পার্বত্য চট্টগ্রামে ভূমির মালিকানা জটিলতা : রাজস্ব হারানো ও জাতীয় নিরাপত্তার চ্যালেঞ্জ

fec-image

বাংলাদেশ একটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র হলেও এর মোট ভূ-খণ্ডের এক-দশমাংশেল অধিক তথা পার্বত্য চট্টগ্রামে আজ পর্যন্ত কার্যকর কোনো ভূমি জরিপ সম্পন্ন হয়নি। ফলে একদিকে সরকার প্রতি বছর বিশাল অংকের রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। অপরদিকে জাতীয় নিরাপত্তার চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়ে আছে। ২০১০ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি দৈনিক ইনকিলাবে প্রকাশিত এক বিশেষ প্রতিবেদনে আমি তথ্য-উপাত্ত দিয়ে উল্লেখ করেছিলাম, পার্বত্য তিন জেলায় ভূমির মালিকানা নিশ্চিত না হওয়ায় সরকার প্রতি বছর বিশাল অংকের রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। আজ দীর্ঘ ১৬ বছর পর ২০২৬ সালে দাঁড়িয়েও যখন পেছনে ফিরে তাকাই, তখন দেখা যায় সেই সংকট কেবল রাজস্বের ক্ষতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। বরং এটি এখন জাতীয় নিরাপত্তা, ভূ-রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং রাষ্ট্রের অখণ্ডতার জন্য এক চরম চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সম্প্রতি সরকারের পক্ষ থেকে ভূমি প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন অত্যন্ত বলিষ্ঠ এবং সময়োপযোগী একটি ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, “সরকারের এক ইঞ্চি জমির রাজস্ব ফাঁকি দেওয়ার কোনো সুযোগ দেওয়া হবে না। সরকারের রাজস্ব বৃদ্ধি ও সরকারি জমি পুনরুদ্ধার করাই বর্তমান সরকারের মূল লক্ষ্য। এখন থেকে সরকারি জমিতে অবৈধ দখলদারদের আর কোনো সুযোগ দেওয়া হবে না”।

প্রতিমন্ত্রীর এই জিরো-টলারেন্স নীতি পার্বত্য চট্টগ্রামের বর্তমান প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, পাহাড়ের যে বিশাল জনপদে আজ পর্যন্ত কোনো ‘ক্যাডাস্ট্রাল সার্ভে’ বা দালিলিক ভূমি জরিপই করা হয়নি, সেখানে প্রতি ইঞ্চির রাজস্ব নিশ্চিত করা কি আদৌ সম্ভব? যেখানে রাষ্ট্রের কাছে জমির প্রকৃত মালিকানা বা দখলদারিত্বের কোনো ডিজিটাল ডাটাবেজ নেই, সেখানে এই ফাঁকি রোধ করা একটি বড় প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ। জরিপহীন এই অন্ধকার ব্যবস্থার সুযোগ নিয়ে এক শ্রেণির বিশেষ গোষ্ঠী ও প্রভাবশালী দখলদার বছরের পর বছর রাষ্ট্রকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে যাচ্ছে এবং রাষ্ট্রের ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত করছে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের সামগ্রিক আয়তনের প্রায় ১১ শতাংশ বা এক-দশমাংশ এলাকা জুড়ে বিস্তৃত। ব্রিটিশ শাসন আমল থেকে শুরু করে পাকিস্তান আমল এবং স্বাধীনতার ৫৪ বছর পার হয়ে গেলেও এই অঞ্চলে কোনো কার্যকর ভূমি জরিপ করা সম্ভব হয়নি। আধুনিক কোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে দেশের মোট ভূ-খণ্ডের ১১ শতাংশ এলাকায় কোনো ভূমি রেকর্ড থাকবে না, তা প্রায় অকল্পনীয়।

সুনির্দিষ্ট মালিকানা বা রেকর্ড না থাকায় সরকার এই বিশাল এলাকা থেকে ভূমি উন্নয়ন কর বা খাজনা আদায় করতে পারছে না। অথচ দেশের বাকি ৬১টি জেলায় প্রতি ইঞ্চির মালিকানা নিশ্চিত করে রাষ্ট্র তার পাওনা আদায় করছে। পাহাড়ের এই ‘প্রশাসনিক ব্ল্যাক হোল’ বা শূন্যতা কেবল অর্থনৈতিক ক্ষতিই করছে না, বরং সেখানে একটি সমান্তরাল ও অবৈধ শাসন ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখার সুযোগ করে দিচ্ছে, যা রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণকে প্রতিনিয়ত চ্যালেঞ্জ করছে।

আমাদের গভীর উদ্বেগের সাথে লক্ষ্য করতে হয় যে, পার্বত্য চট্টগ্রামে আজও এক ধরনের প্রচ্ছন্ন সামন্ততান্ত্রিক প্রথা জিইয়ে রাখা হয়েছে। ১৯৭১ সালে লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতা এবং আমাদের পবিত্র সংবিধানের মূল দর্শন হলো সকল নাগরিকের সমান অধিকার। সংবিধানে জাতি, ধর্ম বা বর্ণ নির্বিশেষে কোনো বৈষম্যের স্থান নেই।

বর্তমান গণতান্ত্রিক বাংলাদেশে কাউকে ‘জুম্ম’ বা ‘বান্য’ (বহিরাগত) ভাবার যেমন কোনো আইনি সুযোগ নেই, তেমনি কেউ এখানে নিজেকে ‘আশরাফ’ বা ‘উচ্চজাতি’ দাবি করে বিশেষ সুবিধা পাওয়ারও অধিকার রাখে না। কিন্তু বর্তমানে পাহাড়ে উপজাতীয় মৌজা প্রধান, হেডম্যান ও কারবারীদের একটি বিশেষ অংশ কোনো বৈধ সরকারি দলিলাদি ছাড়াই কয়েক হাজার একর ভূমি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখছে। অন্যদিকে সাধারণ গরিব পাহাড়িরা এবং বাঙালিরা ভূমিহীন অবস্থায় মানবেতর জীবনযাপন করছে। সামন্ত যুগের অবসান ঘটিয়ে সারা দেশে যেমন একই ভূমি আইন চলে, পাহাড়েও তেমনি সংবিধানের আলোকে সকল বৈষম্য বাতিল করে বৈজ্ঞানিক জরিপ ও অভিন্ন আইন কার্যকর করা এখন জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থেই অপরিহার্য।

পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির (কথিত শান্তি চুক্তি) আলোকে ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন’ গঠিত হলেও তা আজও গতি পায়নি। কমিশন আইনের কতিপয় ধারা সংশোধন নিয়ে আঞ্চলিক সংগঠনগুলো দীর্ঘ সময় ধরে আপত্তি তুলেছিল, যার পেছনে ছিল মূলত জরিপ প্রক্রিয়াকে বিলম্বিত করার কৌশল।

যৌক্তিকভাবে দেখলে, ভূমি জরিপ ছাড়া কোনো বিরোধ নিষ্পত্তি করা বৈজ্ঞানিকভাবে অসম্ভব। আপনার কাছে যদি জমির নির্দিষ্ট ম্যাপ বা বাউন্ডারি না থাকে, তবে আপনি কার বিরোধ মেটাবেন? কিন্তু একটি বিশেষ গোষ্ঠী বারবার দাবি করে আসছে যে, বিরোধ নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত জরিপ করা যাবে না। মূলত এই অজুহাতে তারা পাহাড়কে রাষ্ট্রের আইনি ও প্রশাসনিক কাঠামোর বাইরে রাখতে চায়। তারা চায় না সরকারি নথিতে মালিকানা রেকর্ড হোক, কারণ মালিকানা স্পষ্ট হলে তাদের অবৈধ রাজত্ব ও প্রভাব খর্ব হবে।

২০১০ সালে দৈনিক ইনকিলাবে আমার সেই অনুসন্ধানী রিপোর্টে আমি দেখিয়েছিলাম যে, খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি ও বান্দরবানে জরিপ না হওয়ার সুযোগে এক শ্রেণির প্রভাবশালী মহল পাহাড়ের বিপুল পরিমাণ বনভূমি ও পাহাড় অবৈধভাবে দখল করে নিয়েছে। সেখানে সাধারণ জুমচাষী বা দরিদ্র জনগোষ্ঠীর নামে কোনো দালিলিক সম্পত্তি নেই বললেই চলে। এর ফলে রাষ্ট্র যেমন রাজস্ব হারাচ্ছে, তেমনি সাধারণ মানুষও ভূমিদস্যুদের হাতে জিম্মি হয়ে আছে।

ভূমি প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন যে ‘সরকারি জমি পুনরুদ্ধার’-এর কথা বলেছেন, তা সফল করতে হলে পাহাড়ের এই দালিলিক প্রমাণহীন দখলদারিত্বের অবসান ঘটানো এখন সময়ের দাবি। যদি দ্রুত ক্যাডাস্ট্রাল সার্ভে বা ডিজিটাল জরিপ করা হয়, তবেই বোঝা যাবে কত হাজার একর সরকারি খাস জমি কার অধীনে অবৈধভাবে পড়ে আছে।

পার্বত্য চট্টগ্রামে ভূমি জরিপের বিরোধিতার নেপথ্যে কেবল অর্থনৈতিক কারণ নেই, এর সাথে জড়িত গভীর ভূ-রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র। আদিবাসী স্বীকৃতির বায়না ধরে এবং আন্তর্জাতিক আইনের (যেমন—আইএলও ১৬৯) অপব্যাখ্যা দিয়ে তারা পাহাড়ের ওপর রাষ্ট্রের সার্বভৌম ক্ষমতাকে সংকুচিত করতে চায়।

বিশেষ করে আইএলও ১৬৯-এর অনুচ্ছেদ ৩০-এর দোহাই দিয়ে তারা রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা কার্যক্রম ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে বাধা সৃষ্টি করার চেষ্টা করে। তারা চায় রাষ্ট্র যাতে তার ১১ শতাংশ ভূমির সুষ্ঠু ব্যবহার করতে না পারে, যাতে এই অঞ্চলটি অস্থিতিশীল থাকে এবং এক সময় বিচ্ছিন্নতাবাদের দিকে ধাবিত হয়। জরিপ সম্পন্ন হলে পাহাড়ের প্রতিটি ইঞ্চি যখন ডিজিটাল ম্যাপের আওতায় আসবে, তখন কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠীর পক্ষে অবৈধ ক্যাম্প স্থাপন বা দুর্গম এলাকায় লুকিয়ে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে। তাই রাজস্ব আদায় এবং জাতীয় নিরাপত্তা—উভয় দিক থেকেই ভূমি জরিপ হলো প্রধান হাতিয়ার।

উত্তরণের পথ এবং সুপারিশ:

দেশের এক-দশমাংশ ভূমিকে জরিপহীন এবং রাজস্বহীন রাখা কোনো আত্মমর্যাদাশীল রাষ্ট্রের জন্য কাম্য হতে পারে না। সরকারের তরফ থেকে যে জিরো-টলারেন্স ঘোষণা এসেছে, তার সফল বাস্তবায়নে নিচের পদক্ষেপগুলো নেওয়া জরুরি:

১. অবিলম্বে ডিজিটাল ভূমি জরিপ: আধুনিক স্যাটেলাইট ইমেজারি ও ড্রোন প্রযুক্তির মাধ্যমে দ্রুত পার্বত্য এলাকায় ডিজিটাল ক্যাডাস্ট্রাল সার্ভে শুরু করতে হবে। প্রতিটি ইঞ্চির মালিকানা ডাটাবেজে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

২. অবৈধ দখলদার উচ্ছেদ: প্রতিমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী, কোনো রাজনৈতিক বা আঞ্চলিক দোহাই না মেনে সরকারি খাস জমি থেকে সকল অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করে রাষ্ট্রের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

৩. সংবিধানের পূর্ণ প্রতিফলন: পাহাড়ে প্রচলিত সকল প্রথাগত বৈষম্যমূলক আইন পর্যালোচনা করে সংবিধানের আলোকে সারা দেশের ন্যায় অভিন্ন ভূমি ও রাজস্ব কাঠামো কার্যকর করতে হবে। কাউকে বিশেষ জাতি বা প্রথার দোহাই দিয়ে রাজস্ব ফাঁকি দেওয়ার সুযোগ দেওয়া যাবে না।

৪. রাজস্ব আদায় নিশ্চিতকরণ: পাহাড়ের ভূমি ব্যবস্থাপনাকে সরাসরি ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধীনে এনে আধুনিক খাজনা ও কর ব্যবস্থার আওতায় আনতে হবে, যা জাতীয় জিডিপিতে বড় অবদান রাখবে।

৫. নিরাপত্তা বাহিনীর অবস্থান সুসংহতকরণ: রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও জনগণের জানমাল রক্ষায় পাহাড় থেকে নিরাপত্তা বাহিনীর ক্যাম্প কমানোর কোনো সুযোগ নেই, বরং জরিপ ও প্রশাসনিক কাজে তাদের সহযোগিতা নিশ্চিত করতে হবে।

২০১০ সালে যখন লিখেছিলাম যে “সরকার বঞ্চিত হচ্ছে রাজস্ব থেকে”, তখন আমার লক্ষ্য ছিল কেবল অর্থনৈতিক বঞ্চনার বিষয়টি জনসমক্ষে আনা। কিন্তু আজ ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে এটি পরিষ্কার যে, এই বঞ্চনা কেবল টাকার অংকে নয়, এটি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও প্রশাসনিক অখণ্ডতার ওপর এক প্রচ্ছন্ন আঘাত।

লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত এই স্বাধীন দেশে ১১ শতাংশ ভূমিকে আইনের শাসনের বাইরে রাখা শহীদের রক্তের সাথে বিশ্বাসঘাতকতার শামিল। ভূমি প্রতিমন্ত্রীর ঘোষণার সফল বাস্তবায়ন এবং পাহাড়ের প্রতিটি ইঞ্চিতে রাষ্ট্রের মালিকানা নিশ্চিত করাই হোক আমাদের জাতীয় অঙ্গীকার। সামন্ততান্ত্রিক আধিপত্য ভেঙে একটি বৈষম্যহীন ও সমৃদ্ধ পার্বত্য চট্টগ্রাম গড়তে হলে ভূমি জরিপ ও রাজস্ব নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই।

তথ্যসূত্র:

“একদশমাংশ ভূমির মালিকানা নিশ্চিত না হওয়ায় সরকার বঞ্চিত হচ্ছে রাজস্ব থেকে। (দৈনিক ইনকিলাব, ৭ ফেব্রুয়ারি ২০১০)।”

পার্বত্য চট্টগ্রামে ভূমি জরিপ ও মালিকানা জটিলতা বিষয়ক বিশেষ রিপোর্ট (২০১০)।

“সরকারের এক ইঞ্চি জমির রাজস্ব ফাঁকি দেওয়ার সুযোগ নেই। (দৈনিক দেশ রূপান্তর, ২০২৬)।”

আইএলও কনভেনশন নং ১৬৯ ও ইউএনডিআরআইপি বিষয়ক বিশ্লেষণ (এ এইচ এম ফারুক)।

আইএলও ১৬৯, অনুচ্ছেদ ৩০ (আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা রেকর্ড)।

বাংলাদেশের সংবিধান ও পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি (১৯৯৭) পর্যালোচনা।

লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট, গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

Print Friendly, PDF & Email
ঘটনাপ্রবাহ: পার্বত্য চট্টগ্রাম, প্রবন্ধ
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও পড়ুন