বরিশালের দুর্গম জঙ্গলের সেনা মহড়ায় প্রধানমন্ত্রী


পরিবর্তিত বৈশ্বিক নিরাপত্তা সমীকরণ, হাইব্রিড ওয়ারফেয়ার বা ছদ্মযুদ্ধ এবং প্রযুক্তির অভাবনীয় বিস্ফোরণের এই যুগে সামরিক বাহিনীর আধুনিকায়ন এখন আর বিলাসিতা নয়, বরং অস্তিত্বের অপরিহার্য শর্ত। সোমবার বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলার পূর্ব রহমতপুর ৪১ বীর এক্সারসাইজ এরিয়ায়
অনুষ্ঠিত সেনাবাহিনীর বিশেষ মহড়ায় প্রধানমন্ত্রীর সশরীরে উপস্থিতি এবং দুর্গম জঙ্গলজুড়ে সেনাসদস্যদের যুদ্ধকালীন প্রস্তুতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ কেবল একটি রুটিন পরিদর্শন ছিল না; এটি ছিল দেশের সামরিক সক্ষমতা, আধুনিক প্রযুক্তিগত অভিযোজন এবং জনগণের সাথে সেনাবাহিনীর আত্মিক বন্ধনের এক শক্তিশালী ভূরাজনৈতিক বার্তা।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর পেশাদারিত্ব আজ শুধু দেশের সীমানায় সীমাবদ্ধ নেই, বরং জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনের মাধ্যমে তা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছে। এই প্রেক্ষাপটে, প্রধানমন্ত্রীর এই মহড়া পরিদর্শন এবং সেখানে প্রদত্ত দিকনির্দেশনা রাষ্ট্রীয় প্রতিরক্ষা কৌশলের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে।
মহড়া চলাকালে তিনি জঙ্গলজুড়ে পরিচালিত বিভিন্ন যুদ্ধকৌশল, অ্যান্টি-ড্রোন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং সেনাসদস্যদের মাঠপর্যায়ের প্রস্তুতি সরেজমিনে পর্যবেক্ষণ করেন।
যুদ্ধক্ষেত্র সব সময় সমতল ভূমিতে হয় না। পাহাড়, জঙ্গল, নদী কিংবা জলাভূমি—প্রতিটি ভূখণ্ডের জন্য প্রয়োজন ভিন্ন কৌশল। তাই আধুনিক সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষণে বাস্তব পরিবেশের অনুকরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বাবুগঞ্জের বিস্তীর্ণ জঙ্গলজুড়ে সেনাসদস্যদের অবস্থান গ্রহণ, গোপন চলাচল, প্রতিরক্ষামূলক অবস্থান, কৌশলগত অগ্রসর হওয়া এবং শত্রুর সম্ভাব্য আক্রমণ মোকাবিলার বিভিন্ন অনুশীলন প্রধানমন্ত্রী ঘুরে ঘুরে পর্যবেক্ষণ করেন। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা তাঁকে মহড়ার বিভিন্ন ধাপ এবং বাস্তব যুদ্ধ পরিস্থিতির উপযোগী প্রস্তুতি সম্পর্কে অবহিত করেন।
এই ধরনের প্রশিক্ষণ কেবল শারীরিক সক্ষমতা বাড়ায় না; এটি দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ, দলগত সমন্বয়, নেতৃত্ব এবং প্রতিকূল পরিবেশে মানসিক দৃঢ়তাও গড়ে তোলে।
বিশ্বের সাম্প্রতিক সংঘাতগুলো একটি বিষয় স্পষ্ট করেছে—ড্রোন এখন আধুনিক যুদ্ধের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। ছোট আকারের চালকবিহীন উড়োজাহাজ গোয়েন্দা নজরদারি, লক্ষ্যবস্তু শনাক্তকরণ এবং হামলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে মহড়ায় প্রধানমন্ত্রী অ্যান্টি-ড্রোন মাল্টি-ব্যারেল সিস্টেমের কার্যক্রম প্রত্যক্ষ করেন। সেনা কর্মকর্তারা তাঁকে এই প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির কার্যপদ্ধতি এবং সম্ভাব্য যুদ্ধক্ষেত্রে এর ব্যবহার সম্পর্কে অবহিত করেন।
বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা নীতির মূল লক্ষ্য আগ্রাসন নয়, বরং আত্মরক্ষার সক্ষমতা বৃদ্ধি। আধুনিক প্রযুক্তির সংযোজন সেই প্রতিরক্ষাকে আরও কার্যকর ও সময়োপযোগী করে তোলে। প্রযুক্তিনির্ভর যুদ্ধের যুগে এমন সক্ষমতা একটি দেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে আরও বিশ্বাসযোগ্য করে।
সামরিক ইতিহাসে একটি বিষয় বহুবার প্রমাণিত হয়েছে—নেতৃত্বের শক্তি শুধু নির্দেশনায় নয়, উপস্থিতিতেও নিহিত থাকে। মহড়া চলাকালে প্রধানমন্ত্রী জঙ্গলের ভেতরে কর্মরত সেনাসদস্যদের সঙ্গে কথা বলেন, তাঁদের অভিজ্ঞতা শোনেন এবং দায়িত্ব পালনে উৎসাহিত করেন। পরে তিনি তাঁদের সঙ্গে মাটিতে বসে যুদ্ধক্ষেত্রের পরিবেশে প্রস্তুত করা সাধারণ খাবার গ্রহণ করেন। কৌটার মধ্যে মোম জ্বালিয়ে তৈরি আগুনে রান্না করা ভাত, ডাল, আলুভর্তা, চিংড়ি মাছ ও ডিমের তরকারি গ্রহণের মধ্য দিয়ে তিনি মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা কাছ থেকে অনুভব করেন।
এ ধরনের প্রতীকী উপস্থিতি নেতৃত্ব ও সৈনিকদের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা বৃদ্ধি করে। একজন রাষ্ট্রনেতা যখন মাঠপর্যায়ের সদস্যদের জীবনযাপন ও কর্মপরিবেশকে সম্মান জানান, তখন সেটি বাহিনীর মনোবলেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।
মহড়া পরিদর্শন কালে প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে বলেন, তিনি একটি সেনা পরিবারে বেড়ে উঠেছেন। তাই সেনাসদস্যদের কাছে এলে তাঁর শৈশবের স্মৃতি ফিরে আসে এবং তাঁদের সঙ্গে সময় কাটাতে ভালো লাগে।
এই ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা তাঁর বক্তব্যকে মানবিক মাত্রা দিয়েছে। একই সঙ্গে এটি বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে নেতৃত্বের আবেগগত সংযোগেরও প্রতিফলন।
সেনাবাহিনীর শক্তি শুধু আধুনিক অস্ত্র কিংবা উন্নত প্রযুক্তিতে নয়; জনগণের বিশ্বাসেও নিহিত থাকে।
প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে বলেন, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতীক। জাতীয় সংকট মোকাবিলা, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় বাহিনীটি বারবার পেশাদারিত্ব, সাহসিকতা ও দেশপ্রেমের পরিচয় দিয়েছে। তিনি আরও বলেন, সেনাসদস্যদের শৃঙ্খলা, দক্ষতা, আত্মত্যাগ ও কর্তব্যনিষ্ঠা দেশের মানুষের মনে সেনাবাহিনীর প্রতি গভীর আস্থা সৃষ্টি করেছে।
বাংলাদেশে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, উদ্ধার অভিযান, অবকাঠামো নির্মাণ কিংবা জরুরি পরিস্থিতিতে সেনাবাহিনীর ভূমিকা সাধারণ মানুষের কাছে বাহিনীটির গ্রহণযোগ্যতা আরও বাড়িয়েছে। এই আস্থা ধরে রাখতে পেশাদারিত্ব, শৃঙ্খলা এবং সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনের সংস্কৃতি আরও শক্তিশালী হওয়া প্রয়োজন।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনী জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। বিশ্বের বিভিন্ন সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা পেশাদারিত্ব, মানবিকতা ও দক্ষতার জন্য আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন করেছেন।
প্রধানমন্ত্রীও আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন যে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আরও সুনাম, মর্যাদা ও পেশাগত স্বীকৃতি অর্জন করবে। তিনি বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধি ও আধুনিকায়নের জন্য সরকারের ধারাবাহিক সহযোগিতার কথাও পুনর্ব্যক্ত করেন।
নিরাপত্তা এখন আর শুধু সীমান্ত রক্ষার বিষয় নয়। সাইবার নিরাপত্তা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ, মহাকাশভিত্তিক নজরদারি এবং ড্রোন প্রতিরোধ—সবকিছুই এখন জাতীয় নিরাপত্তার অংশ।
বাংলাদেশের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূকৌশলগত অবস্থানে থাকা দেশের জন্য আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা সময়ের দাবি। একই সঙ্গে দেশীয় প্রতিরক্ষা গবেষণা, প্রযুক্তি উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণে বিনিয়োগ বাড়ানোও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
পরিশেষে বলা যায়, ৎবরিশালের বাবুগঞ্জের জঙ্গল থেকে প্রধানমন্ত্রী যে বার্তাটি দিলেন, তা একাধারে দেশপ্রেমের, আধুনিকায়নের এবং আত্মবিশ্বাসের। প্রযুক্তির ছোঁয়ায় আধুনিক ও মনস্তাত্ত্বিকভাবে বলীয়ান একটি সেনাবাহিনীই পারে একটি স্বাধীন দেশের পতাকাকে চিরকাল সমুন্নত রাখতে। মাঠপর্যায়ের সৈনিকদের সাথে মাটিতে বসে খাবার খাওয়া যেমন নেতৃত্বের মানবিক ও অনন্য উচ্চতাকে প্রকাশ করে, ঠিক তেমনি অ্যান্টি-ড্রোন সিস্টেমের কার্যকারিতা পরিদর্শন রাষ্ট্রের কৌশলগত কঠোর অবস্থানকে তুলে ধরে।
পেশাদার প্রশিক্ষণ, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং সর্বোচ্চ প্রস্তুতি বজায় রাখার মাধ্যমে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী আগামী দিনে দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার পাশাপাশি বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের গৌরব আরও বাড়িয়ে তুলবে—বাবুগঞ্জের এই মহড়া সেই আত্মবিশ্বাসেরই এক মূর্ত প্রতীক।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সম্পাদক, আমার দিন।
ই-মেইল: [email protected]

















