লক্ষ্মীছড়িতে মোবাইল ফোনে জ্বীনে’র বাদশা পরিচয়ে ডিজিটাল প্রতারণা

সোনার কলসী ‘গুপ্তধন’ পাওয়ার আশায় সর্বস্ব হারাচ্ছে অনেকেই 

28-10

স্টাফ রিপোর্টার, লক্ষ্মীছড়ি:

খাগড়াছড়ি জেলার লক্ষ্মীছড়ি উপজেলায় মোবাইল ফোনের মাধ্যমে জিনের বাদশা পরিচয় দিয়ে অভিনব কায়দায় ডিজিটাল প্রতারণা চলছে বেশ কয়েক দিন ধরে। এসব প্রতারণার শিকার হয়ে বেঁচে থাকার শেষ সম্বলটুকু হারাচ্ছে অনেকেই।

বিকাশের মাধ্যমে নগদ টাকা থেকে শুরু করে নির্দিষ্ট স্থানে চাহিদা মত টাকা রেখে আসতে নানা প্রলোভনে পড়ছে অনেকেই। অনুসন্ধানে জানা যায়, গভীর রাতে এক শ্রেণীর মোবাইল প্রতারক কণ্ঠ পরিবর্তন করে ‘আমি জিনের বাদশা, তোর ভাগ্য অনেক ভাল। তুই জীবনে অনেক কিছু হারিয়েছিস। এখন তোর ভাগ্য খুলে গেছে। অচিরেই তুই কোটিপতি হয়ে যাবি বাবা। তবে এর আগে তোর কিছু শর্ত পালন করতে হবে বাবা’- জাতীয় কথা বলে।

যদি কোন সচেতন ব্যক্তি হয় তাহলে গালমন্দ করে মোবাইলটি কেটে দেয়, আর যদি প্রলোভনে পড়ে যায়, তাহলে প্রতি উত্তরে বলে, ‘কী করতে হবে বাবা’। এরপর থেকেই অর্থ হাতিয়ে নেয়ার মিশন শুরু।

সোনার কলসী বা কখনো কখনো ৭টি ড্যাগ (স্বর্ণমুদ্রা) পাবার প্রলোভন দেখায়। ধর্মীয় কিছু পরামর্শ দিয়ে কিছু রীতিনীতি পালন করতে বলে। এরপর কৌশল মত বিকাশ নাম্বারে টাকা নেয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়। কাউকে বলা যাবে না, বললে তোর বড় ক্ষতি হবে, সন্তান মারা যাবে এমন কঠিন শর্ত জুড়ে দেয়। এই খপ্পরে পড়ে ২হাজার টাকা থেকে শুরু করে সাড়ে ৪লাখ টাকা পর্যন্ত হাতিয়ে নেয়ার ঘটনা ঘটেছে এই লক্ষ্মীছড়িতে। পরবর্তিতে ঐ নাম্বারে কল করলেও বন্ধ পাওয়া যায়।

রাতারাতি কোটিপতি হয়ে যাওয়ার আশায় চড়া মূল্যে সুদের বিনিময়ে অর্থ সংগ্রহ করে কিংবা স্বর্ণ, বিক্রি করে এই অর্থ বিকাশ নাম্বারে পাঠিয়ে দিয়ে যেন, নিজের পায়েউ কুড়াল মারছে অনেকেই। ঋণের বোঝা পরিশোধ করেতে ভিটে মাটি জীবনের অর্জিত শেষ সম্বলটুকু হারাচ্ছেন এভাবে। এছাড়াও মোবাইল নাম্বারে অনেক টাকা বোনাস পেয়েছেন বা দীর্ঘ দিন ধরে একই সীম ব্যবহারের ফলে দামি গাড়ি পেয়েছেন।

আবার কখনো পিতার নাম্বার সংগ্রহ করে কৌশলে নাম্বারটি বন্ধ করিয়ে সন্তান বা স্ত্রীর নাম্বারে ফোন করে বলে আপনার স্বামী সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছে লাশটি পাঠানোর জন্য টাকা লাগবে বলে জানায়। একটি বিকাশ নাম্বার দিয়ে বলে এই নাম্বারে টাকা পাঠান।

এমনি একটি ঘটনা গত ৮ জুলাই। ভুক্তভোগী এক ব্যাক্তি বলেন, বেলা ঠিক ১২টা ৪৫ মিনিট। অফিসের গ্রামীন ফোনে কল আসে। রিসিভ করার পর অত্যন্ত বিনয়ের সাথে বলে আপনি কেমন আছেন জানতে চায়। ভাবী বাচ্চারা কেমন আছে। নিজে একা থাকেন না পরিবারের সাথে থাকেন ইত্যাদি, ইত্যাদি। তার পরিচয় জানতে চাইলে, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক প্রধান কার্যালয়ের আর্ন্তজাতিক বিভাগের রেমিঢেন্স শাখা থেকে বলছি বলে পরিচয় দেন। কৌশলাদি জানার পর প্রশ্ন করেন আপনি কয়টি ফোন ব্যবহার করেন। আপনার নাম্বারগুলোতে প্যাকেজে কাজ করতে হবে এবং বাড়ির নাম্বার সহ দেন। ৩৮ পয়সা মিনিটে কলরেইট তাই আমাদের টেকনিক্যাল কিছু কাজ করতে হবে দুই ঘন্টার জন্য আপনার মোবাইলটি বন্ধ রাখবেন, তা না হলে মোবাইলটি নষ্ট হয়ে যেতে পারে। তাদের কথা মত বিশ্বাস করে মোবাইল ফোনটি বন্ধ রাখা হয়। এমন অবস্থায় ঐ লোক আমার বাড়ির নাম্বারে পরিবারের কাছে ফোন করে বলে আপনার স্বামী ম্যানেজার সাহেব অফিসের সামনে রাস্তায় ট্রাকের সাথে এক্সিডেন্ট করেছেন এবং মারা গেছেন, লাশ আনার জন্য ৭ হাজার টাকা বিকাশ নাম্বারে তাড়াতাড়ি পাঠান। কিছুক্ষণ পর আবার ফোন করে বলে এখনো প্রাণ আছে মাথার মগজ বাহির হইয়া গিয়োছে ৭ ব্যাগ রক্ত দিতে হবে তাড়াতাড়ি টাকা পাঠান। এদিকে আমার পরিবারের লোকজন ছেলে-মেয়ে কান্না-কাটি শুরু কর দিয়েছে। আমার মোবাইলে বার বার ফোন করেও বন্ধ পাচ্ছে।

সৌভাগ্য ক্রমে আমার পরিবারের অন্য সদস্যারা তাৎক্ষনিক আমার বিভাগীয় কার্যালয়ে যোগাযোগ করে খাগড়াছড়ি জেলা অফিসের মাধ্যমে লক্ষ্মীছিিড় আমার কৃষি ব্যাংক শাখা অফিসের অন্য আর একজন স্টাফের মোবাইল নাম্বার সংগ্রহ করে পরিবারের সাথে যোগাযোগ হলে স্বস্তি ফিরে আসে এবং বড় ধরনের প্রতারণা থেকে রেহাই পাই।

বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক লক্ষ্মীছড়ি শাখার ব্যবস্থাপক, এ.এইচ.এম মামুনুর রশীদ জানালেন এসব কথা। তিনি বললেন, আমার মত আর যাতে কেউ এই প্রতারণার ফাঁদে না পড়েন। মোবাইল ব্যবহারে একটু সাবধান হোন। আসলে কোন কাজ করতেই মোবাইল ফোন বন্ধ করার কোন প্রয়োজন হয় না। একটু সচেতন হলেই এসব প্রতারণা থেকে রেহাই পাওয়া সম্ভব।

এসব ঘটনা শোনার পর কেউ কেউ রসিকতা করে বলেন, তাহলে এই ডিজিটাল যুগে জিন’র বাদশারাও মোবাইল ব্যবহার করে? তাদেরও টাকার প্রয়োজন। বহিরাগত এবং স্থানীয় একটি চক্র এই অনৈতিক কাজে জড়িত থাকতে পারে বলে অনেককেই ধারনা করছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অনেকেই প্রতারিত হয়ে অসহায়ত্ব প্রকাশ করছেন নিজেকে। এই মোবাইল প্রতারক চক্রকে ধরতে না পারলে অজান্তে ধোকায় পড়ে আরো হয়ত কেউ এভাবে খপ্পরে পড়ে হারাতে পারেন সহায় সম্বল।

 

Print Friendly, PDF & Email
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও পড়ুন