কক্সবাজারের মাতারবাড়ী কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্পে আত্মসাতের তদন্ত রিপোর্ট পেশ

মাতারবাড়ি 
স্টাফ রিপোর্টার, কক্সবাজার:
কক্সবাজারের মহেশখালীর মাতারবাড়িতে কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মানের জন্য জমি অধিগ্রহন প্রক্রিয়ায় অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রতিবেদন দেয়া হয়েছে। প্রতিবেদনে কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসকসহ দায়ী কর্মকর্তা কর্মচারিদের বিরুদ্ধে শাস্তিমুলক ব্যবস্থা নিতে সুপারিশ করা হয়েছে। চট্টগ্রামের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনারের নেতৃত্বে গঠিত তদন্ত কমিটি গত ২৮ ডিসেম্বর এ প্রতিবেদন জমা দেয়।
রিপোর্টে বলা হয়েছে, বেআইনি ও মিথ্যা তথ্যের ভিত্তিতে ক্ষতিপূরণের টাকা দেয়ার পেছনে বড় ধরনের দুর্নীতি হয়েছে। এই অনিয়ম ও দুর্নীতির জন্য প্রতিবেদনে প্রধান অভিযুক্ত কর্মকর্তা হিসেবে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মো. জাফর আলমকে দায়ী করা হয়েছে। এছাড়া সাবেক এল এ ও আরেফিন আখতার নূরসহ সংশ্লিষ্ট কানুনগো, সার্ভেয়ার এবং অফিস সহকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সুপারিশ করা হয়। কক্সবাজার জেলা প্রশাসক রুহুল আমিনও দায় এড়াতে পারেন না বলে প্রতিবেদনে মন্তব্য করা হয়।একই সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে শাস্থিমূলক ব্যবস্থা নিতে জোর সুপারিশও করা হয়।
জানা যায়, মহেশখালীর মাতারবাড়ীতে ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে মাতারবাড়ি ও ধলঘাটা মৌজায় এক হাজার ৪১৪ একর জমির ওপর প্রায় ৩৬ হাজার কোটি টাকায় ১২শ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণের জন্য জমি অধিগ্রহণের বিপরীতে বরাদ্দ রাখা হয় প্রায় ২৩৭ কোটি টাকা। উক্ত জমি ক্ষতিপূরণ দেয়ার ক্ষেত্রে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে ভুয়া ক্ষতিপূরণ দেখিয়ে জেলা প্রশাসনের কতিপয় কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ একটি চক্র প্রায় ২৪ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেন।জমি অধিগ্রহণের টাকা পরিশোধ করতে গিয়ে ক্ষতিপূরণ বাবদ চিংড়ি ঘের ইজারাদের মধ্যে এই টাকা পরিশোধ করা হয়।
সূত্র জানায়, সরকারি কাজে কক্সবাজার জেলার মহেশখালী উপজেলার মাতারবাড়ি ও ধলঘাটা মৌজায় এক হাজার ৪১৪ একর জমি অধিগ্রহণ করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এ বিষয়ে সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে গত বছরের ৯ জুন জমি, অবকাঠামো, গাছপালা,ব্রাইন ওয়াটার ও ফসলের জমি বাবদ মোটা অংকের ক্ষতিপূরণ দেয়ার প্রস্তাব অনুমোদন করে জেলা প্রশাসক। তবে এর মধ্যে চিংড়ির ক্ষতিপূরণ দেয়ার ক্ষেত্রে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির আশ্রয় নেয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, চিংড়ির ক্ষতিপূরণ বাবদ প্রাক্কলিত ৩০ কোটি ৮২ লাখ ৮৮ হাজার ৮৮০ টাকার ক্ষতিপূরণ বাবদ ২৫টি চেকের মাধ্যমে ইজারাদারদের ২৩ কোটি ৯২ হাজার ৪৬৫ টাকা পরিশোধ করা হয়। তবে চিংড়ির ক্ষতিপূরণ বাবদ কত একর জমির জন্য কত টাকা প্রদান করা হয়েছে সে বিষয়ে অনুমোদিত প্রস্তাবে কোনো তথ্য নেই। এমনকি অধিগ্রহণ করা জমির বৈধ কোনো কাগজপত্র ছাড়াই শুধু একটি একপক্ষীয় মাস্টার রোলের ফটোকপির ওপর ভিত্তি করে এই টাকা পরিশোধ করা হয়। এছাড়া এই ক্ষতিপূরণ দিতে গিয়ে ব্রাইন ওয়াটারভুক্ত জমিকেও চিংড়ির জমি হিসেবে দেখানো হয়।
তদন্ত প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ক্ষতিপূরণের প্রস্তাব তৈরির ক্ষেত্রে কোনো যৌথ তদন্ত বা ফ্লিড বুক প্রস্তুত করা হয়নি। মৎস্য কর্মকর্তা একাই পরিদর্শন করে প্রতিবেদন দাখিল করেন।এছাড়া নির্ধারিত সময় অতিবাহিত হওয়ার প্রায় ৩ মাস পর মৎস্য কর্মকর্তার পরিদর্শন প্রতিবেদনের ভিত্তিতে প্রাক্কলন ও রোয়েদাদ প্রস্তুত করা হয়, যা আইনসম্মত হয়নি।
প্রতিবেদনে যে ২৫টি চিংড়িঘেরের নাম করে টাকা লুট করা হয়েছে সেগুলোর নয়টির কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি বলে উল্লেখ করা হয় প্রতিবেদনে। উপজেলার ধলঘাটা ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান ও উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক আহসান উল্লাহ বাচ্চুর ২০ একর জমির মুহুরিঘোনা চিংড়িঘেরেরও অস্তিত্ব পাননি তদন্তকারীরা।
এদিকে তদন্ত প্রতিবেদনে আহসান উল্লাহর ঘেরেরও অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। ওই ঘের বাবদ তিনি গত বছর ২০ আগস্ট ৬৮ লাখ ৫৮ হাজার ৫৬১ টাকা তুলে নেন। এ প্রসঙ্গে আহসান উল্লাহ বলেন, চিংড়িঘের আছে বলেই আমাকে ৬৮ লাখ ৫৮ হাজার টাকার ক্ষতিপূরণের চেক দেওয়া হয়েছিল। সেই টাকা ব্যাংক থেকে উত্তোলনও করা হয়েছে।
এখন তদন্ত প্রতিবেদনে ওই চিংড়িঘের না থাকলে করার কিছু নাই। প্রতিবেদনে মাতারবাড়ী ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলামের ঘেরেরও অস্তিত্ব মেলেনি।রুস্তমের দোনা চিংড়িঘেরের ক্ষতিপূরণ বাবদ রফিকুল ইসলামও ২ কোটি ২২ লাখ ৯০ হাজার ৩২৫ টাকা তুলে নেন।
প্রতিবেদনে বাকি যে ঘেরগুলোর অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি বলে উল্লেখ করা হয়,তার মধ্যে আছে ৩৮ একরের উত্তর মুহুরি ঘোনা-মগডেইল্যা ঘোনা, ১০ একরের মফিজের বাইরের ঘোনা, ২০ একরের রাঙ্গাখালী বাইরের দুটি ঘোনা, ১৮ একরের টিয়াখালীখাল ঘোনা, রাঙ্গাখালী ও রুস্তমের দোনার বাইরের ঘোনা এবং মুহুরি ঘোনা ট্যাকের ঘোনা। এসব অস্তিত্বহীন ঘেরের বিপরীতে চিংড়ির ক্ষতিপূরণ বাবদ ৭ কোটি ৩০ লাখ টাকা তুলে নেওয়া হয়।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে কক্সবাজার জেলার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (বর্তমানে এডিএম) জাফর আলম বলেন, বিশদ ও চূড়ান্ত তদন্তে তিনি নির্দোষ বলে প্রমাণিত হবেন। এর বেশি তিনি আর কোনো প্রশ্নের জবাব দিতে কিংবা মন্তব্য করতে চাননি।
উল্লেখ্য, গত ১২ অক্টোবর চিংড়িচাষি কায়সারুল ইসলাম চৌধুরী বাদী হয়ে মাতারবাড়ীতে ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে ২৪ কোটি টাকা আত্বসাতের ঘটনায় কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মো: রুহুল আমিন, এডিএম জাফর আলম ও ৪ সরকারী কর্মকর্তাসহ ২৮ জনের বিরুদ্ধে কক্সবাজার সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালতে মামলা দায়ের করেন। ওইদিন বিজ্ঞ বিচারক অভিযোগটি আমলে নিয়ে আগামী ২০ জানুয়ারীর মধ্যে দুদককে প্রতিবেদন আকারে আদালতে জমা দেয়ার নির্দেশও দেন।
Print Friendly, PDF & Email
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও পড়ুন