বিশ্বে কওমি শিক্ষার্থীর প্রায় ৬০ শতাংশই বাংলাদেশে

fec-image

উনিশ শতকের মাঝামাঝি ভারতের উত্তর প্রদেশের ছোট্ট জনপদ দেওবন্দে যে শিক্ষাধারার সূচনা হয়েছিল, দেড় শতাব্দী পর সেই ধারার সবচেয়ে বড় কেন্দ্র হয়ে উঠেছে বাংলাদেশ। প্রতিষ্ঠান, শিক্ষার্থী এবং সম্প্রসারণের গতির বিচারে বর্তমানে ভারত ও পাকিস্তানকে ছাড়িয়ে গেছে দেশের কওমি মাদরাসা শিক্ষা।

আঠারোশ সাতান্ন সালের সিপাহি বিদ্রোহের পর মুসলিম সমাজে ধর্মীয় শিক্ষা ও পুনর্জাগরণের লক্ষ্যে মাওলানা কাসিম নানুতাবির নেতৃত্বে ১৮৬৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় দারুল উলুম দেওবন্দ। পরবর্তী সময়ে ভারতীয় উপমহাদেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে দেওবন্দি শিক্ষাধারা। দেশভাগের পর ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশে এ ধারার বিকাশ ঘটলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সবচেয়ে দ্রুত সম্প্রসারণ ঘটেছে বাংলাদেশে। বর্তমানে বিশ্বের দেওবন্দি বা কওমি ধারার মাদরাসাগুলোর শিক্ষার্থীর প্রায় ৬০ শতাংশই বাংলাদেশে অধ্যয়ন করছে। সংখ্যার বিচারে এটি পাকিস্তানের তুলনায় প্রায় তিন গুণ।

দেশের বৃহত্তম কওমি শিক্ষা বোর্ড বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশ (বেফাক)-এর তথ্য অনুযায়ী, তাদের অধীনে বর্তমানে নিবন্ধিত মাদরাসার সংখ্যা প্রায় ৩২ হাজার ৭৩০টি। এসব প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীর সংখ্যা আনুমানিক ৭০ লাখ। এছাড়া অন্যান্য কওমি বোর্ডের অধীনেও রয়েছে আরও ১০ হাজারের বেশি মাদরাসা। ফলে দেশে কওমি ধারার মোট প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৪০ হাজার ছাড়িয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা।

অন্যদিকে ভারতের জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ পরিচালিত অল ইন্ডিয়া দ্বীনি তালিমী বোর্ড-এর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে তাদের আওতায় ছিল ২০ হাজার ৯০০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, যেখানে শিক্ষার্থী ছিল ২৩ লাখ ৭১ হাজার ৪০৪ জন। পাকিস্তানের বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া, পাকিস্তান-এর তথ্য অনুযায়ী, তাদের অধীনে রয়েছে ২৭ হাজার ৪৮টি মাদরাসা এবং শিক্ষার্থী ২৪ লাখ ২ হাজার ৩২৩ জন।

তুলনামূলক এ চিত্রে স্পষ্ট, প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষার্থী—উভয় ক্ষেত্রেই বাংলাদেশ এখন দেওবন্দি ধারার শিক্ষার সবচেয়ে বড় কেন্দ্র। শুধু প্রতিষ্ঠানের সংখ্যাই নয়, প্রতি বছর বাড়ছে শিক্ষার্থীর সংখ্যাও। বেফাকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর তাদের কেন্দ্রীয় পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে ৩ লাখ ৫৪ হাজার ৩৬ জন শিক্ষার্থী। ২০২২ সালে এ সংখ্যা ছিল ২ লাখ ২৫ হাজার ৬৩১। অর্থাৎ চার বছরের ব্যবধানে পরীক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়েছে ১ লাখ ২৮ হাজার ৪০৫ জন, যা প্রায় ৫৭ শতাংশ।

শিক্ষাবিদদের মতে, কওমি শিক্ষায় শিক্ষার্থী বৃদ্ধি দেশের আর্থসামাজিক বাস্তবতারই প্রতিফলন। দরিদ্র ও নিম্নআয়ের পরিবারের জন্য কওমি মাদরাসা একটি কার্যকর বিকল্প শিক্ষা ব্যবস্থা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মো. আব্দুস সালাম বণিক বার্তাকে বলেন, “দেশে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে কওমি মাদরাসায় শিক্ষার্থী বৃদ্ধির অন্যতম কারণ দারিদ্র্য। অধিকাংশ মাদরাসায় বিনা খরচে অথবা খুব স্বল্প ব্যয়ে পড়াশোনার সুযোগ রয়েছে। পাশাপাশি আবাসিক ব্যবস্থাও থাকায় শ্রমজীবী ও নিম্নআয়ের পরিবারগুলো সন্তানদের এসব প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে আগ্রহী হচ্ছে।”

বাংলাদেশে কওমি শিক্ষার আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয় ১৯০১ সালে চট্টগ্রামের দারুল উলুম মঈনুল ইসলাম হাটহাজারী মাদরাসা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। ভারতের দারুল উলুম দেওবন্দের আদর্শ অনুসরণে প্রতিষ্ঠিত এ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্র করেই পরবর্তী সময়ে সারা দেশে কওমি শিক্ষার বিস্তার ঘটে। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে হাজার হাজার কওমি মাদরাসা পরিচালিত হলেও সেগুলোর অধিকাংশই সরকারি নিবন্ধন কাঠামোর বাইরে রয়েছে।

ভারতে দেওবন্দি মাদরাসাগুলোর অধিকাংশ সরাসরি সরকারি নিবন্ধিত না হলেও যেসব সংগঠনের অধীনে এগুলো পরিচালিত হয়, সেগুলো আইনিভাবে নিবন্ধিত। ঐতিহ্যবাহী দারুল উলুম দেওবন্দের পরিচালনাকারী সংস্থা ‘শূরা সোসাইটি’ দেশটির সোসাইটি অ্যাক্টের অধীনে নিবন্ধিত এবং সংবিধান স্বীকৃত সংখ্যালঘু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচালিত হয়। পাকিস্তানেও বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া, পাকিস্তানের আওতাধীন শিক্ষা ব্যবস্থার বিভিন্ন স্তর সরকার স্বীকৃত। তবে বাংলাদেশে কওমি শিক্ষার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে সরকারি স্বীকৃতির সীমাবদ্ধতাকে।

অবশ্য কওমি শিক্ষার সর্বোচ্চ স্তর ‘দাওরায়ে হাদিস’কে মাস্টার্স সমমান হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে ২০১৮ সালে। এ স্বীকৃতির পর ছয়টি বড় বোর্ডকে নিয়ে গঠন করা হয় ‘আল-হাইআতুল উলইয়া লিল-জামিআতিল কওমিয়া বাংলাদেশ’। বর্তমানে দাওরায়ে হাদিস পরীক্ষা এ বোর্ডের অধীনেই অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। তবে কওমি শিক্ষার নিম্ন ও মধ্যম স্তরগুলো এখনো সরকারি স্বীকৃতির বাইরেই রয়ে গেছে। ফলে দাওরায়ে হাদিস পর্যন্ত না পৌঁছানো বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী আনুষ্ঠানিক শিক্ষা ও চাকরির বাজারে প্রবেশের ক্ষেত্রে নানা সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি হন।

চলতি বছরের দাওরায়ে হাদিস পরীক্ষায় অংশ নেয় ২৩ হাজার ৮৮১ শিক্ষার্থী। এর মধ্যে ছাত্র ১৫ হাজার ২৬৮ ও ছাত্রী ৮ হাজার ৬১৩ জন। দেশের ১০৪টি ছাত্র ও ১৫৫টি ছাত্রী মারকাজে (কেন্দ্রে) এ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়।

কওমি মাদরাসা শিক্ষা নিয়ে দেশের আলেম সমাজের মধ্যেই রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি। কেউ এটিকে ইসলামী শিক্ষা ও ধর্মীয় মূল্যবোধ সংরক্ষণের সবচেয়ে কার্যকর মাধ্যম হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ রাষ্ট্রীয় তদারকি ও একাডেমিক স্বীকৃতির আওতায় আনার প্রয়োজনীয়তার কথা বলছেন।

চট্টগ্রামের হাটহাজারীর ফতেপুর মাদরাসার পরিচালক মাওলানা মাহমুদুল হাসান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দেশের আলিয়া মাদরাসার সংখ্যা অনেক হলেও সেগুলোর মাধ্যমে ইসলামী শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য পূরণ সম্ভব হয়নি। বাস্তব দ্বীনি শিক্ষা এবং ইসলামের প্রচার-প্রসারে কওমি মাদরাসাগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এ কারণেই সাধারণ মানুষের মধ্যে এ ধারার শিক্ষার প্রতি আগ্রহ দিন দিন বাড়ছে।’

অন্যদিকে চট্টগ্রাম নেছারিয়া কামিল মাদরাসার সাবেক অধ্যক্ষ জয়নুল আবেদীন জুবাইর মনে করেন, কওমি মাদরাসাগুলোকে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর সঙ্গে আরো সমন্বিত করা প্রয়োজন। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘কওমি মাদ্রাসাগুলো সরকারিভাবে নিবন্ধিত নয়। অনেক ক্ষেত্রেই রাষ্ট্রীয় কাঠামোর আওতায় আসার ব্যাপারে তাদের নিজেদেরও অনাগ্রহ রয়েছে। ফলে তারা নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করছে, যেখানে কার্যকর তদারকি বা মূল্যায়নের সুযোগ সীমিত।’

তার মতে, একটি রাষ্ট্রে একই ধরনের ধর্মীয় শিক্ষা ব্যবস্থা দীর্ঘদিন দুটি পৃথক ধারায় পরিচালিত হওয়া সমন্বিত শিক্ষানীতির জন্য ইতিবাচক নয়। জয়নুল আবেদীন জুবাইর বলেন, ‘যদি কওমি মাদরাসাগুলো নিবন্ধনের আওতায় এনে রাষ্ট্রীয় অডিট, মান নিয়ন্ত্রণ এবং শিক্ষাক্রম প্রণয়নে সরকার ও মাদরাসা শিক্ষাবিদদের যৌথ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা যায়, তাহলে শিক্ষার্থীরা ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি কর্মমুখী দক্ষতাও অর্জনের সুযোগ পাবে। তাই সরকারের উচিত কওমি মাদরাসার নেতৃত্বের সঙ্গে আলোচনা করে এমন একটি গ্রহণযোগ্য কাঠামো তৈরি করা, যাতে তারা রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে পারেন। তবে এ প্রক্রিয়ায় কওমি মাদরাসার নেতৃত্ব ও আলেমদের মতামত এবং ধর্মীয় সংবেদনশীলতাকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।’

দেশে কওমি শিক্ষার বিস্তার এখন আর কেবল ধর্মীয় শিক্ষার পরিসরে সীমাবদ্ধ নয়; এটি বৃহৎ জনগোষ্ঠীর শিক্ষা বাস্তবতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত হয়েছে। তবে শিক্ষার্থী ও প্রতিষ্ঠানের দ্রুত বৃদ্ধির সঙ্গে সমন্বয় করে পাঠ্যক্রমের আধুনিকায়ন, সরকারি নিবন্ধন, বিভিন্ন স্তরের একাডেমিক স্বীকৃতি প্রয়োজন। সেই সঙ্গে কর্মসংস্থানের সুযোগ নিশ্চিত করা না গেলে বিপুলসংখ্যক এ শিক্ষার্থীর সম্ভাবনা মূলধারার অর্থনীতিতে পুরোপুরি কাজে লাগানো কঠিন হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

কওমি শিক্ষার সরকারি নিবন্ধন ও স্বীকৃতির প্রশ্নে এ ধারার বোর্ডগুলোর অবস্থান যদিও এখনো স্পষ্টভাবে বিভক্ত। সংশ্লিষ্টদের একাংশ মনে করেন, সরকারি নিয়ন্ত্রণের আওতায় এলে কওমি শিক্ষার স্বকীয়তা ক্ষুণ্ন হতে পারে। অন্যদিকে গবেষকরা বলছেন, স্বীকৃতি ও মান নিয়ন্ত্রণের অভাব শিক্ষার্থীদের কর্মসংস্থানে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সিলেট অঞ্চলের কওমি শিক্ষা বোর্ড আযাদ দ্বীনি এদারায়ে তালিম বাংলাদেশের মহাসচিব মাওলানা আব্দুল বাছির বণিক বার্তাকে বলেন, ‘নিবন্ধন বলতে যদি এমপিওভুক্তি বা সরকারের সরাসরি নিয়ন্ত্রণকে বোঝানো হয়, তাহলে আমরা তার পক্ষে নই। আমাদের জানা মতে, ভারত ও পাকিস্তানেও কওমি মাদরাসাগুলো এ ধরনের ব্যবস্থার আওতায় পরিচালিত হয় না। বর্তমানে আল-হাইআতুল উলিয়ার মাধ্যমে দাওরায়ে হাদিস স্তর রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পেয়েছে। কিন্তু বাকি প্রতিষ্ঠানগুলোকে সরকারি নিবন্ধনের আওতায় আনার পক্ষে আমরা নই।’

সরকারি নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আশঙ্কার কথাও তুলে ধরেন তিনি। এ প্রসঙ্গে মাওলানা আব্দুল বাছির বলেন, ‘আমাদের আশঙ্কা, নিবন্ধনের আওতায় গেলে সরকার ভবিষ্যতে সিলেবাস বা পাঠ্যবই চাপিয়ে দিতে পারে, যা ইসলামী শিক্ষার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এ কারণেই আমাদের মুরব্বিরা এ বিষয়ে অনাগ্রহী।’ তবে ভবিষ্যতে সময়ের প্রয়োজন বিবেচনায় তারা বসে নতুন সিদ্ধান্তও নিতে পারেন বলে জানান আযাদ দ্বীনি এদারায়ে তালিম বাংলাদেশের মহাসচিব।

বিভিন্ন গবেষণায় যদিও উঠে এসেছে ভিন্ন চিত্র। গবেষকদের মতে, সরকারি স্বীকৃতি ও মূলধারার শিক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে সমন্বয়ের অভাবে কওমি শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশ আনুষ্ঠানিক চাকরির বাজারে প্রবেশ করতে পারছেন না। পাশাপাশি এসব প্রতিষ্ঠানে কার্যকর সরকারি মনিটরিং না থাকায় শিক্ষার মান ও জবাবদিহিতা নিয়েও রয়েছে প্রশ্ন।

এ বিষয়ে কক্সবাজার জেলায় ‘এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড এক্সপেকটেশনস অব ফরমার মাদরাসা স্টুডেন্টস ইন কক্সবাজার: আ ক্রস-সেকশনাল এক্সপ্লোরেশন’ শীর্ষক এক গবেষণা চালায় ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (বিআইজিডি)। তাতে দেখা যায়, কওমি মাদরাসা থেকে পড়াশোনা শেষ করা শিক্ষার্থীদের মাত্র ২ দশমিক ১৭ শতাংশ সরকারি বা বেসরকারি চাকরিতে নিয়োজিত। প্রায় ৪৬ দশমিক ৫৫ শতাংশই মসজিদ, মাদরাসা ও অন্যান্য ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে ইমাম, মুয়াজ্জিন, খতিব বা শিক্ষক হিসেবে কর্মরত। বাকিরা ব্যবসা, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা কিংবা বিভিন্ন অনানুষ্ঠানিক পেশায় যুক্ত।

কর্মসংস্থানের সেই বাস্তবতার প্রতিফলন দেখা যায় সিলেট নগরীর কাজিরবাজারের জামেয়া মাদানিয়া ইসলামিয়া মাদরাসার সাবেক শিক্ষার্থী মো. আবদুল্লাহর জীবনেও। গত বছর দাওরায়ে হাদিস (মাস্টার্স সমমান) সম্পন্ন করার পর তিনি প্রথমে একটি মাদরাসায় শিক্ষকতা শুরু করেন। তবে সীমিত আয়ের কারণে পরে পেশা পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেন। আবদুল্লাহ বলেন, ‘মাদরাসায় শিক্ষকতা করলেও যৎসামান্য বেতন দিয়ে সংসারের প্রয়োজন মেটানো কঠিন ছিল। তাই কয়েক মাস আগে প্রিন্টিং ব্যবসা শুরু করেছি। এখন নগরীর লালদীঘির পাড় এলাকায় একটি প্রিন্টিং প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করছি। আমার পরিচিত আরো অনেক কওমি শিক্ষার্থী জীবিকার জন্য ব্যবসা বা অন্য পেশা বেছে নিয়েছেন।’

দেশে কওমি মাদ্রাসার দ্রুত বিস্তার, অনিয়ন্ত্রিত সম্প্রসারণ এবং নিবন্ধন-সংক্রান্ত জটিলতার পেছনে মূলত আর্থসামাজিক বাস্তবতা ও সমন্বিত সরকারি নীতির অভাব কাজ করছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরাও। তাদের মতে, এ সংকটের টেকসই সমাধানে সরকার, আলেম সমাজ এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের নিয়ে আলোচনার ভিত্তিতে একটি সমন্বিত নিবন্ধন কাঠামো গড়ে তোলা প্রয়োজন। এমন একটি ব্যবস্থা হতে হবে, যা কওমি শিক্ষার স্বকীয়তা ও ধর্মীয় অনুভূতি অক্ষুণ্ন রেখে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করবে।

এ বিষয়ে দেশের বৃহৎ কওমি মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড বেফাকের মহাপরিচালক মাওলানা উবায়দুর রহমান খান নদভী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দেশের সাধারণ শিক্ষা ব্যবস্থায় ব্যয় বেড়ে যাওয়া এবং ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার প্রতি অভিভাবকদের আগ্রহ বৃদ্ধির কারণে অনেক পরিবার কম খরচে সন্তানদের কওমি মাদরাসায় পাঠাচ্ছেন। অন্যদিকে পাকিস্তানে দীর্ঘদিন ধরে একটি সুসংগঠিত শিক্ষা বোর্ড ও নীতিমালার আওতায় কওমি শিক্ষা পরিচালিত হওয়ায় সেখানে নিবন্ধন প্রক্রিয়া তুলনামূলকভাবে সহজ হয়েছে। বাংলাদেশে এখনো সে ধরনের সমন্বিত কাঠামো গড়ে ওঠেনি।’

দেশে যথাযথ তদারকি ছাড়াই ব্যক্তিগত উদ্যোগে অনেক কওমি মাদরাসা প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে উল্লেখ করে বেফাক মহাপরিচালক বলেন, ‘এটাও সত্য, এতে অনেক ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক বিশৃঙ্খলা তৈরি হচ্ছে এবং শিশু অধিকার নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। তবে নিবন্ধনের নামে এমন কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত হবে না, যাতে দীর্ঘদিন ধরে পরিচালিত সুপ্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়। শুধু কওমি মাদরাসাই নয়, দেশের অনেক ইংরেজি মাধ্যম ও কিন্ডারগার্টেন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও সরকারি নিবন্ধনের বিষয়ে অনাগ্রহী। তাই বিষয়টিকে এককভাবে কওমি শিক্ষার সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।’

উৎসঃ বণিক বার্তা ( ১৮ জুলাই ২০২৬)

Print Friendly, PDF & Email
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও পড়ুন