বাজার ফান্ডের আইনি ভিত্তি ও বিদ্যমান শূন্যতা

fec-image

পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন পার্বত্য জেলায় বাণিজ্যিক বিকাশ, বেসরকারি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং স্থানীয় কর্মসংস্থান সৃষ্টির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হলো বাজার ফান্ডের জমি ও স্থাবর সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা। পার্বত্য অঞ্চলের টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নের স্বার্থেই এই ব্যবস্থার সংস্কার অপরিহার্য।

বাজার ফান্ডের আইনি ভিত্তি ও বিদ্যমান শূন্যতা :
১. পার্বত্য অঞ্চলের শহর ও গ্রামীণ বাজার এলাকার জমি বন্দোবস্ত, নিয়ন্ত্রণ এবং রাজস্ব আদায়ের মূল আইনি ভিত্তি হলো Chittagong Hill Tracts Regulation, 1900 এবং এর অধীনে ১৯৩৭ সালে প্রণীত (পরবর্তীতে সংশোধিত) বাজার ফান্ড ম্যানুয়েল’ (Bazar Fund Manual) । এই ম্যানুয়েলটিই বাজার ফান্ডের জমি ব্যবস্থাপনা ও ইজারা দেওয়ার মূল আইনি দলিল।

২. ১৯৯৭ সালের পার্বত্য শান্তি চুক্তি এবং পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন অনুযায়ী বাজার ফান্ডের সামগ্রিক দায়িত্ব জেলা পরিষদের কাছে হস্তান্তরিত হওয়ার কথা থাকলেও, বাস্তব ক্ষেত্রে এর মূল প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ জেলা প্রশাসনের (ডিসি অফিস) হাতে রয়ে গেছে বলে অভিযোগ করা হয়ে থাকে । এই প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতার কারণে বাজার ফান্ডের আধুনিকায়ন ও নীতি নির্ধারণী প্রক্রিয়া থমকে আছে।

৩. অতীতে বাজার ফান্ডের জমি দীর্ঘমেয়াদে (যেমন ৯৯ বছর) বন্দোবস্ত দেওয়া হতো, যা ব্যবসায়ীদের দীর্ঘমেয়াদি আইনি ও আর্থিক নিরাপত্তা দিত। বর্তমানে এই ইজারার মেয়াদ কমিয়ে ১০ বছর বা তার কম করায় কোনো তফসিলি ব্যাংক এই ইজারাকৃত সম্পত্তির বিপরীতে ‘ব্যাংক ঋণ’ (Bank Loan) দিতে চায় না। ফলে স্থাবর সম্পত্তি থাকা সত্ত্বেও উদ্যোক্তারা মূলধনের অভাবে ব্যবসা সম্প্রসারণ করতে পারছেন না।

৪. জমি ইজারা বা নবায়নের জন্য হেডম্যানের সুপারিশ, সার্কেল চিফের সার্টিফিকেট এবং জেলা প্রশাসকের অনুমোদন সহ এই দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা বা স্ট্যান্ডার্ড ফি সুনির্দিষ্ট নেই। ফলে প্রতিটি ধাপে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হয় এবং অনানুষ্ঠানিক আর্থিক লেনদেনের সুযোগ সৃষ্টি হয়।

৫. ইজারা প্রক্রিয়া বা খালি প্লটের তথ্য সাধারণ জনগণের কাছে সহজলভ্য নয়। ফলে প্রকৃত তরুণ উদ্যোক্তা এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের মধ্যে বিভ্রান্তি ও একধরণের প্রাতিষ্ঠানিক অবিশ্বাসের দেয়াল তৈরি হচ্ছে।

৬. আরেকটি সমস্যা হলো বাজার ফান্ড প্রশাসকের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করলে কত দিনের মধ্যে এই আপিল নিস্পত্তি করতে হবে তার সময়সীমা আইনে উল্লেখ নাই। যার ফলে এমনও আপিল রয়েছে যা ১৫-২০ বছর ধরে চলমান।

শান্তি চুক্তির সাথে বাজার ফান্ড ম্যানুয়েলের আধুনিকায়ন সংঘর্ষিক কিনা :
কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা সম্প্রদায়ের জন্য নয়, বরং পাহাড়ে বসবাসকারী উপজাতি এবং অ-উপজাতি, উভয় সম্প্রদায়ের সাধারণ মানুষের যৌথ অর্থনৈতিক মুক্তির চাবিকাঠি হতে পারে বাজার ফান্ডের সঠিক ব্যাবহার। নিন্মোক্ত কিছু বিষয় হয়তো সমাধানের দিকে এগুতে পারে।

প্রথাগত নেতৃত্ব ও অধিকার সুসংহতকরণ:
হেডম্যান ও সার্কেল চিফের মতো প্রথাগত নেতৃত্বকে একটি ডিজিটাল ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় যুক্ত করার মাধ্যমে তাদের প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনি মর্যাদা আরও সুদৃঢ় হবে।

অ-উপজাতি ব্যবসায়ীদের বিনিয়োগ নিরাপত্তা:
পার্বত্য অঞ্চলের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি স্থানীয় বাঙালী ব্যবসায়ী সম্প্রদায়, যারা বংশপরম্পরায় এখানকার বাণিজ্যের সাথে যুক্ত।

দীর্ঘমেয়াদি ইজারা নিশ্চিত হলে তারা আইনি নিরাপত্তা পাবেন, এছাড়াও ব্যাংক গুলো ঋণ প্রদানে আগ্রহী হবে যা পাহাড়ে বড় ধরনের স্থায়ী বিনিয়োগে ব্যবসায়ীদের উৎসাহিত করবে।

সুনির্দিষ্ট সংস্কার প্রস্তাবনা – The Reform Proposals:
পার্বত্য অঞ্চলের বাজার ফান্ড ব্যবস্থাকে যুগোপযোগী ও ব্যবসাবান্ধব করতে নিম্নোক্ত আইনি ও প্রশাসনিক সংস্কারগুলো গ্রহণ করা প্রয়োজন-

বাণিজ্যিক ইজারার মেয়াদ যৌক্তিকীকরণ:
বাজার ফান্ডের বাণিজ্যিক ও শিল্প ইজারার মেয়াদ বর্তমানের স্বল্পমেয়াদ থেকে বৃদ্ধি করে ন্যূনতম ২০ থেকে ৩০ বছর করা অত্যন্ত জরুরি।

দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিশ্চিত হলে ব্যাংকগুলো নির্দ্বিধায় প্রকল্প ঋণ (Project Loan) প্রদান করবে এবং বিনিয়োগ সুরক্ষিত হবে।

ডিজিটালাইজেশন ও ওয়ান-স্টপ সার্ভিস (One-Stop Service) :

আবেদন প্রক্রিয়া থেকে শুরু করে ফি প্রদান এবং চূড়ান্ত অনুমোদন সহ সবকিছু অনলাইনের আওতাভুক্ত করে ট্র্যাকযোগ্য করতে হবে।

অনলাইনে খালি প্লটের তথ্য উন্মুক্ত থাকলে দুর্নীতি ও অতিরিক্ত অনানুষ্ঠানিক ফি নেওয়ার সুযোগ চিরতরে বন্ধ হবে।

নির্দিষ্ট ফি এবং সময়সীমা (Time-Bound Process) নির্ধারণ:
হেডম্যান, সার্কেল চিফ এবং ডিসি অফিসের প্রতিটি প্রশাসনিক অনুমোদনের জন্য একটি নির্দিষ্ট সরকারি ফি এবং সর্বোচ্চ সময়সীমা (যেমন: সর্বোচ্চ ৩০ কার্যদিবস) আইনিভাবে সুনির্দিষ্ট করতে হবে।

আপিল নিস্পত্তির ক্ষেত্রে সময়সীমা থাকতে হবে।

স্থানীয় স্থায়ী বাসিন্দা ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের অগ্রাধিকার:
পার্বত্য অঞ্চলের ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা (SMEs) এবং স্থানীয় স্থায়ী বাসিন্দাদের অর্থনৈতিক সুরক্ষায় ইজারা প্রক্রিয়ায় অগ্রাধিকার নীতি প্রবর্তন করা যেতে পারে।

তবে আমার মতে, একই প্লটের জন্য একাধিক আবেদন বা একাধিক যোগ্য দাবিদার থাকলে অনলাইনে স্বচ্ছ লটারির মাধ্যমে ইজারা দেয়া যেতে পারে।

প্রত্যাশিত ফলাফল (Expected Outcomes) :
একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক এবং আধুনিক বাজার ফান্ড নীতিমালা পার্বত্য চট্টগ্রামের অর্থনীতিতে যুগান্তকারী বিপ্লব ঘটাতে পারে।

ব্যাংক ঋণের সুবিধা নিশ্চিত হলে পাহাড়ে বড় বড় শিল্প, ক্ষুদ্র ও মাঝারি কুটির শিল্প এবং আধুনিক পর্যটন খাতের বিকাশ ঘটবে, যা স্থানীয় বেকারত্ব দূরীকরণে বিশাল ভূমিকা রাখবে।

আইনি সংস্কারের মাধ্যমে বাজার ফান্ডের জটিলতা দূর করা গেলে তা কেবল পাহাড়ের শান্তিশৃঙ্খলাই রক্ষা করবে না, বরং সমগ্র বাংলাদেশের অর্থনীতিতে পার্বত্য অঞ্চলকে একটি নতুন ‘ইকোনমিক হাব’ (Economic Hub) হিসেবে প্রতিষ্ঠা করবে।

লেখক : আইনজীবী

Print Friendly, PDF & Email
ঘটনাপ্রবাহ: প্রবন্ধ
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও পড়ুন