রাজনৈতিক জীবনে লারিজানি ছিলেন অনেকটাই প্র্যাগমাটিক


আলি লারিজানিকে আমরা চিনেছি মাত্র কয়েকদিন হলো। কিন্তু ইরানের ইসলামিক রিপাবলিকের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সাথে আলি লারিজানির এবং তার পরিবারের সদস্যরা এত গভীরভাবে জড়িত, তাদেরকে তুলনা করা হয় আমেরিকার কেনেডি পরিবারের সাথে।
তার বাবা ছিলেন একজন সিনিয়র শিয়া ধর্মীয় নেতা। তার বড় ভাই ছিলেন আয়াতুল্লাহ খামেনির পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা। তার আরেক ভাই ছিলেন ইরানের বিচার বিভাগের প্রধান। তার ছোট ভাই ছিলেন ইরানের ডেপুটি স্বাস্থ্যমন্ত্রী।
আলি লারিজানি নিজে ছিলেন প্রথমে রেভোল্যুশনারি গার্ডের সিনিয়র একজন অফিসার, এরপর সংস্কৃতিমন্ত্রী, পরপর তিনবারের পার্লামেন্ট স্পিকার, একাধিকবার প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী, এক সময়ের প্রচার বিভাগের প্রধান, এবং ভিন্ন ভিন্ন সময়ে দুইবার সিকিউরিটি কাউন্সিলের প্রধান।
শুধু তাই না, পারিবারিকভাবেও তিনি ছিলেন ইসলামিক রিপাবলিকের একেবারের ভেতরের লোক। তার এক ভাইয়ের নাম একসময় আয়াতুল্লাহ খামেনির উত্তরসূরী হিসেবে জোর আলোচনায় ছিল। তিনি নিজে বিয়ে করেছিলেন আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির ঘনিষ্ঠ এক শিষ্যের মেয়েকে।
কিন্তু কেনেডি পরিবারের সাথে লারিজানি পরিবারের পার্থক্য ছিল, লারিজানি পরিবারের সদস্যরা শুধুমাত্র সরকারের উচ্চ পর্যায়েই দায়িত্ব পালন করেননি, একইসাথে জ্ঞান-বিজ্ঞান, দর্শন এবং শিক্ষা-দীক্ষায়ও তাদের সবার অর্জন ছিল ঈর্ষণীয়।
তার এক ভাই ছিলেন ইরানের সেন্টার ফর থিওরিটিক্যাল ফিজিক্সের প্রতিষ্ঠাতা। তার আরেক ভাই ছিলেন তেহরান ইউনিভার্সিটি অব মেডিক্যাল সায়েন্সের চ্যান্সেলর।
আর লারিজানি নিজে? তিনি ছিলেন একজন দার্শনিক। গণিতের উপর ব্যাচেলর শেষ করলেও পরবর্তীতে তিনি মাস্টার্স এবং ডক্টরেট করেন দর্শনের উপর। তার পিএইচডি থিসিস ছিল জার্মান দার্শনিক ইম্যানুয়েল কান্টের উপর।
পুরোটা জীবন রাজনীতির পেছনে অতিবাহিত করলেও কখনোই তিনি তার মূল দায়িত্ব থেকে দূরে সরেননি। সেটা ছিল শিক্ষকতা। তিনি ছিলেন তেহরান ইউনিভার্সিটির দর্শনের অধ্যাপক। তার অধ্যাপনার জীবনে তিনি দর্শনের উপর ছয়টা বই এবং অসংখ্য পেপার এবং নিবদ্ধ রচনা করেছেন।
রাজনীতি, দর্শন এবং গণিত – তিন শাখার উপর অবাধ বিচরণ থাকায় লারিজানি তার লেখা প্রবন্ধগুলোতে এগুলোর মধ্যে সম্পর্ক খোঁজার চেষ্টা করেছেন। এবং পশ্চিমা পত্রপত্রিকাগুলোতে প্রকাশিত তার উপর লেখা আর্টিকেলগুলো থেকে বোঝা যায়, তার শত্রুরাও এই বিষয়ে তার অগাধ পান্ডিত্য এক কথায় স্বীকার করে।
রাজনৈতিক জীবনে লারিজানি ছিলেন অনেকটাই প্র্যাগমাটিক। সরকারে থেকেও বিভিন্ন সময় তিনি সরাকরের বিভিন্ন বিষয়ের সমালোচনা করেছেন। ২০০৯ সালের সরকারবিরোধী আন্দোলনের সময় তেহরান ইউনিভার্সিটির ছাত্রদের উপর ক্র্যাকডাউনের তিনি প্রচণ্ড সমালোচক ছিলেন।
বিদেশী কূটনীতিকরা যারা তার সাথে মিশেছেন, আলোচনা করেছেন, নিউক্লিয়ার ডিল নিয়ে নেগোশিয়েট করেছেন, তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, খামেনির মৃত্যুর পর যে অল্প কয়েকজন ইরানি শীর্ষ কর্মকর্তা ছিল, যাদের সাথে পশ্চিমারা আলোচনার মাধ্যমে এক ধরনের সমঝোতায় পৌঁছতে পারত, লারিজানি ছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম।
কিন্তু সেই লারিজানিকেও গতকাল, কদরের রজনীতে, ইসরায়েল শহিদ করে ফেলল। তার পরবর্তী রিপ্লেসপেন্ট নিঃসন্দেহে আসবে আইআরজিসির রেকমেন্ডেশন অনুযায়ী, যে মোটামুটি নিশ্চিতভাবেই লারিজানির চেয়েও আরও হার্ডলাইনার হবে।
খামেনির মৃত্যুর পর আলি লারিজানিই ছিলেন ইরানের ডিফ্যাক্টো লিডার। কিন্তু অফিশিয়ালি যে পদে তিনি ছিলেন, সেই পদে তিনি ছিলেন মাত্র শেষ এক বছর ধরে।
সুতরাং ব্যাপারটা এমন না যে, এই পদে তার আর কোনো বিকল্প নেই। বরং ইরানের সিস্টেমটাই এমন, সেখানে প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী। ব্যক্তির জন্য সেখানে কোনো কিছু থেমে থাকে না। তাছাড়া এরকম রিপোর্টও আছে যে খামেনি বেঁচে থাকতেই প্রতিটা গুরুত্বপূর্ণ পদের জন্য কমপক্ষে চারজনকে মনোনয়ন দিয়ে গিয়েছিলেন।
আলি লারিজানির শাহাদাত নিঃসন্দেহে ইরানের জন্য বড় একটা আঘাত। কিন্তু সেটা এমন কিছু না, যেটা ইরান সইতে পারবে না। আল্লাহ আলি লারিজানির অপরাধসমূহ ক্ষমা করে তাকে শহিদ হিসেবে কবুল করে নিক এবং ইরানকে আমেরিকা-ইসরায়েলের আগ্রাসনের মুখে শক্তভাবে টিকে থাকার এবং বড় শয়তান এবং ছোট শয়তানের উপর শক্ত আঘাত করার সামর্থ্য দিক।
আমিন।
উৎস : লেখকের ফেইসবুক পেইজ থেকে
















