২০২৬-এর প্রথমার্ধ : অপতথ্যের বড় লক্ষ্যবস্তু বিএনপি-তারেক রহমান



২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে বাংলাদেশে প্রচার হয়েছে এমন ৩২১০টি ভুল তথ্য শনাক্ত করেছে রিউমর স্ক্যানার। গত বছর একই সময়ের তুলনায় যা প্রায় ৭৯ শতাংশ বেশি। ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসে রিউমর স্ক্যানার ভুল তথ্য শনাক্ত করেছিল ১৭৯৫টি। তবে এ বছর প্রথম প্রান্তিকের তুলনায় দ্বিতীয় প্রান্তিকে ভুল তথ্য প্রচারের হার হ্রাস পেয়েছে প্রায় ৩৭ শতাংশ। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে রাজনৈতিক বিভিন্ন ঘটনা প্রবাহ, সংসদ নির্বাচন, ফুটবল বিশ্বকাপ আর বৈশ্বিক একাধিক ঘটনায় ভুল ও বিভ্রান্তিকর তথ্যের প্রচার দেখা গেছে। এই সময়ে একক ব্যক্তি হিসেবে সবচেয়ে বেশি অপতথ্যের শিকার হয়েছেন প্রধানমন্ত্রী ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চেয়ারম্যান তারেক রহমান। রাজনৈতিক দল হিসেবে বেশি অপতথ্য বিএনপিকে জড়িয়ে। রিউমর স্ক্যানারের ওয়েবসাইটে গত ছয় মাসে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলো বিশ্লেষণ করে এসব তথ্য জানা গেছে।
ফেসবুক-টিকটক-ইনস্টাগ্রাম ভুয়া তথ্যে সয়লাব
২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুন-এই ছয় মাসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুল তথ্যের বিস্তার ছিল উদ্বেগজনক। এই সময়ে রিউমর স্ক্যানার ফেসবুকে ২,৮২২টি, ইউটিউবে ২৪৫টি, টিকটকে ৬০০টি, এক্সে ১২৪টি, ইনস্টাগ্রামে ৫৬২টি এবং থ্রেডসে ১০৬টি ভুল তথ্য শনাক্ত করেছে। এছাড়া হোয়াটসঅ্যাপ ও লিংকডইনে অন্তত ২টি করে ভুল তথ্য শনাক্ত হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পাশাপাশি দেশের গণমাধ্যমেও ভুল তথ্য প্রচারের প্রবণতা দেখা গেছে। গত ছয় মাসে দেশের গণমাধ্যমে প্রকাশিত ভুল তথ্য, ছবি ও ভিডিওসংবলিত ১৪১টি দাবির ফ্যাক্টচেক করা হয়েছে। একই সময়ে ভারতের গণমাধ্যমে বাংলাদেশকে জড়িয়ে অন্তত ১৭টি ঘটনায় অপতথ্য প্রচারের নজির পাওয়া গেছে।

রাজনৈতিক অপতথ্যে বড় পতন, জাতীয় ইস্যুতে উল্টো চিত্র
এ বছর প্রথম প্রান্তিকে (জানুয়ারি–মার্চ) অনলাইনে মোট ১,৯৭৪টি ভুল তথ্য শনাক্ত হয়। দ্বিতীয় প্রান্তিকে (এপ্রিল–জুন) এ সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে ১,২৩৬টিতে, যা প্রায় ৩৭ শতাংশ হ্রাস। প্রথম প্রান্তিকের তুলনায় দ্বিতীয় প্রান্তিকে ফেসবুক-টিকটকেও ভুল তথ্য শনাক্তের হার প্রায় ৩৭ শতাংশ করে হ্রাস পেয়েছে। অন্যদিকে, ইউটিউবে ভুল তথ্য শনাক্তের হার প্রায় ১৩ শতাংশ, ইনস্টাগ্রামে প্রায় ১৩ শতাংশ, থ্রেডসে প্রায় ৮ শতাংশ, এক্সে প্রায় ২৫ শতাংশ এবং দেশের গণমাধ্যমে প্রায় ১৩ শতাংশ বেড়েছে। একই সময়ে ভারতের গণমাধ্যমে বাংলাদেশকে ঘিরে অপতথ্য প্রায় ২২ শতাংশ কমেছে।

প্রান্তিকভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, দ্বিতীয় প্রান্তিকে জাতীয় ইস্যুতে ভুল তথ্য শনাক্তের সংখ্যা প্রায় ১৩ শতাংশ এবং ধর্মীয় ইস্যুতে প্রায় ৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। রাজনৈতিক ইস্যুতে উল্টো চিত্র দেখা গেছে; প্রথম প্রান্তিকে ১,৫২৮টি ভুল তথ্য শনাক্ত হলেও দ্বিতীয় প্রান্তিকে তা প্রায় ৪৯ শতাংশ কমে ৭৭২টিতে নেমে এসেছে। একইভাবে আন্তর্জাতিক ইস্যুতেও ভুল তথ্য শনাক্তের
হার প্রায় ৩০ শতাংশ এবং প্রতারণা ইস্যুতে ৬২ শতাংশ কমেছে। অন্যদিকে, শিক্ষা সংক্রান্ত ভুল তথ্য প্রায় ২৭৫ শতাংশ, খেলাধুলায় প্রায় ৯০ শতাংশ, বিনোদন ও সাহিত্যে প্রায় ৯ শতাংশ বেড়েছে।
বিএনপিকে জড়িয়ে অপতথ্য বেশি, এনসিপিকে নিয়ে সর্বাধিক নেতিবাচকতা
২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে ছড়িয়ে পড়া অপতথ্যগুলোয় সবচেয়ে বেশি নাম এসেছে বিএনপির। দলটি, দলটির বিভিন্ন সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন এবং নেতাকর্মীদের জড়িয়ে গত ছয় মাসে ৯৮০টি অপতথ্য শনাক্ত (প্রায় ৯৫ শতাংশই নেতিবাচক) হয়েছে। এসব অপতথ্যে দল হিসেবে বিএনপিকে ঘিরে প্রায় ৮০ শতাংশ এবং দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে ঘিরে প্রায় ৮৫ শতাংশেরই উপস্থাপন নেতিবাচক প্রকৃতির।
একইভাবে, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর (৭০২টি অপতথ্য, প্রায় ৮৮ শতাংশই নেতিবাচক) ক্ষেত্রেও উচ্চমাত্রার নেতিবাচক অপতথ্য লক্ষ্য করা যায়। নেতিবাচকতার এই হার দল হিসেবে প্রায় ৭৯ শতাংশ এবং দলের আমীর ডা. শফিকুর রহমানকে জড়িয়ে প্রায় ৮৭ শতাংশ।

অন্যদিকে, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ক্ষেত্রে মোট অপতথ্যের পরিমাণ (৩১৫টি, প্রায় ৯২ শতাংশই নেতিবাচক) কম হলেও নেতিবাচকতার হার সবচেয়ে বেশি। নেতিবাচকতার এই হার দল হিসেবে প্রায় ৮৪ শতাংশ এবং দলের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামকে জড়িয়ে প্রায় ৯২ শতাংশ।
এর বিপরীতে কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ক্ষেত্রে চিত্রটি ভিন্ন। দলটি, দলের বিভিন্ন সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন এবং নেতাকর্মীদের নামে ছয় মাসে ৬৫৯টি অপতথ্য শনাক্ত (প্রায় ৯২ শতাংশই ইতিবাচক) হয়েছে। এর মধ্যে শুধু দলটিকে ঘিরে প্রায় ৮৭ শতাংশ এবং দলের সভাপতি শেখ হাসিনাকে ঘিরে প্রায় ৮৪ শতাংশ অপতথ্য ইতিবাচক প্রকৃতির, যা ইঙ্গিত করে এই দল ও নেতৃত্বকে ঘিরে প্রচারণামূলক বা অনুকূল অপতথ্যের উপস্থিতি তুলনামূলক বেশি।
প্রান্তিকভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, দ্বিতীয় প্রান্তিকে বিএনপি (সামগ্রিক), তারেক রহমান, জামায়াতে ইসলামী (সামগ্রিক), ডা. শফিকুর রহমান, এনসিপি (সামগ্রিক) ও নাহিদ ইসলামকে ঘিরে অপতথ্যের পরিমাণ কমেছে। সবচেয়ে বড় হ্রাস দেখা গেছে তারেক রহমানকে ঘিরে—প্রথম প্রান্তিকে দলীয় প্রধান হিসেবে ২২২টি অপতথ্য শনাক্ত হলেও দ্বিতীয় প্রান্তিকে তা নেমে এসেছে মাত্র ১টিতে। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর (প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ১২৮ অপতথ্য ছয় মাসে) দলীয় রাজনীতিতে তার অংশগ্রহণ কমেছে, যার প্রতিফলন পড়েছে এই পরিসংখ্যানে। একইভাবে বিএনপিকে ঘিরে অপতথ্য প্রায় ৭৬ শতাংশ, জামায়াতকে ঘিরে প্রায় ৭৩ শতাংশ, শফিকুর রহমানকে নিয়ে প্রায় ৬৬ শতাংশ, এনসিপিকে নিয়ে প্রায় ১৭ শতাংশ এবং নাহিদকে নিয়ে ২০ শতাংশ কমেছে। অন্যদিকে, আওয়ামী লীগকে ঘিরে অপতথ্য প্রায় একই ছিল; প্রথম প্রান্তিকে ৩২৯টি এবং দ্বিতীয় প্রান্তিকে ৩৩০টি শনাক্ত হয়েছে। শেখ হাসিনাকে ঘিরে অপতথ্যও সামান্য কমে ৯০ থেকে ৮৬টিতে নেমেছে।
অপতথ্যের নিয়মিত শিকার বিএনপি সরকার
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ের পর গত ১৭ ফেব্রুয়ারি সরকার গঠন করে বিএনপি। জুন পর্যন্ত এই সরকারকে জড়িয়ে ৩০৫টি অপতথ্য শনাক্ত হয়েছে। এসবের মধ্যে প্রায় ৮৬ শতাংশ অপতথ্যের উপস্থাপনই ছিল সরকারের জন্য নেতিবাচক। এছাড়া, একই সময়ে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানকে জড়িয়ে ১২৮টি অপতথ্য শনাক্ত হয়েছে, যার মধ্যে প্রায় ৭৩ শতাংশ ক্ষেত্রেই তাকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
বর্তমান সরকারের মন্ত্রিপরিষদের সদস্যদের জড়িয়ে একই সময়ে ১২৬টি অপতথ্য প্রচার করা হয়েছে। এদের মধ্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে জড়িয়ে সর্বাধিক ৩৫টি অপতথ্যের প্রচার দেখেছে রিউমর স্ক্যানার। মন্ত্রিপরিষদের আরো ১৭ সদস্য এই সময়ে অপতথ্যের শিকার হয়েছেন। এরা হলেন আ ন ম এহছানুল হক মিলন (১৪), মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর (১৮), শেখ রবিউল আলম (৬), শামা ওবায়েদ (৩), জোনায়েদ সাকি (৩), ফকির মাহবুব আনাম স্বপন (২), আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী (৫), কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদ (২), ববি হাজ্জাজ (২), মোঃ আসাদুজ্জামান (৪), ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু (৯), অনিন্দ্য ইসলাম অমিত (১), নুরুল হক নুর (৬), ড. খলিলুর রহমান (৫), ইশরাক হোসেন (৩), আমিনুল হক (১) এবং জহির উদ্দীন স্বপন (১)।

এছাড়া, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টাদের মধ্যে রুহুল কবির রিজভীকে নিয়ে ১০টি, মির্জা আব্বাসকে নিয়ে ৪টি, ডা. জাহেদ উর রহমানকে নিয়ে ১০টি অপতথ্য শনাক্ত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী সাইয়েদ বিন আব্দুল্লাহকে নিয়েও একটি অপতথ্য ছড়িয়েছে এই সময়ে।
এর বাইরে, জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদকে জড়িয়ে ১২টি এবং ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালকে জড়িয়ে একটি অপতথ্য শনাক্ত করেছে রিউমর স্ক্যানার।
অপতথ্যের লক্ষ্যবস্তু কারা?
ক্ষেত্রভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, রাজনৈতিক অঙ্গনে গত ছয় মাসে সবচেয়ে বেশি অপতথ্যের লক্ষ্যবস্তু হয়েছেন তারেক রহমান। তাকে জড়িয়ে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ১২৮টি এবং দলীয় প্রধান হিসেবে ২২৩টি অপতথ্য শনাক্ত হয়েছে। এই ক্যাটাগরিতে তার পরেই আছেন শেখ হাসিনা ও ডা. শফিকুর রহমান। জাতীয় ইস্যুতে সবচেয়ে বেশি অপতথ্য ছড়ানো হয়েছে ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে ঘিরে; এরপর রয়েছেন সাবেক উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান ও বর্তমান রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন। নারী সংশ্লিষ্ট ভুল তথ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় ছিলেন শেখ হাসিনা, এরপর তারেক রহমানের মেয়ে জাইমা রহমান ও ঢাবির শিক্ষিকা শেহরীন আমিন ভূঁইয়া (মোনামী)। ছাত্র রাজনীতিতে সবচেয়ে বেশি অপতথ্যের শিকার হয়েছেন ডাকসু নেত্রী ফাতিমা তাসনিম জুমা, ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েম ও ঢাবির ছাত্রদল নেতা আবিদুল ইসলাম খান। বাহিনী সংক্রান্ত ভুল তথ্যে সবচেয়ে বেশি লক্ষ্যবস্তু ছিল বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, এরপর বাংলাদেশ পুলিশ ও বিজিবি।

ক্রীড়াঙ্গনে সবচেয়ে বেশি ভুল তথ্য ছড়ানো হয়েছে ক্রিকেটার মুস্তাফিজুর রহমানকে ঘিরে; তার পর রয়েছেন বিসিবি সভাপতি তামিম ইকবাল, আর ক্রিকেটার সাকিব আল হাসান, সাবেক ক্রিকেটার মাশরাফি বিন মোর্ত্তজা ও সাবেক বিসিবি সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুলকে ঘিরে প্রায় সমপরিমাণ ভুল তথ্য শনাক্ত হয়েছে। অন্যদিকে, বিনোদন অঙ্গনে সবচেয়ে বেশি ভুল তথ্যের লক্ষ্যবস্তু ছিলেন প্রয়াত কনটেন্ট ক্রিয়েটর কারিনা কায়সার; এরপর রয়েছেন সংগীতশিল্পী আসিফ আকবর ও কনটেন্ট ক্রিয়েটর তৌহিদ আফ্রিদি।
সেনাপ্রধান থেকে আইজিপি, অপতথ্যের নিশানায় শীর্ষ নিরাপত্তা নেতৃত্ব
দেশে সশস্ত্র এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জড়িয়ে এ বছরের প্রথম ছয় মাসে ১৯৫টি ভুল তথ্য প্রচারের প্রমাণ পেয়েছে রিউমর স্ক্যানার৷ গত বছর একই সময়ের তুলনায় এই সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ৭১ শতাংশ। তবে এ বছরের প্রথম প্রান্তিকের (১৩৪) তুলনায় দ্বিতীয় প্রান্তিকে (৬১) এই সংখ্যা কমেছে প্রায় ৩১ শতাংশ। ছয় মাসে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে জড়িয়ে ৯৬টি ভুল তথ্য প্রচার করা হয়েছে। গেল বছর একই সময়ে এই বাহিনীকে জড়িয়ে শনাক্ত হয়েছিল ৭৪টি ভুল তথ্য। অর্থাৎ, এক বছরের ব্যবধানে সেনাবাহিনীকে নিয়ে ভুল তথ্যের প্রচার বেড়েছে প্রায় ৩০ শতাংশ। বাহিনীটির বর্তমান প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানকে নিয়ে গত ছয় মাসে ২১টি অপতথ্য শনাক্ত করেছে রিউমর স্ক্যানার।
এছাড়া বাংলাদেশ পুলিশকে নিয়ে ৮৬টি ভুল তথ্য শনাক্ত হয়েছে এই ছয় মাসে। গেল বছরের প্রথম ছয় মাসের তুলনায় যা বেড়েছে প্রায় ১৮৭ শতাংশ!
এছাড়া, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন মাসের মধ্যে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) আলী হোসেন ফকির, সাবেক আইজিপি বাহারুল আলম, বর্তমান ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ, সাবেক ডিএমপি কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলীকে নিয়ে একটি ভুল করে তথ্য শনাক্ত হয়েছে।
এর বাইরে, বাংলাদেশ বিমান বাহিনীকে নিয়ে একটি, বাংলাদেশ নৌবাহিনীকে নিয়ে একটি, র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নকে (র্যাব) নিয়ে চারটি, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশকে (বিজিবি) নিয়ে সাতটি ভুল তথ্য শনাক্ত করেছে রিউমর স্ক্যানার৷
দেশে নির্বাচন, বিশ্বে যুদ্ধ— অপতথ্যের বিস্তারে শীর্ষ ইস্যু
২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুনে অনলাইনে অপতথ্যের বিস্তার ছিল বহুমাত্রিক ও ইস্যুকেন্দ্রিক। এই সময়ে আলোচিত দেশীয় ও আন্তর্জাতিক অন্তত ৪২টি আলোচিত ইস্যুতে মোট ১৪৬৭টি ভুল তথ্য শনাক্ত করেছে রিউমর স্ক্যানার। এর মধ্যে ২৪টি ইস্যুতেই গণমাধ্যমের ভুল পাওয়া গেছে। এসব ঘটনা বিশ্লেষণে বোঝা যায়, নির্দিষ্ট ঘটনা ঘিরে দ্রুত ও সংগঠিতভাবে ভুল তথ্য ছড়ানোর প্রবণতা সময়ের সাথে বাড়ছে। সংবেদনশীল, রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক ইস্যুগুলোকে ঘিরেই সবচেয়ে বেশি অপতথ্য ছড়ানো হয়েছে।

দেশীয় ইস্যুগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি অপতথ্য ছড়িয়েছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে (৭৭৪টি) ঘিরে। এছাড়া, গণভোট (৩৮), জ্বালানি সংকট (৩৭), আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী (৩৪), হামের প্রাদুর্ভাব (৩৩), ঈদ (২৯), ধর্ষণের বিভিন্ন ঘটনা (২৫), দীপু দাস হত্যাকাণ্ড (১৮), বিবি সাওদা আটক (১৭), প্রশ্নফাঁস (১৬), রামিসা হত্যা (১৬) এবং রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে ইউরেনিয়াম সংক্রান্ত দাবি (১৪) নিয়েও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ভুল তথ্য প্রচার করা হয়েছে। একইসঙ্গে ইনকিলাব মঞ্চের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ (১২), আইপিএল থেকে মুস্তাফিজুর রহমানের বাদ পড়া ইস্যু (১২), ডা. শফিকুর রহমানের এক্স অ্যাকাউন্ট হ্যাকের দাবি (১১), মাহে রমজান (১০), ওসমান হাদির ওপর হামলা (৯), খালেদা জিয়ার মৃত্যুর গুজব (৯), জকসু নির্বাচন (৮), শহীদ দিবস (৮), বাংলা নববর্ষ (৮), ফয়সাল করিম মাসউদ গ্রেপ্তার (৭), গ্যাস সংকট (৬), স্বাধীনতা দিবস (৫) এবং হজ (৪) নিয়েও ধারাবাহিকভাবে ভুল তথ্য ছড়িয়েছে।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সবচেয়ে বেশি অপতথ্য শনাক্ত হয়েছে ইরান–ইসরায়েল সংঘাতকে কেন্দ্র করে (১৮০), যা অন্য যেকোনো একক ইস্যুর তুলনায় অনেক বেশি। এছাড়া চলমান ফুটবল বিশ্বকাপ ২০২৬ (৩৭), ভারতের বিধানসভা নির্বাচন (৪৫), এপস্টিন ফাইলস (১৩), পাকিস্তান–আফগানিস্তান সংঘাত (৪), ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের হামলা (৩) এবং টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ (৪) নিয়েও ভুল তথ্য শনাক্ত হয়েছে।
সামগ্রিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, যুদ্ধ ও আন্তর্জাতিক সংঘাত, রাজনৈতিক কর্মসূচি, জাতীয় সংকট, ধর্মীয় উৎসব, জনস্বাস্থ্য, নির্বাচন এবং আলোচিত অপরাধের ঘটনাগুলোই ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে অপতথ্য ছড়ানোর প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে। বিশেষ করে চলমান ও উচ্চ-আলোচিত ঘটনাকে কেন্দ্র করে দ্রুত গতিতে ভুল তথ্য ছড়িয়ে পড়ার প্রবণতা এই সময়েও স্পষ্টভাবে লক্ষ্য করা গেছে।
এআই, স্যাটায়ার ও ডিপফেক: বদলে যাচ্ছে অপতথ্যের ধরণ
চলতি বছরের প্রথম দুই প্রান্তিকে অপতথ্যের ধরণ বিশ্লেষণে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবণতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এ সময়ে অপতথ্য কেবল ভুয়া দাবি বা গুজবের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং কনটেন্টের ধরণ ও প্রচারের কৌশলেও উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা গেছে।
সবচেয়ে বেশি শনাক্ত হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে তৈরি অপতথ্য। জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত এ ধরনের ৫০৪টি কনটেন্ট শনাক্ত করেছে রিউমর স্ক্যানার। ছবি, ভিডিও ও টেক্সট—সব ধরনের মাধ্যমেই এআই-নির্ভর কনটেন্ট ব্যবহার করে বিভ্রান্তিকর তথ্য তৈরি ও প্রচার করা হয়েছে। এসব কনটেন্ট ক্রমেই আরও বাস্তবসম্মত হয়ে ওঠায় সাধারণ ব্যবহারকারীর পাশাপাশি গণমাধ্যমও নিয়মিতভাবে বিভ্রান্তির শিকার হয়েছে।
এ সময় সার্কাজম বা ব্যঙ্গাত্মক পেজের পোস্টকে বাস্তব ঘটনা হিসেবে প্রচারের প্রবণতাও উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। ছয় মাসে এ ধরনের ৩৭৪টি ভুল তথ্য শনাক্ত হয়েছে। অর্থাৎ, রসাত্মক বা বিদ্রূপাত্মক উদ্দেশ্যে তৈরি কনটেন্ট প্রাসঙ্গিকতা না বুঝেই বাস্তব ঘটনা হিসেবে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে জনপরিচিত ব্যক্তি ও দায়িত্বশীল অবস্থানে থাকা ব্যক্তিদেরও এসব পোস্টকে সত্য ধরে প্রতিক্রিয়া জানাতে দেখা গেছে, যা বিভ্রান্তির পরিধি আরও বাড়িয়েছে।
এ ছাড়া, ডিপফেক প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি ৩৮টি বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট শনাক্ত হয়েছে। সংখ্যার দিক থেকে তুলনামূলক কম হলেও এসব কনটেন্টের প্রভাব ছিল উল্লেখযোগ্য। কারণ, বাস্তব ব্যক্তির চেহারা বা কণ্ঠস্বর কৃত্রিমভাবে নকল করে তৈরি হওয়ায় সাধারণ ব্যবহারকারীর পক্ষে এগুলো শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে এবং সেগুলো দ্রুত বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করে।
গণমাধ্যমে ভুলের পরিমাণ বেড়েছে
২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসে দেশের গণমাধ্যমগুলোতে ৯০টি ঘটনায় ভুল তথ্য প্রচারের প্রমাণ পাওয়া গিয়েছিল। এ বছর প্রায় ৫৭ শতাংশ বেড়ে এই সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৪১-এ। রিউমর স্ক্যানার প্রকাশিত গত ছয় মাসের ফ্যাক্টচেকগুলো পর্যালোচনা করে দেখা যায়, এই সময়ে সবচেয়ে বেশি ভুল তথ্য ছড়িয়েছে এমন গণমাধ্যমের তালিকায় প্রথম স্থানে ইনকিলাব, দ্বিতীয় স্থানে ইত্তেফাক এবং তৃতীয় স্থানে এসেছে যুগান্তর ও বিডি২৪রিপোর্টের নাম।

গণমাধ্যম সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা প্রয়োজনে +8801751589458 এই হোয়াটসঅ্যাপ নাম্বারে মেসেজ দিয়ে ভুলগুলোর তালিকা সংগ্রহ করতে পারবেন।
বাংলাদেশকে ঘিরে ভারতীয় উৎসের অপতথ্য প্রচার অব্যাহত
ভারতীয় গণমাধ্যম ও ভারত-ভিত্তিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্টগুলো থেকে বাংলাদেশকে ঘিরে ভুয়া তথ্য প্রচারের প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসেও একই চিত্র উঠে এসেছে রিউমর স্ক্যানারের পর্যবেক্ষণে।
জানুয়ারি থেকে জুন- এই ছয় মাসে বাংলাদেশ-সম্পর্কিত ১৭টি পৃথক ঘটনায় ভারতের মোট ৫৬টি সংবাদমাধ্যমে অপতথ্য ছড়ানো হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি, তিনটি অপতথ্য প্রচারের কারণে তালিকার শীর্ষে রয়েছে আজতক বাংলা ও রিপাবলিক ওয়ার্ল্ড।

এছাড়া অন্তত ৫১টি ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভারতীয় অ্যাকাউন্ট ও পেজ থেকে বাংলাদেশকে ঘিরে ভুয়া তথ্য প্রচারের প্রমাণ মিলেছে। সাম্প্রদায়িক অপতথ্যের বিষয়টিও সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বিশেষভাবে আলোচনায় রয়েছে।
চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে রিউমর স্ক্যানার ১০৫টি সাম্প্রদায়িক অপতথ্য শনাক্ত করে। এর মধ্যে ৫৩টি ঘটনায় বাংলাদেশি এবং ৫২টি ঘটনায় ভারতীয় পরিচয়ধারী অ্যাকাউন্ট ও পেজ থেকে অপতথ্য ছড়ানোর প্রমাণ পাওয়া গেছে।
বিশ্বাসযোগ্য সংবাদমাধ্যমের পরিচয়ে ছড়াচ্ছে শত শত অপতথ্য
বিশ্বাসযোগ্য গণমাধ্যমের পরিচয় ব্যবহার করে অপতথ্য ছড়ানো এখন একটি কৌশলগত পদ্ধতিতে পরিণত হয়েছে। প্রথম প্রান্তিকে গণমাধ্যমের নাম ও লোগো ব্যবহার করে ভুয়া ফটোকার্ড তৈরি করে অপতথ্য ছড়ানোর প্রবণতা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। এই সময়ে এমন ৭২০টি ঘটনা শনাক্ত হয়েছে, যার মাধ্যমে মোট ৭৩৯টি ভুল তথ্য প্রচার করা হয়েছে।
সবচেয়ে বেশি টার্গেট হয়েছে দেশীয় গণমাধ্যম। মোট ৭০টি আক্রান্ত সংবাদমাধ্যমের মধ্যে ৬২টিই দেশের, আর আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ছিল মাত্র ৮টি।
আক্রান্ত গণমাধ্যমগুলোর মধ্যে শীর্ষে রয়েছে দৈনিক আমার দেশ (৯৯)। এরপর রয়েছে যমুনা টিভি (৯৬) ও দৈনিক কালের কণ্ঠ (৭৬)। এছাড়া আরটিভি (৪৩) এবং চ্যানেল২৪-কেও (৩৯) উল্লেখযোগ্যভাবে ব্যবহার করা হয়েছে।


কাজের পদ্ধতি
এই পরিসংখ্যানটি রিউমর স্ক্যানারের ওয়েবসাইটে ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত প্রকাশিত ফ্যাক্টচেক প্রতিবেদনের ভিত্তিতে প্রস্তুত করা হয়েছে। এ উদ্দেশ্যে উক্ত সময়ে প্রকাশিত প্রতিটি প্রতিবেদনের তথ্য-উপাত্ত নিয়মিতভাবে সংগ্রহ করে একটি নির্দিষ্ট ডাটাবেজে সংরক্ষণ করা হয়। পরবর্তীতে সেই তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণের মাধ্যমে বিভিন্ন প্রবণতা, ধরন ও বৈশিষ্ট্য চিহ্নিত করা হয়েছে। পাশাপাশি চলতি বছরের প্রথম ও দ্বিতীয় প্রান্তিকের তথ্যের তুলনামূলক বিশ্লেষণের পাশাপাশি ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে জুন সময়ের তথ্যের সঙ্গেও তুলনা করা হয়েছে। বিশ্লেষণের ফলাফল পরবর্তীতে ইনফোগ্রাফিক ও বর্ণনামূলক প্রতিবেদনের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হয়েছে।
রাজনৈতিক দল, রাজনৈতিক নেতা এবং সরকারের বিভিন্ন দায়িত্বশীল ব্যক্তিকে ঘিরে প্রচারিত ভুল তথ্য বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে ইতিবাচক (Positive) ও নেতিবাচক (Negative)—এই দুই ধরনের শ্রেণিবিন্যাস অনুসরণ করা হয়েছে। কোনো ভুল তথ্যের মাধ্যমে যদি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা দলের ভাবমূর্তি ইতিবাচকভাবে উপস্থাপনের চেষ্টা করা হয়ে থাকে, তবে সেটিকে ইতিবাচক হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছে। বিপরীতে, কোনো ভুল তথ্যের মাধ্যমে যদি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করা, বিতর্ক সৃষ্টি করা বা নেতিবাচক ধারণা তৈরির প্রবণতা দেখা যায়, তবে সেটিকে নেতিবাচক হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। এ ধরনের শ্রেণিবিন্যাসের ক্ষেত্রে ভুল তথ্যের বিষয়বস্তু, প্রচারের সময়, সমসাময়িক প্রেক্ষাপট এবং পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
উৎসঃ রিউমার স্ক্যানার বাংলাদেশ থেকে নেওয়া। প্রকাশ ( ৯ জুলাই ২০২৬ )

















