সেনাবাহিনী পেট্রোলে বের হলেই গ্রামের উপজাতি মহিলারা ঢেকিতে পাড় দিতো

(২৫)
আমি পার্বত্য চট্টগ্রামের দক্ষিণে ফারুয়ার মধ্যস্থলে বারবুনিয়া এবং উত্তরে দীঘিনালায় ব্যাটালিয়ান কমান্ডার হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছি। দক্ষিণে ফারুয়া অঞ্চলে শান্তিবাহিনীর তৎপরতা তুলনামূলকভাবে একটু কম, রাঙামাটির বরোবুনিয়াতে মধ্যমে এবং খাগড়ছড়ির দীঘিনালাতে তুঙ্গে ছিলো।
কিন্তু ফারুয়া অঞ্চল, বারবুনিয়ার মতো বিশাল অপারেশনাল অঞ্চল এবং সর্ব উত্তরের দীঘিনালার মতো শান্তি বাহিনীর পাদপিঠে আমার কমান্ডে পরিচালিত ব্যাটালিয়ানের কোনো ক্যাম্পে, কোনো অপারেশনাল পেট্রোলের উপরে শান্তিবাহিনী কখনও একটি গুলি ফায়ার করার সাহস করে নাই বা সুযোগ পায় নাই।
প্রশ্ন হতে পারে, এটা কি করে সম্ভব হয়েছিলো? আমার ব্যটালিয়ান থেকে ডজন ডজন স্বল্প মেয়াদী এবং দীর্ঘ মেয়াদী পেট্রোল, আমার নেতৃত্বে টাষ্কফোর্স অপারেশন এরিয়াতে শান্তিবাহিনীর বিরুদ্ধে অপারেশন পরিচালনা করেছে অহরহ। তারপরেও শান্তিবাহিনীর পক্ষে আমাদের উপরে কোথাও কখনও একটি গুলিও ফায়ার করতে পারে নাই। আমি প্রায় সাড়ে চার বছর পার্বত্য চট্টগ্রামে কর্তব্য পালন করেছি ফারুয়া, বারোবুনিয়া এবং দীঘিনালাতে। এটা কিভাবে সম্ভব হয়েছিলো- সে সম্বন্ধে আলোচনার আগে ঐসময়ে শান্তিবাহিনীর কৌশল নিয়ে আলোচনা প্রয়োজন বলে মনে করি।
এখন পার্বত্য চট্টগ্রামে মোবাইল ফোন গেছে। তখন মোবাইল ফোন ছিলো না। ল্যান্ড ফোন ছিলো শহরে। পার্বত্য চট্টগ্রামে মোবাইল ফোন যাবার ফলে নিশ্চিতভাবে সন্ত্রাসীদের অপারেশনাল কৌশলের পরিবর্তন হয়েছে। তখন কৌশল একরকম ছিলো, এখন অন্যরকম হয়েছে। আমরা জেনে কিংবা না জেনে পার্বত্য চট্টগ্রামে মোবাইল ফোন দেওয়ার পক্ষে আন্দোলন করেছি।
আমি আশির দশকের কথা বলছি যখন পার্বত্য চট্টগ্রামে মোবাইল ফোন যায় নাই। ঐসময় শান্তিবাহিনী যোগাযোগের জন্য গণ লাইন ব্যবহার করতো। এই গণ লাইন কি জানা দরকার। শান্তিবাহিনী পার্বত্য চট্টগ্রামের ভিতরে সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে অপারেশনের জন্য ব্যাপকভাবে গণ লাইনের উপরে নির্ভরশীল ছিলো। এককথায় বলা যায় শান্তিবাহিনীর যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম ছিলো গণ লাইন। এই গণ লাইনে যারা শান্তিবাহিনীকে সহায়তা করতো এরা উপজাতি জনগণ। এরা শহরে এবং গ্রামে কাজ করতো।
যেমন একটি বিশেষ স্হানে নির্দিষ্ট দিনে নির্ধারিত সময়ে শান্তিবাহিনীর একটি দল অপারেশন করবে এই সংবাদ শান্তিবাহিনী তাদের আস্তানার নিকটতম গ্রামের তাদের গণ লাইনের একজন উপজাতি সদস্যকে বলতো । সে তখন তার পরের গ্রামে এসে এইসব সংবাদ অন্য গণ লাইনের সদস্যকে জানাতো । এইভাবে সংবাদ রিলে হয়ে ঘটনাস্থলের গণলাইনের উপজাতিদের কাছে পৌছে যেতো ।
পরে একইভাবে টার্গেট এলাকার সংবাদ রিলে হয়ে শান্তিবাহিনীর কাছে পৌঁছাতো । যখন শান্তিবাহিনীর অপারেশনাল দল অপারেশনের জন্য দেশের অভ্যন্তরে আসে তখনও গণ লাইনের মাধ্যমে তাদের সব সংবাদ আদান প্রদান করে।
যেহেতু শান্তিবাহিনীর একমাত্র সংবাদ আদান প্রদানের মাধ্যম ছিলো গণ লাইন। তাই শান্তিবাহিনীর অপারেশনের একটা প্যাটার্ন তৈরী হতো যা তারা সহজে পরিবর্তন করতে পারতো না। যেমন তিন মাসের বা দুই মাসের মধ্যে একটি বিশেষ দিনে যেখানে শান্তিবাহিনীর অপারেশন হতো ঠিক তার দুই মাস বা তিন মাসের মাথায় ঠিক ঐখানেই পুনরায় শান্তিবাহিনীর মুভমেন্ট দেখা যেতো। তার মধ্যে ছিলো চাঁদা কালেকশন অথবা কোনো উপজাতির বাসায় অবস্থান গ্রহণ করে সেনাবাহিনীর মুভমেন্ট অবজার্ভ করা বা সেনাবাহিনীর পেট্রোলের উপরে রেইড বা এম্বুশ করা।
আশির দশকে শান্তিবাহিনীর চাঁদা কালেকশনের বিষয়টি তখনও স্ট্রিম লাইন হয় নাই তাই চাঁদা কালেকশনের জন্য তাদের প্রতিমাসে শহরে, হাটবাজারে এবং কাঠ ব্যবসায়ীদের কাছে আসতে হতো। এই সুযোগটা আমরা গ্রহণ করতাম এবং অনেক শান্তিবাহিনীর সদস্য আমাদের হাতে ধরা পড়তো।
আমি পার্বত্য চট্টগ্রামে এসে শান্তিবাহিনীর গণ লাইনের বিষয়ে গভীর আগ্রহ নিয়ে এর একটা স্টাডি শুরু করি। আমি আমার অপারেশন অফিসারকে অদেশ দিলাম আমাদের অপারেশন এরিয়াতে যেখানেই শান্তিবাহিনীর মুভমেন্ট দেখা যাবে তারিখ ও সময় দিয়ে তা যেন অপারেশন ম্যাপে মার্ক করা হয়। আমি প্রতি সন্ধ্যায় আপারেশন রুমে ( অপস রুম ) গিয়ে সেগুলো স্টাডি করতাম।
কিছুদিন পরেই আমার কাছে শান্তিবাহিনীর মুভমেন্টের একটা ছক ভেসে উঠলো। আমি লক্ষ্য করলাম এই ছক ধরেই শান্তিবাহিনী আমার অপারেশনাল এরিয়াতে মুভমেন্ট করছে। খুব কমই ব্যত্যয় হচ্ছে। আমি পরীক্ষামুলকভাবে দু’এক স্হানে পেট্রোল পাঠিয়ে দেখতে পেলাম শান্তিবাহিনী ঐএলাকায় এসেছিলো কিন্তু গণ লাইনের মাধ্যমে আগাম সংবাদ পেয়ে চলে গেছে।
এবারে বলবো গণ লাইনের মাধ্যমে শান্তিবাহিনী সেনাবাহিনীর মুভমেন্ট সম্পর্কে কিভাবে আগাম সংবাদ পেয়ে সতর্ক হতো । আমি নিজে গভীর রাতে পেট্রোল নিয়ে বের হয়ে যখনি কোনো গ্রামের পাশ দিয়ে বা ভিতর দিয়ে গেছি তখনই শুরু হয়ে যেতো উপজাতি মহিলাদের খালি ঢেকিতে ঢিম ঢিম করে পাড় দেওয়া যার শব্দ রাতের নিস্তব্ধতাকে খানখান করে চারিদিকে ছড়িয়ে পড়তো। আমাদের পেট্রোলের গমন পথের গ্রামের পর গ্রামে এই ঢেকিতে পাড় দেওয়া চলতো। আমার দৃঢ় ধারণা, ঐসময় গণলাইনের কেউ শান্তিবাহিনীকে আগাম সংবাদ দিতো যে আর্মি পেট্রোল আসছে। এভাবেই শান্তিবাহিনী আগাম সংবাদ পেয়ে সতর্ক হতো।
আমি শান্তিবাহিনীর অপারেশনের এবং মুভমেন্টের প্যাটার্ন জানার পরে গ্রাম এভোয়েড করে নির্দিষ্ট দিনে নির্ধারিত সময়ে টার্গেটে তিনটি পেট্রোল তিন দিক থেকে প্রেরণ করতাম। একটা পেট্রোল টার্গেটে আক্রমণ চালতো। অন্য দুটি পেট্রোল শান্তিবাহিনীর সম্ভাব্য এস্কেপ রুটে পাঠাতাম যাতে শান্তিবাহিনীকে ফাঁদে ফেলা সম্ভব হয়।
এভাবে শান্তিবাহিনীর মুভমেন্টের প্যাটার্ন ধরে অপারেশন পরিচালিত করার ফলে আমাদের অপারেশন এরিয়াতে শান্তিবাহিনীর পক্ষে কোনো প্রকার কার্যকরী তৎপরতা চালানো সম্ভব হয় নাই। আমরা শান্তিবাহিনীর অপারেশনের কৌশলের মর্মমূলে আঘাত করে তার কার্যকরীতা প্রায় শুন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছিলাম বলে শান্তিবাহিনী আমাদের পেট্রোলের উপরে কখনও আক্রমণের সাহস করে নাই।
♦ জেনারেল আ ল ম ফজলুর রহমান: প্রাক্তন মহাপরিচালক বিডিআর ।
















