‘বৈসাবি’ ও বাংলা নববর্ষকে ঘিরে পাহাড় সেজেছে বর্ণিল রূপে
আরিফুল হক মাহবুব, কাউখালী ॥
পাহাড়ী সম্প্রদায়ের প্রধান সামাজিক উৎসব বৈ-সা-বি ও বাংলা নববর্ষ বরণকে ঘিরে তিন পার্বত্য জেলা এখন উৎসবের নগরীতে রূপ নিয়েছে। প্রতিটি এলাকা সেজেছে বর্ণিলরূপে। অন্যান্য বছরের মত এবারও বেশ আনন্দমুখর পরিবেশে বৈ-সা-বি ও বাংলা নববর্ষ পালনের জন্য বিস্তারিত অনুষ্ঠান মালার উয়োজন করতে যাচ্ছে সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলো। পাহাড়ের ক্ষুদ্র জাতি সত্ত্বগুলো তাদের ধর্মীয় আদর্শে এ উৎসব পালন করবে। এ উপলক্ষে বৃহস্পতিবার সকাল দশটায় কাউখালীর ঘাগড়ায় আয়োজন করা হয়েছে বর্ণাঢ্য র্যালীর।
তিন পার্বত্য জেলায় ১১টি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সম্প্রদায়ের লোকজনের বসবাস। একেক সম্প্রদায়ের লোকজন বৈ-সা-বিকে একেক নামে ভিন্ন ভিন্ন অঙ্গীকে পালন করে থাকে। এদের মধ্যে চাকমা ও তঞ্চংগ্যা সম্প্রদায় এই উৎসবকে বিঝু উৎসব নামে, মারমা সম্প্রদায় সাংগ্রাই, ত্রিপুরা ও উসুইরা বৈইসুক বা বৈইসু, ম্রো ও খুমী সম্প্রদায় ক্লবং প্লাই নামে এই উৎসব পালন করে থাকে। বৈ-সা-বিতে ঈদ বা পূঁজার মত পাহাড়ী সম্প্রদায় নতুন জামা কাপড় কিনে থাকে। নতুন নতুন জামা কাপড় পরে পাড়া বা এলাকাতে বেড়াতে বের হয়। প্রতি বছর অন্তত সাতটি বাড়িতে বিজুর তৈরী খাবার খেলে অনেকের ধারণা নিজের স্বাস্থ্যের ভালো এবং মঙ্গল হয়।
বিঝুঃ চৈত্রের শেষ দু’দিন আর পহেলা বৈশাখ এই তিনদিন চাকমারা মহাসমারোহে “বিঝু” উৎসব পালন করে থাকে। প্রতি বছরই চাকমা জনপদে একটি পাখির ‘বিঝু, বিঝু’ ডাকে সবাইকে বিঝু উৎসবের আগমনী বার্তা জানিয়ে দেয়া হয় বলে তাদের ধারণা। এর পরপরই সবাই তিন দিনব্যাপী উৎসবের প্রস্তুতি গ্রহণ করতে থাকে। প্রথম দিনকে “ফুল বিঝু”, দ্বিতীয় দিনকে “মূল বিঝু” এবং শেষ দিনকে “গোজ্যাই পোজ্যা” দিন হিসেবে পালন করা হয়। এই তিনদিনে চাকমারা কোন প্রাণী হত্যা করে না। বিঝু উৎসরেবর জন্য প্রতিটি ঘরে ঘরে থাকে বিশেষ পানীয় জলের ব্যবস্থা। সে সঙ্গে মুখরোচক খাবার তৈরীর জন্য নানা রকমের শাক সবজি, তরিতরকারি, সুটকি জাতিয় মাছ সংগ্রহ করে ঘরে রাখা হয়।
ফুল বিঝুঃ চৈত্রের শেষ দু’দিনের প্রথম দিনটিকে চাকমা সম্প্রদায় ফুল বিঝু হিসেবে পালন করে। এদিন সবাই খুব ভোরে উঠে নদী কিংবা ঝর্ণাতে গিয়ে গোসল করে। বাড়ির ছেলে মেয়েরা পাহাড় ও নার্সারী থেকে ফুল ও পাতা সংগ্রহ করে নিজ নিজ ঘর সাজায়। নদীর ঘাটে গিয়ে গঙ্গা বা জলদেবীর উদ্দেশ্যে ফুল দিয়ে পূজা করা, সকলে মিলে বুদ্ধ মূর্তিকে স্নান করানো, নদী থেকে পানি সংগ্রহ করে বড়-বুড়িদের গোসল করিয়ে যুবক-যুবতীরা আশির্বাদ গ্রহণ করে। রাতে প্রদীপ পূজা, ঘরের আঙ্গীনায়, গোয়াল, ঢেঁকিঘরে নদী বা কুঁয়ার পাড়ে সারি সারি প্রদ্বীপ জ্বালিয়ে সমস্ত গ্রামকে উৎসবের আলোতে উদ্ভাসিত করে রাখা হয়।
মূল বিঝুঃ চৈত্রের শেষ দিনকে মূল বিঝু হিসেবে পালন করা হয়। এটাই হচ্ছে মূল উৎসব। এই দিনে সবার ঘরে অন্তত পাঁচ পদের তরিতরকারী মিলিয়ে বিশেষ ধরণের “পাঁচন” রান্না করা হয়। এছাড়া বিভিন্ন ধরণের পিঠা, তিলের নাড়ু, বিন্নি ধানের খৈ ও মিষ্টি তৈরী করা হয়। এর পাশাপাশি অতিথিদের মদও পরিবেশন করা হয়। চাকমা যুবতী মেয়েরা তাদের কোমরে তাদের বোনা রাঙ্গা খাদি এদিন বুকে জড়িয়ে পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে বেড়ায়। তাছাড়া যুবক-যুবতীরা এক সঙ্গে ঘিলা, পোত্তি (বউচি) প্রভৃতি খেলায় মেতে ওঠে।
গোজ্যাই পোজ্যাঃ নতুন বছরের প্রথম দিন অর্থাৎ পহেলা বৈশাখাককে চাকমারা গোজ্যাই পোজ্যা দিন হিসেবে পালন করে থাকে। তিনদিন ব্যাপী বিঝু উৎসবের এটিই শেষ দিন। গোজ্যাই পোজ্যা অর্থ গড়াগড়ি খাওয়া। অতিতে এদিনে চাকমারা পেট পুরে ভোজন করতো, প্রচুর মদও পান করত। তাই ভোজন শেষে সবাই বিশ্রাম নিতো কিংবা গড়াগড়ি দিতো। বছরের এই প্রথম দিনটি ভাল খাওয়া-দাওয়া শেষে হাসি গল্পে কাটাতে পারলে বছরে বাকী দিনগুলো ভালো যাবে- এটাই সবার বিশ্বাস।
সাংগ্রাইঃ মারমা সম্প্রদায় চারদিন ধরে সাংগ্রাই উৎসব পালন করে থাকে। পুরনো বছরের শেষ তিন দিন এবং নতুন বছরের প্রথম দিনই “সাংগ্রাই” উৎসবের দিন হিসেবে গুরুত্ব পেয়ে থাকে। পুরনো বছরের শেষ তিনদিনের প্রথম দিন নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবাই মিছিল করে বৌদ্ধ মূর্তিগুলোকে নদীর ঘাটে নিয়ে যায়। ভেলা তৈরী করে মূর্তিগুলোকে সেখানে বসিয়ে চন্দন বা দুধ ও ডাবের পানিতে বুদ্ধকে স্নান করানো হয়। এরপর সেগুলোকে বিহারের বুদ্ধ আসনে বসানো হয়। পরের দু’দিন মারমা জনপদে নেসে আসে আনন্দের বন্যা। এ দু’দিন পাড়ায় পাড়ায় চলে ঐতিহ্যবাহী পানি খেলা ও হাতের তৈরী পিঠা উসব। আনন্দের অতিশয্যে একে অপরকে পানি ছিটিয়ে পুরনো বছরের ব্যর্থতা, গ্লানি ও দুঃখকে ধুয়ে মুছে দেয়।
এ উপলক্ষে রাঙামাটি ও কক্সবাজারে রাখাইন সম্প্রদায়ের যুবক-যুবতীরা বড় বড় প্যান্ডেল তৈরি করে তার নিচে নৌকা ভর্তি রঙিন পানি নিয়ে ঐতিহ্যবাহী পানি খেলায় মেতে ওঠে। সবাই নৌকা থেকে পানি নিয়ে একে অপরের গায়ে ছিটিয়ে দিয়ে আনন্দ প্রকাশ করে এবং পুরনো বছরকে বিদায় জানায়। এছাড়া বৌদ্ধ মন্দিরে গিয়ে ধর্ম-কর্মে লিপ্ত হয়ে পুরনো বছরের সকল ব্যর্থতাকে দূর করে নতুন বছর নতুন উৎসাহ-উদ্দীপনা নিয়ে জীবন সংগ্রামে সাফল্য অর্জনের উদ্দেশ্যে প্রার্থনা জানায়। এসময় তারা বয়স্ক আত্মীয়-স্বজন ও পাড়া প্রতিবেশীদের আনুষ্ঠানিকভাবে স্নান করায়।
বৈসুক/বৈইসুঃ ত্রিপুরা সম্প্রদায় বেইসুক উৎসবের মাধ্যমে পুরনো বছরকে বিদায় এবং নতুন বছরকে স্বাগত জানায়। এ উৎসবে হাসি আনন্দ এবং নৃত্যগীতের পাশাপাশি শিবের আশির্বাদ কামনা করা হয়। ত্রিপুরা সম্প্রদায় তিন পর্বে বৈইসুক উৎসব পালন করে।
(ক) হারি বৈইসুকঃ এ দিনটি তারা চৈত্র সংক্রান্তির আগের দিন পালন করে থাকে। এদিন প্রতিটি ত্রিপুরা গৃহস্থ পরিবারেই গবাদি পশুর গোসলের আয়োজন করা হয় এবং বিভিন্ন ফুলের মালা দিয়ে তাদের সাজিয়ে রাখা হয়। খুব সকালে নদীর ঘাটে গিয়ে দেবতার উদ্দেশ্যে ফুল দিয়ে আসা ত্রিপুরা সমাজের প্রচলিত রেওয়াজ।
(খ) বিসুমাঃ চৈত্র সংক্রান্তির দিনকেই তারা বিসুমা দিবাস হিসেবে পালন করে থাকে। এদিন বিশেষ ধরনের “কচুই” বা বিশুদ্ধ পানি দিয়ে ঘর দুয়ার ধুয়ে পবিত্র করা হয়। প্রত্যেকের বাড়িতে বিভিন্ন ধরণের পিঠা তৈরী হয়। পাশাপাশি এদিন মুখরোচক খাদ্য হিসেবে বিশেষ ধরণের তরকারি “পাঁচন” রান্না করা হয়। অতিথিদের এসব পিঠা, পাঁচন ও মদ দিয়ে আপ্যায়ন করা হয়। বছরের এ শেষ দিনটিতে সবাই রাগ, অভিমান, হিংসা, ক্ষোভ বিসর্জন দিয়ে পরস্পরের প্রতি আন্তরিকতা প্রদর্শন করে।
(গ) বিসিকাতালঃ নববর্ষের প্রথম দিনকে ত্রিপুরা সমাজ বিসিকাতাল নামে পালন করে থাকে। এদিন ঘরে ঘরে নতুন বছরকে স্বাগত জানানোর উৎসব আয়োজন করা হয়। ত্রিপুরা নব দম্পতি ও যুবক-যুবতীরা নদী থেকে কলসী ভর্তি পানি তুলে গুরুজনদের গোসল করিয়ে আশির্বাদ গ্রহণ করে। নতুন বছরটি যাতে সবার জীবনে মঙ্গল বয়ে আনে সেজন্য বিভিন্ন দেবতার আরাধনা করা হয়। এ উৎসব চলাকালে তিন থেকে সাতদিন পর্যন্ত পাড়ায় পাড়ায় ত্রিপুরা শিল্পিরা ঐতিহ্যবাহী গরায় নৃত্য পরিবেশন করে।
ক্লবং প্লাইঃ ম্রো সম্প্রদায় বেশ ঘটা করে চৈত্র সংক্রান্তি ও পহেলা বৈশাখ আনন্দ উৎসবের মাধ্যমে পালন করে থাকে। এ উৎসব “ক্লবং প্লাই” নামে ম্রো সমাজে বেশ জনপ্রিয়। চৈত্র মাসের শেষ তিনদিন তারা ফুল পূজা করে। বনের বিচিত্র ধরণের ফুল এনে তারা বাড়ি ঘর সাজায় এবং নিজেরাও সাজে। পহেলা বৈশাখে বুড়ো-বুড়িদের স্নান করানো হয় এবং পাঁচন রান্না করে সবাইকে আপ্যায়ন করে। তারা প্রধানত হাঙর মাছের শুটকি দিয়ে পাঁচন রান্না করে। এদিনে তারা কোন প্রাণী হত্যা করেনা। দিন-রাত পাড়ায় পাড়ায় আনন্দ উল্লাসে মেতে ওঠে। যুবতীরা দাঁতে প্রাকৃতিক লং লাগিয়ে খোপায় বনো ফুল গুজে নৃত্যগীতে অংশগ্রহণ করে। পাশাপাশি যুবকরাও তাদের ঐতিহ্যবাহী “প্লং” বাঁশি বাজিয়ে ঢোল পিটিয়ে আনন্দ-নৃত্যের মাধ্যমে ক্লবং প্লাই উৎসবকে প্রাণবন্ত করে তোলে।


















