মিয়ানমারে পেট চালাতে ‘দেহ বেচছেন’ ডাক্তার-শিক্ষকও

fec-image

দীর্ঘদিনের গৃহযুদ্ধে জ্বলছে মিয়ানমার। একদিকে সেনার শাসন, অন্য দিকে বিদ্রোহীদের সশস্ত্র লড়াই। এই দু’য়ের মাঝে পড়ে ক্রমশ ভ্ঙ্গুর হয়েছে মিয়ানমারের অর্থনীতি। ২০২৫ সালে তার অবস্থাও আরও ভয়াবহ হবে, এমনটাই ইঙ্গিত রয়েছে বিশ্ব ব্যাঙ্কের সাম্প্রতিক রিপোর্টে। দি ডিপ্লোম্যাটের প্রতিবেদন অনুযায়ী, Myanmar Economic Monitor-এর সাম্প্রতিক ইস্যুতে বিশ্ব ব্যাঙ্ক জানিয়েছে নতুন বছরে সে দেশের আর্থিক বৃদ্ধির হার ঋণাত্মক হবে। আর নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ক্রমশ ভেঙে পড়া অর্থনীতির আগুনে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন মহিলারা। তলিয়ে যাচ্ছেন অন্ধকার ভবিষ্যতে।

ওই বিষয়ে আর বিশদে যাওয়ার আগে নজর রাখা যেতে পারে অর্থনীতির প্রশ্নে। কেন মিয়ানমারের অর্থনীতির পরিস্থিতি এমন? এর কারণ হিসেবে প্রথমেই রয়েছে গৃহযুদ্ধ। কোভিডের সময় যখন সারা বিশ্বের অথর্নীতিই বিপর্যস্ত, সেই সময় তার বাইরে ছিল না মিয়ানমারও। সেই ডামাডোলের মধ্যেই ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে গণতান্ত্রিক সরকারকে হঠিয়ে মিয়ানমারে ক্ষমতা দখল করে সেনা। কোভিডের ধাক্কায় এমনিতেই ধুঁকতে থাকা অর্থনীতির উপর সেটা ছিল অনেকটা মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা-এর মতো। তারপর থেকে বিদ্রোহীদের সঙ্গে নিরন্তর লড়াই চলেছে সেনার সরকারের। ইতিমধ্যেই মিয়ানমারের অনেকটা অংশই বিদ্রোহীদের দখলে। এই পরিস্থিতিতে চিন ও থাইল্যান্ড সীমান্তে উত্তেজনার কারণে ব্যবসা প্রায় বন্ধ। বিদ্যুতের ঘাটতির কারণে একের পর এক কারখানা বন্ধ হয়েছে। এর সঙ্গে জুড়েছে ব্যাপক বৃষ্টির কারণে হওয়া বন্যা। সব মিলিয়ে আরও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে মায়ানমারের অর্থনীতি। বিশ্ব ব্যাঙ্কের রিপোর্ট অনুযায়ী, এর ফলে এখন সেই দেশের জনসংখ্যার অর্ধেকই বাস করছেন দারিদ্র সীমার নীচে। আর এমন পরিস্থিতি সবচেয়ে ভয়ানক হয়ে দাঁড়িয়েছে সেই দেশের মহিলাদের জন্য।

নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, অর্থনীতির এমন দশার কারণে কোপ পড়েছে কাজের সুযোগে। আর সেই কারণেই মিয়ানমারে ক্রমশ বেড়ে চলেছে যৌন ব্যবসা। উচ্চ শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকা এমন অনেকেই নেহাত পেট ভরানোর তাগিদে বাধ্য হয়ে বেছে নিচ্ছেন এই পথ। সেই তালিকায় রয়েছেন ডাক্তার থেকে নার্স, শিক্ষক থেকে অন্য সাদা কলার চাকরিজীবীও, এমনটাই দাবি করা হয়েছে নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে। মিয়ানমারে দীর্ঘদিনের সেনার শাসন চলেছে। ২০১১ সালে গণতান্ত্রিক সরকার তৈরি হয়। সেই সময় থেকেই অর্থনীতির বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে তৈরি হয়েছিল মধ্যবিত্ত শ্রেণী। কিন্তু গণতান্ত্রিক সরকার পতনের পর থেকে ক্রমশ খারাপ হতে থাকা অর্থনীতির কারণে কমতে শুরু করে মধ্যবিত্তের সংখ্যা। UNDP-এর তথ্য বলছে, আগের তুলনায় অন্তত ৫০ শতাংশ কমেছে মধ্যবিত্তের সংখ্যা। অর্থনীতির ধাক্কায় সবচেয়ে বেশি ধাক্কা খেয়েছে এই গোষ্ঠী আর নিম্নবিত্তরা।

কেমন ধাক্কা খেয়েছেন তাঁরা? বেশ কিছু মহিলার সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে তৈরি নিউ ইয়র্ক টাইমসের ওই প্রতিবেদনে উঠে এসেছে সেই ছবিটা। সেখানে এক মহিলা নার্সের কথা বলা হয়েছে। একটি বেসরকারি হাসপাতালে চাকরি করতেন তিনি। কিন্তু সরকার বিরোধী বিক্ষোভের জন্য সেনা সরকার ওই হাসপাতাল বন্ধ করে দেয়। পেট চালানোর জন্য এক বন্ধুর হাত ধরে Date Girl-এর কাজে জড়িয়ে পড়েন তিনি। পরে দেখেন আদতে এটি যৌন ব্যবসা। নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই মহিলা জানাচ্ছেন এই কাজে এক রাতে ৮০ ডলারও রোজগার করেছিলেন তিনি, যা আগে সারা মাসেও হাতে আসত না। তাঁর দাবি, ‘আগে খুব লজ্জা হতো, আমি এটা পছন্দও করি না। কিন্তু এখন প্রয়োজন।’

আর এক মহিলা ডাক্তারের সাক্ষাৎকারও রয়েছে সেই প্রতিবেদনে। এর আগে যথেষ্ট উচ্চমানের জীবনযাত্রা ছিল তাঁর। কিন্তু সেনার সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে অর্থনীতি ক্রমশ ভেঙে যায়। ঘর চালাতে তাঁর সব সঞ্চয় শেষ হয়ে যায়। বাধ্য হয়ে বাবা-মার খাবার জোগাড় করতে এই পথে হাঁটেন তিনি। এখনও বাড়িতে সব ঘটনা গোপন করে দিন কাটাচ্ছেন তিনি। তাঁর দাবি, ‘আমি চেয়েছিলাম শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ হবে। কিন্তু সেনার ক্ষমতাদখল আমার সব শেষ করে দিল। আমার আর কিছু করার ছিল না।’

মিয়ানমারের অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি ছিল জামাকাপড়ের শিল্পক্ষেত্র। কিন্তু সেনা সরকার ক্ষমতা দখলের পর থেকে একে একে সব বন্ধ হয়ে গিয়েছে। অনেক সংস্থা মিয়ানমার ছেড়ে চলে গিয়েছেন। ফলে বিপুল সংখ্যক কর্মী কাজ হারিয়েছেন। যাঁদের মধ্যে বড় অংশ মহিলা। এমনই এক মহিলার সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয়েছে নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে। ওই মহিলা জানাচ্ছেন, তাঁর স্বামীকে গুলি করে মেরেছিল সেনারা। যে কারখানায় কাজ করতেন সেটা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরেও কোনও চাকরি পাচ্ছিলেন না। বাধ্য হয়ে কোলের সন্তানের মুখে খাবার জোগানোর জন্য যৌন ব্যবসায় নামতে হয়েছে তাঁকে।

কিন্তু প্রশ্ন রয়েছে আরও কিছু। পেট চালানোর তাগিদে যখন দেহ ব্য়বসায় নামতে বাধ্য হচ্ছেন বহু সংখ্যক মহিলা। তখন এর জোগানও বাড়ছে, কিন্তু ভেঙে পড়া অর্থনীতিতে চাহিদা কী ভাবে তৈরি হচ্ছে? বাকি সব কিছু তলানিতে গেলেও, এই কাজে কী ভাবে টাকা আসছে? কাদের চাহিদা মেটাতে বাড়ছে এই বাজার, তাহলে কী জোগান বেড়ে যাওয়ায়, মিয়ানমারের বড় শহরগুলিতে শুধু এই কারণেই ভিড় করছেন ভিনদেশিরা? রয়েছে এই প্রশ্নও।

Print Friendly, PDF & Email
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও পড়ুন