“জেলা পরিষদ আইনের অনুচ্ছেদ-১৫-তে বলা হয়েছে, ‘পরিষদের মেয়াদ শেষ হইবার একশত আশি দিন পূর্বে চেয়ারম্যান বা কোন সদস্যের পদ শূন্য হইলে, পদটি শূন্য হইবার ষাট দিনের মধ্যে ইহা পূরণ করিতে হইবে এবং যিনি উক্ত পদে নির্বাচিত হইবেন তিনি পরিষদের অবশিষ্ট মেয়াদের জন্য উক্ত পদে বহাল থাকিবেন৷’”

৩১ ডিসেম্বরের আগেই কি জেলা পরিষদের মেয়াদ শেষ হচ্ছে?

fec-image

পরিষদ সদস্য জানে আলমের মৃত্যুর পরের দিন থেকে হিসাব করে দেখা গেছে আগামী ৩১ ডিসেম্বর ২০১৯ মঙ্গলবার ১৮০ দিনের সময়সীমা পূর্ণ হয়। অর্থাৎ জেলা পরিষদ আইনের ১৫ অনুচ্ছেদ মতে, আগামী ৩১ ডিসেম্বর বা তার আগেই পুনর্গঠিত না হলে আইনি সংকটে পড়বে রাঙ্গামাটি জেলা পরিষদ।

বর্তমান রাঙ্গামাটি জেলা পরিষদের মেয়াদ আর কত দিন আছে বা আগামী ৩১ ডিসেম্বর বা তার আগেই এর মেয়াদ শেষ হচ্ছে কিনা কিংবা ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যেই জেলা পরিষদ পুনর্গঠন হচ্ছে কিনা- সেটি নিয়ে জনমনে কৌতূহল সৃষ্টি হয়েছে। আর এ কৌতূহলের পেছনে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট কারণও আছে। গত ৪ জুলাই ২০১৯ রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ সদস্য এবং লংগদু উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মো. জানে আলমের আকস্মিক মৃত্যুই মূলত এ প্রশ্নকে সামনে এনেছে। জানে আলমের মৃত্যুতে জেলা পরিষদের সদস্য পদটি শূন্য হয়ে আছে। কিন্তু এই শূন্যতা কত দিন থাকবে বা কখন কীভাবে এই শূন্যতা পূরণ করা হবে সে ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট কোনো কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে এখনো কোনো প্রকার নির্দেশনা পাওয়া যায়নি।

তবে জেলা পরিষদ আইনে এ ব্যাপারে একটি সুনির্দিষ্ট বিধান দেওয়া আছে। রাংগামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ (সংশোধন) আইনে জেলা পরিষদের আকস্মিক পদ শূন্যতা সংক্রান্ত অনুচ্ছেদ-১৫-তে বলা হয়েছে, ‘পরিষদের মেয়াদ শেষ হইবার একশত আশি দিন পূর্বে চেয়ারম্যান বা কোন সদস্যের পদ শূন্য হইলে, পদটি শূন্য হইবার ষাট দিনের মধ্যে ইহা পূরণ করিতে হইবে এবং যিনি উক্ত পদে নির্বাচিত হইবেন তিনি পরিষদের অবশিষ্ট মেয়াদের জন্য উক্ত পদে বহাল থাকিবেন৷’

জেলা পরিষদ আইনের ১৫ অনুচ্ছেদটি বিশ্লেষণ করলে এটা স্পষ্ট যে, কোনো পদে শূন্যতা সৃষ্টি হলে সেটি ষাট (৬০) দিনের মধ্যে পূরণ করতে হবে। তবে শর্ত হচ্ছে, জেলা পরিষদের মেয়াদ একশত আশি (১৮০) দিন বা তার বেশি থাকলেই কেবল ৬০ দিনের মধ্যে শূন্য পদটি পূরণ করা যাবে। একইভাবে এই অনুচ্ছেদ এটাও নিশ্চিত করছে যে, যদি পরিষদের মেয়াদ ১৮০ দিন বা তার বেশি না থাকে তাহলে শূন্য পদ পূরণের কোনো প্রয়োজন নেই বা এই আইন সেই শূন্য পদ পূরণের জন্য বাধ্যবাদকতা তৈরি করবে না।

রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের সদস্য ও লংগদু উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. জানে আলম গত ৪ জুলাই ২০১৯ হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে লংগদু উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন। তার মৃত্যুর পরের দিন থেকে হিসাব করলে দেখা যায়, জেলা পরিষদ আইনের ১৫ অনুচ্ছেদ মতে, সদস্য পদের শূন্যতা পূরণের ৬০ দিনের মেয়াদ শেষ হয়েছে গত ২ সেপ্টেম্বর ২০১৯ তারিখ। কিন্তু সেই তারিখ পেরিয়ে যাওয়ার দুই মাস পরও শূন্য পদটি পূরণ করা হয়নি। তাহলে আইনের শর্ত অনুযায়ী কি আমরা ধরে নিতে পারি যে, জানে আলমের মৃত্যুর পর রাঙ্গামাটি জেলা পরিষদের মেয়াদ ১৮০ দিন বা তার বেশি ছিল না বলেই এই পদটি এখনো পূরণ করা হয়নি?

পরিষদ সদস্য জানে আলমের মৃত্যুর পরের দিন থেকে হিসাব করে দেখা গেছে আগামী ৩১ ডিসেম্বর ২০১৯ মঙ্গলবার ১৮০ দিনের সময়সীমা পূর্ণ হয়। অর্থাৎ জেলা পরিষদ আইনের ১৫ অনুচ্ছেদ মতে, আগামী ৩১ ডিসেম্বর বা তার আগেই পুনর্গঠিত না হলে আইনি সংকটে পড়বে রাঙ্গামাটি জেলা পরিষদ। তাই এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের ভাবনাটি কী সেটা জানার জন্য রাঙ্গামাটি জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান বৃষ কেতু চাকমা এবং পরিষদের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা ছাদেক আহমদের সাথে চেষ্টা করেও যোগাযোগ করতে পরিনি। তবে রাঙ্গামাটি জেলা পরিষদের জনসংযোগ কর্মকর্তা অরুনেন্দু ত্রিপুরার কাছে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, আমরা চিঠির মাধ্যমে জানে আলমের মৃত্যুজনিত কারণে জেলা পরিষদের সদস্য পদে শূন্যতার বিষয়টি পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছি। এরপর যা করার মন্ত্রণলায় করবে। আপনি এ ব্যাপারে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব মহোদয়কে প্রশ্ন করলে সঠিক জবাব পেতে পারেন।

গত ২৯ অক্টোবর পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মেসবাহুল ইসলাম এ বিষয়ে পার্বত্যনিউজকে বলেন, রাঙ্গামাটি জেলা পরিষদের সদস্য পদের শূন্যতা পূরণে আমরা এখনো কোনো সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব পাইনি। তাই এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত দিতে পারছি না। তবে আইন অনুযায়ী, ৬০ দিনের মধ্যে শূন্য পদ পূরণ না করায় ১৮০ দিন বা তার আইগেই রাঙ্গামাটি জেলা পরিষদ পুনর্গঠন করা হচ্ছে কিনা সে বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিস্তারিত না দেখে এ বিষয়ে মন্তব্য করতে পারছি না।

বিষয়টি যেহেতু আইন সংক্রান্ত তাই কয়েকজন আইনজ্ঞের কাছেও প্রশ্নটি উত্থাপন করেছিলাম। তাদের মধ্যে রাঙ্গামাটির দুজন প্রবীণ আইনজীবী তাদের মতামত জানিয়েছেন। তাদের একজন হলেন রাঙ্গামাটি জেলা জজ কোর্টের পাবলিক প্রসিকিউটর, রাঙ্গামাটি জেলা পরিষদের আইন উপদেষ্টা এবং রাঙ্গামাটি জেলা আওয়ামী লীগের আইন সম্পাদক অ্যাডভোকেট রফিকুল ইসলাম। অপরজন রাঙ্গামাটি জেলা বার অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট মোখতার আহমদ।

জেলা পরিষদের আইন উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট রফিকুল ইসলামের অভিমত হচ্ছে, জেলা পরিষদ আইনের ১৫ অনুচ্ছেদটি নির্বাচিত জেলা পরিষদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে, অন্তর্বর্তীকালীন অনির্বাচিত জেলা পরিষদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না। কিন্তু অন্তর্বর্তীকালীন জেলা পরিষদ যেহেতু বিদ্যমান আইন দিয়েই তাদের সার্বিক কার্যক্রম পরিচালনা করছে, সে ক্ষেত্রে একই আইনের ১৫ অনুচ্ছেদ তাদের বেলায় কেন প্রযোজ্য হবে না জানতে চাইলে তিনি বিষয়টি স্পষ্ট না করে বলেন, আসলে দীর্ঘদিন ধরে এখানে নির্বাচন হচ্ছে না। সেটাই মূল সমস্যা। আমরাও চাই এখানে নির্বাচন হোক। নির্বাচনের মাধ্যমে পার্বত্য তিন জেলার পরিষদগুলো পুনর্গঠিত হোক জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের দিয়ে। তাহলেই আর কোনো সমস্যা থাকবে না।

অপর দিকে রাঙ্গামাটি জেলা বার অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট মোখতার আহমদ বলেন, আইন না মেনে যেখানে দুই যুগের বেশি সময় ধরে অনির্বাচিতদের দিয়ে পার্বত্য জেলা পরিষদগুলো চালানো হচ্ছে, সেখানে আইনের একটি ধারা মানা বা না-মানা একান্তই কর্তৃপক্ষের বিষয়। তবে পরিষদ আইনের সংশ্লিষ্ট অনুচ্ছেদটি  কর্তৃপক্ষের ওপর আইনি বা নৈতিক বাধ্যবাদকতা তৈরি করে কিনা সে বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, পুরো জেলা পরিষদই তো নৈতিকতার প্রশ্নের সন্মুখীন। আশা করি, সেটার প্রতি কর্তৃপক্ষ নজর দেবেন এবং দ্রুত নির্বাচন দিয়ে নির্বাচিতদের হাতে ক্ষমতা দিয়ে সকল প্রশ্নের অবসান করবেন।

উল্লেখ্য যে, স্থানীয় সরকার পরিষদ আইন ১৯৮৯-এর আওতায় ১৯৮৯ সালের ২৫ জুন প্রথমবার নির্বাচন হয় তিন পার্বত্য জেলার তিনটি স্থানীয় সরকার (জেলা) পরিষদে। সে আইনে স্থানীয় সরকার (জেলা) পরিষদের মেয়াদ ছিল তিন বছর। প্রথম এবং একমাত্র নির্বাচিত জেলা পরিষদের মেয়াদ শেষে ১৯৯২ সালের ১৭ জুন পার্বত্য তিন জেলায় তিনটি অনর্তবর্তীকালীন স্থানীয় সরকার (জেলা) পরিষদ দায়িত্ব গ্রহণ করে। এরপর ১৯৯৬ সালের ২০ মার্চ দায়িত্ব গ্রহণ করে দ্বিতীয় অন্তর্বর্তীকালীন স্থানীয় সরকার (জেলা) পরিষদ। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর ১৯৯৭ সালের ৫ জুলাই দায়িত্ব নেয় তৃতীয় অন্তর্বর্তীকালীন স্থানীয় সরকার (জেলা) পরিষদ। (শান্তি চুক্তির শর্ত মতে স্থানীয় সরকার পরিষদ আইন সংশোধন হওয়ায় ১৯৯৮ সাল থেকে এটি পার্বত্য জেলা পরিষদ হিসেবে চিহ্নিত হয় এবং এর মেয়াদ বৃদ্ধি করে পাঁচ বছর করা হয়)। বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর ২০০২ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব নেয় চতুর্থ অন্তর্বর্তীকালীন জেলা পরিষদ। ওয়ান-ইলেভের পর ২০০৭ সালের ১৫ জুলাই দায়িত্ব গ্রহণ করে পঞ্চম অন্তর্বর্তীকালীন জেলা পরিষদ। এরপর আওয়ামী লীগ পুনরায় ক্ষমতায় আসার পর ২০০৯ সালের ২৫ মে দায়িত্ব নেয় ষষ্ঠ অন্তর্বর্তীকালীন জেলা পরিষদ। সর্বশেষ অর্থাৎ অনির্বাচিতদের দিয়ে গঠিত সপ্তম অন্তর্বর্তীকালীন জেলা পরিষদ দায়িত্ব নিয়েছে গত ২০১৫ সালের ২৫ মার্চ। যা অদ্যাবধি চলমান আছে।

Print Friendly, PDF & Email
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

eighteen − 12 =

আরও পড়ুন