পার্বত্য উপজাতীয় অধিবাসীরা আদিবাসী নয়

0913ccd2ba527c520c96a132ae464d30

ইব্রাহীম খলিল:

পাঠকের অভিমত

বাংলাদেশের মোট আয়তন ১,৪৭,৫৭০ বর্গ কিলোমিটার ৷ তার এক-দশমাংশ আয়তন জুড়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম৷ রাংগামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান-এ তিনটি জেলা নিয়ে পার্বত্য অঞ্চল গঠিত৷ এ তিনটি জেলার মোট আয়তন ১৩,২৯৫ বর্গ কি. মি. ৷ যা পুর্ব তিমুরের সমান ও ইসরাইলের কাছাকাছি। ২০০১ সালের আদমশুমারী অনুযায়ী এ অঞ্চলের মোট জনসংখ্যা ১৩,৪৪,৩০৩ জন৷ তন্মধ্যে উপজাতীয় জনসংখ্যা ৬,৯৯,১৯৪এবং অ-উপজাতীয় জনসংখ্যা ৬,৪৫,১০৯ জন ৷

বাংলাদেশে উপজাতি রয়েছে ৪০ থেকে ৪৫টির মতো। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো— চাকমা, মারমা, সাঁওতাল, গারো, মণিপুরী, মুরং, খাসি, হাজং,ওঁরাও, রাজবংশী। যাদের মধ্যে চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, চাক, মুরং ইত্যাদি প্রায় ১৩টি উপজাতির বাস আমাদের পার্বত্য চট্টগ্রামে । এদের আগমন “সিনলুনও চীন” (লুসাই, পাংখু, মোরো ও খুমি গোত্র) , ভারতের “ত্রিপুরা রাজ্য” (ত্রিপুরা, মুরং, রিয়ং), বার্মা বা মায়ানমারের “আরাকান” (চাকমা, মগ ইত্যাদি গোত্র ) হতে। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য এবং সবচাইতে বড় গোষ্ঠী হলো ‘চাকমা’ যারা মূলত মায়ানমারের অধিবাসী; এরা ১৫৯৩ সালে আরাকান রাজার সাথে যু্দ্ধে পরাজিত হয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে এসে আবাস গড়ে তুলেছে।

অ-উপজাতীয়দের এ মধ্যে মুসলমান, হিন্দু ও খ্রিষ্টান ধর্মালম্বী প্রধান ৷ এসব উপজাতীয় ও অ-উপজাতীয় জনগোষ্ঠী তাদের নিজ নিজ ভাষা, সংস্কৃতি, ধর্ম, ঐতিহ্য ও কৃষ্টির স্বকীয়তা বজায় রেখে যুগ যুগ ধরে একে অপরের পাশাপাশি বসবাস করে আসছে ৷ পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলটি ১৮৬০ সনে একটি স্বতন্ত্র জেলার মর্যাদা লাভ করে৷ পরবর্তীতে এ অঞ্চল তিনটি জেলায় রূপান্তরিত হয় । পার্বত্য চট্টগ্রামের অধিবাসীরা গত কয়েক শতক ধরেই উপজাতীয় হিসেবেই পরিচিত ছিল।

কিন্তু হঠাৎ বিগত কয়েক বছর ধরে ঘটা করে পালন করা হচ্ছে কথিত আদিবাসী দিবস। মস্তিষ্ক বিক্রিকারী দেশীয় মিডিয়া এক্ষেত্রে নাটের গুরু হিসেবে কাজ করছে। সাথে আছে কিছু বাম ইয়াতিম ও কথিত সুশীল গ্রুপ। শত-সহস্র প্রমাণ হাজির করার পরেও ওরা মানতে রাজি নয় যে পার্বত্য উপজাতীয় অধিবাসীরা আদিবাসী নয়। বলতে গেলে গায়ের জোরে ও মিডিয়ার জোরে বলতে চাচ্ছে পার্বত্য এলাকার অধিবাসীরা নাকি কথিত আদিবাসী । আগামী ৯ আগস্ট সেই কথিত আদিবাসী দিবস যা কিনা ডাকঢোল পিটিয়ে পালন করা হবে। তবে ঈদের কারণে অবশ্য এবছর সময় কিছুটা এগিয়ে আনা হয়েছে।

বিগত আওয়ামী সরকারের আমলে ১৯৯৬-২০০১ (সঠিকভাবে বলতে গেলে ১৯৯০ এর পর) কথিত শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের পর থেকেই এদেরকে আবার আদিবাসী হিসেবে চিহ্নিত করার ব্যাপক প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এরা আসলে উপজাতী নাকি আদিবাসী তা জানার জন্য আসুন আদিবাসী আর উপজাতি শব্দ দু’টির বিশ্লেষণ করি।

বাংলা একাডেমী অভিধান অনুসারে, ‘উপজাতি’ শব্দের অর্থ হলো, “[বিশেষ্য পদ] সংস্কৃত ছন্দো বিশেষ, প্রধান জাতির অন্তর্ভুক্ত ক্ষুদ্রতর জাতি বা সম্প্রদায়; পাহাড়িয়া বাবন্য জাতি।” সহজ অর্থে অনেকেই আবার “ক্ষুদ্র জাতি, যারা মূল জাতি থেকে আলাদা”। আর আদিবাসী শব্দের অর্থ “একটি অঞ্চলের আদিম অধিবাসী যারা ঐ অঞ্চলের মূল সংস্কৃতির ধারক”। এখানে লক্ষনীয় যে, , উপরোক্ত সংজ্ঞা দুটো থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসকারী ক্ষুদ্র জাতি সত্ত্বাকে আদিবাসী পদের সাথে নয় বরং উপজাতি বিশেষ্য পদটির সাথেই অধিক মিল খুঁজে পাওয়া যায় ।

এবার আসুন দেখি এ ব্যাপারে ইতিহাস, দেশী, বিদেশী বিশেষজ্ঞরাই বা কি বলেন, তার একটি সারসংক্ষেপ আপনাদের সামনে তুলে ধরছি–

উপজাতিদেরকে সাধারনত বলা হয় Tribal, অপরদিকে আদিবাসীদেরকে বলা হয়  Aborigine  বা Indigenous people. Aboriginal কাদেরকে বলা হয়, এব্যাপারে, Cambridge Advanced Learner’s Dictionary লিখেছে, member of the race of people with dark skins who were the first people tolive in Australia (অর্থাৎ,কালো চামড়ার অধিকারী অস্ট্রেলিয়ায় বসবাসকারী প্রথম প্রজন্মের ব্যাক্তি।)

সুত্রঃ http://dictionary.cambridge.org/dictionary/british/aborigine?q=Aborigine

আমেরিকার প্রখ্যাত নৃতত্ত্ববিদ লুইজ মর্গান যাকে আমেরিকার নৃবিজ্ঞানের জনক বলা হয়, তার সংজ্ঞানুযায়ী আদিবাসী হচ্ছে ‘কোনো স্থানে স্মরণাতীতকাল থেকে বসবাসকারী আদিমতম জনগোষ্ঠী যাদের উৎপত্তি, ছড়িয়ে পড়া এবং বসতি স্থাপন সম্পর্কে বিশেষ কোনো ইতিহাস জানা নেই। মর্গান বলেন, The Aboriginals are the groups of human race who have been residing in a place from time immemorial ….. They are the true Sons of the soil….

সূত্রঃ (Morgan, An Introduction to Anthropology, 1972) । সূত্রঃ http://en.wikipedia.org/wiki/Lewis_H_Morgan

সুতরাং উপরোক্ত ক্ষেত্রেও পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতীরা আদিবাসী হিসেবে গন্য হবার উপযুক্ত নয় । কারন তারা প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে নয়, বরং তারা প্রায় গত ৩শ বছর পূর্বের স্মরণকাল থেকেই বিভিন্ন দেশ থেকে এসে এখানে বসবাস আরম্ভ করছেন এবং তাদের ইতিহাসও এতটা অজানা নয় ।

পার্বত্য এলাকার অধিবাসীরা আদিবাসী কিনা ? এব্যপারে বিশিষ্ট সেকুলার বুদ্ধিজীবী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের প্রফেসর, বাংলা একাডেমীর সাবেক মহাপরিচালক, বর্তমানে ডেইলী সান পত্রিকার সম্পাদক সৈয়দ আনোয়ার হোসেন লিখেছেনঃ

‘Most of the tribal people move into this land from areas now in Myanmar (former Burma) during the period from the 15th to the mid-nineteenth centuries. The tribes belonging to the Koki group were the earliest to settle, and the Chama’s came much later.

সূত্রঃ (War and Peace in the Chittagong Hill Tracts, P.5, published by Agamee Prakashni Dhaka, 1999).

অপরদিকে ব্রিটিশ আমলে পার্বত্য চট্টগ্রামের এসডিও T.H Lewin-এর মতে, ‘A great portion of the Hill tribes, at present living in the Chittagong Hills, undoubtedly came about two generations ago from Arakan. This is asserted both by their own traditions and by records in the Chittagong Collectroate (1869, P. 28)„

 বাংলাদেশের অন্যতম প্রখ্যাত বুদ্ধিজীবী ও একাত্তরের অন্যতম বুদ্ধিবৃত্তিক সৈনিক ড এবনে গোলাম সামাদ বলেন, “যাদের বলা হচ্ছে এ অঞ্চলের অধিবাসী, তারা এ অঞ্চলের অধিবাসী কতটা, তা নিয়ে ঘোর সন্দেহ আছে। এরা প্রায় সবাই আরাকান থেকে ইংরেজ আমলে এসে এই অঞ্চলে তাদের পূর্বপুরুষরা উপনিবিষ্ট হয়। এরা হলো কার্যত অভিবাসী (Immigrants)। এরা কোনো পৃথক জাতিসত্তার দাবিদার হতে পারে না। জাতিসত্তার দাবিদার হতে পারে না আন্তর্জাতিক নিয়মানুসারে। কিন্তু এরা নিজেদের দাবি করছে পৃথক জাতিসত্তা হিসেবে, যার কোনো বৈধতা দেয়া যেতে পারেনা। এ রকম কোনো দাবির সমর্থনে ইতিহাসের কোনো ধারাবাহিকতা খুঁজে পাওয়া যায় না। ……চাকমারা যে ভাষায় কথা বলেন, বিখ্যাত ভাষাতাত্ত্বিক গ্রিয়ার্সনের মতে, সেটা হলো চট্টগ্রাম অঞ্চলের বাংলা উপভাষারই একটি রূপ মাত্র। মারমাদের ভাষা চাকমাদের ভাষা থেকে আলাদা। তারা যে ভাষায় কথা বলেন, তাহলো আরাকানি ভাষার একটি রূপ। আরাকানি ভাষা আবার প্রাচীন বর্মি ভাষার সাথে সম্পর্কযুক্ত।ভূতাত্ত্বিক দিক থেকে চাকমা ও মারমা উভয়ই পরে বৃহৎ মঙ্গলীয় মানবধারায়। কিন্তু এরা উৎপত্তিগতভাবে এক নয়। চাকমাদের মাথার খুলির আকৃতি খুবই গোল, যা অন্যদের নয়। চট্টগ্রামের পার্বত্যাঞ্চলের বৃহত্তর মঙ্গলীয় মানব ধারার মধ্যে মারমা ও চাকমারাই প্রধান।“ সূত্রঃ ( নয়া দিগন্ত, ০১/০৩/১০, http://www.dailynaya/diganta.com/2010/03/01/fullnews.asp?News_ID=all&sec=6)

উল্লেখ্য বাংলাদেশের উপজাতি নিয়ে গোলাম সামাদের বই বাংলা একাডেমী থেকে প্রকাশিত হয়েছিল।

আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ভূ-রাজনীতি বিশ্লেষক প্রফেসর ড, আবদুর রব, যিনি পার্বত্য-চট্রগ্রাম নিয়ে বহুদিন গবেষণা করেছেন ও কয়েকটি বইও প্রকাশ করেছেন, তিনি বলেছেনঃ “উপজাতি এবং আদিবাসী। আদিবাসী বলতে ইংরেজিতে Aboriginals বা indigenous people-ও বলে। উপজাতি হলো Tribe. এটা উপনিবেশিক শব্দ। আমাদের দেশে বাঙালি মূলধারার বাইরে যারা আছে তারা আদিবাসী নয়। তাদের আমরা উপজাতি বলতেও নারাজ। বরং তাদেরকে বলা যেতে পারে ethnic বা নৃতাত্ত্বিক ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠী । নৃতাত্ত্বিক সংজ্ঞায় আদিবাসী বা ‘এবোরিজিন্যালস’রা হচ্ছে- ‘কোনো অঞ্চলের আদি ও অকৃত্রিম ভূমিপুত্র বা Son of the soil।’

উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, খর্বাকৃতির স্ফীত চ্যাপ্টা নাক কুঁকড়ানো কেশবিশিষ্ট কৃষ্ণবর্ণের ‘বুমেরাংম্যান’রা অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসী বা যথার্থ এবোরিজিন্যালস। তারা ওখানকার ভূমিপুত্রও বটে। ঠিক একইভাবে মাউরি নামের সংখ্যালঘু পশ্চাৎপদ প্রকৃতি পূজারী নিউজিল্যান্ডের ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠী সেখানকার আদিবাসী। আমেরিকার বিভিন্ন নামের মঙ্গোলীয় ধারার প্রাচীন জনগোষ্ঠী যাদেরকে ভুলক্রমে ‘রেড ইন্ডিয়ান’ (উত্তর আমেরিকা)বলা হয় এবং সেন্ট্রাল আমেরিকা ও দক্ষিণ আমেরিকায় ইনকা, আজটেক, মায়া, আমাজানসহ আরো অসংখ্য ক্ষুদ্র বিলুপ্ত কিংবা সঙ্কটাপন্ন (Extinct or Endangeredgroups) জনগোষ্ঠীকে সঠিক ‘ইনডিজিনাস’ বলে চিহ্নিত করা যায়।

আর এ থেকে বুঝা যায় যে, আমাদের দেশের পার্বত্যাঞ্চলে বসবাসরত ঐসকল জাতিগুলো আদিবাসীতো নয়ই, বরং তাদেরকে উপজাতি নামক এই মূল্যবান উপাধিতে ডাকা যাবে কিনা তাতেও যথেষ্ট সন্দেহ আছে । বরং এ জাতিগোষ্ঠির জন্য যথার্থ উপাধি হচ্ছে ক্ষুদ্র জাতিসত্বা বা ক্ষুদ্র নৃ গোষ্ঠি ।

এবার দেখি এ ব্যাপারে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগের প্রফেসর বিশিষ্ট গবেষক ড হাসান মোহাম্মদ কি লিখেছেন ।তিনি লিখেছেনঃ “কয়েকটি দেশে আদিবাসীদের জন্য সংরক্ষিত অঞ্চলের ধারণাকে পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষেত্রে যারা প্রয়োগ করতে চান, তাদের উদ্দেশে বলা যায়, পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতীয়রা এতদঞ্চলের আদিবাসীও নন। ধারণা পাওয়া যায়, ষোড়শ শতাব্দী কিংবা তার আগে-পরে আগমনকারী উপজাতীয়রা এতদঞ্চলের আদিবাসী নন। ভূমি সংলগ্নতাসহ বিভিন্ন কারণে সংখ্যাল্প হলেও পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূখণ্ডে আগে থেকে অন্যান্য ভাষা ও নৃতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যধারী জনগোষ্ঠীর বসবাস ছিল। এ ছাড়া পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসকারী ১৩টি উপজাতি সমন্বয়ে যে ‘জুম্ম জাতি’ (এক সময়ে জুম চাষে অভ্যস্ত) তত্ত্ব প্রচার করা হয়, সেটি তাত্ত্বিকভাবেও সঠিক নয়। গত শতাব্দীর ষাটের দশকে কাপ্তাই পানি বিদ্যুৎ প্রকল্প তৈরির আগে এসব উপজাতির অনেকেই সমতল ভূমিতে চাষাবাদ করতেন।“

সূত্রঃ (নয়া দিগন্ত, ১৭ জুলাই, ২০০৮, http://www.dailynaya/diganta.com/2008/07/17/fullnews.asp?News_ID=93040&sec=6 )

এবার এ ব্যাপারে একটি ভিন্ন ধরণের ব্যাখ্যা দিই ! বিগত আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় আসার পর ২ ডিসেম্বর ১৯৯৭ ঢাকায় পার্বত্য শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। মজার ব্যাপার হচ্ছে সেই চুক্তিতে পার্বত্যবাসীদের উপজাতি বলা হয়েছে, আদিবাসী নয় !

The Chittagong Hill Tracts (CHT) peace accord was signed on December 2, 1997 in Dhaka at the Prime Minister’s office between the government and the Parbatya Chattagram Jana Sanghati Samity (PCJSS) B. HILL DISTRICT LOCAL GOVT. COUNCIL/HILL DISTRICT COUNCILS Both sides agreed to change, amend, add and repeal the Hill District Local Government Council Acts, 1989. (RangamatiHill DistrictLocal Government Counci1 Act, 1989, Bandarban Hill District, Local Government Council Act, 1989 and Khagrachari Hill District Local Government Council Act, 1989) and its various sections described as below: The term ‘Upajati’ shall be in force. (উপজাতি কথাটি ব্যবহার করা হবে)

 

আদিবাসী ও উপজাতি নিয়ে আমাদের দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনীরও পরিস্কার ধারনা আছে। “পার্বত্যাঞ্চলের তিন জেলায় বসবাসরত উপজাতিরা নয়, বাঙালিরাই ওই এলাকার আদিবাসী বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর চট্টগ্রামের ২৪ পদাতিক ডিভিশনের জিওসিমেজর জেনারেল মোহাম্মদ শামীম চৌধুরী। চট্টগ্রাম সেনানিবাসের­ ডিভিশন সদর দপ্তরের ১৯ আগষ্ট ২০০৯ বুধবার এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ মন্তব্য করেন।

তিনি বলেন, ‘আদিবাসী বলতে যেটা বুঝায় সেটা হচ্ছে, কোন একটি স্থানে যাদের বসবাস ইতিহাসের আগে অর্থাৎ কেউ জানে না কবে থেকে তারা বসবাস শুরু হয়েছে, সেই হিসেবে বাঙালিরাই ওই অঞ্চলের আদিবাসী।

তিনি আরও বলেন, উপজাতিরা বহিরাগত। ঐতিহাসিকভাবে তারা এখানে এসেছেন। তাদের ইতিহাস খুব অল্প দিনের।’ সূত্রঃ (১৯/০৮/২০০৯, আরটিএনএন এবং দেশটিভির নিউজ )

এদিকে মেজর জেনারেল (অব) ইব্রাহীম বীরপ্রতিক দীর্ঘদিন ধরে পার্বত্য চট্রগ্রামে সেনাবাহিনীর দায়িত্বে ছিলেন। সেই দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থেকে কয়েকটি বইও লিখেছেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি প্রক্রিয়া ও পরিবেশ পরিস্থিতির মূল্যায়ন তার মধ্যে অন্যতম। জেনারেল ইব্রাহীমের মতে পার্বত্য-চট্রগ্রামের­ অধিবাসীরা আদিবাসী নয়। সবচেয়ে স্বস্তিকর ব্যাপার হল বর্তমান সরকারের পক্ষ থেকেই আদিবাসী ও উপজাতি নিয়ে তার অবস্থান পরিস্কার করেছেন।

পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর সদস্যরা আদিবাসী নয়—একথা কূটনীতিক এবং দাতাগোষ্ঠীর প্রতিনিধিদের সাফ জানিয়ে দিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনি। পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেছেন, আদিবাসী ইস্যু নিয়ে আর কোনো বিতর্ক চলবেনা।

গত ২৫ জুলাই ২০১১, সোমবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আদিবাসী ইস্যু নিয়ে কূটনীতিক এবং দাতাগোষ্ঠীর প্রতিনিধিদের ব্রিফ করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, ফ্রান্স, চীন, রাশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, জার্মানি, ভারত, পাকিস্তান, জাপান, নরওয়ে, কাতার, থাইল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশের প্রায় ৬০ জন রাষ্ট্রদূত, উপ-রাষ্ট্রদূত এবং পলিটিক্যাল কাউন্সেলর পর্যায়ের কূটনীতিকসহ দাতাগোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা ব্রিফিংয়ে উপস্থিত ছিলেন। ব্রিফিং সম্পর্কে জানতে চাইলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনি বলেন, সংবিধানে আদিবাসী ইস্যুটিকে অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলে পরিস্থিতিকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করাহচ্ছে। এ ব্যাপারে আমরা কূটনীতিকদের ব্রিফ করেছি। এ ব্যাপারে বিস্তারিত আর কিছু বলেননি পররাষ্ট্রমন্ত্রী। ব্রিফিংয়ে উপস্থিত পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এমন একাধিক কর্মকর্তা জানান, পররাষ্ট্রমন্ত্রী কূটনীতিকদের স্পষ্টভাবে বলেছেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসকারী ক্ষুদ্র নৃ-তাত্ত্বিক জাতিগোষ্ঠীর সদস্যরা আদিবাসী নয়। নিজেদের আদিবাসী দাবি করার কোনো সুযোগও নেই। অতীতের কোনো আইনেও তাদের আদিবাসী বলা হয়নি।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী কূটনীতিকদের বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে সর্বপ্রথম এসেছিল কুকিরা কম্বোডিয়া থেকে ১৭০০ সালের দিকে। চাকমারা আসে আরাকান থেকে আরও ১০০ বছর পর। ১৯০০ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক ব্রিটিশ আইনে এদের উপজাতি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ১৯৯৭ সালে স্বাক্ষরিত শান্তিচুক্তিতেও তাদের উপজাতি হিসেবে উল্লেখ করাহয়েছে। বর্তমান সংবিধানে তাদের ক্ষুদ্র নৃ-তাত্ত্বিক গোষ্ঠী হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। এখানে আদিবাসী নিয়ে বিতর্কের কোনো সুযোগনেই।

সূত্রঃ http://www.parisvisionnews.com/2011-07-14-13-36-49/69-political-news/188-2011-07-26-23-10-29.html

বাংলাদেশ সংবিধানের পঞ্চাদশ সংশোধনীতেও বলা হয়েছে যে, বাংলাদেশের কোন আদিবাসী নাই । সেই সাথে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় স্মারক নং ২২.০৯.১.০/০/২৪/২০০৯(অঋশ-৮)-৭৯৯,তারিখ ২৮/০১/২০১০ইং এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রানালয় নং পাচঃবিম (সম-৭)২৯/২৩১/ ২৫, তারিখ ২৮/০১/২০১০ ইং মূলে সরকারের প্রশাসনিকভাবে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে “উপজাতি” শব্দের পরিবর্তে “আদিবাসী” শব্দটি ব্যবহারকরা যাবে না ।

উপরোক্ত সংজ্ঞা, ইতিহাস, দেশি বিদেশী লেখকদের তথ্য বিশ্লেষণ এবং সাংবিধানিক সমর্থন ও সরকারী ঘোষণা থেকে এটাই প্রতিয়মান হয় যে, পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসকারী ক্ষুদ্র নৃ গোষ্ঠি তথা বাংলাদেশের ক্ষুদ্রনৃগোষ্ঠিরা কোন ক্রমেই এদেশের আদিবাসী নয়, বরং তারা ক্ষুদ্র নৃ গোষ্ঠি বা উপজাতি ।

এদিকে শতশত বছর পর কয়েক বছর আগে থেকে হঠাৎ করে নিজেদেরকে উপজাতি থেকে আদিবাসী দাবি করা বিশাল ষড়যন্ত্রের ইঙ্গিত বহন করে । আর আদিবাসী যদি হতেই হয় তবে আদিকাল থেকে এই ভূখন্ড বসবাসকারী বাঙ্গালীরাই হল এদেশের প্রকৃত আদিবাসী ।

উল্লেখ্য যে, বছরখানেক আগে বোমাং রাজা স্পষ্টই বলেছেন যে, তারা মোটেও আদিবাসী নন। তারা এ অঞ্চলে এসে বসবাস শুরু করেছেন মাত্র কয়েকশত বছর আগে।

 

তথ্য সূত্র:

আরো যেসকল লেখার সহযোগীতা নেয়া হয়েছে:

 ১। ক্ষুদ্র জাতি গোষ্ঠীদের নিয়ে এত ষড়যন্ত্র, এত রংঢং কেন?

০৮ ই আগস্ট, ২০১২, http://www.google.com/gwt/x?hl=en&u=http%3A%2F%2Fwww.somewhereinblog.net%2Fblog%2FahmedRashid21%2F29652570&q=%E0%A6%AA%E0%A6%BE%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%AC%E0%A6%A4%E0%A7%8D%E0%A6%AF

২। আদিবাসি নয়,ওরা উপজাতি 10/08/2011 http://humanity2011.wordpress.com/2011/08/10/%E0%A6%86%E0%A6%A6%E0%A6%BF%E0%A6%AC%E0%A6%BE%E0%A6%B8%E0%A6%BF-%E0%A6%A8%E0%A7%9F%E0%A6%93%E0%A6%B0%E0%A6%BE-%E0%A6%89%E0%A6%AA%E0%A6%9C%E0%A6%BE%E0%A6%A4%E0%A6%BF/

৩। উপজাতি না আদিবাসী ড. মো. ফরহাদ হোসেন http://www.google.com/gwt/x?hl=en&u=http%3A%2F%2Fwww.dailyjanakantha.com%2Fnews_view.php%3Fnc%3D37%26dd%3D2012-12-07%26ni%3D118081&q=%E0%A6%89%E0%A6%AA%E0%A6%9C%E0%A6%BE%E0%A6%A4%E0%A6%BF%E0%A6%A6%E0%A7%87%E0%A6%B0

৪। সরকারি প্রতিবেদন : উপজাতীয়রা ১৭২৭ সালে ভারত বার্মা ও মঙ্গোলিয়া থেকে পার্বত্যাঞ্চলে এসেছে http://www.google.com/gwt/x?hl=en&u=http%3A%2F%2Fwww.bdtodaynews.com%2F%25E0%25A6%25B8%25E0%25A6%25B0%25E0%25A6%2595%25E0%25A6%25BE%25E0%25A6%25B0%25E0%25A6%25BF-%25E0%25A6%25AA%25E0%25A7%258D%25E0%25A6%25B0%25E0%25A6%25A4%25E0%25A6%25BF%25E0%25A6%25AC%25E0%25A7%2587%25E0%25A6%25A6%25E0%25A6%25A8-%25E0%25A6%2589%25E0%25A6%25AA%25E0%25A6%259C%25E0%25A6%25BE%25E0%25A6%25A4%25E0%25A7%2580%2F&q=%E0%A6%AA%E0%A6%BE%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%AC%E0%A6%A4%E0%A7%8D%E0%A6%AF %E0%A6%89%E0%A6%AA%E0%A6%9C%E0%A6%BE%E0%A6%A4%E0%A7%80 %E0%A6%86%E0%A6%97%E0%A6%AE%E0%A6%A8&sa=X&ei=jYXxUZ2aD8amrAfCu4HAAw&ved=0CBwQFjAD

Print Friendly, PDF & Email
Facebook Comment

6 Replies to “পার্বত্য উপজাতীয় অধিবাসীরা আদিবাসী নয়”

  1. আমার এই লেখাটি প্রকাশ করার জন্য শুরুতেই পার্বত্য নিউজ.কমকে জানাই অশেষ কৃতজ্ঞতা ।

    পাশাপাশি সকল পার্বত্য বাঙ্গালীসহ সকল সমতলের বাঙ্গালীদের প্রতিও আমার অনুরোধ, পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি অধিবাসীরা আদিবাসী নাকি উপজাতি, তথ্য প্রমাণসহ তার স্বচ্ছ ধারণা পেতে প্রত্যেকে যেন লেখাটি একটু মনোযোগ দিয়ে পড়েন ।

    সর্বোপরি সকলকে জানাই আন্তরিক ধন্যবাদ ।

  2. হতে পারে আপনি ঠিক করছি . কিন্তু এই সমস্যা পিছে দেখাশোনা করবেন না. এখানে আপনার প্রশ্নের দ্বারা ওল্ড দেখতে পারেন………………ওহ এবং বিষয় উত্থাপিত প্রধান সমস্যাটি ভুলবেন না.???????? ??????? ????????? ??????? ?? | parbattanews bangladesh

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

11 + 6 =

আরও পড়ুন