বিচ্ছিন্নতাবাদীদের হাতে রাষ্ট্রীয় অস্ত্র

ভারতের অর্ডন্যান্স ফেক্টরির বুলেট পার্বত্য চট্টগ্রামে

fec-image

ভারতের মণিপুর রাজ্যে জাতিগত দাঙ্গা দমনে নিয়োজিত বিএসএফ ও ভারতীয় সেনাবাহিনী বর্তমানে যে প্রাণঘাতী হামলার শিকার হচ্ছে, সেখানে ব্যবহৃত গোলাবারুদের এক বড় অংশই দেশটির নিজস্ব সরকারি সমরাস্ত্র উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান “অর্ডন্যান্স ফ্যাক্টরি বোর্ড” (OFB)-এর তৈরি। এই তথ্যটি ভারতের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য যতটা লজ্জাজনক, বাংলাদেশের জন্য ততটাই প্রাসঙ্গিক। কারণ, প্রায় দুই বছর আগে পার্বত্য চট্টগ্রামের শান্তিবাহিনীর (জেএসএস) এক সদস্যের অসতর্ক সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছিল যে, ভারতের পুনেতে অবস্থিত “অ্যামোনিশন ফ্যাক্টরি খড়কি” (AFK) থেকে উৎপাদিত বুলেট দীর্ঘ ২৭০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশের বিদ্রোহীদের হাতে পৌঁছেছে। অর্থাৎ, যে কারখানা থেকে ভারত নিজের সেনাবাহিনীর জন্য বুলেট তৈরি করে, সেই একই বুলেটে এক সময় বাংলাদেশের পাহাড় রক্তাক্ত হয়েছে এবং আজ ভারতের পাহাড় রক্তাক্ত হচ্ছে।

পার্বত্য চট্টগ্রামে বিচ্ছিন্নতাবাদ উসকে দিতে ভারতের এই সুসংগঠিত অস্ত্র সরবরাহের ইতিহাসটি শুরু হয় আশির দশকে। তখন ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা R&AW-এর সরাসরি তত্ত্বাবধানে ত্রিপুরা ও মিজোরাম সীমান্তে শান্তিবাহিনীর জন্য প্রশিক্ষণ ক্যাম্প গড়ে তোলা হয়েছিল। নথিপত্র ও সামরিক পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ভারত মূলত তিনটি ধাপে এই অস্ত্র ও গোলাবারুদ সরবরাহ করত। তৎকালীন শান্তিবাহিনীকে (জেএসএস-এর সশস্ত্র শাখা) ভারত যেভাবে সামরিক ও লজিস্টিক সহায়তা দিয়েছিল, তা ছিল অত্যন্ত সুপরিকল্পিত। ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ (R&AW)-এর তত্ত্বাবধানে ত্রিপুরা ও মিজোরামের দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় শান্তিবাহিনীর জন্য একাধিক গোপন প্রশিক্ষণ ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছিল। ভারতের বিএসএফ (BSF) এই ক্যাম্পগুলোর নিরাপত্তা এবং প্রশাসনিক দিকটি দেখাশোনা করত। সেখানে শান্তিবাহিনীর ক্যাডারদের গেরিলা যুদ্ধ, অ্যাম্বুশ এবং বিস্ফোরক ব্যবহারের উচ্চতর প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।

ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর (সেভেন সিস্টার্স) নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অজুহাতে সেখানে প্রচুর পরিমাণে রাষ্ট্রীয় গোলাবারুদ মজুদ করা হয়। সেখান থেকেই একটি বড় অংশ পাচার হয় সন্ত লারমার সশস্ত্র বাহিনী পিসিজেএসএস ও প্রসীত খীসার ইউপিডিএফ এর হাতে। পিসিজেএসএস এর ব্যবহৃত প্রধান অস্ত্রগুলোর মধ্যে এসএলআর (SLR) এবং ভারতীয় কারখানায় তৈরি ৭.৬২ মিমি ক্যালিবারের বুলেট। এছাড়াও জেএসএস’র শীর্ষ নেতাদের ভারতে রাজনৈতিক আশ্রয় দেওয়া হয়েছিল। আগরতলায় তাদের একটি লিয়াজোঁ অফিসও ছিল, যেখান থেকে তারা তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করত। এছাড়া আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে শান্তিবাহিনীর পক্ষে প্রচারণা চালানো এবং তাদের রসদ জোগাতে ভারত সরাসরি আর্থিক অনুদান দেয়।

পুনে থেকে কলকাতা হয়ে আগরতলা পর্যন্ত বিস্তৃত রেল ও সড়কপথকে অস্ত্র পরিবহনের প্রধান রুট হিসেবে ব্যবহার করা হতো। গোয়েন্দা রিপোর্ট অনুসারে, ভারতের ‘অ্যামোনিশন ফ্যাক্টরি খড়কি’ (AFK) থেকে আসা লটগুলো সরাসরি বিএসএফ-এর নিরাপত্তা বেষ্টনী অতিক্রম করে পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম সীমান্ত দিয়ে বিদ্রোহীদের ডেরায় পৌঁছায়। এছাড়াও, বর্তমানে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। মিয়ানমার এখন দক্ষিণ এশিয়ার বিদ্রোহীদের মূল প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ও অস্ত্রাগারে পরিণত হয়েছে। ভারতের নাগাল্যান্ডের বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী, যারা ‘নাগাল্যান্ড’ নামক স্বাধীন রাষ্ট্রের দাবি করে, তারা গত ৩১ মার্চ মিয়ানমারের জঙ্গল থেকে সামরিক মহড়ার ছবি প্রকাশ করেছে। বর্তমানে বাংলাদেশের কেএনএফ (KNF) এবং ভারতের বিভিন্ন বিদ্রোহী গোষ্ঠী মিয়ানমারের অরাজকতার সুযোগ নিয়ে সেখানে যৌথভাবে সামরিক প্রশিক্ষণ নিচ্ছে।

১৯৭০ ও ৮০-র দশকে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে বারবার দিল্লির কাছে এই লজিস্টিক সহায়তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানো হয়। তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং পরবর্তীতে এরশাদ সরকারের আমলে আন্তর্জাতিক ফোরামেও ভারতের এই দ্বিমুখী নীতির বিষয়টি তোলা হয়েছিল। বাংলাদেশ স্পষ্টভাবে জানিয়েছিল যে, প্রতিবেশী রাষ্ট্রের এই ভূমিকা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার পরিপন্থী। শান্তিবাহিনীর এই সশস্ত্র তৎপরতা রুখতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী পার্বত্য চট্টগ্রামে কঠোর সামরিক অভিযান পরিচালনা শুরু করে। ভারত থেকে প্রশিক্ষিত হয়ে আসা বিদ্রোহীদের দমনে সরকার পার্বত্য অঞ্চলে প্রচুরসংখ্যক সেনা মোতায়েন করে এবং ‘অপারেশন দাবানল’ সহ বিভিন্ন বিশেষ অভিযান চালায়।

পরবর্তীতে বাংলাদেশ সরকারের সাথে সন্ত লারমার নের্তৃত্বাধীন পিসিজেএসএস এর পার্বত্য শান্তি চুক্তির পর পার্বত্য চট্টগ্রাম অনেকাংশই নজরদারির বাহিরে চলে যায়। ২০০ এর অধিকা সেনাক্যাম্প তুলে ফেলা হয় হয় ৩ পার্বত্য জেলা থেকে। পরবর্তীতে জন্ম হয় আরো বেশ কয়েকটি বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র সংগঠন।

ভারতের এই দ্বিমুখী নীতির ফলাফল এখন বুমেরাং হয়ে দেখা দিচ্ছে। বিংশ শতাব্দীতে শান্তিবাহিনীকে শান্ত করার ছলে যে গোলাবারুদ সরবরাহ করা হয়েছিল, সেই সাপ্লাই চেইন এখন ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলেই সক্রিয় হয়ে উঠেছে। মণিপুরে উদ্ধার হওয়া OFB-র সিল মারা বুলেটগুলোই এর বড় প্রমাণ। ভারত যখন নিজের কারখানায় তৈরি বুলেট দিয়ে অন্যের ঘরের শান্তি বিঘ্নিত করার মদদ দিয়েছিল, তখন তারা এই লজিস্টিক চেইনের নিরাপত্তার কথা ভাবেনি। আজ সেই একই বুলেট যখন ভারতীয় বাহিনীর শরীরে বিঁধছে, তখন বোঝা যায় যে অন্যের জন্য পাতা অশান্তির ফাঁদ শেষ পর্যন্ত নিজের দিকেই ফিরে আসে।

তথ্য বলছে, মিয়ানমারের গহীন অরণ্যে এখন ভারত ও বাংলাদেশ উভয় দেশের বিদ্রোহীদের জন্য অস্ত্রের একটি উন্মুক্ত বাজার তৈরি হয়েছে, যেখানে ভারতের রাষ্ট্রীয় অস্ত্র কারখানার সরঞ্জামগুলোই বিদ্রোহীদের প্রধান সম্পদে পরিণত হয়েছে। মনিপুর এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে সম্পর্ক মূলত জাতিগত নৈকট্য, যৌথ প্রশিক্ষণ এবং ভৌগোলিক অবস্থানের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে।
মনিপুরের ‘কুকি’ এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের ‘বম’, ‘পাংখুয়া’ বা ‘লুসাই’ জনগোষ্ঠী একই বৃহত্তর জ়ো (Zo) জাতিগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত। এই জাতিগত মিলের কারণে তাদের মধ্যে একটি স্বাভাবিক সহানুভূতি কাজ করে। বিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রামের কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট (KNF)-এর সাথে মনিপুরের কুকি বিচ্ছিন্নতাবাদীদের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে।

পার্বত্য চট্টগ্রামের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো, বিশেষ করে KNF, শুরুর দিকে ভারতের মনিপুর এবং মায়ানমারের চিন রাজ্যে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছে বলে বিভিন্ন গোয়েন্দা প্রতিবেদনে জানা যায়। KNF-এর সশস্ত্র শাখার অনেক সদস্যকে মনিপুরের পাহাড়ি এলাকায় প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। উভয় দেশের বিচ্ছিন্নতাবাদীরা এক দেশের নিরাপত্তা বাহিনী অভিযান চালালে অন্য দেশের দুর্গম পাহাড়ি সীমান্ত এলাকায় তারা নিরাপদ আশ্রয় খুঁজে নেয়। বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলোর টিকে থাকার জন্য চোরাচালান একটি বড় মাধ্যম। মনিপুর ও পার্বত্য চট্টগ্রামের সীমান্ত এলাকাগুলো দুর্গম হওয়ায় এখানে একটি শক্তিশালী ‘স্মাগলিং নেটওয়ার্ক’ গড়ে উঠেছে। মায়ানমার সীমান্ত দিয়ে আসা অত্যাধুনিক অস্ত্র (যেমন AK-series রাইফেল) মনিপুর হয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে বা উল্টো পথে পাচার হয়। এই গোষ্ঠীগুলো একে অপরের অস্ত্রের জোগানদাতা বা মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করে

বর্তমানে মনিপুরের জাতিগত দাঙ্গা এবং বাংলাদেশে KNF-এর বিরুদ্ধে অভিযানের ফলে এই দুই অঞ্চলের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের মধ্যে যোগাযোগ আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে সীমান্ত দিয়ে শরণার্থী চলাচলের সুযোগ নিয়ে বিচ্ছিন্নতাবাদীরা এক দেশ থেকে অন্য দেশে তাদের সরঞ্জাম ও লোকবল আদান-প্রদান করছে। এছাড়াও বাংলাদেশ সীমান্তের কাছাকাছি আফিম চাষ বাড়ছে। গত ৭ মার্চ ২০২৬ তারিখে বান্দরবানের আলিকদম সীমান্তে বুলুপাড়া বিওপির একটি টহল দল বেশ কয়েকটি আফিম বাগানে অভিযান পরিচালনা করে। প্রায় ৫০ শতক জমিতে চাষকৃত আফিম ধ্বংস করে বিজিবি ও সেনাবাহিনী।

পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর বর্তমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতি এটিই প্রমাণ করে যে, বিচ্ছিন্নতাবাদ এবং অবৈধ অস্ত্রের বিস্তার কোনো নির্দিষ্ট সীমানায় সীমাবদ্ধ থাকে না। আশির দশকে ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থে ভারতের অর্ডন্যান্স ফ্যাক্টরির যে গোলাবারুদ ছায়াশক্তির মাধ্যমে সীমান্তের ওপারে পাঠানো হয়েছিল, আজ সেই একই অস্ত্রের নল ভারতের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার দিকেই ঘুরে দাঁড়িয়েছে, যা মূলত একটি ‘বুমেরাং’ বা আত্মঘাতী পরিণতির নামান্তর।

পার্বত্য চট্টগ্রামের KNF বা জেএসএস এবং মনিপুরের কুকি বিদ্রোহীদের মধ্যকার জাতিগত ও কৌশলগত সেতুবন্ধন দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য একটি অশনিসংকেত। বিশেষ করে মিয়ানমারের অরাজকতাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই বিশাল ‘ব্লাক মার্কেট’ এবং যৌথ প্রশিক্ষণ নেটওয়ার্ক রাষ্ট্রীয় সীমানার সার্বভৌমত্বকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে।

উৎস : লেখকের ফেইসবুক পোস্ট

Print Friendly, PDF & Email
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও পড়ুন