পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তিচুক্তি পরবর্তীকালে সেনাবাহিনীর সবচেয়ে বড় অস্ত্র উদ্ধার অভিযান

নিহত ৫, মেশিনগান, সাবমেশিনগানসহ ৮ অস্ত্র ও ৫৩৯ রাউন্ড বিভিন্ন অস্ত্রের গুলি উদ্ধার

বাঘাইছড়িতে নিহত জেএসএস সদস্য

স্টাফ রিপোর্টার

শান্তিচুক্তি পরবর্তীকালে পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাবাহিনীর সাথে সবচেয়ে বড় বন্দুকযুদ্ধ ও অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনা ঘটেছে শনিবার সকাল সাড়ে পাঁচটায়। রাঙামাটি জেলার বাঘাইছড়ি উপজেলার বরাদম এলাকায় সেনাবাহিনীর সাথে সংঘটিত এ বন্দুকযুদ্ধে ৫ জন নিহত হয়েছে। এতে মেশিনগান, সাব মেশিনগান, চাইনিজ রাইফেল, এসএলআরসহ মোট ৮ আগ্নেয়াস্ত্র ও ৫৩৯ রাউণ্ড বিভিন্ন অস্ত্রের গুলি উদ্ধার করা হয়েছে।

প্রথমদিকে নিহত সন্ত্রাসীরা জেএসএস সংস্কাপন্থী গ্রুপের বলে বলা হলেও পরবর্তী খোঁজ নিয়ে জানা গেছে তারা সকলে ইউপিডিএফ’র সদস্য। তবে ইউপিডিএফ গণমাধ্যমে বিবৃতি দিয়ে এ তথ্য অস্বীকার করেছে।

অপারেশন চলাকালে সেনাবাহিনী একটি সাবমেশিনগান, দুইটি চাইনিজ রাইফেল, তিনটি এসএলআর, একটি আমেরিকান পিস্তলসহ বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ উদ্ধার করেছে। অপারেশন পরবর্তীতে ব্যাপক তল্লাশী চালিয়ে সেনাবাহিনী ঘটনাস্থল থেকে আরো একটি ৭.৬২ বোরের ২৬ রাউন্ড গুলি ভর্তি ম্যাগজিনসহ ব্রিটিশ মেশিনগান উদ্ধার করেছে। সন্ত্রাসীদের আটকের সময় হাতাহাতি লড়াইয়ে সেনাবাহিনীর একজন কর্পোরাল মারাত্মকভাবে আহত হয়েছে। তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য হেলিকপ্টারে করে ঢাকায় সিএমএইচ’এ স্থানান্তর করা হচ্ছে বলে জানা গেছে।

বাঘাইছড়ি ১

স্থানীয়রা এ ঘটনাকে শান্তিচুক্তি পরবর্তীকালে পাহাড়ী সন্ত্রাসীদের সেনাবাহিনীর সবচেয়ে বড় বন্দুক যুদ্ধ ও অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনা বলে আখ্যায়িত করেছে। উল্লেখ্য, ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর এ শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।

সূত্র জানিয়েছে, উপজেলার বরাদম এলাকায় জেএসএস সংস্কারপন্থী সন্ত্রাসীদের একটি বড় গ্রুপ বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদসহ বড় ধরণের অপারেশন চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে এমন গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে খাগড়াছড়ি রিজিয়নের কমাণ্ডার ব্রি. জেনারেল স. ম. মাহবুবুল ইসলামের নির্দেশনায় সেনাবাহিনীর বাঘাইহাটে জোনের কমাণ্ডার লে. কর্নেল হায়দারের নেতৃত্বে যৌথবাহিনীর একটি গ্রুপ শুক্রবার দিনগত রাতে ঘটনাস্থল ঘেরাও করে।

সকালের আলো ফোটার সাথে সাথে সন্ত্রাসীদের পাহারাদাররা সেনাবাহিনী কর্তৃক নিজেদের আটক দেখতে পেয়ে তাদের উপর গুলিবর্ষণ শুরু করে। এসময় সেনাবাহিনীও পাল্টা গুলিবর্ষণ শুরু করে। এতে ঘটনাস্থলেই ৫ জন নিহত হয়। যৌথবাহিনী বাহিনী এসময় ৩ জনকে আটক করতে সক্ষম হয়। আটককালে লিয়াকত আলী নামে সেনাবাহিনীর একজন কর্পোরাল মারাত্মকভাবে আহত হয়েছে। আটককৃতদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, তারা বাড়ির মালিক, নির্দোষ, সন্ত্রাসীরা জোর করে তাদেরকে বাড়িতে আশ্রয় দিতে বাধ্য করেছিল। ফলে তাদের ছেড়ে দেয়া হয়।

বাঘাইছড়ি ২

সূত্র আরো জানিয়েছে, যৌথবাহিনী ঘটনাস্থল থেকে বিপুল পরিমাণ গুলি ও সামরিক পোশাক ও সামরিক সরঞ্জাম আটক করেছে। আটক গুলির মধ্যে রয়েছে ২৬ রাউণ্ড মেশিনগানের গুলি, ১২০ রাউণ্ড রাইফেলের গুলি, ৮৪ রাউণ্ড এসএমজি’র গুলি ১৪৫ রাউণ্ড এসএলআরের গুলি, ৯৪ রাউণ্ড পয়েন্ট টু টু বোর রাইফেলের গুলি, ৭ রাউণ্ড পিস্তলের গুলি। এছাড়াও এসময় বিপুল পরিমাণ সামরিক পোশাক ও সামরিক সরঞ্জামাদি আটক করা হয়েছে।

নিহত সন্ত্রাসীরা নাম হচ্ছে, কর্পোরাল সন্তু মনি ত্রিপুরা, কর্পোরাল ফলিন চাকমা, ল্যান্স কর্পোরাল শান্তি মারমা, প্রিয় চাকমা ও সুনীল ত্রিপুরা। এগুলো তাদের সামরিক নাম ও পদবী। এদের আসল নাম হচ্ছে, রুপায়ন চাকমা (২৫), জেকশন চাকমা (২৪), তাতুমনি ত্রিপুরা (৩০), কান্তি মারমা (২৫) এবং বাবুল চাকমা (২০)।

বাঘাইছড়ি

বাঘাইছড়ি জোন কমাণ্ডার লে. ক. হাযদার পার্বত্যনিউজকে বলেন, সন্ত্রাসীরা বরাদম এলাকার বিনয় জ্যোতি চাকমা নামের এক ব্যাক্তির বাড়িতে আশ্রয় আত্মগোপন করেছিল। গুলি বিনিময়ের সময় বাড়ির সদস্যদের জিম্মি করে। কিন্তু সেনাবহিনীর সতর্কগুলি বর্ষণের সাধারণ কোনো নাগরিক হতাহত হয়নি। সন্ত্রাসী দলে মোট ২০ জনের গ্রুপ থাকলেও বাকিরা পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে। তাদের আটকের জন্য এখনো অপারেশন চলছে। ৩৫ মিনিট ধরে এ বন্দুক যুদ্ধ চলে এবং এতে সেনাবাহিনী ৩ শতাধিক রাউন্ড গুলি বর্ষণ করেছে বলে তিনি আরো জানান।

বাঘাইছড়ি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জাকির হোসেন ফকির পার্বত্যনিউজকে এ খবরের সত্যতা নিশ্চিত করেছে। তিনি জানান, আমরা লাশের সুরতহাল রিপোর্টের কাজ শেষ করেছি। এগুলো খাগড়াছড়িতে প্রেরণ করা হবে।  নিহতদের মধ্যে একজনের বাড়ি লংগদু ও অন্যজনের বাড়ি সাজেক থানায় বলেও তিনি জানান।

Print Friendly, PDF & Email
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

5 × four =

আরও পড়ুন