রবীন্দ্রনাথের জাতীয়তাবাদী চেতনা অখণ্ড ভারতীয় চেতনা


আজ ২৫শে বৈশাখ, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মজয়ন্তী। বাংলাদেশ, ভারত ও বিশ্বের সকল বাঙালি জনগোষ্ঠী কবিগুরুর এই জন্মদিনকে শ্রদ্ধা ও উৎসবের সাথে স্মরণ করে থাকে। বাংলা ভাষার আধুনিকায়ন, বিশেষ করে বাংলা গদ্য সাহিত্যের শ্রুতি মধুরতা ও ব্যবহারিক রূপ আনায়নে রবীন্দ্র সাহিত্যের ব্যাপক ভূমিকা রয়েছে। সে কারণে বাংলা ভাষা ও বাংলাভাষীরা রবীন্দ্রনাথের কাছে চিরঋণী।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কাজী নজরুল ইসলাম বাংলা ভাষার দুই প্রধান কবি। বাংলা ভাষাকে একটা সমৃদ্ধ, শক্তিশালী ও মৌলিক ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার ক্ষেত্রে এই দুই কবি প্রধান ভূমিকা রেখেছেন। এই দুইজনে মিলে বাংলা ভাষাকে অন্তত দুই শতাব্দী এগিয়ে দিয়েছেন। আমি নিজে সাহিত্যের ছাত্র। একাডেমিক কারণে এবং সাহিত্যচর্চার কারণে তাদেরকে মোটামুটি পড়তে হয়েছে। দুজনেই আমার অত্যন্ত প্রিয় কবি। তবে আমি নজরুল প্রেমী। কিন্তু তাই বলে নজরুলের শ্রীকৃষ্ণ মহিমা বর্ণনাকারী কীর্তন, ভজনগুলো ধারণ করি না। সাহিত্যের জন্য, একাডেমিক কারণে এগুলো পড়েছি। কিন্তু এগুলোর চেতনা ধারণ করিনা। একজন মুসলিমের আত্মিক শক্তি কখনোই শিব, কালী, দুর্গা, কৃষ্ণ বা এদের উপমা থেকে আসতে পারে না।
কেননা ইসলামের বিশ্বাস অনুযায়ী এগুলো সরাসরি শিরক। একই কথা রবীন্দ্রনাথের বেলায়ও খাটে। রবীন্দ্রনাথের প্রেমের কবিতা আমার খুব পছন্দের এবং মাঝে মাঝেই শুনি। ইচ্ছায় ও অনিচ্ছায় মনের মাঝে গুঞ্জরিত হয়। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের পূজার কবিতা এবং দেশপ্রেমের কবিতা যেগুলোতে পৌত্তলিক উপমা, অলংকার ও রূপক ব্যবহার করা হয়েছে সেগুলো বর্জন করে চলি। কিন্তু আমাদের দেশে রবীন্দ্রনাথের অনেক পূজা পর্বের কবিতাকে দেশপ্রেমের কবিতা বা প্রেমের কবিতা বলে চালিয়ে দেয়া হয়। ফলে নিজের অজান্তে অনেক সময় আমরা শিরকে জড়িয়ে পড়ি। যেমন,
আজি বাংলাদেশের হৃদয় হতে কখন আপনি, এই অপরূপ রূপে বাহির হলে জননী- এই কবিতাটি অনেকেই দেশপ্রেমের কবিতা হিসেবে গেয়ে থাকে। কিন্তু বাস্তবে এটি শারদীয় দুর্গাপূজার আবাহন সংগীত। সংগীত রচনার ইতিহাস পড়লে সহজেই বোঝা যায়। কিংবা এর পরের লাইনগুলো বিষয়টি আরো স্পষ্ট করে দেবে। যেখানে বলা হয়েছে,
ডান হাতে তোর খড়গ জ্বলে বাঁ হাত করে শঙ্কা হরণ, দুই নেত্রে স্নেহের হাসি, ললাট নেত্রে আগুন বরণ।
অন্যদিকে রবীন্দ্রনাথের যে জাতীয়তাবাদী চেতনা সেটি সর্বভারতীয় জাতীয়তাবাদী চেতনা। তিনি ‘একধর্মরাজ্যপাশে খণ্ড ছিন্ন বিক্ষিপ্ত ভারত বেঁধে’ দিতে সংকল্প করেছেন কিম্বা “একধর্মরাজ্য হবে এ ভারতে মহাবচন করিব সম্বল।” এটাই তার রাজনৈতিক ও জাতীয়তাবাদী চেতনা। এটা বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের সম্পূর্ণ বিপরীত অবস্থান। সার্বভৌম বাংলাদেশের বিপরীত।
পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি জয়লাভের পর পরবর্তী মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে আজ শুভেন্দু অধিকারীর নাম ঘোষণার পর ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বলেন, ‘‘গঙ্গোত্রী থেকে গঙ্গাসাগর পর্যন্ত সর্বত্র বিজেপি-র সরকার গঠিত হল। শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের জন্মভূমিতে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের আদর্শের অনুসারী সরকার তৈরি হয়েছে।’’ আজকের বিজেপির ফাউন্ডিং ফাদার শ্রী শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী। সে কারণে বিজেপির এই বিজয়কে তাদের কর্মীরা বাংলায় হিন্দুত্ববাদের পুনরুজ্জীবন, জাগরণ বা পুনরুত্থান বলে গর্বের সাথে দাবি করছে। তাদের মতে, আধুনিককালে সর্বভারতীয় হিন্দুত্ববাদের জন্মভূমি এই বাংলা। বলা হচ্ছে, এটি ছিল ঔপনিবেশিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে শাক্তদের এক স্বতঃস্ফূর্ত ও তীব্র প্রতিক্রিয়া, যা ১৮৬৬ থেকে ১৯০৯ সালের মধ্যে শ্রী অরবিন্দ এবং বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের মতো বাঙালি বুদ্ধিজীবী, বিপ্লবী এবং ঋষিদের দ্বারা নির্মিত হয়েছিল।
আমরা যদি ইতিহাসের দিকে তাকাই তাহলে তাদের এই দাবি খুব বেশি অস্বীকার করার সুযোগ নেই। শিল্প সাহিত্যে যেমন ঈশ্বর গুপ্ত, বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ, এমনকি শরৎচন্দ্র বাঙালির জনমনে হিন্দুত্ববাদী চেতনার বীজ বপন করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ ও শরৎচন্দ্র ছিলেন বঙ্কিমচন্দ্রের পোলিশড ভার্সন। বঙ্কিমচন্দ্রের ‘ত্বং হি দুর্গা দশপ্রহরণধারিণী কমলা কমল-দলবিহারিণীর’ সাথে রবীন্দ্রনাথের ‘শ্যামল বরন কোমল মূর্তির’ লক্ষ্যগত কোন পার্থক্য নেই। কিম্বূ রবীন্দ্রনাথের,
হে চিরসারথি, তব রথচক্রে মুখরিত পথ দিনরাত্রি।দারুণ বিপ্লব-মাঝে তব শঙ্খধ্বনি বাজে,সঙ্কটদুঃখত্রাতা।জনগণপথপরিচায়ক জয় হে ভারতভাগ্যবিধাতা!…ঘোরতিমিরঘন নিবিড় নিশীথে পীড়িত মূর্ছিত দেশে,জাগ্রত ছিল তব অবিচল মঙ্গল নতনয়ন অনিমেষে।দুঃস্বপ্নে আতঙ্কে রক্ষা করিলে অঙ্কে,স্নেহময়ী তুমি মাতা।জনগণদুঃখত্রায়ক জয় হে ভারতভাগ্যবিধাতা!জয় হে, জয় হে, জয় হে, জয় জয় জয়, জয় হে ॥
এটি বঙ্কিমের বন্দে মাতরমের রবীন্দ্র ভার্সন। রবীন্দ্রনাথ ‘এক ধর্মরাজ্যপাশে খণ্ড ছিন্ন বিক্ষিপ্ত ভারতকে বেঁধে দেয়ার’ যে সংকল্প করেছিলেন, ‘মহাভারত একধর্মরাজ্য হবে’ বলে যে মহাবচন দিয়েছিলেন, বিজেপি বাংলার বিজয়কে সেই মহাবচনের, সংকল্পের বাস্তবায়ন হিসেবে দেখছে। সে কারণে এই মহাকবির জন্মজয়ন্তী ২৫ শে বৈশাখে শপথ নেওয়ার দিন হিসেবে বেছে নিয়েছে। এগুলো কাকতালীয় নয়। যদিও মমতার পদত্যাগ জটিলতার কারণে শপথের দিনটি পেছাতে হয়েছে শেষ পর্যন্ত।
বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিককার হিন্দুত্ববাদীদের বলা ভালো বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনকারীদের উৎসাহ যুগিয়েছে রবীন্দ্রনাথের কবিতা ‘বাংলার মাটি বাংলার জল, বাংলার ফুল বাংলার ফল, এক হোক, এক হোক, এক হোক, হে ভগবান।’ অথচ সেদিন যারা ভগবানের কাছে প্রার্থনা করে বাঙালির হাতে রাখি বেঁধে গাইলো, বাঙালির প্রাণ, বাঙালির মন, বাঙালির ঘরে যত ভাই বোন, এক হউক, এক হউক, এক হউক হে ভগবান॥’ ১৯৪৬-এ এসে সেই বাংলা ভাগ করার জন্য তারা বললো, ‘If India wants her bloodbath, she shall have it.'( এম কে গান্ধী)। যে শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি ১১ ফেব্রুয়ারি ১৯৪১ সালে বললেন, মুসলিমরা যদি ভারতবর্ষের বিভাজন চায় তবে ভারতের সকল মুসলিমদের উচিত তাদের তল্পিতল্পা গুটিয়ে পাকিস্তান চলে যাওয়া। তিনিই আবার ১৯৪৭ সালের মে মাসে লর্ড মাউন্টব্যাটেনকে উদ্দেশ্য করে একটি চিঠিতে লেখেন, ভারত ভাগ না হলেও বাংলাকে অবশ্যই ভাগ করতে হবে। এ কারণেই শরৎ বসু প্রমুখের চেষ্টা বৃথা হয়ে যায়।
তবে তাই বলে রবীন্দ্রনাথের প্রতি আমার কোন বিদ্বেষ নেই। আমি আমার সাহিত্য ও কবিতায় তার অবদানকে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করি এবং তার জন্ম ও মৃত্যু দিবসকে শ্রদ্ধার সাথে পালন করি।
মরা গাঙে বান এলে বাঙালি হিন্দুরা নজরুল থেকে ‘জয় মা’ বলে তরী ভাসাবে। আর মুসলিম দাঁড়ি, মাঝি-মাল্লাগণ তরী ভাসাতে একই নজরুল থেকেই সারি গান গাইবে’ লা শারিক আল্লাহ’। এভাবেই বাঙ্গালী হিন্দু ও বাঙালি মুসলিম এক গাঙে এক নজরুলের গান গেয়ে তরী ভাসাবে বুকে রবীন্দ্রনাথের প্রেম নিয়ে,
নিস্তরঙ্গ তটিনীর জনশূন্য তীরে
নিঃশব্দে নামিল আসি সায়াহ্নচ্ছায়ায়
নিস্তব্ধ গগনপ্রান্ত নির্বাক্ ধরায়।
সেইক্ষণে বাতায়নে নীরব নির্জন
আমাদের দুজনের প্রথম চুম্বন।
লেখকঃ সিনিয়র সাংবাদিক, গবেষক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক, সম্পাদক পার্বত্যনিউজ।

















