মহামারী থেকে আত্মরক্ষায় ইসলামের নির্দেশনা

fec-image

করোনা ভাইরাস নামক এক অণুজীব আজ পুরো বিশ্বকে দৈনন্দিন কাজ থেকে অঘোষিত নিষোধাজ্ঞায় রেখেছে। ৪/৫ মাস পূর্বে চীনে শুরু হওয়া এই ভাইরাস পৃথিবীর সর্বত্রে ছড়িয়ে পড়েছে। ২৪ মার্চ পর্যন্ত পাওয়া খবরে বিশ্বের প্রায় দুইশ’ দেশের সাড়েতিন লক্ষাধিক মানুষ এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে। তারমধ্যে ১৫০০০-এর বেশি মানুষ মৃত্যুবরণ করেছে। ছোট্ট এই অণুজীবকে মোকাবেলা করার জন্যে পুরো বিশ^ই আজ হিমশিম খাচ্ছে। নিঃসন্দেহে এটি মহান আল্লাহর পক্ষ হতে একপ্রকারের শাস্তি। মানুষ যখন দুনিয়ার মোহে অন্ধ হয়ে সুদ, ব্যাভিচার, অশ্লীলতা, খুন, অন্যায়, অত্যাচার, নারী-পুরুষ অবাধে মিলামেশা, দুর্নীতিসহ যাবতীয় পাপ কাজে লিপ্ত হয়, তখন মহান আল্লাহ মানুষকে দুনিয়াবি শাস্তি প্রদান করেন। মানব সৃজনের শুরু থেকে পাপাচারে লিপ্ত হওয়ার কারণে মহান আল্লাহ যুগে যুগে বিভিন্ন জাতিকে বিভিন্ন প্রকারের শাস্তি প্রদান করেছেন।

মহাগ্রন্থ আল্-কুরআ’নুল কারীমে বর্ণিত হয়েছে, ইরশাদ হচ্ছে: ‘আমি তোমাদের পূর্বে বহু সমপ্রদায়কে ধ্বংস করে দিয়েছি, যখন তারা অন্যায় কাজে লিপ্ত ছিল’ [সূরা ইউনুস, আয়াত: ১৩]।

অন্য আয়াতে এসেছে, মহান আল্লাহ বলেন: ‘আমি তাদের উপর অভাব, দারিদ্র্য ও রোগ-ব্যাধি চাপিয়ে দিয়েছি, যাতে তারা বিনয়ের সাথে নতি স্বীকার করে’ [সূরা আন’আম, আয়াত: ৪২)।

এই ভাইরাসে আক্রান্ত অধিকাংশ দেশ নিজ দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বন্ধ ঘোষণা করেছে। চীন, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, ইতালি, বাহরাইন, সৌদি আরব, মিসরসহ অনেক দেশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধের পাশাপাশি বিভিন্ন অফিস-আদালত ও বিক্রয়কেন্দ্রগুলো বন্ধ ঘোষণা করেছে। গণজামায়েতের উপর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। অনেক দেশ আর্ন্তজাতিক ফ্লাইট বাতিল করেছে। অনেক দেশ বিদেশিদের প্রবেশের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। গত ১৭ মার্চ থেকে আরবদেশগুলো তথা: সৌদি আরব, মিসর, কুয়েতসহ অনেক দেশ মসজিদে জামায়াতে নামায ও জুম’আ’র নামায আদায়ে সাময়িক নিষেধাজ্ঞা জারী করেছে! এরও আগে থেকে সৌদি আরব উমরা ও সকল প্রকারের ভিসা প্রদান বন্ধ রেখেছে এবং এমনি সৌদি নাগরিক ও সৌদি আরবে অবস্থানরত বিদেশিদের জন্যও উমরা নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।

এই প্রাণঘাতী মহামারী দুনিয়াতে নতুন কিছু নয়। যুগে যুগে মহান আল্লাহ তায়ালা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন জাতিকে এই ধরনের শাস্তি প্রদান করেছেন। যা পবিত্র কুরআ’ন ও হাদীসের অসংখ্য জায়গায় বর্ণিত হয়েছে। সহীহ বুখারী শরীফে বর্ণিত হয়েছে, উম্মুল মু’মেনীন আয়েশা সিদ্দীকা (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি একদা রাসূলুল্লাহ (দ.)-কে প্লেগ রোগ (এক প্রকারের মহামারী) সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলেন। প্রতি উত্তরে তিনি (রাসূল দ.) বললেন:

‘এটা একপ্রকারের আল্লাহর শাস্তি। আল্লাহ যাকে ইচ্ছা তার উপরই প্রেরণ করেন। তবে আল্লাহ তায়ালা এটা মু’মিনদের জন্য রহমত হিসেবে প্রেরণ করেছেন। কোনো বান্দা (মানুষ) যেন প্লেগাক্রান্ত হওয়ার কারণে ঐ এলাকা থেকে বের হয়ে না যায়। বরং ধৈর্য্যধারণ করে এই বিশ^াস নিয়ে সেখানেই অবস্থান করে। সে যেন জেনে রাখে যে, আল্লাহ তা’য়ালা তার জন্য ভাগ্যে যা লিখেছেন তা ব্যতীত তাকে কিছুই স্পর্শ করবে না। যদি স্পর্শ করেও তাহলে সে শহীদের মর্যাদা পাবে’ (সহীহ বুখারী, হাদীস নং- ৩৪৭৪)।

এই হাদীস থেকে বুঝা গেল, যে এলাকা করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত সেই এলাকার অধিবাসীগণ এই মহামারীর ভয়ে নিজ এলাকা ত্যাগ করে যেন অন্যত্র চলে না যায়, বরং আল্লাহর উপর নির্ভর করে ধৈর্য্য ধরে নিজ এলাকায় অবস্থান করেন। কারণ, মহান আল্লাহ তার জন্য ভাগ্যে যা লিপিবদ্ধ করে রেখেছেন তার একবিন্দুও কম-বেশি হবে না। আর যদি কেউ করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণও করে তাহলে সে শহীদের মর্যাদা পাবেন। যার মর্যাদা মহাগ্রন্থ আল্-কুরআ’নে নবীগণ ও সত্যবাদীগণের পরেই উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে এই ধরনের মহামারীর উদ্ভব হলে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। কারণ, ইসলাম মানবতার ধর্ম। মানুষের স্বভাবের বিরুদ্ধে যায় এমন কোনো বিষয় ইসলাম কখনো সমর্থন করে না। এই জন্যই মানুষের জান-মাল সংরক্ষণের উপর ইসলাম বারংবার তাগিদ প্রদান করেছে। আর জানের হেফাজত (আত্মরক্ষা) ইসলামি শরীয়তের গুরুত্বপূর্ণ উদ্দ্যেশ্যসমূহের মধ্যে অন্যতম। মহাগ্রন্থ আল্-কুরআ’ন ও হাদীস আত্মরক্ষার উপর গুরুত্বারোপ করেছেন। মহান আল্লাহ বলেন: ‘তোমরা নিজেদেরকে ধ্বংসের দিকে নিক্ষেপ করো না’ [সূরা আল-বাক্বারাহ, আয়াত: ১৯৫]। এই আয়াতে সরাসরি আত্মরক্ষার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

হাদীসেও মহামারীর ক্ষেত্রে সাবধানতা অবলম্বনের উপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। আবু সালমা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি আবু হুরায়রাহ (রা.)-কে বলতে শুনেছেন, নবী কারীম (দ.) বলেছেন: ‘কেউ যেন কখনো রোগাক্রান্ত উট সুস্থ উটের সাথে না রাখে’ (সহীহ বুখারী, হদীস নং- ৫৭৭১; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং- ১৭৪৩)।

এই হাদীসে যেখানে অসুস্থ উটকে সুস্থ উটের সাথে না রাখার জন্য প্রিয় নবী (দ.) নির্দেশ দিয়েছেন, সেখানে সৃষ্টির সেরা জীব একজন সুস্থ মানুষ কীভাবে অসুস্থ মানুষের সাথে থাকবে?

অন্য হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, সা’দ (রা.) নবী কারীম (দ.) থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি (নবী) বলেছেন: ‘যখন তোমরা কোনো এলাকায় প্লেগ রোগের সংবাদ শোন, তখন সেই এলাকায় প্রবেশ করো না। আর তোমরা যেখানে অবস্থান কর, তথায় প্লেগের প্রাদুর্ভাব ঘটলে সেখান থেকে বেরিয়ে যেয়ো না’ (সহীহ বুখারী, হাদীস নং- ৫৭২৮; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং- ২২১৮)।

এই হাদীস থেকে আমরা বুঝতে পারি যে, অন্য এলাকার লোকজন করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত এলাকায় প্রবেশ করবে না এবং এই মহামারীতে আক্রান্ত এলাকার লোকজন ভয়ে অন্যত্র চলে যাবে না। বরং ধৈর্য্য ধরে আল্লাহর উপর নির্ভর করে সেখানেই অবস্থান করবেন।

এই ধরনের মহামারী থেকে পরিত্রাণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কাজ হচ্ছে, তাওবা করে সর্বদা দয়াময় আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া এবং নিয়মিত নামায আদায় ও কুর’আন তেলাওয়াতের মাধ্যমে মহান সৃষ্টিকর্তাকে স্মরণ করা। আর হাদীসে বর্ণিত দোয়াগুলো বেশি বেশি পড়া।

নবী হুদ (আ.)-এর ভাষায়, মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন: ‘হে আমার জাতি! তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের নিকট ক্ষমা প্রার্থনা কর, অতঃপর তারই প্রতি প্রত্যাবর্তন কর, তিনি তোমাদের উপর প্রচুর বৃষ্টি বর্ষণ করবেন এবং তোমাদেরকে আরো শক্তি প্রদান করে তোমাদের শক্তিকে বৃদ্ধি করে দিবেন, আর তোমরা অপরাধী হয়ে মুখ ফিরিয়ে নিয়ো না’ [সূরা হুদ, আয়াত: ৫২]।

প্রসিদ্ধ সাহাবী আব্দুল্লাহ ইব্নে উমর (রা.) বলেন, প্রিয় নবী (দ.) বিভিন্ন প্রকারের রোগ থেকে বাঁচতে সকাল-সন্ধ্যায় নিন্মোক্ত দোয়াটি বেশি পড়তেন: ‘হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে দুনিয়া ও আখিরাতের ক্ষমা ও নিরাপত্তা প্রার্থনা করছি। হে আল্লাহ! আমার দীন, আমার দুনিয়া, আমার পরিবার ও আমার সম্পদ সর্ম্পকে আপনার কাছে অনুকম্পা ও নিরাপত্তা প্রার্থনা করছি। হে আল্লাহ! আমার লজ্জাস্থানকে ঢেকে দিন এবং আমার ভয়গুলো বিদূরিত করুন এবং আমাকে আমার সামনে থেকে এবং আমার পিছন থেকে এবং আমার ডান দিক থেকে এবং আমার বাম দিক থেকে এবং আমার উপরের দিক থেকে আমাকে রক্ষা করুন। এবং আমার নিচে দিয়ে আমাকে ধসিয়ে দেওয়া থেকে আমি অপনার কাছে পানাহ চাই’ (সুনানু আবি দাউদ, হাদীস নং- ৫০৭৪; সুনানু ইবনে মা’জাহ, হাদীস নং- ৩৮৭১)।

অন্য হদীসে বর্ণিত হয়েছে, প্রসিদ্ধ সাহাবী আনাস (রা.) বলেন, নবী কারীম (দ.) এরূপ দোয়া বেশি করতেন: ‘হে আল্লাহ! আমি শে^ত (কুষ্ঠ) রোগ হতে, পাগলামী হতে, খুঁজলী-পাঁচড়া হতে এবং বিভিন্ন প্রকারের ঘৃণ্য রোগ হতে পরিত্রাণ পাওয়ার জন্য তোমার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি’ (সুনানু আবি দাউদ, হাদীস নং- ১৫৫৪)।

এইধরনের আরো অনেক প্রকারের দু’য়া বিভিন্ন হাদীসের মধ্য রয়েছে, যেগুলোর মাধ্যমে করোনা ভাইরাসের আগ্রাসন থেকে মুক্তির জন্য সর্বক্ষমতার অধিকারী মহান আল্লাহকে আহবান করলে তিনি আমাদেরকে ক্ষমা করবেন এবং এই প্রাণঘাতী মহামারী থেকে অমাদেরকে পরিত্রাণ দিবেন।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, করোনা ভাইরাস বা এই ধরনের মহামারীর উদ্ভব হলে জুম’য়া অথবা জামায়া’তে নামায আদায়ে নিষেধাজ্ঞা জারি করা যাবে কিনা?

বিভিন্ন চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের থেকে যুক্তিসংগত তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে বিভিন্ন মুসলিম দেশের স্বায়ত্বশাসিত ও সরকার নিয়ন্ত্রিত ফতোয়া বোর্ডগুলো, যেমন: মিসরের আল্-আয¦হারের সিনিয়র স্কলারদের বোর্ড, সৌদি আরবের সিনিয়র আলেমদের বোর্ড, তুরস্ক, আরব আমিরাত, কুয়েত, কাতার, ইরাক, মরক্কো, ওমান ও জর্ডানের ধর্মমন্ত্রণালয়ের আওতাধীন ফত্ওয়া বোর্ডগুলো পৃথক পৃথক জরুরি সভায় মিলিত হয়ে ব্যাপক পর্যালোচনার পর মসজিদে আযান চালু রেখে জুম’য়া ও পাঁচওয়াক্ত নামায জামায়াতে আদায় না করার বিষয়ে ফত্ওয়া প্রদান করেছেন। তার পরিপ্রেক্ষিতে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত অধিকাংশ আরবদেশগুলো মসজিদ সাময়িকভাবে বন্ধ রেখেছে। কিন্তু আযান চালু রেখেছে এবং হাদীসের বর্ণনা অনুযায়ী ‘আশ্হাদু আন্না মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’র পরে ‘হাইয়া আলাস্ সালাহ্’ এর পরিবর্তে “সাল্লু ফি বুয়ূতিকুম” (তোমরা নিজ নিজ গৃহে নামায আদায় কর) বলে আযান দেন। ইসলামি শরীয়তেও এই বিষয়ে যথেষ্ট দলিল রয়েছে।

হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, আব্দুল্লাহ ইবনে হারেছ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “এক বর্ষণমুখর দিনে আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) মুয়ায্যিনকে বললেন: যখন তুমি (আযানে) ‘আশ্হাদু আন্না মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’ বলবে, তখন হাইয়া আলাস্ সালাহ্’ বলবে না, বলবে ‘সাল্লু ফি বুয়ূতিকুম’ (তোমরা নিজ নিজ গৃহে নামায আদায় কর)। তা লোকেরা অপছন্দ করল। তখন তিনি বললেন: আমার চাইতে উত্তম ব্যক্তি (রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তা করেছেন। জুম’আ নিঃসন্দেহে জরুরি। আমি অপছন্দ করি যে, আপনাদেরকে মাটি ও কাদার মধ্য দিয়ে যাতায়াত করার অসুবিধায় ফেলি” (সহীহ বুখারী, হাদীস নং- ৯০১; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং- ৬৯৯) ।

অত্র হাদীসে শুধুমাত্র অতিবৃষ্টির কারণে মসজিদে না গিয়ে ঘরে নামাজ পড়ার জন্য বলা হয়েছে। আর বর্তমান করোনাভাইরাস হলো এমন এক মহামারী যার কারণে মানুষের মৃত্যু হতে পারে! সুতারাং এই মহামারীর অবস্থায় মসজিদে না গিয়ে সাময়িকভাবে ঘরে নামাজ পড়া অধিকতর যুক্তিসঙ্গত। যা এই হাদীস থেকে বুঝা যায়।

ইসলামি আইনজ্ঞগণ জান-মালের হেফাজতের জন্য জুম’য়া এবং জামায়া’তে নামায ত্যাগ করার বৈধতার ফত্ওয়া দিয়েছেন। সুনানু আবি দাউদে ইবনে আব্বাস (দ.) থেকে বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (দ.) বলেছেন: ‘যে ব্যক্তি মুয়ায্যিনের আযান শুনে বিনা কারণে মসজিদে উপস্থিত হয়ে জামায়াতে নামায আদায় করবে না, তার অন্যত্র আদায়কৃত নামায আল্লাহর দরবারে কবুল হবে না (অর্থাৎ পরিপূর্ণ নামায হিসেবে গণ্য হবে না)। সাহাবীরা ওজর (অজুহাত) সর্ম্পকে জিজ্ঞেস করলে রাসূলুল্লাহ (দ.) বলেন: যদি কেউ ভয়ভীতি ও অসুস্থতার কারণে জামায়াতে উপস্থিত হতে অক্ষম হয় তবে তার জন্য বাড়িতে নামায পড়া দূষণীয় নয়’ (সুনানু আবি দাউদ, হাদীস নং-৫৫১)।

অত্র হাদীসে কোনো কিছুর ভয় ও অসুস্থতার কারণে জামায়াতে উপস্থিত হতে অক্ষম হলে আল্লাহর রাসূল (দ.) ঘরে নামায পড়ার অনুমতি প্রদান করেছেন। আর করোনাভাইরাস হলো এমন এক মহামারী, যা গণ-জমায়েত ও সংষ্পর্শের কারণে সৃষ্টি হয় এবং জুম’আ ও জামায়া’ত গণ-জমায়েতের অন্তর্ভুক্ত, যার কারণে মানুষের মধ্যে এই মহামারী বিস্তার করার আশংকা রয়েছে। তাই এই ভয়ে জুম’য়া ও জামায়াত ত্যাগ করার অনুমতি রয়েছে, যা এই হাদীসের মাধ্যমে প্রমাণিত।

সুতারাং বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকগণ যেহেতু মানুষের সংষ্পর্শ ও গণ-জমায়েতকে মরণব্যাধি করোনাভাইরাস বিস্তারের মূল কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন, সেহেতু এই বিষাক্ত মহামারী থেকে বাঁচার জন্য জুম’আ ও জামায়া’তে নামায আদায় সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা জায়েয আছে। তবে শর্ত যে, কোনো অবস্থাতেই মসজিদে আযান বন্ধ রাখা যাবে না এবং আযানে ‘আশ্হাদু আন্না মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’ এর পর ‘হাইয়া আলাস্ সালাহ্’ এর পরিবর্তে বলবে “সাল্লু ফি বুয়ূতিকুম” (তোমরা নিজ নিজ গৃহে নামায আদায় কর)। এমন পরিস্থিতে সবাই ঘরেই নামায পড়বেন এবং পরিবারের অন্য সদস্যকে নিয়ে ঘরে জামায়া’তে নামায আদায় করা উত্তম। আর জুম’আ’র পরিবর্তে ঘরে জোহরের নামায আদায় করবেন।

আর ওজরের (অজুহাত) কারণে মসজিদে জুম’আ ও জামায়া’তে নামায আদায়ে সাময়িকভাবে নিষেধ হওয়ার কারণে ঘরে নামায আদায় করলেও দয়াবান মহান আল্লাহ পরিপূর্ণ সাওয়াবই দেবেন। সহীহ বুখারী শরীফের হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, নবী কারীম (দ.) বলেছেন: ‘যখন বান্দা রোগ্রাক্রান্ত হয় কিংবা সফর করে, তখন তার জন্য তাই লিখিত হয়, যা সে মুকীম অবস্থায় বা সুস্থ অবস্থায় আমল করত’ (সহীহ বুখারী, হাদীস নং- ২৯৯৬)।

করোনাভাইরাস একপ্রকারের ওজর (অজুহাত)। তাই এই ভাইরাস থেকে আত্মরক্ষার্থে মসজিদ বা ইবাদাতখানায় জামায়া’তে নামায আদায় না করে ঘরে নামায আদায় করলেও সাওয়াব একই পাওয়া যাবে ইন্শা’আল্লাহ। যা উপরোক্ত হাদীস থেকে প্রমাণিত।

উল্লেখ্য যে, সরকারি কর্তৃপক্ষ ব্যতীত এলাকার কোনো সরদার বা অন্য যে কেউ কোনো অবস্থাতেই মসজিদে জুম’আ অথবা জামায়াত বন্ধ করতে পারবে না। কোনো এলাকায় যদি এমন মহামারীর উদ্ভব হয়, সরকারি কর্তৃপক্ষকেই সংবাদ পৌঁছে দিতে হবে এবং সরকারই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।

এইধরনের মহামারী থেকে বাঁচতে মুসলমানদের করণীয়:

এক. তাওবা করে প্রতিনিয়ত আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া এবং এই ধরনের মহামারী থেকে আত্মরক্ষার জন্য রাসূল (দ.) কর্তৃক নির্দেশিত দু’য়াগুলো বেশি বেশি পড়া।

দুই. নিয়মিত নামায ও কুরআ’ন তেলাওয়াতের মাধ্যমে সময় ব্যয় করা।

তিন. পাপাচারে লিপ্ত হওয়া থেকে বিরত থাকা।

চার. গণ-জমায়েত ও আক্রান্ত লোকের সংষ্পর্শ থেকে দূরে থাকা।

পাঁচ. কোনো মানুষ মহামারীতে আক্রান্ত এলাকা ত্যাগ করে অন্যত্র চলে যাবে না। বরং ধৈর্য্য ধরে পরম করুণাময় আল্লাহর উপর নির্ভর করে ঐ এলাকায় অবস্থান করবে। অনুরূপভাবে অন্য এলাকার কোনো মানুষ মহামারীতে আক্রান্ত এলাকায় প্রবেশ করবে না।

ছয়. রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো এই মহামারী মোকাবেলায় সামর্থ্য অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

সাত. অধিক লোকের সমাগম হয় এমন যাবতীয় সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সরকার কর্তৃক সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করা।

আট. চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের যুক্তিসংগত প্রমাণ উপস্থাপন সাপেক্ষে সরকার কর্তৃক আক্রান্ত এলাকায় জুম’আ ও জামায়াতে নামায আদায় সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা। তবে শর্ত যে, কোনো অবস্থাতেই মসজিদে আযান বন্ধ রাখা যাবে না। আর জুম’আ’র পরিবর্তে ঘরে জোহরের নামায আদায় করবে।

নয়. এই মহামারী মোকাবেলায় সরকার যত ধরনের যুক্তিসংঙ্গত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন, সব সিদ্ধান্তকে মেনে নিয়ে সরকারি কাজে সহযোগিতা করা প্রত্যেক নাগরিকের অবশ্য কর্তব্য।

পরিশেষে, মহাগ্রন্থ আল্-কুরআ’নের একটি আয়াতের মাধ্যমে ইতি টানতে চাই। ইরশাদ হচ্ছে: ‘হে নবী (দ.) আপনি বলে দিন, আল্লাহ আমাদের জন্য যা নির্ধারণ করে দিয়েছেন তা ছাড়া অন্য কোনো বিপদ আমাদের উপর আসবে না, তিনিই আমাদের প্রকৃত অভিভাবক আর সকল মু’মিনের কর্তব্য হলো যাবতীয় কাজে আল্লাহর উপরই নির্ভর করা’ [সূরা তাওবা, আয়াত:৫১]।

পরম করুণাময় মহান আল্লাহ আমাদের সকলকে এই মহামারী থেকে হেফাজত করুক। আমিন!

লেখক: সহকারী অধ্যাপক, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এবং পিএইচডি গবেষক, কিং আব্দুলআজীজ বিশ্ববিদ্যালয়, জেদ্দা, সৌদি আরব।
ই-মেইল: [email protected]

Print Friendly, PDF & Email
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

eight − two =

আরও পড়ুন