ান কোম্পানি গ্যাজপ্রমের সাথে কৌশলগত চুক্তি করেছে বাপেক্স।

উল্লেখ্য যে, দেশের মোট আয়তনের ১০ শতাংশের বেশি অংশ পড়েছে পার্বত্য তিন জেলায়। বিভিন্ন সময় আলাপ-আলোচনা হলেও, এই অঞ্চলে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে তেমন কোনো কাজ করেনি সরকার।
যদিও পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে এখানে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান চালায় বিদেশি কয়েকটি কোম্পানি। সেই ছয় দশক আগেই এখানে অন্তত ছয়টি ক্ষেত্র চিহ্নিত। এগুলো জালদি, সীতাপাহাড়, পটিয়া, পাথারিয়া, সুনেত্র আর কাসালং নামে পরিচিত।

গেল এক দশকে পার্বত্য এলাকায় তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে দুই দফা উদ্যোগ নেয় বাপেক্স। প্রথমবার অনভিজ্ঞতার কারণে অংশীদার কোম্পানি চাইলেও চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়নি সরকার। আর ২০১৪-১৫ সালে অনুমোদন মিললেও আগ্রহ দেখায়নি কোনো কোম্পানি। তবে গত দুই দফা ব্যর্থতার জন্য এককভাবে বাপেক্সকে দায়ী করাটা অযৌক্তিক মনে করেছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা মনে করেন, জ্বালানি বিভাগের সিদ্ধান্তহীনতার কারণে দেশের পার্বত্য এলাকায় সম্পদ অনুসন্ধানের কাজ শুরু করতে পারেনি বাপেক্স।

সূত্রগুলো বলছে, ২০১০-১১ এবং ২০১৪-১৫ সালে দুই দফায় অংশীদার কোম্পানি খোঁজে বাপেক্স। উদ্দেশ্য ছিল, এখানে ওইসব কোম্পানির সঙ্গে বাপেক্স যৌথভাবে কাজ করবে। যেহেতু বাপেক্স’র পার্বত্য এলাকায় কাজ করার অভিজ্ঞতা নেই তাই অংশীদার খোঁজার অনুমতি দেয় সরকার।

প্রথম দফায় কয়েকটি কোম্পানি বাপেক্স’র সঙ্গে কাজ করার আগ্রহ দেখায়। সেবার সরকারের সায় মিললে এতদিনে ওই এলাকার সম্পদ তুলে আনা সম্ভব হতো। কিন্তু তখন কোনো কোম্পানির সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করার অনুমতি দেয়নি সরকার। ফলে তখন ২০১০-১১ এর প্রক্রিয়া থেমে যায়।

যদিও তখন বাপেক্স’র তরফ থেকে বলা হয়, চীনের সিনোপ্যাকের সঙ্গে কাজ করার বিষয়টি তারা চূড়ান্ত করে সরকারের অনুমোদনের অপেক্ষায় পাঠায়। ওই সময়ও বলা হয়েছিল, যৌথভাবে চট্টগ্রামের পটিয়া, জলাদি এবং সীতাকু-ে তেল গ্যাস অনুসন্ধানের কাজ করা হবে। চার বছরের মাথায় আবার নতুন করে বাপেক্সকে বলা হয় অংশীদার খুঁজতে। নতুন করে পার্বত্য এলাকায় কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে এমন কোম্পানির কাছে আগ্রহপত্র চায় বাপেক্স।

শেষ পর্যন্ত ২০১৪-১৫ সালে চীনের জিও জাদি পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন এবং লংহুড সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির (বেইজিং) সঙ্গে চুক্তি করার বিষয়ে অনেক দূর এগোলেও চীনা কোম্পানিটি শেষে আর আগ্রহ দেখায়নি। এর ঠিক প্রায় ৬ বছর পর আবারও তেল গ্যাস অনুসন্ধানে উদ্যোগ নিয়েছে বাপেক্স।

গত কয়েক বছর ধরে রাশিয়া, উজবেকিস্তান এবং জাপানের কয়েকটি প্রতিষ্ঠান কাজ করতে আগ্রহ দেখায়। আর বাপেক্স এবার কৌশলগতভাবে কাজের চুক্তি করেছে রাশিয়ার একটি প্রতিষ্ঠানের সাথে।
তবে তার আগে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের বাংলাদেশে কাজ করার নিশ্চয়তা দরকার বলে মনে করছেন সাবেক বাপেক্স এমডি মর্তুজা আহমেদ ফারুক।

সূত্র বলছে, ৫০ দশকের গোড়ার দিকে পটিয়াতে একটি বিদেশি কোম্পানি গ্যাসকূপ খনন করার কাজ শুরু করে। কিন্তু তখন ওই এলাকা দুর্গম এবং নিরাপত্তাহীন হওয়ার পাশাপাশি গ্যাসের বাজার তৈরি না হওয়ায় কাজ বন্ধ করে দেয় তারা। পরবর্তীতে ৬০ দশকের মাঝামাঝি সময়ে জালদি এবং ৮০ দশকে সিতা পাহাড়ে অনুসন্ধান চালানো হয়। এছাড়াও একটি আইওসি কাছালংয়ে কাজ করার জন্য প্রস্তুত ছিল।

এদিকে পার্বত্য চট্টগ্রামের একমাত্র গ্যাসক্ষেত্র পার্বত্য খাগড়াছড়ির মানিকছড়ির সেমুতাং গ্যাস ফিল্ডের ৬নং কূপে পানির চাপ বেড়ে যাওয়ার ফলে হালদার পানি দূষণের আশঙ্কা নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের সত্যতা পাওয়ার কারণে বাপেক্স ২০১৪ সালের৩র ডিসেম্বর থেকে ৬নং কূপটি বন্ধ করে দিয়েছে।

মানিকছড়ি সদর থেকে ১০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে কালাপানি এলাকায় হালদার উজানে সেমুতাং গ্যাসফিল্ডটি অবস্থিত। এ গ্যাস ফিল্ডের ৫ নং কূপ থেকে ২০১১ সালের ডিসেম্বরে প্রথম গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয়। পরে বাপেক্স পুরাতন ১নং কূপের পাশে পাহাড় বেষ্টিত এলাকায় ৬নং কূপ খননের উদ্যোগ নেয়। প্রায় দুই’শ কোটি টাকায় ব্যয়ে কূপটি খননের কাজ পায় রাশিয়ান কোম্পানি গেজপ্রম।

এ কূপের খনন কাজটি শেষ করে গেজপ্রমের সহযোগী বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠান কে.এন। ২০১৪ সালের ১৯ জানুয়ারি থেকে ১২ এপ্রিল পর্যন্ত নানা সমস্যা কাটিয়ে এ গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয়। শুরুতে এ কূপ থেকে প্রতিদিন গড়ে ৪.৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ হলেও ৭ মাসের মধ্যে তা ২.২ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমে এসেছে।

প্রতিদিন গড়ে সাড়ে ৩ হাজার ব্যারেল পানি উঠায় তা নিয়ে এক পর্যায়ে বিপাকে পড়তে হয়। ফলে অপরিশোধিত পানিতে শোধনাগার উপচে আশে-পাশের জমি এবং হালদায় পড়তে থাকে। ফলে জমির ফসল, মাটিসহ পুরো হালদার পরিবেশ দূষিত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়। বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর বিষয়টি কর্তৃপক্ষের নজরে আসে। ফলে কর্তৃপক্ষ ৩ ডিসেম্বর কূপটি বন্ধ করে দেয়।

এই সেমুতাং গ্যাসক্ষেত্রটির ইতিহাস অনেক পুরানো এবং দেশ-বিদেশে পরিচিত। পার্বত্য খাগড়াছড়ি ও চট্টগ্রামের সীমান্তবর্তী উপজেলা ঐতিহ্যবাহী মংরাজার আবাসস্থল মানিকছড়ি উপজেলার কালাপানি মৌজার ২১ একর ভূমির উপর ১৯৬৩ সালে ব্রিটিশ কোম্পানির একটি অনুসন্ধানী দল এই গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার করে। ৫টি কূপের মাধ্যমে ১৯৬৯ সালে সর্বপ্রথম পরীক্ষামূলকভাবে র্দীঘ ১বছর ধরে গ্যাস ও তেল উত্তোলন করে। এতে প্রচুর পরিমাণ তেল ও গ্যাসের মজুতের সন্ধান পাওয়ায় এই গ্যাসক্ষেত্র নিয়ে বিশ্বব্যাপী আলোচনার সৃষ্টি হয়।

এরপর হতেই এ গ্যাস ক্ষেত্রে ষড়যন্ত্র শুরু হয় বলে স্থানীয়দের অভিযোগ ছিলো। যদিও এ নিয়ে তথ্যভিত্তিক কোনো গবেষণা হয়নি। এক পর্যায়ে ২নং কূপে পাহাড়ি সন্ত্রাসীরা বোমা মেরে রিগ মেশিনসহ ওয়েল হেডটি সস্পূর্ণরূপে ভূ-গর্ভে তলিয়ে দেয়। আজও সেই কূপ থেকে অঝোরে বুদ বুদ করে গ্যাস বের হচ্ছে। এতে ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়ে আসছে। দর্শনার্থীরা দীর্ঘ ৫ কিলোমিটার এলাকার পাহাড়, জমি, পানিতে, গ্যাসের বুদ বুদ দৃশ্য দেখে অবাক হচ্ছে! অনেকে আবার তাতে আগুন ধরিয়ে উল্লাস করছে। এ সন্ত্রাসী কার্যক্রমের পর গ্যাস ক্ষেত্রের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেলে সীমান্তের ওপারে ভারত নতুন কূপ খনন করে গ্যাস ও তেল উত্তোলন শুরু করে এবং সেখান থেকে আগেই এ গ্যাস উত্তোলনের ফলে পার্শ্ববর্তী গ্যাসক্ষেত্র গ্যাসের সংকটে পড়ে যায়।

‘৭০ এর দশকে আবার কার্যক্রম শুরু হলে দেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের কারণে তা বন্ধ হয়ে যায়। এক যুগ পর ১৯৮৩ সালে পেট্রোবাংলাপুনরায় ‘সেমুতং’ চালু করলেও হঠাৎ দু’জন প্রকৌশলীকে অপহরণ করে হেডম্যান পাড়ায় লাশগুম করে তৎকালীন শান্তিবাহিনী। ফলে এক পর্যায়ে কাজ বন্ধ হয়ে যায়। অপহরণকৃত প্রকৌশলীদের রেখে যাওয়া জরিপে গ্যাসক্ষেত্রের ৫নং কূপে হীরা, গন্ধক পাওয়ার প্রচুর সম্ভবনা ছিল বলে এলাকাবাসীরা তখন দাবি করেছিলেন। যার কারণেই তাদেরকে জীবন দিতে হয়েছে বলে এলাকাবাসীর ধারণা। তবে আজ পর্যন্ত ওই হত্যাকা-ের কোনো তদন্ত হয়নি।

পরবর্তীতে ১৯৯৪, ১৯৯৭, ২০০০, ২০০৪ সালে বিভিন্ন কোম্পানির সাথে চুক্তি ও গ্যাসের ব্যবহার নিয়ে পেট্রোবাংলার সিদ্ধান্তহীনতার কারণে বার বার উত্তোলন ব্যর্থ হয়ে পরিত্যক্ত অবস্থায় গ্যাসক্ষেত্রটি অভিভাকহীন হয়ে পড়ে। এর মধ্যে গ্যাসক্ষেত্রের ব্যারাকে রক্ষিত কেয়ার্ন এনার্জি কোম্পানির উন্নত মানের মালামাল ও জেনারেটরসহ বিভিন্ন লোহার যন্ত্রাংশগুলো পাহারাদাররা কালো বাজারে বিক্রি করে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে।

সর্বশেষ আওয়ামী লীগ সরকার ২০০৯ সালে একনেক সভার সিদ্ধান্তানুয়ায়ী বাপেক্স ২০১১ সালে ৫নং কূপ থেকে পাইপ লাইনের মাধ্যমে র্দীঘ ৬৫ কি.মিটার দূরে চট্টগ্রাম শহরের জাতীয় গ্রিডে এ গ্যাস সংযোগ চালু করে। শুরুতে গ্যাসের গতি ১৫-১৭ মিলিয়ন ঘনফুট থাকলেও পরবর্তীতে তা নিন্ম পর্যায়ে নেমে আসে। এতে বাপেক্স চিন্তিত হয়ে পড়ে। পরে বাপেক্স পুরাতন (দেবে যাওয়া) ১নং কূপের পাশে পাহাড় বেষ্টিত ৬নং কূপ খনন শুরু করে রাশিয়ান কোম্পানি গেজপ্রম’র সহযোগী প্রতিষ্ঠান (বাংলাদেশি) ড. হাসান মাহমুদ চৌধুরীর পরিচালনাধীন কে.এন।

Print Friendly, PDF & Email
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

one + 1 =

আরও পড়ুন