পানছড়িতে ত্রিমুখী উৎসবের সাজ : পূজা-ঈদ ও কঠিন চীবরকে ঘিরে চলছে খুশীর জোয়ার
শাহজাহান কবির সাজু, পানছড়ি:
হিন্দু সম্প্রদায়ের শারদীয় দুর্গোৎসব, মুসলমানদের পবিত্র ঈদুল আযহা ও বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের দানোৎত্তম কঠিন চীবরকে ঘিরে পানছড়ির সর্বত্র লেগেছে উৎসবের সাজ। প্রতিটি পাড়ায় পাড়ায় বাজছে উৎসবের সূর।
ধনী-গরিব সকলের ঘরে ঘরে চলছে উৎসবের প্রস্তুতি। চলতি বছর হিন্দু সম্প্রদায়ের শারদীয় দুর্গোৎসব, মুসলমানদের পবিত্র ঈদুল আযহা ও বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের দানোত্তম কঠিন চীবর দানোৎসব খুব কাছাকাছি সময়ে হওয়ায় সকল সম্প্রদায়ের মাঝে বিরাজ করছে উৎসবমুখর পরিবেশ।
মাসব্যাপী উৎসবের আনন্দে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান আর মুসলিম যেন জাতিগত সব বিভেদ ভুলে মিলেছে এক কাতারে। পাহাড়ের এই উৎসব ভুলিয়ে দিয়েছে জাতিগত বিভেদ। সবাই ভুলে যায় কে পাহাড়ী বা কে বাঙ্গালী। সবাই মেতে উঠে ধর্মীয় উৎসবের অনাবিল এক আনন্দ আয়োজনে। তৈরী হয় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক নজিরবিহীন দৃষ্টান্ত। সব মিলে ধর্মীয় উৎসবগুলো জাতিগত ভেদাভেদের শেকড়কে উপড়ে ফেলে। সকলের আন্তরিকপূর্ণ উপস্থিতিতে উৎসবগুলো হয়ে উঠে প্রাণবন্ত।
২৯ সেপ্টেম্বর’১৪ থেকে শুরু হওয়া শারদীয় দূর্গোৎসব চলবে ৪ অক্টোবর’১৪ পর্যন্ত। পানছড়ির ৮টি পূজামন্ডপে একযোগে চলবে হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রধান এ ধর্মীয় উৎসব। অন্যান্য বছরের তুলনায় এবছর অধিকাংশ পূজামন্ডপেই তৈরি করা হয়েছে দৃষ্টিনন্দন প্রতিমা। শিল্পীর মননশীল চিন্তা, নিপুণ হাতের প্রাণবন্ত ছোঁয়া ও নিখুঁত কারুকাজে প্রতিমাগুলোকে সাজানো হয়েছে নান্দনিক সাজে। পাশাপাশি নয়নাভিরাম সাজে সাজানো হয়েছে পূজামন্ডপগুলোকে। আর কেনা-কাটায়ও পিছিয়ে নেই হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন। শান্তিপূর্ণ পরিবেশে দুর্গোৎসব সম্পন্ন করতে প্রতিটি মন্ডপে নেয়া হচ্ছে বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থা। টহল দিবে নিরাপত্তার কাজে নিয়োজিত মোবাইল টিম। হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রধান ধর্মীয় উৎসব দূর্গাপূজা শেষ হতে না হতেই সম্ভবত আগামী ৬ অক্টোবর পালিত হবে মুসলমানদের অন্যতম ধর্মীয় উৎসব পবিত্র ঈদ-উল আযহা।
পবিত্র ঈদ-উল আযহা পালনেও যে যার সামর্থ্য অনুযায়ী প্রস্তুতি প্রায় শেষ করে এনেছে মুসলমানরা। এ উৎসবকে ঘিরে ইতিমধ্যে পানছড়ির বাজারগুলোতে জমে উঠেছে কোরবানীর পশুর হাট। কোরবানীর পশুর হাটকে ঘিরেই চলছে প্রাথমিক উৎসব। রবিবার হাটবারে পানছড়ি সদর বাজারে প্রচুর গরুর সমাগম ঘটেছিল এবং ক্রয়কৃত গরুর রশি ধরে বাপ-ছেলের গরু টানাটানির দৃশ্যগুলোও ছিল চোখে লেগে থাকার মত।
এদিকে মুসলমানদের ঈদের আনন্দ কাটতে না কাটতেই শুরু হবে বৌদ্ধ ধর্মালম্বীদের ঐতিহ্যবাহী উৎসব দানোৎত্তম কঠিন চীবর দানোৎসব। কঠিন চীবর দানোৎসবকে সামনে রেখে পাহাড়ী জনপদের বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের ঘরে ঘরে চলছে উৎসব প্রস্তুতি। এ উৎসবে তাদের নতুন জামা-কাপড় কেনাকাটার রেওয়াজ না থাকলেও এই ধর্মীয় উৎসব আয়োজন ও পালনে তাদের মাঝে উৎসাহের কোনো কমতি নেই। আগামী ৮ অক্টোবর’১৪ থেকে পার্বত্য জনপদ পানছড়ির বিভিন্ন বৌদ্ধ মন্দিরে পালন করা হবে ঐতিহ্যবাহী কঠিন চীবর দানোৎসব। এসময় পাহাড়ের আকাশে আকাশে ভেসে বেড়াবে ফানুস বাতির আলোকসজ্জা।
দক্ষিন এশিয়ার সবচেয়ে বড় বৌদ্ধ বিহার হিসাবে খ্যাত পানছড়ি শান্তিপুর অরণ্য কুটিরে কঠিন চীবর দানোৎসব অনুষ্ঠিত হবে ১৭-১৮ অক্টোবব । তাই প্রতি বছরের ন্যায় এবারও কুটিরকে সাজানো হচ্ছে বর্ণিল সাজে। প্রতিদিন শত শত দায়ক-দায়িকা অংশ নিচ্ছেন বৌদ্ধ মন্দিরগুলোর প্রস্তুতির কাজে। প্রতিটি বৌদ্ধ মন্দিরেই চলছে কঠিন চীবর দানোৎসব উদযাপনের প্রস্তুতি। দানোৎত্তম কঠিন চীবর দানোৎসবকে ঘিরে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী সম্প্রদায়ের এ ধর্মীয় উৎসবগুলোতে থাকেনা কোন জাতিগত ভেদাভেদ। সকল সম্প্রদায়ের মানুষের উপস্থিতিতে এই ধর্মীয় উৎসবগুলো হয়ে উঠে প্রাণবন্ত।
এ ত্রিমুখী উৎসব উপলক্ষে পানছড়ির বিভিন্ন জায়গায় শোভা পেয়েছে নানা রংঙের ডিজিটাল ব্যানার। শারদীয় দূর্গা পূজার শুভেচ্ছা, ঈদুল ্আযহার শুভেচ্ছা ও কঠির চীবর দানের শুভেচ্ছা লিখা ডিজিটাল ব্যানারগুলো অনুষ্ঠানকে আরো প্রাণবন্ত করে তুলবে বলে মত ব্যক্ত করেন অভিজ্ঞ মহল। এই ত্রিমুখী আনন্দে যাতে ভাটা না পড়ে সেই লক্ষে প্রতি মুহুর্তে মুহুর্তে খোঁজ নিচ্ছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জাহিদ হোসেন সিদ্দিক। তাছাড়া নিরাপত্তায় কাজ করবে ২০ বিজিবি, পানছড়ি সাব জোন, পুলিশ ও আনসার বাহিনীর সদস্যরা। পানছড়ির সর্বশেষ সীমানা বাম্বু পাড়া হইতে লোগাং পর্যন্ত বিভিন্ন পূজামন্ডপ এরি মাঝে পরিদর্শন করেছেন পানছড়ি থানা অফিসার ইনচার্জ মো: আব্দুস সামাদ মোড়ল। গত ২০/৯/২০১৪ ইং তারিখ পানছড়ির বিভিন্ন পূজা মন্ডপে আর্থিক সহায়তা প্রদান অনুষ্ঠানে ২০ বিজিবি লোগাং জোন অধিনায়ক লে: কর্ণেল মো: আতিকুর রহমান জানান, বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদি চলাকালে আইন শৃংঙ্খলার পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পানছড়িস্থ ২০ বিজিবি লোগাং জোনের মোবাইল টিমও কাজ করবে। তাছাড়া পানছড়ি সাব জোন কমান্ডার মেজর মেহেদি হাসান রাসেল জানান, ত্রিমুখী আনন্দ উপভোগ করার জন্য নিরাপত্তার কাজে সেনাবাহিনীর টহল অব্যাহত থাকবে। সব মিলিয়ে ত্রিমুখী উৎসবের জন্য প্রস্তুত পানছড়ি।


















