চট্টগ্রামে উদ্ধারে সেনাবাহিনী

পাহাড়ি ঢল ও টানা বৃষ্টির কারণে বিভিন্ন স্থানে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি

fec-image

পাহাড়ি ঢল ও টানা বৃষ্টির কারণে বিভিন্ন স্থানে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। কয়েক লাখ মানুষ পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছে। রাঙামাটি, বান্দরবান, খাগড়াছড়িসহ কক্সবাজারে বিরাজ করছে পাহাড়ধস আতঙ্ক।

রাঙামাটি : রাঙামাটিতে পানিবন্দি হয়ে পড়েছে কয়েক হাজার মানুষ। প্লাবিত হয়েছে রাঙামাটি, বাঘাইছড়ির প্রায় ৩০ গ্রাম। ডুবেছে লংগদু ও সদর উপজেলার মাগবান ইউনিয়ন। টানা বৃষ্টিতে পাহাড়ি ঢলে ডুবে গেছে সড়ক, হাটবাজার, দোকানপাট, বিদ্যালয়, কলেজ, গবাদি পশুর খামার ও ফসলি জমি। ডুবে আছে স্থানীয়দের ঘরবাড়ি। বিশুদ্ধ পানি ও খাদ্যসংকটে মানবেতর দিন পার করছে পানিবন্দি উপজেলাবাসী।

বান্দরবান : টানা কয়েক দিনের অতি ভারী বর্ষণের পর গতকাল সকালে বান্দরবানে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হতে শুরু করেছে। কমছে জেলার নিম্নাঞ্চলের পানি। বিকালে দেখা গেছে, জেলা শহরের মেম্বারপাড়া, বালাঘাটা, কালাঘাটা, ইসলামপুর, হাফেজঘোনা, ক্যাচিংঘাটাসহ বিভিন্ন এলাকার পানি কমে গেছে। তবে আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে এখনো ক্ষতিগ্রস্তরা অবস্থান করছে। বান্দরবানের জেলা প্রশাসক সানিউল ফেরদৌস জানান, সরকার প্রাথমিকভাবে জেলার বন্যাদুর্গতদের জন্য ৪০০ মেট্রিক টন খাদ্যশস্য বরাদ্দ দিয়েছে। ২২০ আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রিতদের মধ্যে প্রশাসন, সেনাবাহিনী ও বিজিবির পক্ষ থেকে রান্না করা খাবার ও বিশুদ্ধ পানি বিতরণ করা হচ্ছে।

কক্সবাজার : টানা ভারী বৃষ্টি, আকস্মিক বন্যা ও পাহাড় ধসে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পের মানবিক পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। ৪ জুলাই রাত থেকে ৯ জুলাই দুপুর পর্যন্ত পাহাড় ধসে ১৫ জন রোহিঙ্গার মৃত্যু হয়েছে এবং ১৮ জন আহত হয়েছে। এ ঘটনায় ২৬ হাজার ১১৯ জন ক্ষতিগ্রস্ত এবং ৪ হাজার ৩০৭ জন সাময়িক বাস্তচ্যুত হয়েছে। আরও ধসের আশঙ্কায় তীব্র আতঙ্ক বিরাজ করছে।

জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআরের বাংলাদেশ প্রতিনিধি ইভো ফ্রেইসেন বিবৃতিতে বলেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে এ পর্যন্ত ২৮৬টি আবহাওয়াজনিত দুর্ঘটনা ঘটেছে। যার মধ্যে রয়েছে ৯৫টি ভূমিধস, ১৫৬টি ঝোড়ো হাওয়া ও ২১টি বন্যার ঘটনা। টানা বৃষ্টিতে ২ হাজার ৮০৯টি আশ্রয় আংশিক ও ১৩টি আশ্রয় সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পাশাপাশি শিক্ষাকেন্দ্র, স্বাস্থ্যসেবা, পানি, স্যানিটেশন অবকাঠামোসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাও ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মানবিক সংস্থাগুলো সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করে উদ্ধার, নিরাপদ স্থানে স্থানান্তর, খাদ্য, চিকিৎসা, আশ্রয় ও অন্যান্য জরুরি সহায়তা প্রদান অব্যাহত রেখেছে।

এদিকে টানা ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে কক্সবাজারে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। জেলার অন্তত ৪০টি ইউনিয়নের ২ শতাধিক গ্রাম প্লাবিত হয়ে ৬ লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। এদিকে জেলার প্রধান দুই নদী বাঁকখালী ও মাতামুহুরীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। টানা বৃষ্টি ও পাহাড় ধসের ঘটনায় গত চার দিনে জেলায় অন্তত ২২ জনের মৃত্যু হয়েছ। অধিকাংশ উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে বিচ্ছিন্ন সড়ক যোগাযোগ, বন্ধ গুরুত্বপূর্ণ সব নৌপথ। জানা গেছে, কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার বরইতলী ইউনিয়নের রসুলাবাদ এলাকায় বন্যার পানি থেকে বাঁচতে নিরাপদ স্থানে যাওয়ার পথে গতকাল নৌকা ডুবে হাসনাতুল জন্নাত ঝর্ণা (১০) ও জেরিন (৭) নামে দুই বোনের মৃত্যু হয়েছে।

চট্টগ্রাম : বাঁশখালী উপজেলার বাহারছড়া ইউনিয়নে পাহাড়ি ঢলে ভেসে গিয়ে গতকাল মারা গেছে মিরাজ (৫) ও আশিক (৬) নামে দুই শিশু। এদিকে চট্টগ্রামে ১০ লাখের বেশি মানুষ পানিবন্দি হয়ে আছে। তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে বিশুদ্ধ পানি ও খাবারের। বন্যা, জলাবদ্ধতা ও পাহাড় ধসে তিন দিনে নারী-শিশুসহ আটজনের মৃত্যু হয়েছে। অনেকের গৃহপালিত পশু, পুকুরের মাছ, খামার ভেসে গেছে পানিতে। বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের তথ্যানুযায়ী, মৌসুমি বায়ু ও উজানের ঢলে দেশের দক্ষিণ-পূর্ব ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে। এর মধ্যে চট্টগ্রামের সাঙ্গু নদের বান্দরবান পয়েন্টে ৯৫ ও দোহাজারী পয়েন্টে ২৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে। এ ছাড়া মাতামুহুরী নদীর লামা পয়েন্টে ৪৭ ও চিরিঙ্গা পয়েন্টে ৩২ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

চট্টগ্রামে সেনা মোতায়েন :
চট্টগ্রাম জেলায় ভারী বৃষ্টিপাত ও পাহাড়ি ঢলের কারণে সৃষ্ট আকস্মিক বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তার জন্য ‘ইন এইড টু সিভিল পাওয়ার’-এর আওতায় সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের জরুরি অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ১০ পদাতিক ডিভিশন ও ২৪ পদাতিক ডিভিশন বন্যাদুর্গত বিভিন্ন উপজেলায় অনুসন্ধান, উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা করছে। গতকাল রাতে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর)-এর এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

এতে বলা হয়, টানা ভারী বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে চট্টগ্রামের লোহাগাড়া, সাতকানিয়া, চন্দনাইশ ও বাঁশখালী এ চারটি উপজেলা ব্যাপকভাবে প্লাবিত হয়েছে। এর ফলে এসব এলাকার প্রায় ৪ লাখ মানুষ চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ও পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। উদ্ভূত এই সংকটময় পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ১০ পদাতিক ডিভিশন কর্তৃক দুর্গত এলাকায় জরুরি ভিত্তিতে উদ্ধারকারী দল ও প্রয়োজনীয় আনুষঙ্গিক সরঞ্জামাদি মোতায়েন করা হয়েছে। এ ছাড়া ভারী মৌসুমি বৃষ্টিপাতের ফলে চট্টগ্রামের বোয়ালখালী, হাটহাজারী ও ফটিকছড়ি উপজেলাতেও ভয়াবহ বন্যা দেখা দিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে জরুরি উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ওই উপজেলাগুলোতে ২৪ পদাতিক ডিভিশনের সেনাসদস্যদের মোতায়েন করা হয়েছে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী এ অঞ্চলগুলোতে আটকে পড়া মানুষদের জন্য নিরলসভাবে অনুসন্ধান ও উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

উদ্ধার অভিযান ও ত্রাণ কার্যক্রম দ্রুত এবং সুশৃঙ্খলভাবে সম্পন্ন করার লক্ষ্যে ২৪ পদাতিক ডিভিশন ইতোমধ্যে বন্যাদুর্গত এলাকায় ৩টি ক্যাম্প স্থাপন করেছে।

আইএসপিআরের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আরও উল্লেখ করা হয়, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী বরাবরের মতোই দেশের যেকোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগে বেসামরিক প্রশাসনের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সাধারণ মানুষের জানমাল রক্ষায় বদ্ধপরিকর। দুর্গত এলাকার মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং সার্বিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত সেনাবাহিনীর এ কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।

Print Friendly, PDF & Email
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও পড়ুন