পার্বত্য সীমান্তে সশস্ত্র সংগঠন কেপিএফ-এর উদ্ভব ও আঞ্চলিক নিরাপত্তাঝুঁকি


দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সামরিক জান্তাবিরোধী গৃহযুদ্ধ ক্রমাগতভাবে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব পার্বত্য সীমান্তকে এক জটিল ও বহুমুখী সংকটের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। বাংলাদেশ, ভারত ও মিয়ানমারের সংযোগস্থলে অবস্থিত বান্দরবানের দুর্গম সীমান্ত অঞ্চল ঐতিহাসিকভাবেই অত্যন্ত সংবেদনশীল। দীর্ঘকাল ধরে এই ‘ট্রাইজংশন’ বা ত্রিদেশীয় সীমান্ত এলাকাটি ভৌগোলিক দুর্গমতার কারণে বিভিন্ন বিচ্ছিন্নতাবাদী ও গেরিলা গোষ্ঠীর অবাধ যাতায়াত এবং গোপন তৎপরতার চারণভূমিতে পরিণত হয়েছে।
এই ধারায় সর্বশেষ সংযোজন হিসেবে আত্মপ্রকাশ ঘটেছে ‘খুমি পিপলস ফোর্স’ (কেপিএফ) নামক একটি নতুন সশস্ত্র সংগঠনের। মিয়ানমারের চিন স্টেটের পালেতওয়া অঞ্চলে ক্ষমতার ভারসাম্য পরিবর্তন এবং রাখাইন জাতিগোষ্ঠীভিত্তিক শক্তিশালী সশস্ত্র দল ‘আরাকান আর্মি’ (AA)-এর একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তারের প্রতিক্রিয়ায় এই অঞ্চলের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী খুমিদের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই এখন আন্তর্জাতিক সীমানা পেরিয়ে বাংলাদেশের অভ্যন্তরেও ছায়া ফেলতে শুরু করেছে।
কেপিএফ-এর নামকরণ সম্পর্কে, বিভিন্ন উৎস থেকে কিছু তথ্য জানা যায়। নিম্নে তুলে ধরা হলো-
রাজনৈতিক শাখা ও সাংগঠনিক কাঠামো
নব্য আত্মপ্রকাশকারী এই দলটির সাংগঠনিক কাঠামো পার্বত্য সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর মত দ্বিমুখী; যার একটি রাজনৈতিক উইং এবং অন্যটি সামরিক শাখা। দলটির রাজনৈতিক শাখার নাম ‘খুমি ন্যাশনাল কংগ্রেস পার্টি’ (KNCP)। অন্যদিকে, এই রাজনৈতিক দলের অধীনে মাঠপর্যায়ে সশস্ত্র কার্যক্রম পরিচালনার জন্য গঠিত সামরিক শাখার নাম ‘খুমি পিপলস ফোর্স’ (KPF)। কৌশলগত কারণে মাঠপর্যায়ে একে একত্রে ‘KPF/KNCP’ হিসেবে অভিহিত করা হয়।
বিভিন্ন উৎসের তথ্য বিশ্লেষণ করে জানা যায়, ২০২৫ সালের জুলাই মাসে এর রাজনৈতিক উইং ‘KNCP’ আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মপ্রকাশ করে। তবে একটি সশস্ত্র দল হিসেবে KPF-এর সামরিক তৎপরতা ও উপস্থিতি ২০২৬ সালের শুরুর দিকে দৃশ্যমান হতে শুরু করে। খুমি সম্প্রদায়ের স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক অ্যাক্টিভিস্ট, নৃ-গোষ্ঠীগত বুদ্ধিজীবী এবং খুমিদের পুরনো কিছু সশস্ত্র উপদলের অবশিষ্টাংশের সমন্বয়ে এই নতুন জোট বা ফোর্সটি গঠিত হয়েছে।
২০২৬ সালের জুনের বর্তমান পরিস্থিতিতে এই সংগঠনটিকে ঘিরে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তীব্র বিতর্ক, কৌতূহল ও সামরিক উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে। তবে এই তথ্যগুলো নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
উদ্ভব ও অস্তিত্বের কারণ এবং আরাকান আর্মির আধিপত্য ও জান্তাবিরোধী সংঘাত প্রসঙ্গে:
কেপিএফ-এর উদ্ভব মূলত মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার দ্বন্দ্ব এবং জাতিগত নিপীড়নের একটি প্রত্যক্ষ ফল। ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর মিয়ানমার জান্তা সরকারের বিরুদ্ধে যে দেশব্যাপী সশস্ত্র প্রতিরোধ শুরু হয়, তাতে খুমিদের পূর্বতন সংগঠন ‘খুমি ন্যাশনাল অর্গানাইজেশন’ (KNO) এবং এর সশস্ত্র শাখা ‘খুমি ন্যাশনাল আর্মি’ (KNA) জান্তাবিরোধী আন্দোলনে যুক্ত হয়েছিল।
কিন্তু পরিস্থিতি নাটকীয়ভাবে মোড় নেয় ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে, যখন শক্তিশালী রাখাইন সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মি (AA) মিয়ানমার সেনাবাহিনীর হাত থেকে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পালেতওয়া (Paletwa) অঞ্চল এবং সামি (Samee) অঞ্চলের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ কেড়ে নেয়।
আরাকান আর্মি মূলত রাখাইন জাতিগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করায়, চিন স্টেটের পালেতওয়া অঞ্চলের স্থানীয় বাসিন্দা চিন বা খুমি গোষ্ঠীগুলোর সাথে তাদের এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক ও সামরিক দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। স্থানীয় সূত্রগুলোর দাবি, আরাকান আর্মি পালেতওয়া টাউনশিপ দখলে নেওয়ার পর অন্যান্য ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী ও খুমিদের জোরপূর্বক নিজেদের দলে যোগ দিতে এবং তাদের আধিপত্য মেনে নিতে প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করে। আরাকান আর্মি এবং খুমি ন্যাশনাল আর্মি (KNA)-এর যৌথ নিপীড়ন ও অত্যাচারের হাত থেকে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে এবং পালেতওয়া অঞ্চলে খুমিদের নিজস্ব একটি শক্ত সামরিক অবস্থান তৈরি করার লক্ষ্যে পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবেই মূলত ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ‘খুমি পিপলস ফোর্স’ (KPF)-এর আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। বর্তমানে ওই এলাকায় ‘চিনল্যান্ড ডিফেন্স ফোর্স’ (CDF-Paletwa) এবং নতুন গঠিত KPF/KNCP সমান্তরালভাবে সক্রিয় থাকার চেষ্টা করছে।
জোরপূর্বক সেনা নিয়োগ ও সীমান্ত এলাকায় মানবিক সংকট প্রসঙ্গে:
যদিও কেপিএফ নিজেদের খুমিদের সুরক্ষাকবচ হিসেবে দাবি করছে, কিন্তু মাঠপর্যায়ে তাদের বিরুদ্ধে সাধারণ খুমি নাগরিকদের ওপর বলপ্রয়োগের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। চলতি বছরের জুন মাসের প্রথম সপ্তাহে (১ ও ২ জুন) চিন স্টেটের পালেতওয়া টাউনশিপের থারিয়ারকোন, কিয়াকপালিন এবং সাত্তালাইংওয়া গ্রামে KPF/KNCP-এর সশস্ত্র যোদ্ধারা গভীর রাতে অতর্কিত অভিযান চালায়। তথ্য অনুযায়ী, তারা এই গ্রামগুলো থেকে আনুমানিক ৪০ জন সাধারণ খুমি তরুণ-তরুণীকে জোরপূর্বক নিজেদের বাহিনীতে লড়াইয়ের জন্য তুলে নিয়ে যায়। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, এই বাধ্যতামূলক ও জোরপূর্বক নিয়োগের বিরুদ্ধে কেউ প্রতিবাদ করলে বা কথা বললে পরিবারের সদস্যদের প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হচ্ছে।
এই অভ্যন্তরীণ সংঘাত, আরাকান আর্মির নিপীড়ন এবং কেপিএফ-এর জোরপূর্বক সেনা নিয়োগের ভয়ে মায়ানমার থেকে সাধারণ খুমি পরিবারগুলো দলে দলে সীমান্ত অতিক্রম করে পালাচ্ছে, যা মায়ানমার সীমান্তে এক নতুন মানবিক ও সামরিক সংকট তৈরি করেছে। এরই ধারাবাহিকতায়, গত ৪ জুন রাতে মিয়ানমারের পালেতওয়া থেকে পালিয়ে আসা ৪৭ জন সাধারণ খুমি নাগরিক; যার মধ্যে নারী এবং ১১টি শিশু রয়েছে, বাংলাদেশের বান্দরবানের থানচি সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে অনুপ্রবেশ করার সময় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) কর্তৃক আটক হন।
বাংলাদেশ সীমান্তে কেপিএফ-এর অনুপ্রবেশ ও যাতায়াত: যমুনা টিভির তথ্যানুসন্ধান:
মিয়ানমারের ভেতরে আরাকান আর্মির প্রচণ্ড চাপ ও আক্রমণের মুখে টিকতে না পেরে গত দুই মাস ধরে কেপিএফ-এর সদস্যরা বাংলাদেশের বান্দরবানের রুমা ও থানচি সীমান্তে অবস্থান গ্রহণ করেছে। যমুনা টিভি-তে প্রকাশিত সংবাদ (প্রকাশ: শনিবার, ২০ জুন ২০২৬)
“বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে আনাগোনা বেড়েছে খুমি পিপল ফোর্স নামে নতুন একটি সশস্ত্র সংগঠনের। মিয়ানমারের চীন প্রদেশের পালেতোয়া টাউনশিপ এলাকার খুমি ন্যাশনাল কংগ্রেস পার্টির সশস্ত্র শাখা এটি। চলতি বছরেই তাদের আত্মপ্রকাশ। আরাকান আর্মির অত্যাচারে টিকতে না পেরে গেলো দুই মাস ধরে বান্দরবানের রুমা ও থানচি সীমান্তে অবস্থান করছে সংগঠনটির সদস্যরা।”
যমুনা টিভির মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানে জানা যায়, গত এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে সশস্ত্র এ দলটিকে প্রথম দেখা যায় বান্দরবানের বাংলাদেশ-ভারত-মিয়ানমারের সংযোগস্থল বা তিনমুখ পিলার সংলগ্ন কেসপাই পাড়া এলাকায়। এরপর তংব্রাই ডুলু চাঁদ, থানদৈ, ক্রামচি পাড়াসহ বেশ কয়েকটি সীমান্তবর্তী পাড়ায় তাদের উপস্থিতি চোখে পড়ে বলে স্থানীয়রা জানান। সবশেষ মে মাসের শেষ নাগাদ তাদের দেখা যায় থানচি উপজেলার তিন্দু ইউনিয়নের পাউপাড়া এলাকার একটি ঝিরিতে। তিন্দু বাজার ও তৎসংলগ্ন পাড়ায় এ ব্যাপারে তীব্র ভয়ে কেউ মুখ না খুললেও জানা গেছে, সেখানকার পাউপাড়া থেকে সশস্ত্র এই দলটি তিন্দু বাজারের উল্টোপাশে অবস্থিত ক্রামচি পাড়ায় গমন করে এবং সেখানে পাড়া কারবারির ছেলে অংসাই খুমিকে প্রধান করে একটি স্থানীয় কমিটিও গঠন করে, যা অন্তত দু’জন জনপ্রতিনিধি নিশ্চিত করেছেন। এছাড়া, রেমাক্রীর ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য ণাংলুম খুমির ইঞ্জিনচালিত নৌকায় তিন্দুর রাজাপাথর এলাকায় এই সংগঠনের অন্যতম শীর্ষ নেতা লা-থোইং খুমিকে যাতায়াত করতে দেখা গেছে।
সার্বভৌমত্বের সংকট: বিজিবি-কে দেওয়া চিঠি এবং ভারতের প্রত্যাখ্যান:
নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে এবং আন্তর্জাতিক সীমান্তকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করতে কেপিএফ কৌশলগত কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু করেছে। সংগঠনটি গত ২৫ মে ২০২৬ তারিখে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)-এর একটি থানচি ক্যাম্পে একটি আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠায়, যার একটি কপি যমুনা নিউজের হস্তগত হয়েছে। চিঠিতে তারা উল্লেখ করে যে, আরাকান আর্মি ও খুমি ন্যাশনাল আর্মি যৌথভাবে বাকি নৃগোষ্ঠীগুলোর ওপর যে অত্যাচার চালিয়েছে, তার পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবেই তাদের এই কার্যক্রম। চিঠির মাধ্যমে তারা বাংলাদেশ সীমান্তে নিরাপদে চলাচল, অবস্থান ও আশ্রয়ের জন্য বিজিবির কাছে বিনীত অনুরোধ জানায় এবং বিজিবির সাথে আলোচনায় বসার আগ্রহ প্রকাশ করে।
এর আগে, কেপিএফ-এর পক্ষ থেকে একই ধরনের একটি চিঠি ভারতের মিজোরামের মুখ্যমন্ত্রীর দফতরেও পাঠানো হয়েছিল, যেখানে তারা বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তবর্তী মিজোরামের লাংতলাই এলাকায় একটি সামরিক প্রশিক্ষণ ক্যাম্প স্থাপনের অনুমতি চেয়েছিল। তবে ভারতের মুখ্যমন্ত্রীর দফতর ভারতের জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে সেই অনুরোধ সরাসরি নাকচ বা প্রত্যাখ্যান করে দেয়।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এই সশস্ত্র গোষ্ঠীকে আশ্রয় দেওয়ার কোনো আইনি বা প্রশাসনিক সুযোগ নেই। বিজিবি কক্সবাজার রিজিওনের রিজিওন কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ আকসার খান বিজিবি-কে দেওয়া চিঠির সত্যতা নিশ্চিত করে যমুনা টিভিকে জানান: “আমাদের একটা বর্ডার পোস্টে তারা একটা চিঠি পাঠিয়েছে স্থানীয় কারবারির মাধ্যমে। তারা বসতে চায়, সহায়তা চায়, আলোচনা করতে চায় বিজিবির সাথে। আমাদের শক্ত অবস্থান হচ্ছে, সীমান্তে কোনো সশস্ত্র গ্রুপকে অ্যালাউ করা হবে না।”
তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, সীমান্ত সড়ক নির্মাণ সম্পন্ন হলে বর্ডার আউটপোস্টগুলো আরও সীমান্ত ঘেঁষে স্থানান্তরিত হবে, যা বাংলাদেশের সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরও সুসংহত করবে। বর্তমানে সীমান্ত সুরক্ষায় অস্থায়ী ক্যাম্প ও চেকপোস্ট বৃদ্ধি করা হয়েছে।
গবেষক আলতাফ পারভেজের ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষণ:
দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতি ও সীমান্ত সংকট নিয়ে দীর্ঘসময় খোঁজখবর রাখা বিশিষ্ট গবেষক আলতাফ পারভেজের মতে, সীমান্ত এলাকায় নতুন নতুন সশস্ত্র সংগঠনের এই আনাগোনা সম্পূর্ণভাবে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ অস্থিতিশীল পরিস্থিতির ওপর নির্ভরশীল। ত্রিদেশীয় দুর্গম সীমান্ত অঞ্চলের জটিলতা ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন:
“এই খুমিরা মিজোরামেও ঢুকতে চায়, আসা-যাওয়া করতে চায়। ত্রিদেশীয় সীমান্ত, যেখানে ভারত-বাংলাদেশ-মিয়ানমার যুক্ত হয়েছে, সেখানে কোনো দেশের সীমান্তরক্ষীরাই একেবারে পূর্ণ নিরাপদ রাখতে পারে না। এটা এমন একটা এলাকা যেটা প্রাচীনকাল থেকে গেরিলা দলগুলোর আসা-যাওয়া আছে। চোরকারবারী-ডাকাতদের আসা-যাওয়া আছে। ফলে এইখানে বাংলাদেশে সীমান্তরক্ষীদের নজরদারির কোনো ঘাটতি নেই। কিন্তু তারা সশস্ত্র যেকোনো ছোট ছোট গ্রুপের আসা-যাওয়া পুরো ঠেকাতে পারবে না। এটা বর্মার পুরো অভ্যন্তরীণ রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত।”
গবেষকদের মতে, গত এক বছরে বান্দরবান-মিজোরাম ও চিন প্রদেশের এই ট্রাইজংশন বা সংযোগস্থলকে কেন্দ্র করে কেপিএফ ছাড়াও আরও কয়েকটি ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীভিত্তিক সংগঠনের আত্মপ্রকাশ ঘটেছে, যা আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
পার্বত্য চট্টগ্রামের অভ্যন্তরীণ সশস্ত্র সমীকরণ এবং কেপিএফ-এর প্রতিকূলতা:
পার্বত্য চট্টগ্রামে কেপিএফ-এর মতো একটি বিদেশি ক্ষুদ্র সশস্ত্র গোষ্ঠীর দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকা অত্যন্ত কঠিন এবং প্রতিকূল। বর্তমানে পার্বত্য চট্টগ্রামে স্থায়ীভাবে ৬টি বড়-ছোট আঞ্চলিক সশস্ত্র সংগঠন সক্রিয় রয়েছে:
১. পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (জেএসএস সন্তু লারমা পক্ষ)
২. ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ প্রসীত পক্ষ)
৩. জেএসএস (এম.এন. লারমা সংস্কারপন্থী পক্ষ)
৪. ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক)
৫. মগ লিবারেশন পার্টি (এমএলপি)
৬. কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট (KNF), যা স্থানীয়ভাবে ‘বম পার্টি’ নামে পরিচিত।
ভৌগোলিক আধিপত্যের দিক থেকে ইউপিডিএফ খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটিতে, জেএসএস খাগড়াছড়ি আংশিক ও রাঙামাটি বড় আধিপত্য এবং বান্দরবানের কিছু অংশে, এমএলপি রাজস্থলী ও কাপ্তাই এলাকায় এবং কেএনএফ মূলত বান্দরবানের রুমা, থানচি, রোয়াংছড়ি এবং মিয়ানমার-ভারত সীমান্ত অঞ্চলে অত্যন্ত শক্তিশালী।
এই সমীকরণে কেপিএফ-এর টিকে থাকা অসম্ভব হওয়ার প্রধান কারণ দুটি-
অর্থনৈতিক ও ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতা। থানচির দুর্গম বা সীমান্তবর্তী জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক অবস্থান অত্যন্ত নাজুক। সেখানে নতুন একটি সশস্ত্র গোষ্ঠীর জন্য প্রয়োজনীয় রসদ, খাদ্য ও দীর্ঘমেয়াদী আশ্রয় লাভ করা প্রায় অসম্ভব।
জনমিতিক ও জাতিগত বিরোধ:
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২২ সালের জনশুমারি ও গৃহগণনা অনুযায়ী, বাংলাদেশে খুমি জনগোষ্ঠীর মোট জনসংখ্যা মাত্র ৩ হাজার ৭৮০ জন (যার মধ্যে পুরুষ ১ হাজার ৯৫১ জন এবং নারী ১ হাজার ৮২৯ জন। এর মধ্যে ৩ হাজার ২৮৭ জন বান্দরবানের থানচি, রুমা ও রোয়াংছড়িতে বাস করেন। বাংলাদেশে স্বজাতির এই অত্যন্ত নগণ্য জনসংখ্যার কারণে কেপিএফ কোনো সামাজিক বা লোকবল সংক্রান্ত সুবিধা পাবে না। তার ওপর, থানচি ও রুমা অঞ্চলে আধিপত্য বিস্তারকারী বম জনগোষ্ঠীর সশস্ত্র সংগঠন কেএনএফ নিজেদের আধিপত্য ও অস্তিত্বের স্বার্থে নতুন আগত সংগঠনকে টিকতে দিবে না। এছাড়াও বম ও মারমা একটি উগ্র অংশের সাথে গোপনে প্রকাশ্যে খুমিদের তীব্র বিরোধ রয়েছে। ফলে এই প্রতিকূল পরিবেশে কেপিএফ থানচিতে অবস্থান নিলে কেএনএফ এবং মিয়ানমারের আরাকান আর্মি উভয়ের সাথেই এক রক্তক্ষয়ী ত্রিমুখী সশস্ত্র সংঘাতের সৃষ্টি হতে পারে।
আরাকান আর্মির অনুপ্রবেশ ও বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন:
কেপিএফ-এর এই সংকটের সমান্তরালে, বাংলাদেশের পার্বত্য সীমান্তে মিয়ানমারের প্রধান বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মির সরাসরি অনুপ্রবেশের ঘটনা দেশের সার্বভৌমত্বকে বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। দৈনিক নয়া দিগন্ত-এ প্রকাশিত সংবাদ (রোববার, ২০ এপ্রিল ২০২৫)
” বাংলাদেশের সার্বভৌম সীমা লঙ্ঘন করে বান্দরবানে থানচি উপজেলার তিন্দু ইউনিয়নের রেমাক্রি মুখ এলাকায় অনুপ্রবেশ করে সামরিক পোশাকে জলকেলি উৎসব করেছে আরাকান আর্মি। বান্দরবান সীমান্তের ১০ কিলোমিটার ভেতরে রেমাক্রি জলপ্রপাতে স্থানীয় পাহাড়িদের নিয়ে আরাকান আর্মির সদস্যরা গত ২০২৫ সালের ১৬-১৭ এপ্রিল এই উৎসবে অংশ নেয়। এই উৎসবের সচিত্র ভিডিও আরাকান আর্মি তাদের সামাজিক গণমাধ্যম অ্যাকাউন্টে শেয়ার করে।”
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয় যে, বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক সীমানা থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার অভ্যন্তরে মিয়ানমারের এই শক্তিশালী সশস্ত্র গোষ্ঠী এবং তাদের রাজনৈতিক শাখা ‘ইউনাইটেড লিগ অব আরাকান’ (ULA)-এর অর্থায়ন ও প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে ‘আরাকা ওয়াটার ফেস্টিভাল’ নামের এই অনুষ্ঠানের আয়োজন সরাসরি বাংলাদেশের সীমান্ত নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের একটি নজিরবিহীন দৃষ্টান্ত। স্থানীয় মারমা সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী জলকেলি উৎসবে আরাকান আর্মির এই প্রকাশ্য অংশগ্রহণ এবং কিছু ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রশাসনিক গাছাড়াভাব বা উদাসীনতার গুঞ্জন স্থানীয় ভূ-রাজনীতিতে গভীর নেতিবাচক প্রভাব ও আতঙ্কের সৃষ্টি করেছে।
আন্তর্জাতিক খুমি জনমিতি ও তুলনামূলক চিত্র:
খুমি জনগোষ্ঠীর বৈশ্বিক বিন্যাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বাংলাদেশ ও ভারতের তুলনায় মিয়ানমারেই এদের মূল কেন্দ্রবিন্দু অবস্থিত।
মিয়ানমার: এখানে খুমিদের (যারা মূলত খুমি চিন বা মিউ-খুমি নামে পরিচিত) জনসংখ্যা প্রায় ৬৭ হাজার থেকে ৭৩ হাজার জন। এর মধ্যে ‘মূল খুমি’ (Khumi Chin) প্রায় ৫০ হাজার থেকে ৬৭ হাজার জন এবং ‘পূর্বাঞ্চলীয় খুমি’ (Eastern Khumi) প্রায় ১৪ হাজার জন, যারা প্রধানত সামি ও মাতুপি অঞ্চলের অববাহিকায় বাস করেন। কালাদান নদীর অববাহিকায় এদের মূল বসবাস হলেও বর্তমান যুদ্ধের কারণে এই জনমিতি সম্পূর্ণ ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে এবং হাজার হাজার খুমি বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।
ভারত: ভারতের মিজোরামে স্থায়ীভাবে বসবাসকারী খুমির সংখ্যা অত্যন্ত নগণ্য। ভারত সরকার তাদের আলাদা নৃতাত্ত্বিক স্বীকৃতি না দিয়ে সামগ্রিকভাবে “কুকি-চিন” (Kuki-Chin) জনসংখ্যার অংশ বা উপদল হিসেবে গণনা করে। তবে ২০২১ সালের পর মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধের কারণে প্রায় ৬০ হাজার থেকে ১ লাখ চিন শরণার্থী মিজোরামে আশ্রয় নিয়েছেন, যার মধ্যে একটি বড় অংশ খুমি চিন। ভারত সরকার তাদের স্থায়ী নাগরিক নয়, বরং সাময়িক বা বাস্তুচ্যুত শরণার্থী হিসেবে বিবেচনা করে।
বাংলাদেশ: মাত্র ৩ হাজার ৭৮০ জনের এই ক্ষুদ্র জনসংখ্যা নিয়ে বাংলাদেশে খুমিরা একটি চরম বিপন্ন ও প্রান্তিক নৃ-গোষ্ঠী হিসেবে টিকে থাকার লড়াই করছে। যেখানে বান্দরবানের প্রভাব বিস্তারকারী মারমাদের সাথে তাদের টিকে থাকা অনেক কঠিন। মারমাদের একটি অংশ আরাকান আর্মির সমর্থক। থানচি, রুমাতে আরাকান আর্মি মারমাদের কিছু লোকের সমর্থনে আশ্রয় নেয়।
পার্বত্য চট্টগ্রামের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সমীকরণ এবং অখণ্ডতা রক্ষা ও রাষ্ট্রের জন্য নতুন হুমকি:
পার্বত্য চট্টগ্রামের ভৌগোলিক অখণ্ডতা, নিয়োজিত নিরাপত্তা বাহিনী এবং স্থানীয় বাঙালি জনগোষ্ঠীর স্থায়ী নিরাপত্তার ক্ষেত্রে দীর্ঘকাল ধরে প্রধান অন্তরায় হিসেবে কাজ করছে দেশী-বিদেশী স্বার্থান্বেষী মহলের ইন্ধনে সৃষ্ট উল্লিখিত ৬টি আঞ্চলিক সশস্ত্র সংগঠন। এদের ক্রমবর্ধমান জনবল, অত্যাধুনিক ভারী অস্ত্রের মজুত, প্রকাশ্য চাঁদাবাজি, অপহরণ, গুম এবং নৃশংস হত্যাকাণ্ডের মতো রাষ্ট্রদ্রোহী ও চরমপন্থী কার্যকলাপ ইতোমধ্যে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের জন্য এক গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিভিন্ন সময়ে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বাহিনী ও নিরীহ বাঙালি নাগরিকদের ওপর পরিচালিত বর্বরোচিত হামলা এবং পরবর্তীতে তাদের আস্তানা থেকে বিপুল পরিমাণ আধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধারের ঘটনাগুলো প্রমাণ করে যে, এই অভ্যন্তরীণ সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো দিন দিন আরও বেশি অপ্রতিরোধ্য ও মারমুখী হয়ে উঠছে।
বিশেষ করে বান্দরবান পার্বত্য জেলায় বিগত বছরগুলোতে ‘কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট’ (কেএনএফ) কর্তৃক প্রকাশ্যে ব্যাংকে সশস্ত্র ডাকাতি, রাষ্ট্রীয় পুলিশ-আনসারের ১৪টি অস্ত্র লুট এবং দেশের সার্বভৌম নিরাপত্তা রক্ষাকারীদের ওপর চোরাগোপ্তা হামলা ও মাইন বিস্ফোরণের মতো যে জঘন্য ধৃষ্টতা দেখানো হয়েছে, তা এক চরম অরাজকতার ইঙ্গিত দেয়। এই অশান্ত ও অস্থিতিশীল পরিস্থিতির মধ্যে যদি মিয়ানমার সীমান্ত থেকে আগত ‘খুমি পিপলস ফোর্স’ (KPF)-এর মতো নতুন কোনো বিদেশি ভূঁইফোড় সশস্ত্র সংগঠনকে সামান্যতম প্রশ্রয় বা কৌশলগত ছাড় দেওয়া হয়, তবে তা সমগ্র পার্বত্য অঞ্চলে এক নতুন ও অনিয়ন্ত্রণযোগ্য বহুমাত্রিক নিরাপত্তাঝুঁকি তৈরি করবে।
ভূ-রাজনৈতিক সংকট আরও ঘনীভূত হওয়ার আগেই পার্বত্য চট্টগ্রামের সার্বভৌমত্ব ও শান্তি বজায় রাখতে সমতলের আপামর জনসাধারণের তীব্র দাবি এবং সময়ের অপরিহার্য তাগিদ হলো: সেখানে অনতিবিলম্বে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বাহিনীর স্থায়ী ক্যাম্পের সংখ্যা বৃদ্ধি করা এবং সব ধরনের অবৈধ অস্ত্রধারী ও বিচ্ছিন্নতাবাদী সন্ত্রাসীদের গোড়া থেকে নির্মূল করতে একটি সমন্বিত ও কঠোর ‘সাঁড়াশি অভিযান’ পরিচালনা করা।
পার্বত্য বান্দরবান সীমান্তে খুমি পিপলস ফোর্স (KPF)-এর আবির্ভাব এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরে আরাকান আর্মির অনধিকার প্রবেশ কেবল কোনো বিচ্ছিন্ন সীমান্ত অপরাধ নয়, বরং এটি বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য এক গভীর ও দীর্ঘমেয়াদী হুমকি। এই নতুন সশস্ত্র সংগঠনগুলোর বিষয়ে বর্ণিত তথ্যাদি সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ আন্তর্জাতিক সূত্র থেকে শতভাগ যাচাই করা সম্ভব না হলেও, মাঠপর্যায়ের লক্ষণগুলো অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এই ভূ-রাজনৈতিক সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশকে অবিলম্বে ত্রিদেশীয় সীমান্তে কঠোর সামরিক নজরদারি বাড়াতে হবে, কোনো অবস্থাতেই বিদেশি সশস্ত্র গোষ্ঠীকে বাংলাদেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করতে দেওয়া যাবে না এবং কূটনৈতিক চ্যানেলে মিয়ানমারের এই অভ্যন্তরীণ সংঘাতের আঁচ যেন বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বকে স্পর্শ না করে, তা নিশ্চিত করতে হবে।
লেখক : সাবেক মানবাধিকার কর্মী, পার্বত্য চট্টগ্রাম চট্টগ্রাম।
তথ্যসূত্র:
১. যমুনা নিউজ, ২০ জুন ২০২৬, সূত্র (ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ আকসার খান ও গবেষক আলতাফ পারভেজের সাক্ষাৎকার এবং বিজিবি-কে দেওয়া কেপিএফ-এর চিঠির বিবরণ)।
২. দৈনিক নয়া দিগন্ত; ২০ এপ্রিল ২০২৫ (আরাকান আর্মি কর্তৃক থানচির রেমাক্রি মুখে সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন ও জলকেলি উৎসব সংক্রান্ত প্রতিবেদন)।
৩. বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও বিভিন্ন উৎস থেকে তথ্য।
৪. বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ; জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২২, বাংলাদেশের খুমি জনগোষ্ঠীর জনমিতিক পরিসংখ্যান)।
৫. আন্তর্জাতিক নৃ-ভাষাতাত্ত্বিক গবেষণা সংস্থা ‘জশুয়া প্রজেক্ট’ (Joshua Project) ও চিন রেজিস্ট্যান্স সোর্সেস (২০২৫-২০২৬)।















